জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব একটি মূল্যায়ন

তার ব্যক্তিগত সততা এবং নৈতিক মান তাকে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে আসন লাভ করেছেন। আজ এত বছর পরও, জিয়ার দূরদর্শী কর্মের প্রতিধ্বনি বাংলাদেশের প্রতিটি স্পন্দনে অনুরণিত হয়

ড. শেখ আকরাম আলী
একটি জাতির সমৃদ্ধি ও সাফল্যের মূলে থাকে যোগ্য এবং দূরদর্শী নেতৃত্ব। একজন প্রকৃত নেতা হলেন তিনি, যিনি সহজ ও কঠিন উভয় সময়ে অন্যদের যত্ন নেন। অন্যদের অনুপ্রাণিত করেন। দিকনির্দেশনা দেন। পাশে দাঁড়ান। একজন ভালো নেতা মানুষের কথা শোনেন, বিজ্ঞোচিত সিদ্ধান্ত নেন। একইভাবে সততা ও সম্মানের সাথে নেতৃত্ব দেন। তিনি কঠোর পরিশ্রম করেন। দলগত কাজে বিশ্বাস করেন। অন্যদের বিকাশে ও সফল হতে আন্তরিকতা নিয়ে সাহায্য করেন। আসলে একজন প্রকৃত নেতা শুধু কথায় নয়, বরং কাজের মাধ্যমে আশা জাগান। অন্যদের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠেন। মহান নেতাদের সমাজের মানুষ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্মরণ করেন। তারা নিজেদের সৎকর্মের জন্য ইতিহাসের অংশ হন।

আমাদের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে যিনি অনন্য দূরদর্শী এক রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন, তিনি আর কেউ নন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং খাঁটি দেশপ্রেম তাকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন প্রাসঙ্গিক করে রাখবে।

জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের বিকাশ কোনো আকস্মিক বা দুর্ঘটনাজনিত ঘটনা ছিল না; বরং এটি ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, ধারাবাহিক এবং সুদৃঢ়। তার গতিশীল সামরিক নেতৃত্বের প্রথম ধাপ শুরু হয় পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদানের মাধ্যমে, যে পেশাটি মূলত দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করার চূড়ান্ত দীক্ষা দেয়। একজন তরুণ কর্মকর্তা হিসেবে তিনি পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি (পিএমএ) কাকুলে মর্যাদাপূর্ণ ‘প্লাটুন কমান্ডার’ হিসেবে নিযুক্ত হন, যা ভবিষ্যতের সামরিক নেতাদের গড়ে তোলার এক অনন্য সুযোগ এনে দিয়েছিল। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাক যুদ্ধের সময় তার সাহসিকতা ও কৌশল সমগ্র পাকিস্তানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ওই যুদ্ধে অসীম সাহসিকতাপূর্ণ ভূমিকার জন্য একজন বীর যোদ্ধা হিসেবে তার যোগ্যতা প্রমাণ করে। তবে তার জীবনের এবং এ জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় ও সিদ্ধান্তমূলক মুহূর্তটি আসে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে। মেজর জিয়া আনুগত্যের শৃঙ্খল ভেঙে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে নিজের এবং দুই শিশু সন্তানসহ পরিবারের জীবন চরম ঝুঁকিতে ফেলে তিনি স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। এ ঘোষণা দিকভ্রান্ত ও হতাশ জাতিকে অবরুদ্ধ অন্ধকার থেকে আশার আলোয় পরিচালিত করেছিল। এই একটি ঘোষণাই বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে অনিবার্য করে তুলেছিল।

মুক্তিযুদ্ধে তিনি ‘জেড’ ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে সম্মুখে থেকে নেতৃত্ব দেন। অসামান্য বীরত্বের জন্য তাকে জীবিত যোদ্ধাদের জন্য সর্বোচ্চ সামরিক বীরত্বপূর্ণ পুরস্কার ‘বীর উত্তম’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। সবচেয়ে যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও তাকে সেনাপ্রধানের পদ থেকে বঞ্চিত করা হয়। তবে এক ঐতিহাসিক ঘটনাক্রম দেশ শাসনের বৃহত্তর দায়িত্ব তার কাঁধে এসে বর্তায়। তখনই সামরিক সীমানা ছাড়িয়ে তার প্রকৃত সম্ভাবনার বিকাশ ঘটে, যা তাকে একজন সফল ও দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আত্মঃপ্রকাশ ঘটায়।

একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে জিয়াউর রহমানের প্রথম ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ছিল রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত একটি জাতিকে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর তত্ত্বে ঐক্যবদ্ধ করা। এ দর্শন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীসহ সব ধর্ম, বর্ণ ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষকে একটি একক ছাতার নিচে নিয়ে আসে। তার দ্বিতীয় যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’- বিএনপির প্রতিষ্ঠা, যা দেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক প্লাটফর্ম হিসেবে সবার কাছে স্বীকৃতি পায়। আজো এই দল জনপ্রিয়তায় দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয়তাবাদী শক্তি হিসেবে টিকে আছে। একই সাথে তিনি দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন ঘটান। একদলীয় বাকশাল শাসনের অবসান ঘটান এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও উন্মুক্ত রাজনৈতিক চর্চার পথ সুগম করেন।

পররাষ্ট্রনীতিতে জিয়াউর রহমানের সাফল্য ছিল এককথায় অবাক করার মতো। স্নায়ুযুদ্ধের দ্বিপক্ষীয় বিশ্বব্যবস্থায় বিশ্ব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমান অত্যন্ত কৌশলী কূটনীতির মাধ্যমে পশ্চিমা ও মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। তিনি চীনের সাথে কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করেন; যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের আধিপত্য বিস্তারের অপচেষ্টা প্রতিহত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সহায়তায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনীকে একটি আধুনিক ও পেশাদার বাহিনী হিসেবে পুনর্গঠিত করেন। দেশের প্রশাসনিক কাঠামো সুবিন্যস্ত করতে তিনি পাকিস্তানের সিভিল সার্ভিসের আদলে ‘বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস)’ প্রবর্তন করেন। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তার ‘সবুজ বিপ্লব’ (খাল কাটা কর্মসূচি), তৈরী পোশাক (আরএমজি) খাতের সূচনা এবং মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রফতানির সিদ্ধান্ত আজকের স্বনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে, দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) প্রধান স্থপতি হিসেবে তার দূরদর্শিতা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

পাঁচ বছরের একটু বেশি সময়ের সংক্ষিপ্ত শাসনামলে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রের প্রতিটি খাতে তার প্রখর মেধা ও সংস্কারের গভীর স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তিনি আধুনিক বাংলাদেশের নির্মাতা এবং সংস্কারক ছিলেন। এ অভূতপূর্ব সাফল্যের মূলে ছিল তিনটি প্রধান গুণ : সততা, কঠোর পরিশ্রম এবং খাঁটি দেশপ্রেম। দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করার ক্ষমতা তার ছিল। জাতীয় লক্ষ্য অর্জনে একটি দক্ষ বেসামরিক ও সামরিক দল গঠন করেছিলেন তিনি।

সর্বোপরি, তার ব্যক্তিগত সততা এবং নৈতিক মান তাকে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে আসন লাভ করেছেন। আজ এত বছর পরও, জিয়ার দূরদর্শী কর্মের প্রতিধ্বনি বাংলাদেশের প্রতিটি স্পন্দনে অনুরণিত হয়।

লেখক : লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব:), সম্পাদক- মিলিটারি হিস্ট্রি জার্নাল এবং আইন ও ইতিহাসের অধ্যাপক