আমাদের বিমানবন্দরের ক্রমইতিহাস

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন তৎকালীন পূর্ব-বাংলায় ব্রিটিশ ও যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক যে সামরিক বিমানবন্দর ও রানওয়ে নির্মিত হয়েছিল যুদ্ধ-পরবর্তী তার কিছু বেসামরিক বিমান চলাচলে উন্মুক্ত হয়। এছাড়া কিছু পরিত্যক্ত হয়। তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে একটি মাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছিল, যা তেজগাঁও বিমানবন্দর নামে অভিহিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সারা বিশ্বে বিমান যোগাযোগের দ্রুত প্রসার ঘটলেও তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে সে অনুযায়ী প্রসার না ঘটে বরং সামরিক কাজে ব্যবহৃত তিনটি বিমানবন্দর (কুমিল্লা, ফেনী ও লালমনিরহাট) বন্ধ হয়ে যায়। এই তিনটির মধ্যে লালমনিরহাট বিমানবন্দরটি চালুর সম্ভাবনা থাকলেও কুমিল্লা ও ফেনী এ দু’টি আদৌ চালুর সম্ভাবনা আপাতত ক্ষীণ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত চলে। সে সময় আমাদের এই উপমহাদেশ ব্রিটিশ শাসনাধীন ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধটি মিত্রশক্তি ও অক্ষশক্তির মধ্যে সংঘটিত হয়। মিত্রশক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল ব্রিটিশ, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া এবং এদের উপনিবেশগুলো। অন্যদিকে অক্ষশক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল জার্মানি, ইতালি ও জাপান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে পূর্ব-বাংলায় কোনো বিমানবন্দর ছিল না। ভারত বিভাজনের পর পূর্ব-বাংলা পূর্ব-পাকিস্তান নামে অভিহিত হয়। এ সময় আসামের সিলেট জেলা করিমগঞ্জ মহকুমা ছাড়া পূর্ব-পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন জাপানের সেনাবাহিনী তৎকালীন বার্মা, বর্তমান মিয়ানমার এবং ভারতের আসাম পর্যন্ত কার্যক্রম সম্প্রসারিত করে। জাপানের অগ্রযাত্রা প্রতিহত করতে ব্রিটিশরা সেনাবাহিনীর পাশাপাশি বিমানঘাঁটি বা বিমানবন্দর স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে।

যুদ্ধ শুরুর পর ব্রিটিশরা পর্যায়ক্রমে ঢাকার তেজগাঁও ও কুর্মিটোলায়, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, কক্সবাজার, লালমনিরহাট ও ফেনীতে বিমানবন্দর নির্মাণ করে। তেজগাঁও বিমানবন্দরটি ছিল পূর্ব-বাংলায় যুদ্ধের প্রধান সামরিক বিমানবন্দর। কুর্মিটোলা বিমানবন্দরটি তেজগাঁও এর বিকল্প হিসেবে যুদ্ধের সময় তৈরি করা হয়েছিল। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা বিমানবন্দর মিত্রবাহিনীর বিমান উড্ডয়ন ও আক্রমণ পরিচালনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি ছিল। কুমিল্লা শহরের সন্নিকটে কুমিল্লা বিমানবন্দরকে ব্রিটিশ বাহিনীর অন্যতম বিমানঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কক্সবাজার বিমানবন্দর যুদ্ধকালীন নির্মিত হয়। এই বিমানবন্দর হতে যুদ্ধবিমান পরিচালনা করা হতো। লালমনিরহাট বিমানবন্দরটি উত্তর-বাংলার রংপুর জেলাস্থ লালমনিরহাট মহকুমা শহরের সন্নিকটে অবস্থিত ছিল। বিমানঘাঁটি হতে গুরুত্বপূর্ণ অভিযান পরিচালিত হতো। চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা শহরের মাঝামাঝি নোয়াখালীর ফেনী মহকুমায় ফেনী বিমানবন্দরের অবস্থান ছিল। এই বিমানঘাঁটি হতেও যুদ্ধবিমানের কার্যক্রম পরিচালিত হতো।

Airport-1=6

উপরোক্ত বিমানবন্দরগুলো মূলত যুদ্ধবিমান পরিচালনা, রসদ সরবরাহ এবং বৈমানিক বা পাইলট প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হতো। এ বিমানবন্দরগুলোর মধ্যে কিছু বর্তমানে পরিত্যক্ত; আবার কিছু অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পরিত্যক্তের তালিকায় রয়েছে কুমিল্লা ও ফেনী বিমানবন্দর। লালমনিরহাট বিমানবন্দরটি বর্তমানে বন্ধ থাকলেও এর অংশবিশেষ অ্যাভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠায় দেয়া হয়েছে, যার কার্যক্রম বর্তমানে চলমান। লালমনিরহাট বিমানবন্দরটি অভ্যন্তরীণ ও সামরিক কাজে ব্যবহারে চীন ও তুরস্কের সাথে আলোচনা চলছে। তেজগাঁও বিমানবন্দরটি তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের এবং বাংলাদেশ অভ্যুদ্বয় পরবর্তী ১৯৮১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধান বিমানবন্দর ছিল। এটি বর্তমানে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি সামরিক ঘাঁটি, যার নাম বিএএফ বাশার ঘাঁটি। বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার ও সামরিক বিমান ওঠা-নামাসহ প্রশিক্ষণকেন্দ্র হিসেবে বর্তমানে ঘাঁটিটি ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও এ সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে থাকে। কুর্মিটোলা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিমানবন্দরগুলো বর্তমানে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় ধরনের বিমান ওঠা-নামার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

পূর্ব-পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকার মিরপুর ও তেজগাঁও এলাকার মধ্যবর্তী স্থানে তেজগাঁও বিমানবন্দরের অবস্থান। ১৯৪১ সালে এই বিমানবন্দরের নির্মাণকাজ শুরু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকরা আকাশপথে যুদ্ধে এই বিমানবন্দর নির্মাণ করে। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এটি বেসামরিক বিমানবন্দর হিসেবে চালু হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের পর বিমানবন্দরটির গুরুত্ব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। সেই সাথে এটিকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের উপযোগী করা হয়। বাংলাদেশ অভ্যুদ্বয় পূর্ববর্তী পর্যন্ত বিমানবন্দরটি প্রাদেশিক রাজধানীর প্রধান বিমানবন্দর হিসেবে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করে যাত্রীসেবায় অনন্য অবদান রাখে। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিসরে ব্যবহারের পাশাপাশি সামরিক কাজেও বিমানবন্দরটির ব্যবহার অব্যাহত থাকে।

১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকার তেজগাঁও থেকে কয়েক কিলোমিটার উত্তরে কুর্মিটোলায় বিমান চলাচলে একটি রানওয়ে তৈরি করে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হওয়ার পর তেজগাঁও বিমানবন্দরটি পূর্ব-পাকিস্তানের প্রধান বিমানবন্দর হয়ে ওঠে। প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে তেজগাঁও বিমানবন্দরে বিমান ওঠা-নামার কাজ ব্যাপৃত হলে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ১৯৬৬ সালে কুর্মিটোলার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একটি নতুন বিমানবন্দর নির্মাণে প্রকল্প গ্রহণ করে। সে সময় নির্মাণসামগ্রী পরিবহনে একটি রেলওয়ে স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছিল, যা বর্তমানে ঢাকা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন নামে পরিচিত।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ভারত বিভাজনের পর চট্টগ্রাম বিমানবন্দরকে অভ্যন্তরীণ বেসামরিক বিমানবন্দরে পরিণত করা হয়। পাকিস্তান শাসনামলে এ বিমানবন্দর হতে নিয়মিত ঢাকার সাথে বিমান যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। এটি চট্টগ্রাম শহর হতে ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে কর্ণফুলী নদীর তীরে অবস্থিত। পাকিস্তান শাসনালে সামরিক কাজেও বিমানবন্দরটি ব্যবহৃত হতো।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজিত হলে ১৯৫৬ সালে যশোরে পূর্ণাঙ্গ বিমানবন্দর চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে ১৯৬০ সালের আগে তা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। এ বিমানবন্দরটি চালু হওয়া পরবর্তী তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকার সাথে নিয়মিত বিমানযোগাযোগ রক্ষা করে চলে। এ বিমানবন্দরটি যশোর শহর থেকে সাত কিলোমিটার উত্তরে এবং ঢাকা শহর থেকে ১৪০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। এটিও সামরিক বিমান ওঠা-নামা ও প্রশিক্ষণ কাজে ব্যবহৃত হতো।

ঈশ্বরদী বিমানবন্দরটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ব্যবহৃত হয়েছিল। এটি পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলা ও নাটোরের লালপুর উপজেলায় অবস্থিত। তবে প্রশাসনিক কাজ পাবনার ঈশ্বরদী হতে পরিচালিত হতো। পাকিস্তান শাসনামলে বিমানবন্দরটি হতে সরাসরি ঢাকায় ফ্লাইট পরিচালিত হতো। বর্তমানে ঈশ্বরদী বিমানবন্দরটির কার্যক্রম বন্ধ আছে।

সিলেট বিমানবন্দরটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন বার্মা হতে জাপানি আগ্রাসন প্রতিহত করতে ব্রিটিশ কর্তৃক নির্মিত হলেও ভারত বিভাজন পরবর্তী এটি অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর হিসেবে পরিচালিত হতে থাকে। পাকিস্তান শাসনামলে এ বিমানবন্দর হতে ঢাকার সাথে পাকিস্তান বিমান সংস্থা পিআইএ ফ্লাইট পরিচালনা করত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন বিমানবন্দরটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন বিমানবন্দর হতে বিমান চলাচল বন্ধ ছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন নির্মিত কক্সবাজার বিমানবন্দরটি যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বহুদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সরকার এর সংস্কারকার্যক্রম পরিচালনা করে। একইসাথে এটিকে বাণিজ্যিক ব্যবহারের উপযোগী করে তোলে। এ সময় কিছু দিনের জন্য কক্সবাজারে পিআইএ বিমান চলাচল শুরু করে; তবে অল্প সময়ের ব্যবধানে এ ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ হয়ে যায়। এভাবে দু’দফা পিআইএ এর ফ্লাইট চালু হয়। আবার বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় বিমানবন্দরটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৭২ সালে তা সংস্কার করে ফ্লাইট চালনা শুরু হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন তৎকালীন পূর্ব-বাংলায় ব্রিটিশ ও যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক যে সামরিক বিমানবন্দর ও রানওয়ে নির্মিত হয়েছিল যুদ্ধ-পরবর্তী তার কিছু বেসামরিক বিমান চলাচলে উন্মুক্ত হয়। এছাড়া কিছু পরিত্যক্ত হয়। তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে একটি মাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছিল, যা তেজগাঁও বিমানবন্দর নামে অভিহিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সারা বিশ্বে বিমান যোগাযোগের দ্রুত প্রসার ঘটলেও তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে সে অনুযায়ী প্রসার না ঘটে বরং সামরিক কাজে ব্যবহৃত তিনটি বিমানবন্দর (কুমিল্লা, ফেনী ও লালমনিরহাট) বন্ধ হয়ে যায়। এই তিনটির মধ্যে লালমনিরহাট বিমানবন্দরটি চালুর সম্ভাবনা থাকলেও কুমিল্লা ও ফেনী এ দু’টি আদৌ চালুর সম্ভাবনা আপাতত ক্ষীণ।

লেখক : সাবেক জজ এবং সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

[email protected]