মেধার বিকাশে শিক্ষাব্যবস্থা

শিশুদের দক্ষ, আত্মনির্ভরশীল, গণতান্ত্রিক মনোভাবসম্পন্ন, সৎ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে জাতীয় ঐকমত্যের মাধ্যমে একমুখী শিক্ষাব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোর শিক্ষাকাঠামোর আলোকে আমাদের দেশের উপযোগী কারিকুলাম প্রণয়নে গুরুত্বারোপ করার কোনো বিকল্প নেই

দেশে দেশে শিক্ষা-সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মেধার বিকাশ ঘটিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করেছে। সেখানে আমাদের দেশে ২০২৬ সালে এসেও অটো পাসের জন্য আন্দোলন করছে কিছু শিক্ষার্থী। সবধরনের নীতিনৈতিকতা ভুলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির গাড়িতে হামলা চালিয়ে তাকে লাঞ্ছিত করার অপচেষ্টাও দেখা গেছে। গত ৬ এপ্রিল দুপুরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি গাজীপুর ক্যাম্পাস থেকে ঢাকায় ফেরার পথে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে এ ঘটনা ঘটে। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ২০২৩ সালেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন। তখন ১০ পার্সেন্ট গ্রেস দিয়ে আন্দোলনরত বেশির ভাগ শিক্ষার্থীকে পাস করিয়ে দেয়া হয়। এই সুযোগেও যারা পরীক্ষায় পাস করতে পারেননি তারা অটো পাসের দাবিতে বিভিন্ন সময়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সামনে বিক্ষোভ করেছেন। এর আগে ২০২২ সালের ২১ মে স্নাতক (পাস) পরীক্ষার্থীরা অটো পাসের দাবিতে ভিসির ওপর হামলা চালানোর অছাত্রসুলভ অপচেষ্টা করেন। শুধু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নয়, এর আগেও একাধিকবার দেশে অটো পাস দেয়া হয়েছে, যা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ক্ষতচিহ্ন। স্বাধীন বাংলাদেশে সূচনালগ্নে পরীক্ষা ছাড়া সব শ্রেণীতে অটো পাস বা অটো প্রমোশন দেয়া হয়েছিল।

কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স প্রথম বর্ষের তিন লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ শিক্ষার্থীকে অটো পাস দেয়া হয়। ২০২০ সালে অনার্স প্রথম বর্ষ পরীক্ষায় অংশগ্রহণে যারা ফরম পূরণ করেছিলেন তাদের শর্তসাপেক্ষে দ্বিতীয় বর্ষে প্রমোশন দিয়ে ক্লাস করার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। অনুরূপভাবে ২০২০ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অটো পাস দেয়া হয়েছে। ২০২১-২৪ সাল পর্যন্ত মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা এবং উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে। ২০২১ সালে শুধু ছয়টি বিষয়ের ওপর এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি পরীক্ষা ছিল ৩২ নম্বরের। ২০২২ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় প্রতি বিষয়ে নির্ধারিত ছিল ৪৫ নম্বর। একইভাবে ২০২৪ সালে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো লেখাপড়া করতে না পাড়ায় এইচএসসি পরীক্ষায় অটো পাসের দাবি ওঠে।

শিক্ষাবিদদের অভিমত, ২০২০ সালের পর থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে অটো পাস, সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের মতো ঘটনা শিক্ষার মানে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। অটো পাসের সুবিধাভোগী শিক্ষার্থীদের একটা অংশ আনন্দে আত্মহারা হলেও আখেরে তাদের উচ্চশিক্ষা ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে এর দুর্বলতা দৃশ্যমান হবে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবজেক্ট-ভিত্তিক ভালো নম্বর না থাকলে ভর্তি হওয়া যায় না। কাজেই প্রতিযোগিতামূলক মেধার বিকাশ না হলে শুধু ব্যক্তি নয় প্রকারান্তরে সমাজ ও রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

শিক্ষা মানে জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধের মাধ্যমে মানুষের অন্তর্নিহিত সুপ্ত প্রতিভা ও গুণের পূর্ণ বিকাশ ঘটানো, যা নীতিনৈতিকতা সততা অর্জনের মাধ্যমে একজন মানুষকে স্বাধীন চিন্তাশীল, নৈতিক, উৎপাদনশীল, সমাজসংস্কারক, আদর্শ ও পূর্ণাঙ্গ গুণাবলি সম্পন্ন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। সেই সাথে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে ইতিবাচক ভূমিকা পালনে সক্ষম হয়। তাই জাতি গঠনের পূর্বশর্ত হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষা মানুষের বিবেককে জাগ্রত ও প্রস্ফুটিত করে। সমাজ থেকে কুসংস্কার অনাচার দূর করতে সাহায্য করে। ফলে সময়োচিত মানসম্মত প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা জাতি ও রাষ্ট্র গঠনে অগ্রাণী ভূমিকা পালন করে। তবে শিক্ষার ক্ষেত্রে সুশিক্ষা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একজন মানুষ উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করে দুর্নীতিবাজ হয়ে সমাজের ক্ষতির কারণও হতে পারে। তাই শিক্ষা মানুষকে জ্ঞান দান করে আর সুশিক্ষা মানুষকে মার্জিত ন্যায়পরায়ণ এবং আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। সুশিক্ষার মাধ্যমে ব্যক্তি পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র প্রতিটি ক্ষেত্রে নীতিনৈতিকতা, বিবেকবিবেচনা সর্বোপরি সততা ধারণ করতে সাহায্য করে।

জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আজও দেশ তুঘলকি কাণ্ড থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। প্রায় সব উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে প্রাথমিক পর্যায়ে একমুখী ও অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলিত। যেখানে সব শিক্ষার্থী একই কারিকুলাম ও বই অনুসরণ করে। আমাদের এই ছোট ভূখণ্ডে একমুখী শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় অন্তত পাঁচ রকমের কারিকুলাম চালু আছে ।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী কারিকুলামের ভিন্নতায় অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতার স্তরে ব্যাপক পার্থক্য তৈরি হয়। প্রাথমিক স্তর পেরিয়ে পরবর্তী ধাপে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ভিন্ন ভিন্ন বোর্ডের অধীনে হয়ে থাকে। যারা সাধারণ বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে তাদের জন্য এসএসসি। মাদরাসার শিক্ষার্থীদের জন্য দাখিল। কারিগরি শিক্ষার্থীদের জন্য এসএসসি ভোকেশনাল, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা পরীক্ষা এবং ইংরেজি ভার্সন শিক্ষার্থীদের জন্য ইংরেজি ভাষায় এসএসসি পরীক্ষা নেয়া হয়। এ ছাড়াও ক্যামব্রিজ কারিকুলামে পৃথক স্কুল আছে। সাধারণত শহরের ধনিক শ্রেণীর সন্তানরা ইংলিশ মিডিয়ামে লেখাপড়া করে। গ্রামের একটা বিরাট জনগোষ্ঠী লেখাপড়া করে কওমি মাদরাসায়। তাদের পরীক্ষার জন্য একাধিক বোর্ড রয়েছে।

যদিও সরকার কওমি মাদরাসাকে স্বীকৃতি দিয়ে দাওরায়ে হাদিস পাস করা শিক্ষার্থীদের মাস্টার্সের সমমান দিয়েছে। সরকার নিয়ন্ত্রিত আরেকটা সেক্টর আলিয়া মাদরাসা। ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষার মিশ্রণে শিক্ষা দেয়া হয়ে থাকে। গরিব ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষা একসাথে অর্জনের লক্ষ্যে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করে। ফলে শিক্ষাজীবনের শুরুতে প্রতিষ্ঠানের ধরন আলাদা হওয়ায় ভিন্ন কারিকুলামের কারণে শিক্ষার্থীদের অর্জিত জ্ঞান এবং দক্ষতার মধ্যে গুণগত পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক বৈষম্যের সৃষ্টি করে। কাজেই শিশুদের দক্ষ, আত্মনির্ভরশীল, গণতান্ত্রিক মনোভাবসম্পন্ন, সৎ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে জাতীয় ঐকমত্যের মাধ্যমে একমুখী শিক্ষাব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোর শিক্ষাকাঠামোর আলোকে আমাদের দেশের উপযোগী কারিকুলাম প্রণয়নে গুরুত্বারোপ করার কোনো বিকল্প নেই।

মনে রাখা আবশ্যক যে, শিক্ষার্থীদের দলীয় লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে হবে। দলীয় লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি নানান অনৈতিক সুবিধা, তদবিরবাণিজ্য, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজিকে উৎসাহিত করে। তবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি তৈরির ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রশাসনিক সংগঠন ছাত্র পরিষদ বা ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিশ্চিত করাও দরকার। কারণ শিক্ষার্থীদের যাবতীয় দাবি তুলে ধরার অন্যতম প্ল্যাটফর্ম ছাত্র সংসদ, যা শিক্ষার্থীদের পক্ষে স্বাধীনভাবে কাজ করে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নকালে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের ন্যায্য দাবি থাকে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতার মাধ্যমে সমাজের উন্নতি, শিক্ষার্থীদের মেধার বিকাশ ও নেতৃত্বের গুণাবলি প্রস্ফুটিত হয়। এ ছাড়া জাতির প্রয়োজনে দেশকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে উৎকৃষ্ট নেতা তৈরি করতে সাহায্য করে। যেমনটা বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং সবশেষ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে সফল গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের পতন ঘটে। এসব ইতিহাস সৃষ্টিকারী ঘটনা আমাদের দেশে শিক্ষার্থীদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসে অম্লান হয়ে থাকবে। কাজেই জাতীয় ঐকমত্যের মাধ্যমে সঠিক মানসম্মত ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অধিক গুরুত্ব আরোপ, মেধার বিকাশে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা আদর্শ জাতি গঠনের প্রধান নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করবে বলে শিক্ষাবিদরা মনে করে থাকেন।

লেখক : আইনজীবী ও কলামিস্ট