প্রফেসর ড. মুহা: কামরুজ্জামান
দেশের সর্বপ্রথম শরিয়াহভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংক হলো ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। ১৯৮৩ সালে ব্যাংকটির যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সুনামের সাথে পরিচালিত ইসলামী ব্যাংক বিশ্বের সেরা এক হাজার ব্যাংকের তালিকায় জায়গা করে নেয়। কিন্তু ২০১৫ সাল থেকে একটি তস্করের দল এই ব্যাংককে ধ্বংস করতে আদাজল খেয়ে মাঠে নামে। প্রথমে তারা জঙ্গিবাদের সাথে জড়িত অর্থ লেনদেনের মিথ্যা অভিযোগ তুলে ব্যাংকের ভিত দুর্বল করার চেষ্টা করে। কিছু চিহ্নিত মিডিয়াকর্মীও তাদের সাথে সুর মিলিয়ে মিথ্যা খবর প্রচার করতে থাকে।
এসব অপপ্রচার ব্যর্থ হলে ব্যাংকের পেছনে লাগে কথিত প্রগতিশীল শাহবাগীরা। প্রশাসনের ছত্রছায়ায় এর বিরুদ্ধে দেশব্যাপী মিছিল-মিটিং শুরু করে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সব বিভাগ, জেলা ও উপজেলা শহরে অপপ্রচার চলতে থাকে। শাহবাগীরা ভাঙচুর শুরু করে ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা ও বুথ। ব্যাংকের তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ, শেয়ার হোল্ডার, ডিপোজিটর ও কর্মকর্তারা ছিল অসহায়, মজলুম। তারা জালিমের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তো দূরের কথা প্রকাশ্যে কান্নাও করতে পারত না। নীরব চোখের পানি ফেলা ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় ছিল না। ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার প্রশাসনের কাছে সবাই ছিল জিম্মি। ‘শাহবাগী’দের এ ঘৃণ্য অপতৎপরতায় ইসলামী ব্যাংক সাময়িকভাবে বেকায়দায় পড়ে। ব্যাংক থেকে ডিপোজিট তুলে নেয়ার হিড়িক পড়ে যায়।
হাসিনা সরকার ইসলামী ব্যাংক সমূলে ধ্বংস করতে আরেকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ব্যাংকটিকে চট্টগ্রামের শিল্পপতি এস আলমের হাতে তুলে দেয়। দখল ও ধ্বংস করার জন্য শুরু হয় ফ্যাসিবাদী বিভিন্ন উদ্যোগ। ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান মোস্তফা আনোয়ার, পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও তৎকালীন ম্যানেজিং ডিরেক্টর আব্দুল মান্নানকে অবরুদ্ধ করে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। লুটেরাদের হাতে চলে যায় অর্ধশতাব্দী ধরে তিল তিল করে গড়ে ওঠা ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। এই দখলের পর থেকে শুরু হয় অবিরাম লুটপাট। এর সহযোগী হয় এস আলমের অনুগত উচ্ছিষ্টভোগী পরিচালনা পর্ষদ ও তাদের সাঙ্গপাঙ্গোরা।
ব্যাংকের কেন্দ্রীয় কার্যালয় সূত্রে প্রকাশ, ব্যাংকের তৎকালীন এমডি মো: মাহবুবুল আলম ও মুহাম্মদ মনিরুল মওলা লুটপাটের জন্য ভল্ট খুলে দেয়। আকিজ, মিফতাহ, সাব্বির, কায়সার, রেজাউল, খালেদ মুহাম্মদ রায়হান, মমতাজ উদ্দিন, মোস্তাকসহ একদল অসৎ অফিসার ভল্ট থেকে বস্তাবোঝাই টাকা কাঁধে করে এস আলমের অফিসে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব পালন করে। লুটপাটে যেসব প্রতিবন্ধকতা আছে তা দূর করতে বাংলাদেশ ব্যাংক সহায়তা করে। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকও ভাগ বসায়। হাসিনা, জয় ও রেহানা পেয়ে যায় আলাদিনের চেরাগ। ইসলামী ব্যাংক প্রাইভেট সেক্টরে সবচেয়ে বড় ব্যাংক হওয়ায় বড় ধরনের লুটপাটে কোনো বেগ পেতে হয়নি। এভাবেই লুটেরারা ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা লুট করে নিয়ে যায়। কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এস আলমের নিজ উপজেলার অযোগ্য ও অথর্ব আট হাজার লোককে এই ব্যাংকের বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেয়া হয়।
ইসলামী ব্যাংকের গর্বের প্রতীক ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশের ৫২ কাঠা জমি, যার হোল্ডিং নম্বর ১৯৬, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০। এই জায়গা বিক্রির জন্য জাতীয় দৈনিকে নিলাম বিজ্ঞপ্তি দিলে সর্বোচ্চ ৫৮০ কোটি টাকার দরপত্র দাখিল হয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জমিটি মাত্র ১১০ কোটি টাকায় বিক্রি করে দেয়া হয়েছে! মতিঝিলের প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে লাগোয়া জায়গাটি নিয়ম ভঙ্গ করে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করা হয়।
এস আলম গ্রুপকে ব্যাংকের প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা বাই মুরাবাহা (প্লেজ) পদ্ধতিতে বিনিয়োগ দেয়া হয়েছে; যার এক টাকার পণ্যও ব্যাংকের কাছে নেই। এই বিনিয়োগের অধিকাংশ তৎকালীন এমডি মুহাম্মদ মুনিরুল মওলা তথাকথিত বোর্ডকে পাশ কাটিয়ে একতরফভাবে দিয়েছেন। অথচ ব্যাংকের বিদ্যমান নীতি অনুযায়ী তিনি সর্বোচ্চ মাত্র এক কোটি টাকা ফান্ডেড এবং ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত নন-ফান্ডেড বিনিয়োগ দিতে পারেন।
৫ আগস্ট ২০২৪ বিপ্লবের পর এস আলম গং ইসলামী ব্যাংকের অসৎ অফিসারদের মাধ্যমে বিভিন্ন শাখায় পরিচালিত বিভিন্ন চলতি হিসাবের টাকা দ্রুত তুলে নিয়ে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় Top Ten Trading House-এর নামে পরিচালিত, চলতি হিসাব নং-৪৩৪৫, খাতুনগঞ্জ শাখার ৫৪৪ কোটি টাকা সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। এ ঘটনা ইসলামী ব্যাংকের অন্যান্য অফিসারের দৃষ্টিগোচর হলে তারা বাধা দেন। তৎকালীন এমডি মুহাম্মদ মুনিরুল মওলা টাকা দেয়ার জন্য প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেন। কিন্তু আন্দোলনকারীদের বাধার মুখে তা নিতে ব্যর্থ হয়। পরে এই টাকা দিয়ে এস আলমের দায় শোধ করা হলেও অদৃশ্য কারণে এই টাকা রিভার্স করে আবার ওই হিসাবে জমা দেয়া হয়।
দুঃখজনক হলেও সত্য, জুলাই বিপ্লবের পর দুই বছর হতে চলল- তথাপিও ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ব্যাংকটির হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না। উল্টো এক অদৃশ্য শক্তির বলে এস আলম তার ভাড়াটিয়া জনবল নিয়ে ইসলামী ব্যাংক আবার দখলের অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
ইসলামী ব্যাংকের সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, নতুন সরকার মাছ ও দুধ পাহারা দেয়ার জন্য বিড়াল নিয়োগ দিয়ে চলেছে। আগস্ট বিপ্লবের পর ব্যাংকটি উদ্ধারে সরকার বাহাদুর প্রথমে উবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদকে চেয়ারম্যান করে বোর্ড গঠন করে। কিন্তু তিনি ছিলেন সেই এস আলমেরই সহযোগী। ফলে তিনি ইসলামী ব্যাংকের স্বকীয়তা ফিরিয়ে আনার কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেননি; বরং দুর্নীতির মাধ্যমে তিনিও ফ্যাসিবাদী কায়দায় আখের গুছিয়েছেন। নির্বাচিত সরকার ইসলামী ব্যাংকের যোগ্য কর্মকর্তাদের সরিয়ে সেখানে নিয়োগ দিচ্ছে সেই এস আলমেরই সহযোগীদের!
এ দেশে কল্যাণমুখী ব্যাংকিং ধারার প্রবর্তক ইসলামী ব্যাংক। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ব্যাংকের অস্তিত্ব রক্ষা ও হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। জুলাই চেতনা টিকিয়ে রাখতে এই ব্যাংক টিকিয়ে রাখা প্রয়োজন। জুলাই-বিরোধীরা ইসলামী ব্যাংকের অস্তিত্ব রাখতে চায় না।
লেখক : অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া



