হাম আতঙ্ক নয়, সচেতনতা প্রয়োজন

‘হাম বহু আগে থেকে বিদ্যমান। টিকাদানের মাধ্যমে এর প্রকোপ অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল। এখন এটি আবার ফিরে আসার দায় আমাদেরই। আমাদের অসচেতনতা, অবহেলা এ জন্য দায়ী। তাই এখনই সময় টিকা নিশ্চিত করা, লক্ষণ বুঝে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া এবং সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা’

মশার আক্রমণ আর হামের প্রকোপে জনস্বাস্থ্যের ওপর দ্বিমুখী চাপ তৈরি হয়েছে। সাথে যোগ হয়েছে বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব; মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও অর্থনৈতিক চাপ স্বাস্থ্য খাতেও পরোক্ষ প্রভাব ফেলছে। এ বাস্তবতায় বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কি আতঙ্কিত হব, নাকি সচেতন হব?

হাম আতঙ্কের নয়, এটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ, যদি সময়মতো টিকা ও সচেতনতা নিশ্চিত করা যায়।

ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ হাম খুব সহজে ছড়িয়ে পড়ে। কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে এর দ্রুত সংক্রমণ ঘটে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে ১২-১৮ জন পর্যন্ত সংক্রমিত হতে পারে। ফলে একটি এলাকায় যদি টিকাদান কভারেজ কমে যায়, তাহলে সেখানে দ্রুত এটি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে হাম বেড়ে যাওয়ার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ চিহ্নিত হয়েছে। ক. করোনা মহামারীর সময় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়। অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি। খ. অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে- প্রথম ডোজ (৯ মাসে) দেয়ার পর অনেকে দ্বিতীয় ডোজ (১৫ মাসে) দিতে ভুলে যান বা অবহেলা করেন। অথচ এ দুই ডোজ সম্পূর্ণ না হলে শিশুর পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত হয় না।

এ ছাড়া শহর ও গ্রামাঞ্চলের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্যও অন্যতম কারণ। ঢাকার মতো শহরে যেমন সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বিশেষ ইউনিট খোলা হয়েছে, তেমনি অনেক জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে এখনো পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেই। সরকার ওষুধ আমদানি করেছে; কিন্তু দক্ষ জনবল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতি এখনো চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।

হামের ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি থাকে শিশুরা। সাধারণত ছয় মাস বয়স পর্যন্ত মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি শিশুকে কিছুটা সুরক্ষা দেয়; কিন্তু এরপর ঝুঁকি দ্রুত বাড়ে। তাই ৯ মাস বয়সে প্রথম টিকা এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় টিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি, আক্রান্ত শিশুর ক্ষেত্রে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে, যেমন খেতে না পারা, খিঁচুনি, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হামের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। চিকিৎসা মূলত উপসর্গভিত্তিক। তাই প্রতিরোধ একমাত্র কার্যকর উপায়। এ ক্ষেত্রে ভিটামিন ‘এ’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্ট দিলে হামের জটিলতা ও মৃত্যুহার প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে।

বিশ্বব্যাপী চিত্রও উদ্বেগজনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন দেশে হামের পুনরাবির্ভাব ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্র, আফগানিস্তান, ভারতসহ বহু দেশে নতুন করে প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে টিকাদানে অনীহা, ভুল তথ্য প্রচার এবং স্বাস্থ্যসেবায় বিঘ্নকে দায়ী করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে ইতোমধ্যে দেড় শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এটি শুধু একটি স্বাস্থ্যসঙ্কট নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও হুমকি। এ সঙ্কট মোকাবেলায় সরকার, স্বাস্থ্যকর্মী, অভিভাবক- সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

সরকারের পক্ষ থেকে হাসপাতালে বিশেষ ইউনিট চালু, ওষুধ সরবরাহ, টিকাদান কর্মসূচির মতো কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। তবে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন জনসচেতনতা বৃদ্ধি, গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যশিক্ষা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- ভয় নয়, তথ্যভিত্তিক সচেতনতা। অনেকসময় গুজব বা ভুল তথ্য মানুষের মধ্যে অযথা আতঙ্ক তৈরি করে। তাই নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তথ্য নেয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা জরুরি।

শেষ কথা হলো, হাম বহু আগে থেকে বিদ্যমান। টিকাদানের মাধ্যমে এর প্রকোপ অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল। এখন এটি আবার ফিরে আসার দায় আমাদেরই। আমাদের অসচেতনতা, অবহেলা এ জন্য দায়ী। তাই এখনই সময় টিকা নিশ্চিত করা, লক্ষণ বুঝে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া এবং সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক