বিরোধীদলীয় নেতার জাপান সফর নিয়ে কিছু কথা

জাপান সফরে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা: শফিকুর রহমানের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, তিনি শুধু ক্ষমতার রাজনীতি নয়; বরং রাষ্ট্র গঠনের রাজনীতি জনগণের সামনে আনতে চাইছেন। উন্নয়ন, সুশাসন, ন্যায়-ইনসাফ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, মানবিকতা, গণতন্ত্র, প্রবাসীদের সম্পৃক্ততা আকাঙ্ক্ষাকে একই সুতোয় গাঁথার চেষ্টা করছেন।

ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে চলে সঙ্ঘাত-সহিংসতা, হরতাল-অবরোধ, মুখোমুখি অবস্থান, অচলাবস্থা কিংবা প্রতিশোধের রাজনীতি; কিন্তু দিন যত যাচ্ছে, সময় তত বদলাচ্ছে, পরিবর্তন হচ্ছে জনগণের প্রত্যাশাও। মানুষ এখন শুধু রাজনৈতিক স্লোগান শুনতে চায় না; দেখতে চায় দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, রাষ্ট্রগঠনের চিন্তা এবং উন্নয়নমুখী রাজনৈতিক ভিশন। মূলত সঙ্ঘাত নয়, সহযোগিতা উন্নতি অগ্রগতির ভিত্তি। রাজনীতি তখনই সুন্দর হয়, যখন সংশোধন ও উন্নতিকে প্রধান্য দেয়া হয়। তখনই জনগণের জন্য নিবেদিত হয় রাজনীতি।

বিশেষ করে আন্দোলন ছিল বৈষম্য, অন্যায়-অবিচার, দুর্নীতি, বে-ইনসাফির বিরুদ্ধে। জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতির গুণগত মান উন্নয়ন অবলোকন করার তুমুল এক আগ্রহ রয়েছে জনগণের। এ বাস্তবতায় জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমানের সাম্প্রতিক জাপান সফর আশার আলো জাগিয়েছে। তার এ সফর শুধু একটি রাজনৈতিক সফর ছিল না; বরং এটি ছিল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, প্রবাসী সম্পৃক্ততা এবং জুলাই অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষাকে সামনে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা। বলা হয়ে থাকে- যে নেতা ভবিষ্যৎ স্পষ্টভাবে কল্পনা করতে পারেন, তিনি জাতিকে নতুন পথে এগিয়ে নিতে পারেন। ‘ভিশনারি নেতৃত্ব জাতিকে শুধু পরিচালনা করে না; বরং নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।’

মনে রাখা দরকার, রাজনীতিতে মতভেদ থাকতে পারে; কিন্তু দেশ গঠনের প্রশ্নে ঐক্যই সবচেয়ে বড় শক্তি। বিরোধীদলীয় নেতার জাপান সফর দেশের জন্য এই অনন্য বার্তাটি দিয়েছে। তার এই সফর রাজনৈতিক, কূটনৈতিক এবং মানবিক- তিন দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ।

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান গত ২ মে সাত দিনের সফরে জাপানের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন। সেখানে গিয়ে ডা: শফিকুর রহমান শুধু প্রবাসী বাংলাদেশীদের সাথে মতবিনিময় করেননি; বরং জাপান সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাথেও কয়েকটি বৈঠকে অংশ নেন।

জাপান সফর শেষে দেশে ফিরে তিনি বলেন, ‘দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জাইকা এবং বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সাথে বাংলাদেশের উন্নয়ন, বিনিয়োগ, শিক্ষাবিনিময়, দক্ষতা উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।’ ওই সফরে ক্যান্সার চিকিৎসা, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।

তার এসব উদ্যোগ ও বক্তব্য স্পষ্ট করে, তিনি সফরটি শুধু রাজনৈতিক আনুষ্ঠানিকতাতে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং বাংলাদেশের উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তব দিকগুলোও সমভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন।

জাপান : ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ, হিরোশিমা-নাগাসাকির পারমাণবিক বিপর্যয় এবং ভয়াবহ অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে উঠে এসে জাপান আজ বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষা, প্রযুক্তি, গবেষণা, মানবসম্পদ এবং জাতীয় শৃঙ্খলা উন্নয়নকে মূল শক্তিতে পরিণত করেছে দেশটি। আসলে উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণে হয় না; এ জন্য প্রয়োজন সৎ প্রশাসন, দক্ষ জনগোষ্ঠী, দায়িত্বশীল নাগরিক এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা।

হিরোশিমা পিস পার্ক পরিদর্শনের মাধ্যমে ডা: শফিকুর রহমান ইতিহাসের ভয়াবহতা যেমন স্মরণ করেছেন, তেমনি পুনর্গঠনের শক্তিকেও উপলব্ধি করেছেন। ধ্বংসস্তূপ থেকেও একটি জাতি কিভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে- জাপান তার বাস্তব উদাহরণ।

বিরোধী দল ও বিরোধিতার নতুন ভাষা
জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় মানুষের প্রত্যাশা এখন অনেক বদলে গেছে। জনগণ শুধু সঙ্ঘাত চায় না; তারা চায় দায়িত্বশীল, পরিণত এবং রাষ্ট্রের কল্যাণমুখী রাজনীতি। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান একটি ভিন্ন রাজনৈতিক ভাষা সামনে আনার চেষ্টা করছেন। তিনি বিরোধী দলের নেতা হয়েও শুধু সরকারের সমালোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং রাষ্ট্র কিভাবে উন্নত হবে, গণতন্ত্র কিভাবে শক্তিশালী হবে এবং জনগণের আকাক্সক্ষা কিভাবে বাস্তবায়িত হবে, সেই প্রশ্নগুলো তুলে এনেছেন বারবার।

বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থানের পর জনগণ যে গণরায়, সংস্কার ও ‘জুলাই সনদ’-এর প্রত্যাশা করেছিল, তা বাস্তবায়নে সরকারের ধীরগতি নিয়ে তিনি স্পষ্ট উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বলেছেন, ‘গণভোটের রায় বাস্তবায়ন হবেই হবে, ইনশাআল্লাহ।’ আরো বলেছেন, ‘গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করা মানে দেশের প্রত্যেক নাগরিককে অপমান করা।’

তার এ বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক নয়; বরং গণতন্ত্রের মৌলিক দর্শনের প্রতিফলন। কারণ গণতন্ত্রের সৌন্দর্য শুধু নির্বাচন আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; জনগণের রায়, জন-আকাক্সক্ষা এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিকে সম্মান করার মধ্যে গণতন্ত্রের মূল মর্যাদা নিহিত।

অনেকে মনে করছেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় মানুষ ক্ষমতাসীন দলের কাছে যেমন দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করে, তেমনি বিরোধী দলের কাছ থেকেও পরিণত ও গঠনমূলক ভূমিকা দেখতে চায়। ডা: শফিকুর রহমান সেই জায়গায় ‘রাষ্ট্র গঠনের রাজনীতি’ সামনে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন।

তিনি বুঝাতে চান, একটি দায়িত্বশীল বিরোধী দলের কাজ কেবল বিরোধিতা করা নয়; বরং বিকল্প রাষ্ট্রচিন্তা, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং নৈতিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি উপস্থাপন করা। জাপান সফরে তার বক্তব্যে উন্নয়ন, শিক্ষা, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, সুশাসন এবং জবাবদিহিতার প্রশ্নগুলো বারবার উঠে এসেছে। এটি তার রাজনৈতিক অবস্থানের বিশেষ দিক।

জাপান প্রবাসী ভাইদের প্রতি জামায়াত আমিরের বার্তা
জাপান সফরে ডা: শফিকুর রহমান বারবার প্রবাসী বাংলাদেশীদের দায়িত্ব, সম্ভাবনা এবং ভূমিকার কথা বলেছেন। বিগত নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রদান নিয়ে জামায়াতে ইসলামী সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে। প্রবাসীরাও এ মর্যাদার প্রতি সম্মান দেখিয়ে জামায়াতের পক্ষে ভোটের রায় দিয়েছেন। জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেছেন, ‘প্রবাসী বাংলাদেশীরা শুধু নিজেদের জীবন-মান উন্নয়নের সুযোগই পাচ্ছেন না; বরং দেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘বিদেশে উচ্চশিক্ষা অর্জন করে দেশে ফিরে কিংবা প্রবাসে থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে হবে।’ তিনি প্রবাসীদের শুধু রেমিট্যান্স পাঠানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং তাদের দক্ষতা, প্রযুক্তি, জ্ঞান ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার বাহক হিসেবে দেখছেন। একই সাথে প্রবাসীদের স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন, ‘দূর প্রবাসে এসে নিজেদের শিকড় ভুলে গেলে চলবে না।’

এখানেও তিনি বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা নিয়ে, দেশের গৌরব ও সম্মানের কথা ভুলে যাননি। তাই তো তিনি প্রবাসী ভাইবোনদের জাপানের আইন-কানুন মেনে চলা, জাপানি জনগণের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমর্যাদা তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন।

তার এই বক্তব্য, কথাগুলো শুধু রাজনীতি কিংবা রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং একটি দায়িত্বশীল নাগরিক ও জাতীয় নেতৃত্বের অভিভাবকসুলভ দৃষ্টিভঙ্গিও।

ডা: শফিকুর রহমান : জুলাইয়ের ধারক ও মানবিক রাজনীতির রূপকার
জুলাই অভ্যুত্থান বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই আন্দোলনের শহীদ ও আহতদের স্মরণ এবং তাদের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি এখনো জনগণের আবেগের জায়গায় রয়েছে। ডা: শফিকুর রহমান তার পুরো সফরজুড়ে জুলাইয়ের স্পিরিট সামনে রেখেছেন।

তিনি বলেছেন, ’৪৭, ’৭১, ’২৪ প্রতিটি অধ্যায়ে বাংলাদেশের সন্তানেরা রক্ত দিয়েছেন। এ ছাড়া দেশে ফেরার পথে ব্যাংককে চিকিৎসাধীন আহত জুলাইযোদ্ধাদের দেখতে যাওয়াটাও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতীকী বার্তা। রাজনীতি শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি মানবিক দায়বদ্ধতারও বিষয়, আর তিনি যেন সেটি দেখাতে চেয়েছেন।

আহতদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে ডা: শফিকুর রহমান প্রমাণ করেছেন, জুলাই শুধু রাজনৈতিক স্লোগান নয়; বরং এটি তার রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ।

শফিকুর রহমান ও জামায়াতের প্রতি জন-আকাঙ্ক্ষা
চব্বিশ-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি নতুন সমীকরণ ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় সঙ্ঘাতমুখর রাজনীতির বাইরে এসে জনগণের একটি বড় অংশ এখন বিকল্প নেতৃত্ব, নৈতিক রাজনীতি এবং সুশাসনভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে তাকাচ্ছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এ পরিবর্তন আরো স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়। বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় দেখা গেছে, দেশের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভোটার তাদের মূল্যবান ভোট প্রদানের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীকে ঘিরে একধরনের আস্থা ও প্রত্যাশা প্রকাশ করেছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সবকিছু মিলিয়ে জামায়াত এখন আর প্রান্তিক কোনো রাজনৈতিক শক্তি নয়; বরং একটি উল্লেখযোগ্য জনসমর্থনভিত্তিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছেন জামায়াতের আমির ডা: শফিকুর রহমান। জনগণের একটি বড় অংশের কাছে তিনি এখন শুধু বড় একটি রাজনৈতিক দলের নেতা নন; বরং একটি ‘নৈতিক রাজনৈতিক বিকল্পের প্রতীক’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। বিশেষ করে তরুণ, প্রবাসী এবং মধ্যবিত্ত অসহায় দরিদ্র শ্রেণীর মধ্যে তার প্রতি একধরনের নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

এ প্রত্যাশার মূল বিষয়গুলো হলো- দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠন, সুশাসন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠাকরণ, গণতান্ত্রিক অধিকার ও গণরায়ের প্রতি সম্মান, প্রশাসনিক সংস্কার ও ন্যায্য নির্বাচন-ব্যবস্থার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে ভারসাম্য ও উন্নয়নমুখী করা।

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান এমপির বক্তব্যে উপর্যুক্ত প্রত্যাশাগুলোর প্রতিফলন স্পষ্টভাবে প্রায়ই দেখা যায়। তিনি বারবার বলছেন, ‘দুর্নীতিমুক্ত, সুশাসনভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমাদের লড়াই সংসদের ভেতরে এবং বাইরে অব্যাহত থাকবে।’

এ ধরনের অবস্থান তাকে বাংলাদেশের বিগত সময়কার প্রচলিত বিরোধী রাজনৈতিক ভাষা ও চরিত্র থেকে আলাদা করেছে। তিনি শুধু সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরছেন না; বরং জামায়াতে ইসলামীর হয়ে বিকল্প রাষ্ট্রচিন্তাও সামনে আনছেন।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর জনমনে যে পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছিল, বিশেষ করে ‘জুলাই সনদ’, ‘গণরায়’ এবং ‘গণভোটে বাস্তবায়ন’-তার পক্ষেও তিনি সরাসরি অবস্থান নিয়েছেন। এই অবস্থান তাকে কেবল রাজনৈতিক বক্তা হিসেবে নয়; বরং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গণমানুষের স্পষ্ট একজন কণ্ঠস্বর হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে।

সবমিলিয়ে জামায়াতে ইসলামী ঘিরে এখন যে জন-আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে, তা শুধু একটি নির্বাচনী ফলের প্রতিফলন নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত করছে।

আর এ পরিবর্তনের কেন্দ্রে জামায়াতে ইসলামী ও ডা: শফিকুর রহমানকে অনেকে দেখছেন এমন একজন দল ও দলের নেতৃত্ব হিসেবে, যেই দল বিরোধী দলে থেকে এবং যিনি বিরোধী দলের নেতা হয়েও রাষ্ট্রগঠনের চিন্তা সামনে আনছেন।

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় জামায়াত ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা এখন আর কেবল দলীয় রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সংস্কৃতি কিভাবে গড়ে উঠবে, সেই প্রশ্নের সাথে সরাসরি ও গভীরভাবে যুক্ত হয়েছে।

ভবিষ্যতের রাজনীতি কেমন হওয়া উচিত
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি কি আবারো পুরনো সঙ্ঘাত, প্রতিশোধ এবং বিভাজনের পথে হাঁটবে, নাকি আরো দায়িত্বশীল, সহনশীল, ইনসাফ-ভিত্তিক ও উন্নয়নমুখী গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির দিকে এগোবে, এটি এখন বড় প্রশ্ন।

জাপান সফরে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা: শফিকুর রহমানের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, তিনি শুধু ক্ষমতার রাজনীতি নয়; বরং রাষ্ট্র গঠনের রাজনীতি জনগণের সামনে আনতে চাইছেন। উন্নয়ন, সুশাসন, ন্যায়-ইনসাফ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, মানবিকতা, গণতন্ত্র, প্রবাসীদের সম্পৃক্ততা আকাঙ্ক্ষাকে একই সুতোয় গাঁথার চেষ্টা করছেন। জুলাইয়ের ভেতর দিয়ে যাওয়া এ দশের জনগণ এখন এমন কিছু নেতৃত্ব খুঁজে ফিরছে, যারা শুধু প্রতিপক্ষকে হারানোর রাজনীতি করবেন না; বরং রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেয়ার রাজনীতি করবেন।

অযুত সম্ভবনার এ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সত্যিই ‘রাষ্ট্রগঠনের রাজনীতি’ শক্তিশালী হলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে আরো পরিণত, সহনশীল ও উন্নয়নমুখী, ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন পরিবেশে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে।

ভিশনারি নেতৃত্ব বর্তমানের ভেতর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ দেখতে পান। বলা হয়, ‘সত্যিকারের নেতা তিনিই, যিনি আজকের সীমাবদ্ধতার বাইরে আগামীর সম্ভাবনা দেখেন।’ সব বিবেচনায় ডা: শফিকুর রহমান হচ্ছেন তেমনই একজন দূরদর্শী নেতা।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা