একটি দেশের জাতীয় বাজেট কেবল কিছু শুষ্ক সংখ্যা, রাজস্বের হিসাব কিংবা আয়-ব্যয়ের খতিয়ান নয়; বাজেট হলো একটি রাষ্ট্রের দর্শন এবং সাধারণ মানুষের আগামী এক বছরের বেঁচে থাকার স্বপ্ন ও নির্দেশিকা। দীর্ঘকাল ধরে আমাদের দেশে প্রাক-বাজেট সংলাপের মঞ্চগুলো নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায়ী সংগঠন, বহুজাতিক করপোরেট প্রতিষ্ঠান, থিংক-ট্যাংক এবং অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু গত ২৪ মে জাতীয় প্রেস ক্লাবে দেশের সম্মিলিত উলামা-মাশায়েখ পরিষদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ‘প্রাক-বাজেট সংলাপ উলামায়ে কেরামের ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনাটি এই চেনা বৃত্তে এক অভাবনীয় ও ইতিবাচক পরিবর্তনের হাওয়া এনে দিয়েছে। এই আয়োজনটি প্রমাণ করেছে যে, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, মুদ্রাস্ফীতি এবং জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনে আলেম সমাজ আর নীরব দর্শক থাকতে রাজি নয়। প্রাক-বাজেট আলোচনাটি ছিল অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
অতীতে দেখা গেছে, রাষ্ট্রীয় বাজেট পেশের পর বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন, এফবিসিসিআই, সিপিডি বা অর্থনীতিবিদদের পক্ষ থেকে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া বা গোলটেবিল বৈঠক করা হলেও, দেশের আলেম-উলামা ও পীর-মাশায়েখদের পক্ষ থেকে কাঠামোগত কোনো প্রস্তাবনা খুব একটা আসত না। অথচ দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন, নৈতিক সমাজ গঠন, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং প্রান্তিক মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আলেম-উলামাদের কথা বলার, দাবি তোলার এবং বাস্তবসম্মত প্রস্তাবনা পেশ করার ভালো সুযোগ রয়েছে। ২৪ মে-র সেমিনারটি অবহেলিত ক্ষেত্রগুলোকে জাতির সামনে যৌক্তিক ভাষায় উন্মোচন করেছে। আলেম-উলামারা সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থাকেন, তাই তাদের প্রস্তাবনা বাস্তবভিত্তিক। দেশের কোটি কোটি ধর্মপ্রাণ মানুষ আলেমদের কথা শোনেন ও বিশ্বাস করেন। মাদক, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে নৈতিক সমাজ গঠনে উলামাদের কথা যতখানি প্রভাব ফেলে, তা কেবল আইন দিয়ে সম্ভব নয়। আলেমরা বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করেন। কওমি, আলিয়া, ইবতেদায়ি মাদরাসা, হেফজখানা এবং দেশের লাখ লাখ মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন— এই বিশাল ধর্মীয় ও শিক্ষামূলক জনশক্তির আর্থিক নিরাপত্তা সরাসরি জাতীয় বাজেটের নীতিমালার ওপর নির্ভর করে।
কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ স্তর ‘দাওরায়ে হাদিস’কে (মাস্টার্স সমমান) সরকারি স্বীকৃতি দেয়া হলেও সাধারণ বাজেটে কওমি ধারার জন্য কাঠামোগত কোনো বড় বরাদ্দ থাকে না। কওমি মাদরাসার সাধারণ শিক্ষার (বাংলা, গণিত, ইংরেজি, আইটি) মানোন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ কল্যাণ তহবিল বা উপবৃত্তির ব্যবস্থা বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়। ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন, আলিয়া মাদরাসাগুলোর ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন, ল্যাবরেটরি স্থাপন এবং পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগের জন্য শিক্ষা বাজেটের একটি বড় অংশ সুনির্দিষ্ট করার দাবি তোলা হয়।
দেশের প্রতিটি উপজেলা ও জেলায় যে ৫৬০টি সরকারি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প চলছে, সেগুলোর শতভাগ সমাপ্তি, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সেখানে যোগ্য উলামাদের স্থায়ী ও সম্মানজনক বেতনে নিয়োগের জন্য বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান নিশ্চিত করার দাবি উত্থাপিত হয়। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মক্তব শিক্ষা (সহজ কুরআন শিক্ষা), যুবসমাজকে নৈতিক শিক্ষা প্রদান এবং ইসলামী বই-পুস্তক অনুবাদ ও গবেষণার জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বাজেট দ্বিগুণ করার দাবি তোলা হয়।
দেশের চার লাখ ইমাম-মুয়াজ্জিনের জন্য ন্যূনতম একটি জীবনধারণ উপযোগী রাষ্ট্রীয় স্কেল বা স্থায়ী বিশেষ কল্যাণ তহবিল গঠন এবং মধ্যবিত্তের নাগালে হজের খরচ নামিয়ে আনার দাবিগুলো কেবল ধর্মীয় আবেগের বিষয় নয়; বরং এগুলো দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সাথে সম্পৃক্ত।
উলামা-মাশায়েখদের এই প্রাক-বাজেট ভাবনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে চলমান অর্থনৈতিক সঙ্কট, বিশেষ করে লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি ও বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ। আলেমদের পক্ষ থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক কমিয়ে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেয়ার যে দাবি তোলা হয়েছে, তা মূলত একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের মূল স্পিরিট। এর পাশাপাশি, করের আওতা (Tax Net) বৃদ্ধি করে সাধারণ দরিদ্র মানুষের ওপর ভ্যাটের বোঝা কমানো এবং সরকারের অনুৎপাদনশীল ও বিলাসী ব্যয় সঙ্কোচন নীতি গ্রহণের প্রস্তাবগুলো যেকোনো প্রথম সারির অর্থনীতিবিদের ভাবনার মতোই পরিপক্ব ও সময়োপযোগী। বিলাসবহুল পণ্যের আমদানি নিরুৎসাহিত করতে উচ্চ শুল্ক বজায় রাখা সময়ের দাবি। সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি কেনা, বিদেশ ভ্রমণ এবং বিলাসী কেনাকাটা কঠোরভাবে সীমিত করা একান্ত প্রয়োজন। এডিপি বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প স্থগিত রেখে, জনকল্যাণমুখী ও দ্রুত শেষ করা সম্ভব এমন প্রকল্পে অর্থায়ন করা দরকার।
এই সংলাপে আলেম সমাজের নৈতিক অবস্থান ছিল— কালো টাকা সাদা করার ঢালাও সুযোগ বন্ধ করা। ইসলামে অবৈধ বা অন্যায্য উপায়ে উপার্জিত অর্থকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বছরের পর বছর কর ফাঁকিদাতাদের এই ধরনের অনৈতিক সুবিধা দেয়া হলে সৎ করদাতারা নিরুৎসাহিত হন, যা দেশের সুশাসনকে বাধাগ্রস্ত করে। আলেম সমাজ যখন এই অনৈতিক নিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন, তখন নীতিনির্ধারকদের ওপর তা এক ধরনের বড় সামাজিক ও নৈতিক চাপ সৃষ্টি করে। একই সাথে, ব্যাংক খাতের বর্তমান ভঙ্গুর দশা, ভুয়া ঋণ ও অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে আলেমদের কঠোর অবস্থান জনআকাঙ্ক্ষারই বাস্তব প্রতিফলন।
দেশে সরকারি হিসাবমতে মোট নিবন্ধিত স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা রয়েছে সাত হাজার ৪৫১টি। এর মধ্যে সরকারের সামান্য আর্থিক অনুদান পায় মাত্র এক হাজার ৫১৯টি মাদরাসা। বাকি পাঁচ হাজার ৯৩২টি মাদরাসার শিক্ষকরা দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে বিনা বেতনে পাঠদান করছেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো জাতীয়করণ হলেও ইবতেদায়ি মাদরাসাগুলোর শিক্ষকরা যেভাবে প্রতি মাসে মাত্র তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা সম্মানী পাচ্ছেন (অথবা অনেকেই বিনা বেতনে আছেন), এই বৈষম্য দূর করতে সরাসরি বাজেট বরাদ্দের দাবি তোলার এটিই উপযুক্ত সময়। সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগ এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে এই খাতটি নিয়ে বড় ধরনের নীতিগত অগ্রগতি হয়েছে। অনুদানভুক্ত এই এক হাজার ৫১৯টি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসাকে পুরোপুরি এমপিওভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে এবং এর জন্য গণবিজ্ঞপ্তিও জারি করা হয়েছে। এমপিওভুক্ত হলে শিক্ষকরা বেসরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের মতো মূল বেতনের সরকারি অংশ (শতভাগ) এবং উৎসব ভাতা পাবেন। বর্তমানে ফাইলটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এই ফাইলটির চূড়ান্ত অনুমোদন সাপেক্ষে ‘ইবতেদায়ি মাদরাসা জাতীয়করণ ও শতভাগ এমপিওভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় থোক বরাদ্দ রাখার দাবি জানানো হয়। আলিয়া ও কওমি মাদরাসা শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক কারিগরি, আইটি ও ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষ থোক বরাদ্দ চাওয়া হয় যাতে তারা দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি অবদান রাখতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের (NPL) পরিমাণ এখন প্রায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ আমাদের মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩০.৬০ শতাংশ (৩০.৬ শতাংশ)। অর্থাৎ, ব্যাংকগুলো যে পরিমাণ ঋণ বাজারে দিয়েছে, তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই এখন খেলাপি হয়ে পড়েছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড ৬.৩২ লাখ কোটি টাকা (৩৬.৩ শতাংশ) ছাড়িয়ে গিয়েছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যাংকিং খাতে কঠোর তদারকি শুরু করার পর এবং আগের অনেক গোপন বা ‘রাইট-অফ’ করা খারাপ ঋণ সামনে নিয়ে আসায় এই উল্লম্ফন ঘটেছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট খেলাপি ঋণের একটি বিশাল অংশ (প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা) কেন্দ্রীভূত রয়েছে মাত্র পাঁচ হাজার ৭৭৫ জন বড় ঋণগ্রহীতার হাতে, যারা প্রত্যেকে ২০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছেন। খাত হিসেবে তৈরী পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে খেলাপি ঋণের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে একটি বিশাল অঙ্কের অর্থ নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন হিসেবে জমা রাখতে হয়। এতে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের লাগামহীন বিস্তারের ফলে সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা।
আলেমরা ব্যাংকিং কমিশন গঠন করার প্রস্তাব দিয়েছেন। দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতকে সঙ্কট থেকে বাঁচাতে, অনিয়ম দূর করতে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুপারিশ করার জন্য একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন স্বাধীন ও বিশেষজ্ঞ দল নিয়ে গঠিত হবে ব্যাংকিং কমিশন। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সচল করতে কী করা দরকার, কোনো ব্যাংক বন্ধ বা অন্য ব্যাংকের সাথে একীভূত করা হবে কি না এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন কিভাবে বাড়ানো যায়, তা নির্ধারণ করা কমিশনের দায়িত্ব।
বেসরকারি খাতের নেয়া ঋণ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণসহ বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১১৩.৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশী মুদ্রায় এই মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৩ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি। মোট ঋণের মধ্যে সরকারি খাতের অংশ হচ্ছে ৯৩.৪৬ বিলিয়ন ডলার (যার মধ্যে ৮০.৯৪ বিলিয়ন ডলার সরাসরি সরকার এবং বাকিটা সরকারি বিভিন্ন সংস্থা নিয়েছে)। অন্যদিকে বেসরকারি খাতের ঋণ রয়েছে ২০.০৫ বিলিয়ন ডলার। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণের কারণে দেশের প্রতিটি নাগরিকের মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের দায় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৫৫ মার্কিন ডলারে (বাংলাদেশী মুদ্রায় যা প্রায় ৭৬ হাজার টাকার বেশি)। এ মুহূর্তে দেশের অর্থনীতিতে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই ঋণের কিস্তি শোধ করা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো বার্ষিক বিদেশী ঋণ পরিশোধের পরিমাণ চার বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ঋণ পরিশোধের এই চাপ আরো তীব্র হবে। তাই প্রাক-বাজেট সংলাপে অপ্রয়োজনীয় মেগা প্রকল্প বাদ দিয়ে নতুন করে যেকোনো বিদেশী ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে কঠোর স্ক্রিনিং বা যাচাই-বাছাইয়ের প্রস্তাব রাখা অত্যন্ত জরুরি।
অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন ‘অর্থনৈতিক শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি’ এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রতিবেদনে এই পাচারের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিগত ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে মোট ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাচার হয়েছে। বাংলাদেশী মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ২৭ লাখ থেকে ২৮ লাখ কোটি টাকা। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, প্রতি বছর দেশ থেকে গড়ে ১২ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার (প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার কোটি থেকে এক লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা) পাচার হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, খেলাপি ঋণের এই বিশাল অঙ্কের একটি বড় অংশই (প্রায় ১.৫ থেকে দুই লাখ কোটি টাকা) আসলে ছদ্মবেশী বা ভুয়া ঋণ। এই লাগামহীন অর্থ পাচারের কারণেই আজ দেশে ডলার সঙ্কট তীব্র হয়েছে, রিজার্ভ কমে গেছে এবং মুদ্রাস্ফীতি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এ কারণেই প্রাক-বাজেট সংলাপে অবৈধ টাকা সাদা করার সুযোগ বন্ধ করা এবং হুন্ডি ও পাচার রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার প্রস্তাবগুলো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ব্যাংক খাত পুনর্গঠনে এই ভুয়া ঋণের সাথে জড়িতদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার জন্য একটি ‘বিশেষ অ্যাসেট রিকভারি টাস্কফোর্স’ গঠনের জন্য সুস্পষ্ট বাজেট বরাদ্দ ও আইনি কাঠামোর দাবি রাখা অত্যন্ত যৌক্তিক হবে।
আলেম-উলামাদের বাজেট ভাবনার মূল লক্ষ্য হলো— শিক্ষার আধুনিকায়ন ও নৈতিক উন্নয়ন, ধর্মীয় কর্মীদের সামাজিক নিরাপত্তা এবং একটি শোষণমুক্ত, অপচয়হীন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। ২৪ মে-র এই প্রাক-বাজেট আলোচনাটি একটি নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, আলেম সমাজ এখন আর প্রথাগত গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তারা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, রাজস্ব নীতি এবং সাধারণ মানুষের রুটি-রুজির সঙ্কট নিয়ে সমানভাবে সচেতন এবং রাষ্ট্রকে দিকনির্দেশনা দিতে সক্ষম। একটি বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে সমাজ ও রাষ্ট্রের কোনো অংশকেই পেছনে ফেলে রাখা যাবে না। আশা করি, নীতিনির্ধারকেরা উলামা-মাশায়েখদের এই প্রাসঙ্গিক, যৌক্তিক ও বাস্তবভিত্তিক প্রস্তাবনাগুলোকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবেন এবং আগামী বাজেটে এর প্রতিফলন ঘটাবেন। আলেমদের এই অর্থনৈতিক সচেতনতা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করুক— এটাই জনগণের প্রত্যাশা।
লেখক : অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা



