ড. শাহজাহান খান
১৯৪৭ সালের আগে ‘ইসরাইল’ নামে কোনো রাষ্ট্র ছিল না। পরের বছর জাতিসঙ্ঘ (UN) বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের জন্য ফিলিস্তিনের খ্রিষ্টান ও মুসলিম জনগণের ভূমিতে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেয়। এই ঘোষণা ফিলিস্তিনের স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য ছিল বিপর্যয়কর। কিন্তু ব্রিটিশ ও আমেরিকান সমর্থিত বিদেশী দখলদারদের মোকাবেলার শক্তি তাদের ছিল না। স্থানীয় অধিবাসীরা যখন আগ্রাসী জায়নবাদীদের প্রতিরোধের চেষ্টা করেন, তখন শত শত মানুষকে হত্যা করা হয় এবং হাজার হাজার মানুষকে তাদের শতাব্দীপ্রাচীন ঘরবাড়ি থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয়। মুহূর্তের মধ্যেই তারা তাদের সবকিছু হারিয়ে নিজ ভূমিতেই উদ্বাস্তুতে পরিণত হন এবং দখলদারদের নিয়ন্ত্রণ ও দয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
১৯৪৭ সালের শেষ ভাগ এবং ১৯৪৮ সালের মে মাসে সংঘটিত প্রথম নাকবার (মহাবিপর্যয়) সময় ৫৩০টিরও বেশি গ্রাম থেকে সাত লক্ষাধিক ফিলিস্তিনিকে উচ্ছেদ করে বিদেশী জায়নবাদী বসতিস্থাপনকারীদের জন্য জায়গা তৈরি করা হয়। এই নিরীহ ফিলিস্তিনিদের একমাত্র ‘অপরাধ’ ছিল তারা তাদের পূর্বপুরুষদের বৈধ ও ঐতিহাসিক ভূমিতে জন্মগ্রহণ ও বেড়ে উঠেছিলেন। পৃথিবীর কোনো আইন বা প্রস্তাবেরই এমন ক্ষমতা থাকা উচিত নয় যে তা মানুষকে তাদের নিজস্ব ভূমি ও ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করতে পারে। এসব হামলা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য ছিল আরবদের উচ্ছেদ করে জায়নবাদী রাষ্ট্রের সীমানা সম্প্রসারণ করা।
১৯৪০ সালে ফিলিস্তিনের মাত্র ৬ শতাংশ ভূমি ইহুদিদের মালিকানায় ছিল, আর ৯৪ শতাংশ ছিল আরবদের মালিকানায়। সুতরাং যেকোনো মানদণ্ডেই ফিলিস্তিন ছিল আরবদের ভূমি, যেখানে প্রধানত ফিলিস্তিনিরাই বসবাস করতেন। কিন্তু ১৪ মে ১৯৪৮ সালে ডেভিড বেন-গুরিয়ন ইসরাইল রাষ্ট্র ঘোষণা করেন এবং ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অবসান ঘটে। তখন পর্যন্ত ইহুদি রাষ্ট্র আরবদের ৫৫ শতাংশ ভূমি দখল করে নিয়েছিল। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের পর জায়নবাদী রাষ্ট্র তার সীমানা আরো সম্প্রসারণ করে ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের প্রায় ৭৮ শতাংশ অঞ্চল দখল করে নেয়। ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরাইল পশ্চিমতীর, পূর্ব জেরুসালেম, গাজা, মিসরের সিনাই এবং সিরিয়ার গোলান মালভূমি দখল করে। ফলে বহু আরব তাদের পৈতৃক ভূমি থেকে বিতাড়িত হন এবং নতুন করে লাখো মানুষ উদ্বাস্তুতে পরিণত হন।
সুতরাং জায়নবাদী রাষ্ট্রের ইতিহাস হলো ক্রমাগত ভূমি দখলের ইতিহাস, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য পুরো ফিলিস্তিনকে ইহুদি রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত করা এবং ফিলিস্তিনি আরবদের নানা উপায়ে নির্যাতন, নিপীড়ন ও দমন-পীড়নের মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলা। বর্তমানে ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের ৮৫ শতাংশেরও বেশি অঞ্চল ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ইসরাইল আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসঙ্ঘের সনদ ও প্রস্তাব উপেক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের নিঃশর্ত সমর্থনের কারণে।
বহু বছর ধরে ‘ইসরাইলের অস্তিত্বের অধিকার’ স্লোগানের আড়ালে জায়নবাদী রাষ্ট্র কার্যত ‘অবিরাম সম্প্রসারণের শক্তি’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ফিলিস্তিন ছাড়াও ইসরাইল, জর্দান, লেবানন, সিরিয়া, মিসর, ইরাক, সুদান ও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। বর্তমানে তথাকথিত ‘বৃহত্তর ইসরাইল’-এর মানচিত্র প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে সৌদি আরবের অংশসহ জর্দান, লেবানন, সিরিয়া, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইরাকের অংশ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ ও সামরিক শক্তির সমর্থনপুষ্ট ইসরাইলের আগ্রাসী নীতির মুখে কোনো আরব দেশই নিরাপদ নয়। প্রকৃতপক্ষে ইসরাইল পৃথিবীর একমাত্র রাষ্ট্র যার নির্দিষ্ট ও স্বীকৃত সীমানা নেই এবং এর পেছনের উদ্দেশ্য হলো ক্রমাগত ভূমি দখল ও সম্প্রসারণ।
১৯৫৬ সালে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সমর্থনে ইসরাইল মিসরের সুয়েজ খালে হামলা চালায়। ১৯৬৭ সালের ৮ জুন সিনাই উপদ্বীপের উপকূলবর্তী আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইসরাইলি বিমান ও টর্পেডো নৌকা মার্কিন যুদ্ধজাহাজ USS Liberty-তে হামলা চালায়। এতে ৩৪ জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত এবং ১৭১ জন আহত হয়।
১৯৮২ সালের লেবানন যুদ্ধে ইসরাইল ‘অপারেশন পিস ফর গ্যালিলি’ চালিয়ে দক্ষিণ লেবানন ও বৈরুত থেকে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনকে (PLO) উৎখাত করার চেষ্টা করে। তখন সেখানে হিজবুল্লাহ, হামাস বা ইরানের কোনো ভূমিকা ছিল না। এসব অভিযানও ‘আত্মরক্ষার অধিকার’ বা ‘অস্তিত্বের অধিকার’-এর নামে পরিচালিত হয়। ২০০৬ সালেও হিজবুল্লাহ নির্মূলের অজুহাতে ইসরাইল লেবাননে হামলা চালায়।
দখলদার জায়নবাদী রাষ্ট্র ২০০৮-০৯, ২০১২, ২০১৪ এবং ২০২৩ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত গাজায় বারবার সামরিক হামলা চালিয়েছে। গাজা চারদিক থেকে ইসরাইল ঘেরা ভূখণ্ড। ইসরাইল গাজার খাঁচায় আবদ্ধ ফিলিস্তিনিদের খাদ্য, পানি, বিদ্যুৎ, ওষুধ ও জ্বালানিসহ সমস্ত কিছু নিয়ন্ত্রণ করে।
গত বছর ইহুদি রাষ্ট্র তার স্বপ্নের ‘বৃহত্তর ইসরাইলি’ রাষ্ট্রের মানচিত্র প্রকাশ করেছে। সেখানে সৌদি আরবের অংশ, ফিলিস্তিন, জর্দান, লেবানন, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও সিরিয়া অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইসরাইল ইতোমধ্যেই অনেক প্রতিবেশী দেশে আক্রমণ করে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে তাদের বৃহত্তর ইসরাইল প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম শুরু করেছে। আমেরিকার আর্থিক ও সামরিক শক্তির সমর্থনপুষ্ট হয়ে ইসরাইল ফিলিস্তিনের সম্পূর্ণ দখল নেয়ার কার্যক্রমের সাথে সাথে সাম্প্রতিক ইরান ও লেবানন আক্রমণ ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে ইরাক, সিরিয়া, জর্দান, মিসর ও সুদানে সামরিক অভিযান চালিয়েছে। এছাড়াও জায়নবাদী দেশটি পাকিস্তান ও তুরস্ককে আক্রমণের ইঙ্গিতও দিয়েছে। আমেরিকার অসীম সমর্থনে এই ক্ষুদ্র ইহুদিবাদী দেশটি সব আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে সারা দুনিয়াতে যুদ্ধের মাধ্যমে তীব্র অশান্তি ও সন্ত্রাস ছড়াচ্ছে।
সারা বিশ্ব জানে, ইসরাইলের পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। কিন্তু দেশটি কখনো স্বীকার করেনি। ইসরাইল ১৯৬৮ সালের পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তাররোধ চুক্তিতে (NPT) স্বাক্ষর করেনি। প্রতিবেশী প্রায় সব দেশের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়েও ইসরাইল আন্তর্জাতিক জবাবদিহি ছাড়াই পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার ধরে রেখেছে। অথচ ওই দেশটি ইরানের পারমাণবিক শক্তির তীব্র বিরোধিতা করছে। এটিও ইসরাইলের আন্তর্জাতিক আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থানের উদাহরণ।
ইসরাইল আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে ইসরাইল, গাজা ও পশ্চিমতীরে প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করেছে, যাতে সেখানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড বিশ্ববাসীর চোখের আড়ালে থাকে। ফিলিস্তিনিদের প্রতি আচরণ, কারাগারে নির্যাতনের অভিযোগ এবং গাজায় খাদ্য ও ওষুধ পৌঁছে দিতে চাওয়া আন্তর্জাতিক কর্মীদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে নানা মানবাধিকার সংগঠন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইল এবং বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশে তার সমর্থক গোষ্ঠীগুলো সমালোচনামূলক মতামতকে সীমিত করতে সক্ষম হয়েছিল। ‘ইসরাইল একটি গণতান্ত্রিক ও নৈতিক রাষ্ট্র’ এই ধারণাও আজ বিতর্কের মুখে পড়েছে। বর্তমানে জাতিসঙ্ঘ, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC), আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ), UNRWA, UNICEF, WHO, সাংবাদিক, রেড ক্রস, বিশ্বব্যাংক, মানবাধিকার সংস্থা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের প্রতিবেদনের কারণে ইসরাইলের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা চলছে।
সমালোচকদের মতে, জায়নবাদী রাষ্ট্র ফিলিস্তিনিদের নির্বিচারে হত্যা ও ক্রমবর্ধমান অমানবিক অত্যাচার গোপন করার মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে বিশ্বজনমত দাবিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে। একই সাথে খ্রিষ্টান ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও প্রতীকের প্রতি অসম্মান প্রদর্শনের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে উঠেছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে অনেকে মনে করেন যে সমস্যাটি কেবল আরব বা মুসলমানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বৃহত্তর মানবিক ও নৈতিক প্রশ্নের সাথে সম্পর্কিত।
জায়নবাদী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জনমত ক্রমশ বাড়তে থাকায় এন্টিসেমেটিজম (Antisemitism) শব্দটি ব্যবহার করে সমালোচনা দমন করার চেষ্টা করেছে। তবে ইসরাইলের বর্ণবাদ, যুদ্ধনীতি বা সরকারের গণহত্যা কর্মকাণ্ডের সমালোচনা এবং ইহুদিবিদ্বেষকে এক করে দেখা উচিত নয়। সব ইহুদি জায়নবাদী নন এবং বহু ইহুদি গাজায় বেসামরিক মানুষের হত্যাকাণ্ড ও ইসরাইল আগ্রাসী যুদ্ধনীতির বিরোধিতা করেন।
ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং হচ্ছে। গাজা ও লেবাননে তথাকথিত যুদ্ধবিরতির সময়ও ইসরাইল কর্তৃক হাজার হাজার বেসামরিক মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশ বহু আগে থেকেই ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে, যেমনটি যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অধিকাংশ পশ্চিমা দেশসহ বিশ্বের ১৫৭টিরও বেশি রাষ্ট্র করেছে। ফিলিস্তিনি জনগণের দীর্ঘদিনের সমর্থক হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ ও তথ্যকে গুরুত্ব দিয়ে গাজায় চলমান মানবিক সঙ্কট, পশ্চিমতীরে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক সামরিক উত্তেজনা বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, যাতে বিশ্বে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠিত হয়।
লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ড অস্ট্রেলিয়া; সাবেক ভিসি, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ



