বাংলাদেশের উৎপাদন শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা বর্তমানে প্রধান চ্যালেঞ্জ, কারণ শিল্প খাত আমদানিকৃত এলএনজি ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশের শিল্প খাত (বিশেষ করে টেক্সটাইল ও উৎপাদন) আমদানিকৃত এলএনজি এবং এলপিজির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল, যা আঞ্চলিক অস্থিরতায় ঝুঁকিতে রয়েছে। এ দিকে বিদ্যুৎ ও শিল্পে প্রাকৃতিক গ্যাসের অপর্যাপ্ত সরবরাহ উৎপাদন খরচ বাড়াচ্ছে। শিল্পের নিজস্ব জেনারেটর (ক্যাপটিভ পাওয়ার) মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ (প্রায় ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ)। দেশে গ্যাস ও তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে পেট্রোলপাম্পে দীর্ঘ সারি এবং ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সরকারকে এ বিষয়ে আগাম পদক্ষেপ নিতে হবে। নচেত জাতির জন্য অপেক্ষা করছে তীব্র লোডশেডিং ও শিল্প উৎপাদনে ব্যাপক সঙ্কট। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে তেল-গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। যুদ্ধে রেমিট্যান্সের পরিমাণ কমে যেতে পারে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যেতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে জ্বালানি আমদানির দায় মেটানো কঠিন হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসই পরিকল্পনা ছাড়া শুধু আমদানির ওপর নির্ভর করলে বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলা : যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ইরানে হামলা করায় বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাব মোকাবেলায় বিশ্বের অনেক দেশ নানা পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাত দীর্ঘায়িত হলে ভারত বিকল্প উৎস থেকে অপরিশোধিত তেল, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। ঘাটতি মোকাবেলায় ভারতীয় জ্বালানি কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যে কিছু শিল্প গ্রাহকের কাছে গ্যাস সরবরাহ কমানো শুরু করেছে।
জরুরি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পাকিস্তান সরকার সরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা খাত এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে জ্বালানি সাশ্রয়ের বিভিন্ন পদক্ষেপ বিবেচনা করছে। আমাদের দেশেও সরকারপ্রধান ইতোমধ্যে দেশজুড়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহার কমাতে সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
অফিসগুলোতে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার নিশ্চিত করতে জানালা, দরজা বা ব্লাইন্ড খোলা রাখতে বলা হয়েছে, যাতে প্রয়োজন না হলে বৈদ্যুতিক আলো ব্যবহার না করতে হয়। এসব উদ্যোগ ভালো। তবে সঙ্কট মোকাবেলায় ও শিল্প উৎপাদনে যাতে জ্বালানি সঙ্কট না হয়; সে বিষয়ে টেকসই পদক্ষেপ নিতে হবে। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে সঙ্কট ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
আর একটি বিষয় হলো— আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নেটওয়ার্কে হরমুজ প্রণালী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। ৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ হরমুজ প্রণালী সমুদ্রপথে পণ্য ও জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এ পথ দিয়ে দৈনিক প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ হতে থাকে। বিশ্বের সরবরাহের ২২ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। অনেক দেশের জন্য এটি ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে মনে হলেও বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহের মেরুদণ্ড হরমুজ প্রণালী। যুদ্ধের কারণে ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেছে। এতে জ্বালানি তেল সরবরাহসহ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের সঙ্কট দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশে যে পরিমাণ জ্বালানি তেল ব্যবহৃত হয় তার ১০ শতাংশ আমাদের প্রাকৃতিক উৎস থেকে আহরণ করা হয়।
প্রায় এক দশক ধরে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বছরে ৫ শতাংশ হারে কমছে এবং এখন তা জাতীয় চাহিদার অর্ধেকও মেটাতে পারছে না। প্রতিদিনের ঘাটতি এক হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ১০৯টি এলএনজি চালান কিনেছে, এতে খরচ হয়েছে ৩৮৮ কোটি ডলার। তেল আমদানির বার্ষিক বিল দাঁড়িয়েছে ৬১০ কোটি ডলারে। এলপিজি আমদানিতে আরো ১২০-১৪০ কোটি ডলার খরচ হয়। মোট বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের ১০ শতাংশ এখন জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হচ্ছে। বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার, ফলে অতিরিক্ত চাপ নেয়ার সুযোগ খুব সীমিত। একই সাথে আমদানির উৎস এবং বাণিজ্যপথও ঝুঁকিপূর্ণ। আরেকটি বিষয় হলো— বাংলাদেশ উপসাগরীয় উৎপাদকদের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসায়িক অংশীদারদের কাছ থেকে স্পট মার্কেটেও এলএনজি কেনে। হরমুজ প্রণালীতে বিঘ্ন ঘটলে শুধু দাম বাড়ে না, চালানও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে নিউজ চ্যানেল থেকে জানা যায়, কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির অংশ হিসেবে চার কার্গো এলএনজি আসার কথা থাকলেও যুদ্ধের ডামাডোলে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে এখন আমাদের স্পট মার্কেট থেকে উচ্চ মূল্যে আরো চার কার্গো কিনতে হবে, এমন সরকারি নির্দেশনা রয়েছে।
বাংলাদেশ প্রায় সম্পূর্ণরূপে আমদানিকৃত গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। অথচ দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের সামান্য বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের চাহিদা প্রতিদিন আড়াই হাজার মিলিয়ন ঘনফুট; কিন্তু সরবরাহ সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিদিন ৮৫০-৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এ হারে গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে উৎপাদনে এক হাজার ৮০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত ঘাটতি দেখা দিতে পারে। আপৎকালীন জ্বালানি মজুদ সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় যেকোনো বাহ্যিক ধাক্কা সরাসরি বিদ্যুৎ ঘাটতি তৈরি করে জ্বালানি নিরাপত্তা বিপন্ন করতে পারে। তাই আগামী দিনগুলোতে দেশে তীব্র লোডশেডিং দেখা দিতে পারে। যদিও সম্প্রতি সরকার ভারত থেকে প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানির কথা বলেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি মূল্যের ধাক্কা পরিবহন, কৃষি, উৎপাদন, ভোক্তাবাজার এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যা ইতোমধ্যে অনেকটা দৃশ্যমান।
দেশের কারখানাগুলোতে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার বেশি। প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বৃদ্ধি কারখানায় উৎপাদন কমতে পারে। বাংলাদেশে উপসাগরীয় উৎস থেকে যে এলএনজি আমদানি করে তাতে বেশি আমদানি ব্যয় মেটাতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ কমে যাওয়ায় টাকার মান চাপে পড়বে। এ অবমূল্যায়ন সব আমদানির দাম আরো বাড়িয়ে দেবে। ডিজেলের দাম বাড়লে এর প্রভাব সরাসরি খামার ও বাজার দুই স্তরে খাদ্যমূল্যে ছড়িয়ে পড়ে। গ্যাসের দাম এরইমধ্যে ২০২৩ সালের তুলনায় তিনগুণ বেশি। বাড়তি খরচ মেটাতে হলে ভর্তুকি দিতে হবে; কিন্তু অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সরকারের এ ভর্তুকি দেয়ার সামর্থ্য নেই।
সঙ্কট নিরসনে পদক্ষেপ : বাংলাদেশের শিল্প উৎপাদনে চলমান জ্বালানি ও গ্যাস সঙ্কট নিরসনে দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধান ও উত্তোলন বৃদ্ধি, এলএনজি আমদানি অব্যাহত রাখা এবং শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির (যেমন- সৌরশক্তি, বায়ুবিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ ইত্যাদি) ব্যবহার বৃদ্ধি, জ্বালানি-সাশ্রয়ী আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ তৈরির মতো উদ্যোগগুলো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে।
শিল্প খাতে জ্বালানি সঙ্কট সমাধান : শিল্প খাতে জ্বালানি সঙ্কট উত্তরণে বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়িয়ে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান এবং স্থল ও সমুদ্রে ড্রিলিং কার্যক্রম দ্রুততর করতে হবে। শিল্পকারখানায় প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কয়লার ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। শিল্পকারখানার ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপন এবং ‘বর্জ্য থেকে জ্বালানি’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। জ্বালানি-সাশ্রয়ী আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ায় জ্বালানির অপচয় কমাতে হবে।
নীতিমালা ও সংস্কার : জ্বালানি খাতের প্রশাসনিক সংস্কার, দুর্নীতি রোধ এবং শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
আঞ্চলিক সহযোগিতা : প্রতিবেশী দেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানি এবং আঞ্চলিক গ্রিড ব্যবহারের মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করা যেতে পারে।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ব্যাংকার



