প্রাচুর্যের পৃথিবীতে ক্ষুধার লজ্জা

ইসলাম খাদ্যকে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করে এবং অপচয়কে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। জাকাত, সদকা ও সম্পদের পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ওপর ইসলাম গুরুত্ব দেয়। খাদ্য অপচয় রোধ, ন্যায্য বণ্টন, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হলে ক্ষুধা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব

একবিংশ শতাব্দী মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রযুক্তিগত ঔৎকর্ষের এক অনন্য যুগ। এ সময়ে মানবজাতি এক দিকে মঙ্গলগ্রহে অভিযান পরিচালনা করছে, অন্য দিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের কাজ, জ্ঞান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। একই সাথে জিন সম্পাদনা প্রযুক্তি চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটিয়ে বহু জটিল রোগ নিরাময়ের সম্ভাবনা তৈরি করছে। কিন্তু এই বিস্ময়কর অগ্রগতির পাশাপাশি পৃথিবীর আরেকটি বাস্তবতা অত্যন্ত তীব্র ও বেদনাদায়ক, কোটি কোটি মানুষ এখনো প্রতিদিন ক্ষুধা ও অপুষ্টির সাথে লড়াই করে বেঁচে আছে। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও মানবিক বঞ্চনার এই সহাবস্থান আধুনিক সভ্যতার এক গভীর নৈতিক ও কাঠামোগত বৈপরীত্য স্পষ্ট করে তোলে। এটি কেবল অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রশ্ন নয়; বরং বৈশ্বিক ন্যায়বিচার ও মানবিক দায়িত্ববোধের সঙ্কটও বটে।

জাতিসঙ্ঘের সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে প্রায় ৬৭৩ মিলিয়ন মানুষ দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টি ও খাদ্য ঘাটতির মধ্যে ছিল। আরো বিস্তৃত সংজ্ঞা অনুযায়ী খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার শিকার মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৩ বিলিয়নেরও বেশি, যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ; অর্থাৎ প্রতি চারজনে একজন মানুষ প্রয়োজনীয় ও পুষ্টিকর খাদ্য থেকে বঞ্চিত। অন্য দিকে বৈশ্বিক খাদ্য উৎপাদন পর্যাপ্ত হওয়া সত্ত্বেও প্রতি বছর উৎপাদিত খাদ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অপচয় হয়। এই বিপরীত চিত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে, বিশ্বে কি সত্যিই খাদ্যের অভাব রয়েছে, নাকি সমস্যা মূলত বণ্টন ও ব্যবস্থাপনার?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের বিশ্লেষণ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি দেখিয়েছেন, দুর্ভিক্ষ বা ব্যাপক ক্ষুধার প্রধান কারণ সাধারণত খাদ্য উৎপাদনের ঘাটতি নয়, বরং মানুষের খাদ্যে প্রবেশাধিকার না পাওয়া; অর্থাৎ বিশ্বে খাদ্য থাকলেও তা সব মানুষ সমানভাবে পায় না। এর পেছনে কাজ করে আয়বৈষম্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক অবকাঠামোর দুর্বলতা এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অসমতা। এ দিক থেকে বর্তমান বৈশ্বিক ক্ষুধা সঙ্কট বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, এটি মূলত উৎপাদনগত নয়; বরং বণ্টনগত ও নীতিগত ব্যর্থতার ফল। একই সাথে এটি একটি নৈতিক প্রশ্নও উত্থাপন করে, এক দিকে অতিরিক্ত খাদ্যের অপচয়, অন্য দিকে অনাহারে মানুষের মৃত্যু; এই বৈপরীত্যকে সভ্যতা হিসেবে আমরা কতটা গ্রহণযোগ্যভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি? ফলে ক্ষুধার এই সঙ্কট মোকাবেলায় কেবল উৎপাদন বৃদ্ধি নয়; বরং ন্যায্য বণ্টন, দক্ষ নীতি প্রণয়ন এবং বৈশ্বিক সহযোগিতাই হতে পারে কার্যকর সমাধানের ভিত্তি।

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় খাদ্য ক্রমেই একটি মৌলিক মানবাধিকার না থেকে একটি বাজারজাত পণ্যে পরিণত হয়েছে। ফলে যার ক্রয়ক্ষমতা আছে, সে খাদ্য পাচ্ছে; যার নেই, সে বঞ্চিত হচ্ছে। এই কাঠামোগত বাস্তবতাই বিশ্ব ক্ষুধার অন্যতম প্রধান কারণ। খাদ্যের অভাবের চেয়ে বড় সত্য হলো, খাদ্য পৃথিবীতে যথেষ্ট পরিমাণে বিদ্যমান থাকলেও তা সমভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায় না। তাই ক্ষুধার প্রকৃত বিশ্লেষণ করতে হলে খাদ্য উৎপাদনের পরিমাণ নয়; বরং খাদ্যের মালিকানা, বণ্টনব্যবস্থা এবং প্রবেশাধিকারের প্রশ্নকে কেন্দ্র করতে হবে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার তথ্যে এই বৈপরীত্য আরো স্পষ্ট। জাতিসঙ্ঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে উৎপাদিত খাদ্য পৃথিবীর সব মানুষের জন্য যথেষ্ট। তবুও প্রতি বছর প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন টন খাদ্য অপচয় হয়। এই পরিমাণ খাদ্য দিয়ে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণ সম্ভব। অন্য দিকে ২০২৪ সালের হিসেবে প্রায় ৬৭৩ মিলিয়ন মানুষ চরম ক্ষুধার্ত অবস্থায় জীবনযাপন করছে এবং প্রায় ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন মানুষ মাঝারি থেকে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে; অর্থাৎ পৃথিবীতে খাদ্য ঘাটতি নয়, খাদ্যে প্রবেশাধিকারের ঘাটতিই প্রকট।

এই বৈষম্য আরো গভীরভাবে বোঝা যায় সম্পদ বণ্টনের দিকে তাকালে। অক্সফামের বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বের শীর্ষ ১ শতাংশ ধনী জনগোষ্ঠী বৈশ্বিক সম্পদের প্রায় অর্ধেকেরও বেশি নিয়ন্ত্রণ করে, অন্য দিকে নিচের অর্ধেক জনগোষ্ঠী বৈশ্বিক সম্পদের মাত্র সামান্য অংশের অধিকারী। এই অসম অর্থনৈতিক কাঠামো খাদ্য নিরাপত্তাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। কারণ খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও যদি মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা না বাড়ে, তাহলে তারা সেই খাদ্যে প্রবেশ করতে পারে না। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দুর্ভিক্ষ ও ক্ষুধা সাধারণত খাদ্যসঙ্কটের কারণে নয়; বরং আয়, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে খাদ্য অর্জনের সক্ষমতা হারানোর কারণে ঘটে।

এই বাস্তবতার উদাহরণ বিভিন্ন দেশে স্পষ্টভাবে দেখা যায়। আফ্রিকার সাব-সাহারান অঞ্চলের দেশগুলো যেমন- সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান ও নাইজারে খাদ্য উৎপাদন থাকলেও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সঙ্ঘাত ও দারিদ্র্যের কারণে জনগণ খাদ্যে প্রবেশাধিকার থেকে বঞ্চিত। ইয়েমেনে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফলে জাতিসঙ্ঘের তথ্যানুযায়ী লাখ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে রয়েছে, যদিও সেখানে আন্তর্জাতিক সহায়তা ও খাদ্য সরবরাহ কার্যক্রম চালু আছে। লাটিন আমেরিকার ভেনিজুয়েলাতেও অর্থনৈতিক সঙ্কট ও মুদ্রাস্ফীতির কারণে খাদ্য সহজলভ্য হলেও তা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে উন্নত হলেও বৈষম্য ও পুষ্টিহীনতার সমস্যা এখনো গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্যানুযায়ী, দেশে খাদ্য উৎপাদন স্বয়ংসম্পূর্ণতার কাছাকাছি পৌঁছালেও প্রায় ১১ শতাংশ মানুষ এখনো পর্যাপ্ত পুষ্টি পায় না। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, শিশুদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ খর্বাকৃতি ও অপুষ্টির শিকার, যা খাদ্য প্রাপ্যতা থাকলেও ক্রয়ক্ষমতা ও বণ্টন সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও নগর বস্তিবাসীদের ক্ষেত্রে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা এখনো বাস্তবতা।

অর্থনৈতিক বৈষম্য এ সঙ্কটকে আরো তীব্র করে তুলছে। বিশ্বের গিনি সহগ (Gini Coefficient) বহু উন্নয়নশীল দেশে উচ্চ অবস্থানে রয়েছে, যা আয় ও সম্পদের অসম বণ্টনের চিত্র তুলে ধরে। এই বৈষম্য অব্যাহত থাকলে খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও ক্ষুধার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে না। কারণ ক্ষুধা মূলত উৎপাদনের নয়; বরং ক্রয়ক্ষমতা, আয় ও সামাজিক ন্যায্যতার সঙ্কট।

বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জাতিসঙ্ঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (SDG 2: Zero Hunger) মূল লক্ষ্য হলো ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গঠন করা। কিন্তু এই লক্ষ্য অর্জন শুধু উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে সম্ভব নয়; বরং প্রয়োজন ন্যায্য বণ্টনব্যবস্থা, সামাজিক নিরাপত্তা, দারিদ্র্য হ্রাস এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার। বাস্তবতা হলো বিশ্ব এখনো সামরিক খাতে বছরে ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করলেও ক্ষুধা নিরসনে তার একটি ক্ষুদ্র অংশও ব্যয় হয় না।

অতএব, বর্তমান বিশ্বে ক্ষুধা কোনো প্রাকৃতিক অনিবার্যতা নয়; এটি মূলত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর ব্যর্থতার ফল। খাদ্য যথেষ্ট আছে; কিন্তু ন্যায্য প্রবেশাধিকার নেই, এই সত্যটি স্বীকার না করলে ক্ষুধার সমাধান কেবল একটি অসম্পূর্ণ স্বপ্ন হয়েই থাকবে। এ সমস্যা সমাধানে কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

প্রথমত, খাদ্য অপচয় কমানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বর্তমানে বিপুল খাদ্য সংরক্ষণ, পরিবহন ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে নষ্ট হয়, যা কমালে বৈশ্বিক খাদ্য ঘাটতি অনেকটাই হ্রাস পেতে পারে। দ্বিতীয়ত, ক্ষুদ্র কৃষকদের সহায়তা বৃদ্ধি করতে হবে উন্নত বীজ, প্রযুক্তি, সেচ, ঋণ ও বাজার সুবিধার মাধ্যমে, যাতে উৎপাদন ও গ্রামীণ আয় উভয়ই বাড়ে। তৃতীয়ত, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্য সহায়তা, নগদ ভাতা এবং পুষ্টি কর্মসূচি সম্প্রসারণ করে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করতে হবে, যাতে খাদ্যে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হয়।

চতুর্থত, খাদ্যকে কেবল বাজারজাত পণ্য নয়, একটি মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে বাস্তবভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য। পঞ্চমত, যুদ্ধ ও সঙ্ঘাত হ্রাস করা জরুরি, কারণ অধিকাংশ তীব্র খাদ্যসঙ্কট সঙ্ঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সৃষ্টি হয়। একই সাথে জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পরিস্থিতি আরো জটিল। এখানে এক দিকে বড় একটি জনগোষ্ঠী খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, অন্য দিকে অবকাঠামোগত দুর্বলতা যেমন- অপর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজ, দুর্বল পরিবহন ব্যবস্থা ও বাজার ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে বিপুল খাদ্য নষ্ট হয়। পশ্চিমা বিশ্বে খাদ্য অপচয়ের প্রধান কারণ হলো অতিভোগ ও ভোক্তা সংস্কৃতি, আর উন্নয়নশীল দেশে তা মূলত ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা।

আফ্রিকা ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অনেক দেশে খাদ্যসঙ্কটের পেছনে ধর্ম নয়; বরং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, দুর্নীতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব রয়েছে। এসব কারণে বাজারে খাদ্য থাকলেও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়।

ইসলাম খাদ্যকে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করে এবং অপচয়কে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। জাকাত, সদকা ও সম্পদের পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ওপর ইসলাম গুরুত্ব দেয়। খাদ্য অপচয় রোধ, ন্যায্য বণ্টন, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হলে ক্ষুধা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

লেখক : অর্থনীতিবিদ গবেষক ও কলামিস্ট

[email protected]