পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির সফলতা

শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জনসম্পর্কের মাধ্যমে দুই দেশের জনগণের মধ্যে বোঝাপড়া বাড়ছে। বাংলাদেশের জন্য সুবিধা-নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ এবং রফতানি বাড়ানোর সম্ভাবনা। আঞ্চলিক রাজনীতিতে আরো শক্তিশালী অবস্থান তৈরি। মুসলিম বিশ্বের কূটনৈতিক ঐক্যে সক্রিয় ভূমিকা রাখার সুযোগ, সম্প্রতি পাকিস্তান বাংলাদেশের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং তারা হাইপারসনিক মিসাইল এবং ড্রোন প্রযুক্তিতে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে আগ্রহী হয়েছে যা বাংলাদেশের নিরাপত্তার নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য অন্যতম সহযোগী হতে পারে

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনার সময় পাকিস্তানের মধ্যস্থতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার পররাষ্ট্রনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সফলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরান-আমেরিকা সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনাপূর্ণ। বর্তমান যুদ্ধে পাকিস্তান আলোচনার সেতুবন্ধ তৈরি করে সঙ্ঘাত প্রশমনের চেষ্টা করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলতে থাকলে পাকিস্তানসহ গোটা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকবে। এই উদ্যোগ পাকিস্তানকে শুধু দক্ষিণ এশিয়ার খেলোয়াড় নয়; বরং বৈশ্বিক কূটনীতির সক্রিয় অংশীদার হিসেবে তুলে ধরেছে। দেশটি দেখিয়েছে, সে শুধু নিজের স্বার্থ নয়; বরং আন্তর্জাতিক শান্তি ও সহযোগিতার জন্য কাজ করতে প্রস্তুত। এটি তার পররাষ্ট্রনীতিকে আরো বিশ্বাসযোগ্য ও সম্মানজনক করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা, আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং অর্থনৈতিক কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেয়ার মাধ্যমে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতিতে চমক দেখিয়েছে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা পাকিস্তানের অন্যতম বড় সাফল্য।

পাকিস্তান, ভারত, আফগানিস্তান, ইরান ও চীনের সাথে সীমান্ত ভাগ করে। ফলে এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডোর। পাকিস্তান চীনের পশ্চিমাঞ্চলকে আরব সাগরের সাথে যুক্ত করে, যা চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আফগানিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের নিকটবর্তী হওয়ায় পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সামরিক কৌশলের অংশ। পাকিস্তান তার অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে একদিকে চীনের সাথে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা বাড়িয়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এভাবে ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান পাকিস্তানকে দুই পরাশক্তির কাছে অপরিহার্য করে তুলেছে।

অর্থনৈতিক স্বার্থ : চীনের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক মূলত অবকাঠামো ও বিনিয়োগকেন্দ্রিক (যেমন- সিপিইসি, চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর), অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের অন্যতম বড় রফতানি বাজার, বিশেষ করে টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্পে। ফলে অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে উভয় দেশের সাথে সম্পর্ক অপরিহার্য এবং সামরিক সহযোগিতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।

কূটনৈতিক ভারসাম্য : একদিকে চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতা পাকিস্তানকে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা আন্তর্জাতিক মঞ্চে গ্রহণযোগ্যতা ও সহায়তা নিশ্চিত করে।

নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা : এটি বলা যায়, পাকিস্তান তার কূটনৈতিক দক্ষতা দিয়ে দুই পরাশক্তির সাথে সম্পর্ক রক্ষা, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভারসাম্য বজায় রেখে নিজস্ব স্বার্থ সমুন্নত রাখতে সক্ষম হয়েছে। দেশটি জোটনিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করছে, যাতে কোনো বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে না পড়ে। মধ্যপ্রাচ্যের সাথে পাকিস্তানের নিবিড় সম্পর্ক তার পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়।

পাকিস্তানি শ্রমিকরা সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারে বিপুল সংখ্যায় কাজ করে। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস, যা অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে।

এই অর্থনৈতিক সহযোগিতা শুধু অর্থনীতিকেই শক্তিশালী করেনি; বরং কূটনৈতিক সম্পর্কও দৃঢ় করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো পাকিস্তানের রাজনৈতিক অবস্থানকে গুরুত্ব দেয়, কারণ তারা জানে, পাকিস্তান তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখছে। পাকিস্তান তেল ও গ্যাসের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। এই সম্পর্ক তার জ্বালানি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ইসলাম ধর্মের কারণে পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে একটি স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সংযোগ রয়েছে, যা রাজনৈতিক সম্পর্ক আরো গভীর করে।

মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ কাশ্মির ইস্যুতে পাকিস্তানের অবস্থান সমর্থন করে। এতে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মঞ্চে মুসলিম বিশ্বের ঐক্য প্রদর্শন করতে পেরেছে। পাকিস্তান সবসময় ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। পাকিস্তান ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা- ওআইসির মাধ্যমে মুসলিম দেশগুলোর সাথে একত্রে কাজ করে। কাশ্মির ও ফিলিস্তিনের মতো ইস্যুতে পারস্পরিক সমর্থন পাকিস্তান-মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্ককে শুধু রাজনৈতিক নয়; বরং আদর্শিক ও কৌশলগতভাবে শক্ত অবস্থান দিয়েছে।

সৌদি আরবের সাথে পাকিস্তান নিরাপত্তা চুক্তি করেছে। এই নিরাপত্তা চুক্তি দুই দেশের মধ্যে সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা বাড়িয়েছে। এতে পাকিস্তান তার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান আরো শক্তিশালী করেছে এবং আঞ্চলিক হুমকি মোকাবেলায় সক্ষমতা বাড়িয়েছে। পাকিস্তানি সেনারা সৌদি সেনাদের প্রশিক্ষণ দেয়, আবার সৌদি আরবও পাকিস্তানের নিরাপত্তাব্যবস্থায় সহায়তা করে।

তুরস্কের সাথে পাকিস্তানের সামরিক চুক্তি : পাকিস্তান ও তুরস্ক নিয়মিত যৌথ সামরিক মহড়া পরিচালনা করে, যা দুই দেশের সেনাবাহিনীর দক্ষতা ও সমন্বয় বাড়ায়। তুরস্ক পাকিস্তানকে আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করে। নৌবাহিনীর জন্য যুদ্ধজাহাজ নির্মাণে সহযোগিতা করছে। দেশ দু’টি নিরাপত্তা ও ঐক্য জোরদার করতে একে অপরকে সমর্থন করে।

তুরস্কের মতো শক্তিধর দেশের সাথে পাকিস্তান সম্পর্ক জোরদার করে মুসলিম বিশ্বের ঐক্য প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়েছে। এই সহযোগিতা পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়িয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার কূটনৈতিক অবস্থান আরো দৃঢ় করেছে। তুরস্কের সাথে সামরিক সহযোগিতা পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতিকে শুধু নিরাপত্তার দিক থেকে নয়; বরং কৌশলগত ও কূটনৈতিক দিক থেকেও সমৃদ্ধ করেছে।

ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার সাথে পাকিস্তান বিশেষ সম্পর্ক তৈরি করেছে। দেশটি ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার সাথে বাণিজ্য বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বিশেষ করে হালাল খাদ্য শিল্প, টেক্সটাইল ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা তিন দেশের জন্যই লাভজনক। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়ায় তিন দেশের মধ্যে একটি স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐক্য রয়েছে। ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া প্রায়ই একে অপরকে সমর্থন করে। কাশ্মির ও ফিলিস্তিনের মতো ইস্যুতে পাকিস্তানকে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া সমর্থন করেছে, আবার পাকিস্তানও তাদের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অবস্থানকে গুরুত্ব দিয়েছে।

ইউরোপে সফলতা : পাকিস্তান ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে বাণিজ্য বাড়াচ্ছে, বিশেষ করে টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্পে। জিএসপি+ সুবিধা ইউরোপীয় বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাকিস্তানের রফতানি বাড়াতে সহায়তা করেছে। ইউরোপীয় দেশগুলো পাকিস্তানে প্রযুক্তি ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করছে।

আফ্রিকায় সফলতা : আফ্রিকার দেশগুলোতে পাকিস্তান কৃষিপণ্য, ওষুধ ও টেক্সটাইল রফতানি করছে। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সাথে পাকিস্তান নতুন কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে, যা ব্যবসায়-বাণিজ্যকে সহজ করেছে। তাদের সাথে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা করছে।

ইউরোপ ও আফ্রিকার সাথে সম্পর্ক পাকিস্তানের অর্থনীতি বহুমুখী করেছে। এভাবে দেখা যায়, কূটনৈতিক দক্ষতা পাকিস্তানকে শুধু আঞ্চলিক নয়; বরং বৈশ্বিক পর্যায়েও ব্যবসায়-বাণিজ্যে দ্রুত অগ্রসর হতে সাহায্য করছে।

সম্প্রতি পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি দুই দেশের জন্যই তাৎপর্যপূর্ণ। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ বাণিজ্য বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। বিশেষ করে টেক্সটাইল, কৃষি ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা দুই দেশেরই অর্থনীতি শক্তিশালী করতে পারে। অতীতের কিছু জটিলতা কাটিয়ে দুই দেশ এখন পারস্পরিক আস্থা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর একত্রে কাজ করার জন্য পাকিস্তান-বাংলাদেশ সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এটি সার্কের মতো আঞ্চলিক সংগঠনকে আরো কার্যকর করতে পারে। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জনসম্পর্কের মাধ্যমে দুই দেশের জনগণের মধ্যে বোঝাপড়া বাড়ছে। বাংলাদেশের জন্য সুবিধা-নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ এবং রফতানি বাড়ানোর সম্ভাবনা। আঞ্চলিক রাজনীতিতে আরো শক্তিশালী অবস্থান তৈরি। মুসলিম বিশ্বের কূটনৈতিক ঐক্যে সক্রিয় ভূমিকা রাখার সুযোগ, সম্প্রতি পাকিস্তান বাংলাদেশের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং তারা হাইপারসনিক মিসাইল এবং ড্রোন প্রযুক্তিতে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে আগ্রহী হয়েছে যা বাংলাদেশের নিরাপত্তার নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য অন্যতম সহযোগী হতে পারে।

বৈশ্বিক পর্যায়ে পাকিস্তানকে সক্রিয় ও দায়িত্বশীল কূটনৈতিক খেলোয়াড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে পাকিস্তানের শত্রুরা দেশটিকে অস্থিতিশীল এবং অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। পাকিস্তানের সফলতা নির্ভর করে এই আগ্রাসন থেকে নিজেকে রক্ষা করার সক্ষমতার মধ্যে।

লেখক : সিনিয়র ফেলো, এসআইপিজি, নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটি

[email protected]