বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে বিলীনপ্রায় বামপন্থীরা। দূরবীন দিয়ে খুঁজলেও এখন আর কোনো বামপন্থী পাওয়া যাবে না- তা সে চীনপন্থী হোক আর রুশপন্থীই হোক। ভারতের কেরালা, পশ্চিম বাংলা হোক কিংবা খোদ রাশিয়া, চীন, কিউবা, যুগোস্লাভিয়া, চেক বা পোল্যান্ড হোক সমাজতন্ত্রের দুর্গগুলো থেকে মাত্র দেড় শ’ বছরের মধ্যে এই মার্কসবাদী-লেনিনবাদী শাসনব্যবস্থা ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল।
১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সমাজতন্ত্রের লাল ঝাণ্ডা উঠেছিল। এর পর বড় জাগরণ নিয়ে আসে চীনের সমাজতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব। সোভিয়েত বিপ্লবের তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে কিউবা থেকে শ্রীলঙ্কা কিংবা চিলি থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত। সেই লাল রঙ ফিকে হতে হতে আজ নিশ্চিহ্ন। সমাজতন্ত্র আসলে একটি প্রকৃতি-বিরুদ্ধ ব্যবস্থা; তাই প্রকৃতিই তাকে খারিজ করে দিয়েছে। নীতিগতভাবে সমাজতন্ত্রের মূলমন্ত্র ছিল সাম্য ও একতা। ছিল সর্বহারা শ্রেণীর রাজত্ব প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার। তবে কার্যত সাম্যের পরিবর্তে একদলীয় শাসনব্যবস্থার সমুদয় কুফল একসাথে হয়ে বাম-স্বৈরতন্ত্র কায়েম হয়। যেখানে মৃত্যু অথবা মৃত্যুদণ্ড ছাড়া শাসক বদলের কোনো পথই থাকে না। যেমন, এক ঘণ্টার বিচারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় নিকোলাই চসেস্কুর। তার সাথে মরতে হয় তার স্ত্রী ও পরিবারের সব সদস্যকে।
সমাজতন্ত্রের আঁতুড়ঘর খোদ রাশিয়ায় পতন শুরু হয় সমাজতন্ত্রের। আশির দশকে ‘গ্লাসনস্ত’ এবং ‘পেরেস্ত্রয়কা’ নামের সুবিধাবাদী সংস্কারের নামে সাম্রাজ্যবাদের সাথে গাঁটছড়া বাঁধেন মিখাইল গরবাচেভ-এর মতো একনায়ক। সোভিয়েত দেশ ছেয়ে যায় কোকাকোলার ব্যানারে। অথচ আমেরিকার সাথে চুটিয়ে বাণিজ্য করা শুরু করলেও কোকাকোলার একটি বোতলও চীনারা গ্রহণ করেনি। তারা উৎপাদন ও ব্যক্তি উদ্যোগের স্বীকৃতি দিলেও শাসন ও নৈতিকতার প্রশ্নে ধরে রাখে সমাজতন্ত্রের আদর্শ।
রাশিয়া যেখানে সংশোধনবাদের পথ ধরে দেশজুড়ে সমাজতন্ত্রের বদলে অতিপরতন্ত্র (অভিগারসি) কায়েম করে, চীনারা সেখানে ব্যক্তি উদ্যোগের সাথে জনকল্যাণের মিশেলে জগৎকে অবাক করে দিয়ে মাত্র ২৫ বছরের মধ্যে পৃথিবীর ২০তম বড় অর্থনীতিকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত করে।
বিশ্বের বামপন্থী মতবাদের শব মিছিলে শরিক বাংলাদেশের অবস্থা সত্যি একটি বৈশ্বিক নজির। অবশ্য বাংলাদেশের বামপন্থীদের নির্মূল হওয়ার সূচনা হয় মস্কো-পিকিং বিরোধ থেকে। আর তাদের গণবিচ্ছিন্নতার মূল কারণ ধর্মের বিরোধিতার সাথে ভারতীয় শঠতা। ১৯৬৫ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত এ দেশের বাম রাজনীতির রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও আনুগত্য ছিল হিন্দু নেতাকর্মীদের দখলে। তারা বাংলাদেশের মজদুর শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে ভারতের কেন্দ্রীয় কংগ্রেস বা টাটা-বিড়লা-মফতলাল-বাজাজ-গোয়েংকা পুঁজিবাদের এত বড় বাজার দখলের স্বার্থে মদদ জোগায়। তারা অশান্তি হানাহানির লক্ষ্যে অবস্থাপন্ন গৃহস্থ কৃষকদের ‘সীমান্ত প্রভু’ আখ্যা দিয়ে তাদের গলা কাটা শুরু করে, এটা বেশি ঘটে খুলনা থেকে দিনাজপুর পর্যন্ত। ‘নকশালবাড়ির লাল আগুনে পূর্ববাংলা জ্বলবে’ এই ছিল তাদের রণধ্বনি। অথচ ইউরোপের মতো এই দেশে তেমন কোনো বড় সামন্তবাদী ভূমি প্রভুর অস্তিত্ব ছিল না। কেননা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে একটি বুর্জোয়া দল হয়েও মুসলিম লীগ সরকার ১৯৫০ সালে এ দেশের জমিদারি প্রথা রদ করে। এ ছাড়া ঋণ সালিশি বোর্ড প্রতিষ্ঠার মতো সংস্কার আইন প্রত্যয়ন করে মুসলিম লীগ সরকার এ দেশের সামন্ত প্রথা একপ্রকার নির্মূল করে। এ সংস্কারের অন্যতম প্রবাদপুরুষ ছিলেন বাংলার কৃষক প্রজাদের প্রাণপ্রিয় নেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক।
অতি সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের বামপন্থীদের রাজনৈতিক রক্তশূন্যতা এবং গণবিচ্ছিন্নতা বৈশ্বিক মার্কসবাদী দর্শনের ভরাডুবির এক রূপক দৃষ্টান্ত। শিল্পাঞ্চলে বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন নেতা এবং তাদের অনুগত শ্রমিক সংগঠক এবং আন্দোলনকারীদের গণবিচ্ছিন্নতা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। যদিও বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা শ্রমিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ‘জনপ্রিয়তার’ একধরনের মিথ্যা আত্মসন্তুষ্টিতে ভুগত। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বামপন্থীদের শবাধারে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে।
যেখানে জার্মানি, যুক্তরাজ্য এমনকি খোদ আমেরিকায় পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টির অস্তিত্ব আছে, সেখানে এককালের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী বামপন্থীরা এবারের নির্বাচনে একেবারে গো-হারা হেরেছেন। এটি লজ্জাজনক হলেও রাজনীতির বাস্তব গণিত। রামপন্থী এবং ধর্মবিরোধীদের খপ্পরে পড়ে এত করুণভাবে তাদের হারিয়ে যাওয়া এটি আফসোসের।
টঙ্গী ও গাজীপুর শিল্প এলাকায় বাম দলের কাঁচি প্রতীকের প্রার্থী সাকুল্যে ভোট পেয়েছেন ২৫০টি। এর চেয়ে লজ্জাজনক পরাজয় আর কী হতে পারে? মোট কথা, পতিত স্বৈরাচারী আওয়ামী-বাকশালীদের দোসর হিসেবে বামদের এহেন বিপর্যয়। পর্যুদস্ত হয়েছে বাম ঐক্যের শেষ প্রয়াস ‘গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট’। অর্থাৎ, বামপন্থীরা এখন রাজনীতির আইসিইউতে। এরপর হয়তো ঠাঁই হবে মর্গে!
একবার ভেবে দেখুন, এ নির্বাচনে ১০ দলীয় বাম জোটের ১৪৭টি আসনে সারা দেশে ভোট পড়েছে এক লাখ ১৭ হাজারের মতো, যা কিনা প্রাপ্ত মোট বৈধ ভোটের ০.১৭ শতাংশ। জোটের বেশির ভাগ প্রার্থীর ভোট সংখ্যা এক হাজারের নিচে। অনেকের ১০০-এরও নিচে। জামানত খুইয়েছেন সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন এবং সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহিল কাফী রতন। এতে কি পরিষ্কার নয় যে, স্বৈরাচারের তোষণ, ভারতপ্রেম, ইসলামবিদ্বেষ, মতাদর্শগত বিভাজন, নেতৃত্বের অহমিকা, মাত্রাতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, আদর্শবাদী নীতি থেকে প্রস্থান, গণসম্পৃক্ততা থেকে বিচ্ছিন্নতা, পতিত স্বৈরাচারের প্রতি অন্ধ আনুগত্য প্রভৃতি গণধিকৃত কার্যকলাপের ফলে তারা জনসাধারণের ন্যূনতম সমর্থন থেকে খারিজ হয়ে গেছে?
এই বাম ঐক্যফ্রন্টে কম করেও ১০টি বামপন্থী দল সমবেত হয়। একই সাথে নির্বাচনে অংশ নেয়। ওই যুক্তফ্রন্টে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত দল ছিল চারটি। তারা মোট ৯৭টি আসনে জোটগত প্রার্থী দিয়েছিল। তাদের সবার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।
সমাজতন্ত্রের শিবির সোভিয়েত রাশিয়া এবং চীনের দ্বন্দ্ব শুরু হওয়ার আগে থেকে পৃথিবীর এ অংশে সমাজতান্ত্রিক দলগুলোর বিভাজনের লক্ষণ দেখা দিতে থাকে। এর অনেকগুলো পটভূমিকার মধ্যে অন্যতম হলো পার্টিগুলোর নেতৃত্বে হিন্দু নেতাদের শঠতা এবং পলিটব্যুরোগুলোয় হিন্দুদের অনুপ্রবেশ। পূর্ববাংলার মতো ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যায় তারা চরমপন্থী রূপ ধারণ করে অবস্থাপন্ন গৃহস্থ কৃষক ও ভূমিমালিকদের খুন করা শুরু করে। তারা একে অন্যের চেয়ে বেশি বা বড় মস্কোপন্থী কিংবা পিকিংপন্থী বলে আত্মতুষ্টি পেতে থাকেন। থানা ফাঁড়ি বা চৌকি লুট করে তাদের ‘অস্ত্রাগার’ আরসেনাল বাড়াতে থাকে। মাও সেতুং যে বলেছিলেন, ‘মাছ যেমন পানিতে মিশে থাকে, তেমনি কমিউনিস্টদেরও জনগণের মধ্যে মিশে যেতে হবে’। যে নির্দেশনার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তারা দলীয় গণ্ডির ভেতর সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। সেই সাথে নেতৃত্বের কলহ-বিবাদ থেকে ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। দলের নেতৃত্বে ঢুকে পড়ে সরকারি গোয়েন্দারা, যারা ভেতর থেকে অন্তর্ঘাতে লিপ্ত থাকে। এ দেশে স্বাধীনতার পর থেকে বামপন্থী দলগুলোর ভাঙন প্রকাশ্য রূপ নেয়।
একপক্ষ শাসকদল আওয়ামী-বাকশালীদের সাথে যোগ দেয়; অন্যপক্ষ স্বাধীনতাকে অস্বীকার করে সাবেক পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (ইপিসিপি) এম-এল নামে বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলে ও মধ্যাঞ্চলের জেলাগুলোয় তৎপরতা চালাতে থাকে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উদারতায় গুপ্ত অবস্থা থেকে অনেকগুলো দল প্রকাশ্যে উঠে আসার সুযোগ পায়; কিন্তু ওই যে কথায় বলে, ‘কয়লা ধুলেও ময়লা যায় না’, ছোট বড় মিলিয়ে ১০টি দল নির্বাচন কমিশনে বিধিবদ্ধ হয়। বাকিগুলো আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকে যায় অথবা রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। তবে আওয়ামী লীগ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে পতিত এবং দেশ ছাড়া হওয়ার পর বামপন্থী দলগুলো আর কোনোভাবে মাজা সোজা করে দাঁড়ানোর সুযোগ পায়নি।
সাম্প্রতিক নির্বাচনে রাজনৈতিক অপমৃত্যুর মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারের দোসর হিসেবে তাদের অস্তিত্ব আজ বিলীন হওয়ার পথে। অস্তিত্ব বলতে যা অবশিষ্ট আছে তা হলো বাম বুদ্ধিজীবীদের সভা-সমাবেশ এবং পল্টন-সর্বস্ব মাইকের প্রচারণা, যেখানে বক্তাও তারা, শ্রোতাও তারা। ৭৮ বছর ধরে মস্কো ও দিল্লির ধামা ধরে তারা পেল ২০২৬-এর নির্বাচনে ০.০৮ শতাংশ ভোট। শূন্য আসন! অর্থাৎ রাজনীতির আইসিইউর মধ্যেও নয়, তাদের ঠাঁই হলো ‘মরচুয়ারি’ বা মর্গে।
লেজুড়বৃত্তির এ উদাহরণ রাজনীতিতে একটি বিস্ময়কর পর্যবেক্ষণের খোরাক হয়ে থাকবে। বাম দলগুলোর মধ্যে ধর্মবিরোধিতার প্রভাব তাদের এ করুণ জীবনাবসানের জন্যও এক মস্তবড় শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে থাকবে। ধর্মের বিরোধিতা যে এ দেশের মানুষ কখনো মেনে নেয়নি এবং ভবিষ্যতেও যে মেনে নেবে না, বামদলগুলোর সমাধিগাত্রে সত্যটি শিলালিপি আকারে খোদাই হয়ে থাকবে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক



