আতিকুল ইসলাম
১.
স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম জেলহত্যা সংঘটিত হয় ১৯৭৩ সালের ১৮ জুলাই। অভিযোগ আছে, এ দিন বিষাক্ত ইনজেকশন পুশ করে হত্যা করা হয় কারাবন্দী রাজনৈতিক নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরীকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রফেসর ড. মোহর আলী ফজলুল কাদের চৌধুরী সম্পর্কে লিখেছেন, ‘ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতীয় মুসলমানদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্বাধীনতা অর্জনের ঐতিহাসিক সংগ্রামের অন্যতম নির্ভীক সিপাহসালার ফজলুল কাদের চৌধুরী। অসত্য অভিযোগে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন শাসক নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে কলঙ্কিত করার উদ্দেশে কলকাতায় ব্রিটিশদের স্থাপিত কুখ্যাত হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণের অগ্রনায়ক, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রসের সাবেক সভাপতি, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াইয়ের অগ্নিপুরুষ, আজাদ হিন্দ ফোর্সের সর্বাধিনায়ক, বাংলার সর্বকালের শ্রেষ্ঠ রাজনীতিক নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে যুবক ফজলুল কাদের চৌধুরী ১৯৪০ সালে হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণ আন্দোলনে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, ব্রিটিশ ভারতে কারাবরণকারী প্রথম মুসলিম ছাত্রনেতা, তদানীন্তন পাকিস্তানের চারটি মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, জাতীয় পরিষদের সাবেক স্পিকার, পাকিস্তানের অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট ও পাকিস্তান মুসলিম লীগের সাবেক সভাপতি চট্টগ্রামের সিংহপুরুষ এ কে এম ফজলুল কাদের চৌধুরী আমাদের জাতীয় ইতিহাসের মৌলিক উপাদান এবং রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ। যে জাতি নিজেদের ইতিহাস সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা ও জ্ঞান রাখে না, সে জাতি তাদের ভবিষ্যৎ কর্মধারা নির্ভুলভাবে পরিচালনা করতে পারে না। জাতির ইতিহাস চেতনা মূলত আত্মচেতনার নামান্তর।’
২.
স্বাধীনতার পরপরই আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা বেপরোয়া লুটতরাজ ও ভারতে পণ্য চোরাচালানে লিপ্ত হয়ে পড়ে। ফলে সীমাহীন মূল্যবৃদ্ধি ঘটে এ দেশে উৎপাদিত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর। সর্বক্ষেত্রে সরকারের দুর্নীতি এবং অনভিজ্ঞ ও নিয়ন্ত্রণহীন শাসনের কারণে শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যাপারে জনগণের মোহমুক্তি ঘটে। ফলে গণ-সমর্থন হারিয়ে তিনি পরিণত হন খলনায়কে। সেই সাথে দখলদার ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক দেশের সম্পদ ও পাকিস্তান সেনাদের সমর্পিত সমরাস্ত্রগুলো লুণ্ঠনসহ ঢাকার উপর দিল্লির আধিপত্য ও কর্তৃত্ব প্রত্যক্ষ করে দেশবাসী বিক্ষুব্ধ হয়। ফলে আওয়ামী লীগের অপশাসন, রাষ্ট্র ও গণ-স্বার্থবিরোধী প্রকাশ্য কর্মকাণ্ড এবং ভারতীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে জনমত প্রবল হয়ে ওঠে। মুসলিম লীগ যেন ভবিষ্যতে মাথা তুলতে না পারে সেই লক্ষ্যে দিল্লির পরামর্শে শেখ পরিবারের একজন প্রভাবশালী সদস্যের ব্যবস্থাপনায় পাকিস্তান মুসলিম লীগের সাবেক সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরীকে ১৯৭৩ সালে ১৮ জুলাই ঢাকা কারাগারে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ব্যবস্থাপক ও ঘাতকের পরিচয় জানার পরও প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪২ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত তার অন্যতম রাজনৈতিক গুরু ফজলুল কাদের চৌধুরী হত্যাকাণ্ডের বিচার করেননি। সেই অন্ধকার সময়কালে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হাজার হাজার তরুণকে রক্ষীবাহিনী দিয়ে বিচারবহিভর্ূত হত্যা করিয়েছে। ফলে শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার উধাও হয়ে যায়। একইরকম অপশাসন ভয়ঙ্কর রূপে পুনঃপ্রবর্তিত হয় তার কন্যা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে। ফজলুল কাদের চৌধুরীর ছেলে, দিল্লির আধিপত্যের বিরুদ্ধে সর্বদা উচ্চকিত সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে প্রহসনের বিচারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেন হাসিনা। আরেক ছেলে গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে বিনাবিচারে দীর্ঘদিন কারাগারে আটকে রাখেন। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে বলেই হুম্মাম কাদের চৌধুরীকে কয়েক বছর গুম করে রাখে। মুসলিম লীগের রাজনীতির মৌলিক আদর্শে বিশ্বাসী ফজলুল কাদের চৌধুরী এবং তার দুই ছেলে ও নাতির সাথে আওয়ামী লীগ যে অমানবিক আচরণ করেছে তা ইতিহাসে বিরল। পরিবারের উপর এত নির্যাতনের পরও পিতার আদর্শ ধারণ করে তার প্রথম সন্তান ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে অনার্স ও মাস্টার্স উত্তীর্ণ জোবায়েদা কাদের চৌধুরী বাংলাদেশ মুসলিম লীগের সভানেত্রী পদে নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। মূলত মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে ১৯৫৩ সালে গঠিত হওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগ দিল্লির ছত্রছায়ার নীতিবিবর্জিত একটি মুসলিমবিরোধী শক্তিতে পরিণত হয়। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শত শত নেতাকর্মী নিয়ে দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়ায় প্রমাণিত হয়েছে, শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ দিল্লি অনুগত ও স্বাধীনতাবিরোধী একটি অপশক্তি।
৩.
চট্টগ্রাম জেলার রাউজান থানার গহিরা গ্রামের এক বনেদি মুসলিম পরিবারে ১৯১৯ সালের ২৬ মার্চ জন্মগ্রহণকারী ফজলুল কাদের চৌধুরী ১৯৩৪ সালে নোয়াখালী সরকারি জিলা স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা ও ১৯৩৬ সালে বরিশালের বিএম কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে আইএ এবং ১৯৩৯ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইতিহাসে সম্মানসহ বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। প্রেসিডেন্সি কলেজের শিক্ষার্থী থাকাকালীন তিনি নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর অনুসারী হয়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে জড়িত হন। বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার অন্ধকূপ হত্যাকাণ্ডের কাল্পনিক কাহিনী প্রতিষ্ঠিত করতে ব্রিটিশ সরকার ও বর্ণ হিন্দুরা কলকাতায় নির্মাণ করে হলওয়েল মনুমেন্ট নামে একটি স্মারক স্তম্ভ। নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। এই দাবিতে ১৯৩৯ সালে ফজলুল কাদের চৌধুরীর সভাপতিত্বে কলকাতায় অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সভায় বক্তৃতা করেন অখণ্ড বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রমুখ। এর পরই বাংলার মুসলিমদের কাছে ফজলুল কাদের চৌধুরী তরুণ নেতা হিসেবে অধিষ্ঠিত হন। বিপ্লবী মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধির প্ররোচনায় এবং ব্যবস্থাপনায় নেতাজী ভারত ত্যাগ করে জার্মানি যান। তিনি জার্মানি ও জাপানের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রবাসী ভারতীয়দের সংগঠিত করে আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করার পর সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। জার্মানি ও জাপান সরকার নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রপ্রধান রূপে স্বীকৃতি দেয়। রাজনীতির প্রথম গুরু নেতাজী ভারত ত্যাগ করলে ফজলুল কাদের চৌধুরী দ্বিতীয় গুরু ব্রিটিশ হটাও আন্দোলনের অন্যতম নেতা খাকসার পার্টির প্রধান আল্লামা মাশরেকির সাহচর্যে থেকে রাজনীতির সবক গ্রহণ করেন।
৪.
১৯৩৮ সালে বোম্বের অ্যাংলো অ্যারাবিয়ান কলেজে ছাত্রদের এক বিশেষ সমাবেশে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সভাপতি কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মুগ্ধকর বক্তৃতা শুনে ফজলুল কাদের চৌধুরী উপলব্ধি করেন, নিয়মতান্ত্রিক পথে রাজনীতি করে কামিয়াব হওয়া সম্ভব, যদি সে রাজনীতি প্রজ্ঞা ও যুক্তিনির্ভর হয়। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার বিকাশ ঘটাতে তিনি মুসলিম লীগে যোগ দেন। ১৯৪০ সালে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত সর্বভারতীয় মুসলিম ছাত্র সম্মেলনে ফজলুল কাদের চৌধুরী নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি জেনারেল এবং মাহমুদাবাদের নবাব ইয়াসিন খান প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নির্বাচিত হন। এ বছরের ২৩ মার্চ লাহোরের মিন্টু পার্কে অনুষ্ঠিত দলীয় জনসভায় মুসলিম লীগ নেতা ও অখণ্ড বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক ব্রিটিশ ভারতের পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে দু’টি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব করেন, যা লাহোর প্রস্তাব নামে ইতিহাসে অভিহিত। স্বাধীন বাংলাদেশ লাহোর প্রস্তাবের ফসল।
৫.
ভাইসরয় লর্ড কার্জন ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ করে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গের সাথে আসাম প্রদেশকে যুক্ত করে গঠন করেন পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ। নতুন প্রদেশের রাজধানী হয় ঢাকা। কিন্তু কলকাতা প্রবাসী পূর্ববঙ্গের ব্রিটিশ অনুগত প্রজা শোষক হিন্দু জমিদাররা তাদের কায়েমি স্বার্থে ও তাদের ধারাবাহিক কর্তৃত্ব বজায় রাখতে কুষ্টিয়ার জমিদার কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে বঙ্গভঙ্গ রহিত আন্দোলন শুরু করেন। হিন্দু নেতাদের এই আন্দোলন পরিণত হয় সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে যা ব্রিটিশ শাসনবিরোধী ছিল না, ছিল শুধু বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী। ফলে এই আন্দোলন সমর্থন করে কংগ্রেস। কলকাতা থেকে রাজধানী দিল্লিতে স্থানান্তরের ব্রিটিশ প্রস্তাবটি হিন্দু নেতারা মেনে নেয়ার বিনিময়ে সম্রাট পঞ্চম জর্জ ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর দিল্লির দরবার হলে বঙ্গভঙ্গ রহিত করেন। তাতে পূর্ববঙ্গ পুনরায় পশ্চিমবঙ্গের সাথে যুক্ত হয় এবং ঢাকার পরিবর্তে যুক্ত বাংলার রাজধানী হয় কলকাতা। ফলে পূর্ববঙ্গের পশ্চাৎপদ মুসলিমদের ভাগ্যোন্নয়নের সম্ভাবনার অকাল মৃত্যু ঘটে। তবে বঙ্গভঙ্গ রহিত করা থেকে ভারত ভাগের সূচনা হয়।
বঙ্গভঙ্গ রহিত হওয়ার পর বর্তমান হবিগঞ্জ, মৌলভী বাজার, সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলা আগের মতো আসাম প্রদেশের সাথে যুক্ত হয়। ভারত বিভক্তি যখন অনিবার্য হয় তখন মুসলিম লীগের দাবি মেনে নিয়ে ভাইসরয় অ্যাডমিরাল লর্ড লুইস মাউন্টব্যাটেন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বৃহত্তর সিলেট জেলায় ১৯৪৭ সালের জুন মাসে গণভোটের ব্যবস্থা করেন। বৃহত্তর সিলেটের অধিকাংশ মুসলিমই ছিলেন অশিক্ষিত এবং কৃষি ও মৎস্যজীবী। অসংখ্য হাওর, বিল, নদী, খাল ইত্যাদি থাকায় সে দিন চলাচলের রাস্তা প্রায় ছিলই না।
মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বে গোপালগঞ্জ মহকুমা মুসলিম লীগ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী নিয়ে সিলেটের জলমগ্ন ও কর্দমাক্ত অঞ্চলগুলো ঘুরে ঘুরে পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দিতে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেন। মুসলিম লীগের আহŸানে সিলেটবাসী ভোট দিয়ে সে দিন পাকিস্তানে যোগ দিয়েছিলেন বলেই তারা আজ স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক। তার সৃজনশীল বিপুল কর্মকাণ্ডের অংশবিশেষ এখানে উল্লেখ করার পর প্রফেসর ড. মোহর আলীর ভাষায় বলতে হয়, ‘ফজলুল কাদের চৌধুরী আমাদের জাতীয় ইতিহাসের মৌলিক উপাদান এবং রাজনৈতিক ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ।’
লেখক : স্থায়ী কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ



