তিতুমীরের প্রেরণার ট্রান্সফরমেশন

তিতুমীরের এই প্রতিবাদ সংগ্রাম যুগ যুগ ধরে থাকবে। তিতুমীর চব্বিশ উত্তর সময়ে এসেও তিতুমীর। এরা মরে না। এরাই সমাজের প্রেরণা হিসেবে টিকে থাকে। এই শক্তি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে। কেল্লা তত্ত্বের ট্রন্সফরমেশন হয় কালের আবর্তে।

ওমর বিশ্বাস
আধিপত্যবাদ ঝড়ের বিপরীতে রুখে দাঁড়ানোর প্রতীক ছিলেন তিতুমীর। তিনি কি জানতেন না তিনি বিশাল এক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। কতটুকু লড়াই করতে পারবেন? এটি কি জানতেন না, তার এই বাঁশের কেল্লা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য শক্তির বিরুদ্ধে কতটুকু শক্তিশালী এবং প্রতিরক্ষার জন্য কতটা কার্যকর? এই শক্তি সম্পর্কে তার কি ধারণা ছিল না? অবশ্যই ছিল। তিনি জানতেন এবং জেনেই এই লড়াই সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তাকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেছিল। এই দেশপ্রেম তাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করে। তিনি রুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সাহসের সাথে দৃঢ়তা প্রদর্শন করতে পেরেছিলেন।

বাঁশের কেল্লা কি ছিল? স্থানীয় জমিদার, নীলকরদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সাথে ব্রিটিশের হাত থেকে গোলামি মুক্ত হওয়ার নাম। কেন তিনি এই বাঁশের কেল্লা তৈরি করেছিলেন? তিনি সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কারের জন্য প্রথমে এই আন্দোলন সূচনা করে একপর্যায়ে বৃহত্তর প্রতিরোধের জন্য বাঁশের কেল্লা তৈরি করেন।

তিতুমীর কে ছিলেন? কি তার উদ্দেশ্য ছিল? সেটি আমাদের বুঝতে হবে। তিতুমীর ছিলেন সৌর্য-বীর্যের প্রতীক। মানসিক সাহসের এক মহাবীর। তিনি জানতেন সমাজ সংস্কার জরুরি। প্রতিরোধে বিকল্প নেই। শক্তির ভারসাম্য না থাকলেও ক্ষুদ্র শক্তিও বড় শক্তিকে মোকাবেলা করতে পারে। প্রতিরোধ করতে পারে যদি তার বুকে হিম্মত থাকে এবং যদি সে তা কার্যকর করতে পারে। তার একটি স্বপ্ন ছিল, তিনি সে স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছিলেন।

তিতুমীরের সত্যি কি সামর্থ্য ছিল আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর? সেই সামর্থ্য সামরিক শক্তির অর্থে ছিল না। সেটি ছিল মানসিক দৃঢ়তার। আমাদের এই দৃঢ়তার বড় অভাব। তিতুমীরের কথা এ জন্যই বারে বারে আসে। আমাদের তিতুমীরের মতো রুখে দাঁড়াতে হবে। কোনো লড়াই সংগ্রামে আমরা যেন মাথা নত না করি। এই লড়াই সংগ্রাম কার সাথে? আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এই লড়াই। অপশক্তির বিরুদ্ধে এ লড়াই। এটি দেশের জন্য স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের জন্য লড়াই। মাথা নত করা মানে পরাজিত হওয়া। আমরা নিজেদেরকে লড়াকু জাতি হিসেবে মনে করি। আমাদের এই বিশ্বাসটুকু রাখতে হবে সাহসের সাথে। আমাদের যার যার অবস্থান থেকে যেকোনো বিষয়ে প্রতিবাদ করা উচিত। লড়াই সংগ্রাম অব্যাহত রাখা উচিত। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে সংগ্রাম ও লড়াই অব্যাহত থাকলে জাতীয় ঐক্য সম্ভব। তখন আমার আভ্যন্তরীণ শক্তিকে বিশাল শক্তিতে পরিণত করতে পারব।

ব্যক্তি স্বার্থে আমরা ক্ষুদ্র প্রতিবাদকে ছেড়ে দেই। ছোট বড় সব ধরনের অন্যায়ের কাছে হার মেনে যাই। আমরা ক্ষুদ্র অন্যায়কে প্রায় অবহেলা করি। অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে নিতে পারি না। সমাজে অন্যায় কমে না বাড়ে। এমনকি তুচ্ছ প্রতিবাদকে তাচ্ছিল্য করায় অন্যায়গুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সেখানে অপশক্তি বিজয়ী হয়ে আধিপত্যবাদ কায়েম করে। এই হার মানাটা আমাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। যার জন্য আমরা সমাজে প্রতিপদে পদে বিপর্যস্ত হই। গোষ্ঠীস্বার্থ আমাদেরকে পদানতা করে রাখে। এতে সমাজে অনিয়ম বাড়ে। আমরা অনিয়মকে প্রশ্রয় দেই। মেনে নেই অন্যায় অবিচার। এসব বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতায় সমাজের মন্দগুলো আরো দানা বাঁধে। সেখানে সুযোগ-সন্ধানীদের চোরা গর্তে লুকিয়ে থাকে কায়েমি স্বার্থবাদীরা। ঘুষ-দুর্নীতি, অনিয়ম-অন্যায়-অবিচার বাড়তে থাকে। আমরা ঝামেলা এড়াতে গিয়ে ভুলে যাই এগুলো আমাদের সমাজের জন্য ক্ষতিকর। রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার ক্ষেত্রেও অন্যায়ের প্রতিবাদ প্রতিরোধ করতে পারি না। সেখানে বৃহৎ স্বার্থ কীভাবে সংরক্ষিত থাকবে? বৃহৎ স্বার্থে কীভাবে ঐক্য প্রতিষ্ঠা হবে?

আমরা অনিয়মের মতো সমাজের সামান্য অন্যায়কে অন্যায় মনে করি না। অনেক সময় মেনে নিয়ে প্রশ্রয় দেই। ঝামেলার মনে করে ঝামেলা এড়িয়ে যাই। এতে ন্যায়ের ওপর অন্যায়টা চেপে বসতে সাহস পায়। গুটিকয়েকের অসৎ চিন্তা, ধ্যান-ধারণা, কাজ প্রাধান্য পায় ন্যায়নীতির ওপর। তারা চেপে বসে গোটা জাতির ওপর। এরই ছিদ্রপথ দিয়ে ঢুকে পড়ে অপশক্তি। দুই দিক দিয়ে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হইÑ অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা কাঠামোর মূলে আঘাত দিতে দিতে তাকে ভঙ্গুর করা হয় এবং আধিপত্যবাদের প্রবেশ ও বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়।

আমরা এটি করতে পারি না বলে ফ্যাসিবাদের জন্ম হয়। এই ফ্যাসিবাদ এক সময় আমাদের গিলে খায়। ততদিনে আমাদের অনেক ক্ষতি হয়ে যায়। আমাদের মস্তিষ্ক সজাগ হতে হতে অস্তিত্ব ভূলুণ্ঠিত হয়ে পড়ে।

তিতুমীরের এই মূল প্রেরণাশক্তিকে আমাদের বুঝতে হবে। এটি একজন মানুষের একার লড়াই নয়। এটি সাম্রাজ্যবাদ শক্তির ক্রিয়াশীল কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে লড়াই। তাদের অন্যায় অপকর্মের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর লড়াই। তিতুমীরের কাছে নীলকরের অস্তিত্ব মেনে নেয়ার থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই ছিল বড়। এ জন্য তিনি তার শক্তি সামর্থ্যরে ব্যাপারে জানার পরও প্রতিরোধ সংগ্রামকে বেছে নিয়েছিলেন। পরিণতি মৃত্যুও হতে পারে। তিনি জেনেবুঝে শহীদ হিসেবে মৃত্যুকে বেছে নিয়েছিলেন।

তার স্বপ্ন ছিল স্বাধীনতা। তিনি একটি দেশকে মুক্ত করতে তার জাতিকে জাগ্রত করতে চেয়েছিলেন। জাগাতে চেয়েছিলেন মানুষের ভেতরের সুপ্ত থাকা মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর চেতনাকে। তার লড়াই ছিল জনসাধারণকে ঐক্যবদ্ধ করার এবং সাম্রাজ্যবাদ শক্তির বিরুদ্ধে অস্তিত্বের সংগ্রামে পথ দেখানোর। তিতুমীরের সার্থকতা এখানে।

এই অপসামাজিক শক্তির বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে রুখে দাঁড়াতে হয় যেন রাষ্ট্রের অর্গানগুলো ক্রিয়াশীল থাকে এবং রাষ্ট্র তার স্বাভাবিক গতি বজায় রাখতে পারে। এর জন্য অপসংবাদ, অপশক্তির মোকাবেলায় সক্ষমতা অর্জন প্রয়োজন রাষ্ট্রের স্বার্থে, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে এবং সর্বোপরি জনগণের স্বার্থে। ব্যক্তি ভূমিকা অনুপস্থিত থাকলে সমাজে আঘাত আসে। সামাজিক শক্তি দুর্বল হলে অপশক্তি সুযোগ নেয়। সামাজিক শক্তি পরাভূত হলে অপশক্তির উত্থান হয়। অপশক্তি টিকে গেলে সমাজ বিপর্যস্ত হয়। সেখানে রাষ্ট্রকে দুর্বল করার চক্রান্ত চলে। জনগণের শক্তি দুর্নিবার না হলে রাষ্ট্রের ওপর আঘাত আসে।

আমাদের তিতুমীরের সংগ্রামের প্রাণশক্তিকে বুঝতে হবে। সেটা শুধু নীলকরের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ লড়াই হিসেবে দেখলে হবে না। সেটি ছিল একটি শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই। বিশাল আধিপত্যবাদী সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াই। সে লড়াই সক্রিয়ভাবে অবতীর্ণ হয়ে তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন আধিপত্যবাদ শক্তির বিরুদ্ধে। তিনি তাদের অন্যায়কে মেনে নেননি, জীবন দিয়েছিলেন। আজো সেই বাঁশের কেল্লার লড়াই সাহসের প্রেরণা হয়ে টিকে আছে। কেন এটি টিকে আছে তা আমাদের বুঝতে হবে। তাই তিতুমীরের লড়াইকে আমাদের সামগ্রিক বিবেচনায় রাখতে হবে। তিতুমীরের সংগ্রাম যুগ যুগ ধরে রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে শক্তিশালী করার সাহস জোগায়। আমাদের সামনে উপস্থিত হয় একটি বাস্তব কেল্লার শক্তির প্রেরণা হয়ে। সেই কেল্লা তত্ত্ব যুগ যুগ ট্রান্সফর্ম হয়। জনগণকে উজ্জীবিত করে উদ্বুদ্ধ করে। জনগণের দেশপ্রেমে শক্তির সাহস জোগায়। যারা ধারণ করতে পারে তারা বিজয়ী হয়।

বাঁশের কেল্লা মুক্তি সংগ্রামের একটি নাম। বাঁশের কেল্লার মাধ্যমে আধিপত্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ শক্তির বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় হয়নি। কিন্তু চূড়ান্ত বিজয়ের পথকে সুগম করেছিল। শক্তি ও সাহসে উদ্বুদ্ধ করেছিল। মুক্তিকামী মানুষকে মুক্তির পথে জড়ো হতে সাহায্য করেছিল। তিনি আজাদী সংগ্রামের একটি আন্দোলন সূচনা করেছিলেন। মানুষের ভেতরে সুপ্ত স্বাধীনতার সংগ্রামকে জাগ্রত করেছিলেন। এই আজাদী সংগ্রামের বহু পর্যায়ে যুক্ত হয়েছিল আরো অনেক বীর সেনানী। তাদের দ্বারা একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক শক্তি সঞ্চারিত হয়েছিল। তাদের মানসিকতা ছিল দৃঢ় ও নিখাদ। এই বাঁশের কেল্লা সেই আজাদী আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

এরা পরাজিত হয় না। দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় অনুপ্রেরণা হয়ে থাকে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত মানুষের প্রেরণার উপলব্ধি হয়ে আছে। বাঁশের কেল্লা এভাবে মানুষকে সাহস ও লড়াইয়ের শক্তি জুগিয়েছে। যে লড়াই ছিল অধীনতা থেকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর লড়াই। এই জিনিসটি আমাদের মনে রাখতে হবে। লড়াই অব্যাহত রাখতে না পারলে মানুষ যেকোনো সময় হোঁচট খেতে পারে। মানুষের মুক্তির চিন্তা বিপর্যস্ত হতে পারে। দুর্বলের প্রতি আধিপত্যের থাবা নেমে আসতে পারে। মানুষের মুক্তি মানসিকতা পরাধীনতার অধীনস্তে থাকতে পারে না। একে দৃশ্যমান, অদৃশ্য শক্তি বারবার বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড় করায়। সেখান থেকেই মানুষের মুক্তির প্রয়োজন।

তিতুমীরের এই প্রতিবাদ সংগ্রাম যুগ যুগ ধরে থাকবে। তিতুমীর চব্বিশ উত্তর সময়ে এসেও তিতুমীর। এরা মরে না। এরাই সমাজের প্রেরণা হিসেবে টিকে থাকে। এই শক্তি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে। কেল্লা তত্ত্বের ট্রন্সফরমেশন হয় কালের আবর্তে।

[email protected]