শাহ্ আবদুল হান্নান : বহুমাত্রিক সংস্কারের স্থপতি

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে ভ্যাট প্রবর্তন, ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর রিফর্ম প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন এবং ইসলামী ব্যাংকিংয়ের জন্য ব্যাংক কোম্পানি আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার- এই তিন উদ্যোগই দীর্ঘমেয়াদি প্রভাববাহী রাষ্ট্রসংস্কার হিসেবে বিবেচিত হবে। এসব সংস্কারের সাথে শাহ্ আবদুল হান্নানের নাম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হবে। এর সুফল যুগ যুগ ধরে ভোগ করবে বাংলাদেশ

শাহ্ আবদুল হান্নান
শাহ্ আবদুল হান্নান |সংগৃহীত

ড. আহসান এইচ মনসুর
শাহ্ আবদুল হান্নানের সাথে আমার পরিচয় ১৯৮৯ সালের শেষ দিকে। সে সময় আমি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দায়িত্বে মূল্য সংযোজন কর বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ওয়াশিংটন থেকে ঢাকায় আসি। তখন শাহ্ আবদুল হান্নান এনবিআরের মেম্বার (এক্সাইজ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাকে এবং এনবিআরের চেয়ারম্যানকে সাথে নিয়ে আমরা একাধিক দেশ সফর করি, যার উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন দেশের ভ্যাটব্যবস্থা সরেজমিন পর্যালোচনা করা। এসব সফরের সময় প্রায়ই আমরা একই হোটেলে থাকতাম। ঘনিষ্ঠভাবে আলাপের সুযোগ হতো। এভাবেই আমাদের সম্পর্ক গভীর ও ঘনিষ্ঠতায় রূপ নেয়।

বহুমাত্রিক কর্মজীবন ও সততা
তিনি ছিলেন সফল ও সর্বজনস্বীকৃত কর্মকর্তা। একই সাথে দক্ষ ও প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকার। তার কর্মজীবন ছিল বহুমাত্রিক ও বিস্তৃত। বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, অর্থ মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন সংস্থা এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়- প্রতিটি ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। ইসলামী ব্যাংকের মতো বড় একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ছিলেন। একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন। ইবনে সিনা ট্রাস্ট, মানারাত ট্রাস্ট, নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টসহ বিভিন্ন দাতব্য, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সাথেও যুক্ত ছিলেন। এতগুলো কর্মক্ষেত্রে একসাথে সফল পদচারণা খুব কম মানুষের পক্ষেই সম্ভব হয়েছে।

এই বহুমুখী সাফল্যের পেছনে যে নৈতিক ভিত্তি কাজ করেছে, সেটিই ছিল তার সবচেয়ে বড় শক্তি। সততার সাথে চলতে গিয়ে যে সীমাবদ্ধতা ও কষ্টের মুখোমুখি হতে হয়, তার মধ্যেও তিনি পরিবারকে যতটুকু সম্ভব সমর্থন দিয়ে গেছেন।

আমার বাবা ছিলেন সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তা- আরো আগের প্রজন্মের, ব্রিটিশ আমলের বেঙ্গল সার্ভিসে যোগ দেয়া একজন অফিসার। সততার সাথে জীবনযাপন করলে সংসারে যে কষ্ট নিত্যসঙ্গী হয়, তা আমরা নিজের চোখেই দেখে বড় হয়েছি। এই অভিজ্ঞতার কারণেই আমি শাহ্ আবদুল হান্নানকে গভীর শ্রদ্ধার চোখে দেখি। পরবর্তী প্রজন্মের মানুষ হয়েও তিনি সেই ত্যাগ ও নৈতিক দৃঢ়তা আন্তরিকভাবে ধারণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন নিখুঁতভাবে বিশুদ্ধ ও সৎ মানুষ।

এক দুপুরে তিনি আমাকে তার বাসায় নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই বাসা দেখে আমাদের বাসার মতোই মনে হয়েছিল- অর্থাৎ, আমার বাবার বাসার সাথে বিস্ময়কর মিল। বৈঠকখানায় ছিল মাত্র একটি টেবিল ও চারটি চেয়ার। তার এই সরলতা ছিল তার চরিত্রের স্বাভাবিক প্রতিফলন।

তিনি আমাকে বিভিন্ন সময় উপদেশ দিয়েছেন। তার প্রত্যাশা ছিল, আমি যেন ইসলামী অর্থনীতির ওপর কাজ করি। আমার ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য, সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারিনি। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে ইসলামিক ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণ ও নীতিনির্ধারণসংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করেছি, তবুও তার প্রত্যাশিত অর্থে আমি ইসলামী অর্থনীতির বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠতে পারিনি।

তার বাবা কাস্টমস বিভাগে কর্মরত ছিলেন, আমার মামাও ছিলেন একই বিভাগে। একদিন মামার কাছ থেকে শুনি, কাস্টমস সার্ভিসে একজন কাস্টমস ইন্সপেক্টরের ছেলে যোগ দিয়েছে- সৎ কর্মকর্তা। পরে বুঝতে পারি, সেই ব্যক্তিই ছিলেন শাহ্ আবদুল হান্নান। সততা ও দক্ষতার জন্যই তাকে দুর্নীতি দমন সংস্থার মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। একদিন তিনি দুঃখভরে আমাকে বলেছিলেন- বাংলাদেশে সৎ মানুষের জন্য কাজ করা কঠিন। কারণ অভ্যন্তরীণভাবে অনেকেই দুর্নীতিগ্রস্ত ছিলেন। সাধারণ মানুষকে তুচ্ছ বিষয়েও হয়রানি করা হতো, আর প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা। এই পরিস্থিতিতে দুর্নীতি দূর করতে কার্যকর ভূমিকা রাখা ছিল কঠিন ও ক্লান্তিকর দায়িত্ব।

মূল্য সংযোজন করের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারক
তিনি ব্যক্তি হিসেবে সফল ছিলেন। পরিবারপ্রধান হিসেবেও ছিলেন সফল। রাষ্ট্রের জন্যও বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে গেছেন। ইন্তেকালের পরও তার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো- ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয় ও দাতব্য সংস্থাগুলো- দেশের সেবায় সক্রিয় থাকবে। তিনি যে ধরনের কাঠামোগত সংস্কার করেছেন, তার মধ্যে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) প্রবর্তন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই উদ্যোগের সাথে আমি নিজেও প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলাম। আজ ভ্যাট বাংলাদেশের রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎস। শাহ্ আবদুল হান্নানের এই কর্মতৎপরতার সুফল বাংলাদেশ দীর্ঘকাল ধরে ভোগ করবে। ভ্যাট প্রবর্তন ছিল জটিল ও বহুপক্ষীয় প্রক্রিয়া। তিনটি সরকারের ধারাবাহিক উদ্যোগের মধ্য দিয়ে এটি আইনি রূপ পেয়েছে। বর্তমানে সরকারি আয়ের মূল ভিত্তি হিসেবেই ভ্যাট সুপ্রতিষ্ঠিত।

এই অবদানের সবচেয়ে দৃশ্যমান ও দীর্ঘস্থায়ী প্রকাশ ঘটেছে মূল্য সংযোজন কর প্রবর্তনের মাধ্যমে। আমি যদিও তখন আনুষ্ঠানিকভাবে অর্থমন্ত্রীর উপদেষ্টা ছিলাম, বাস্তবে ভ্যাট ইস্যুতেই নিবিড়ভাবে কাজ করেছি। সে সময় শাহ্ আবদুল হান্নান এনবিআরের মেম্বার (এক্সাইজ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। আমাদের লক্ষ্য ছিল সুস্পষ্ট- এক্সাইজ ট্যাক্স ব্যবস্থার আর প্রয়োজন নেই, সেটিকেই ধাপে ধাপে ভ্যাটে রূপান্তর করতে হবে। সেই উদ্দেশ্য সামনে রেখে আমরা একসাথে কাজ করে এক্সাইজ ব্যবস্থাকে ভ্যাট কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করি। তখন ইউএনডিপির একটি প্রজেক্ট ছিল এক্সাইজ ট্যাক্স সংগ্রহ শক্তিশালীকরণের জন্য। আলোচনা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমরা সিদ্ধান্ত নিই, এই প্রকল্পটিকেই ভ্যাট প্রকল্পে রূপান্তর করা হবে। এনবিআরের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই ভ্যাট বাস্তবায়নের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।

এই প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তকে বাস্তবে রূপ দিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সময়োচিত পদক্ষেপ অপরিহার্য হয়ে ওঠে। এই প্রকল্পের আওতায় আমরা প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করি। একই সাথে ইউএনডিপিকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিই, এক্সাইজ ব্যবস্থা কার্যত বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে, ফলে এক্সাইজকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে এই অর্থ ব্যবহার করে ভ্যাট ব্যবস্থা চালু করাই হবে যুক্তিসঙ্গত। ইউএনডিপি এতে সন্তুষ্ট হয়, কারণ তুলনামূলকভাবে স্বল্প অর্থ ব্যয় করে তারা একটি বৃহৎ সংস্কার প্রকল্পের সাথে যুক্ত হতে পারছিল। বাস্তবে ২০০-৩০০ মিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্প তারা প্রায় ২০-৩০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যেই বাস্তবায়নের সুযোগ পাচ্ছিল। ফলে তারা আমাদের প্রস্তাবে সম্মতি দেয়। তবে ডিসেম্বর মাসে হঠাৎ করে ইউএনডিপির প্রধান আমাদের লিখে জানান, প্রকল্পটি এখনো টিএপি না হওয়ায় এবং কোনো সরকারি অনুমোদন না থাকায় তারা অর্থায়ন অব্যাহত রাখতে পারবে না। ইতোমধ্যে অর্থ ছাড় দেয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, এ বিষয়ে অডিটজনিত জটিলতা তৈরি হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে দ্রুত ও দৃঢ় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেয়া ছিল সময়ের দাবি। এই প্রসঙ্গে একটি ঘটনা আমার স্পষ্টভাবে মনে আছে। তখন আমার পূর্বপরিচিত ইআরডি সচিবের মেয়ের বিয়ের বিষয়ে আমার স্ত্রী মধ্যস্থতার দায়িত্বে ছিলেন। আমরা দুপুরে একটি রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলাম। আমি ফাইলটি হাতে নিয়েই সচিবকে বলেছিলাম- ‘আপনাকে এই ফাইলটিতে প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর নিয়ে দিতে হবে।’ আনন্দের বিষয় হলো, পরদিনই তিনি আমাকে ফোন করে জানান- ‘স্বাক্ষর হয়ে গেছে’। সে সময় প্রেসিডেন্টের দফতর বর্তমানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েই ছিল। কোনো আনুষ্ঠানিক জটিলতা ছাড়াই প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ স্বাক্ষর করেন। পরে ইআরডি সচিব ফাইলটি সংগ্রহ করে আমার বাসায় পৌঁছে দেন। এর ফলেই আমরা প্রকল্পটির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করতে সক্ষম হই।

আইনি ও প্রশাসনিক অনুমোদনের পর শুরু হয় সংস্কারের কঠিন পর্ব- মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা। ভ্যাট প্রবর্তনের সময় আমরা শাহ্ আবদুল হান্নানের সাথে দেশের বিভিন্ন জেলায় সফর করেছি। এই প্রক্রিয়ায় বহুবার ঘেরাওয়ের মুখোমুখি হয়েছি। এনবিআর প্রাঙ্গণেও ভ্যাটবিরোধী আন্দোলনের সময় আমাদের ঘেরাও করা হয়েছে- এগুলো ছিল ব্যাপক ও সংগঠিত আন্দোলন। ভ্যাট প্রবর্তনের পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল ঘটনাবহুল। এই উদ্যোগের সূচনা হয় হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সময়। পরে শাহাবুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার এলে ভ্যাট অধ্যাদেশ আকারে কার্যকর হয়। এরপর বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে এটি পূর্ণাঙ্গ আইনি রূপ লাভ করে। প্রতিটি পর্যায়েই শাহ্ আবদুল হান্নান প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও দক্ষতার সাথে জটিল বাস্তবতা সামাল দিয়েছেন।

ভ্যাট অধ্যাদেশ জারির জন্য আমরা যখন বিষয়টি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান, প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদের কাছে পাঠাই, তিনি বিষয়টি বিচক্ষণতার সাথে পর্যালোচনা করেন। বলেন, তিনি একটি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে মাত্র তিন মাসের দায়িত্বে আছেন। এমন অবস্থায় কেন তিনি এ ধরনের একটি বড় আইন প্রণয়নের পদক্ষেপ নেবেন? জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে কারণ দর্শাতে বলে প্রস্তাব ফেরৎ পাঠালেন তিনি।

পরে বিষয়টি নিয়ে আবার আলোচনা করি। সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে শাহ্ আবদুল হান্নান ও এনবিআরের চেয়ারম্যানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানের কাছে যেতে হয়। তবে মূল যুক্তিগুলো সুসংগঠিতভাবে উপস্থাপন করেন শাহ্ আবদুল হান্নান নিজেই। তিনি ব্যাখ্যা করেন, সরকারের প্রণীত বাজেটে ভ্যাট থেকে আয়ের হিসাব অন্তর্ভুক্ত আছে; এটি বাস্তবায়ন না হলে বাজেটে বড় ধরনের ঘাটতি সৃষ্টি হবে, যা রাষ্ট্র ও সরকারের জন্য কাম্য নয়। এই বাস্তবসম্মত যুক্তির ভিত্তিতেই শেষ পর্যন্ত বিচারপতি শাহাবুদ্দিন সাহেবের অনুমোদন পাওয়া যায়।

এই যুক্তিনির্ভর অবস্থানের পরই রাজনৈতিক পর্যায়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পথ সুগম হয়। বিশ্বব্যাংকের প্রাথমিক ধারণা ছিল, ভ্যাট প্রবর্তনে কমপক্ষে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগবে। কিন্তু আমাদের দেশে দুই বছর বা তারও কম সময়ে- এই ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হয়। জাতীয় নির্বাচন পরবর্তী ধাপে বিষয়টি বিএনপি সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হয়। সাইফুর রহমান সাহেব তখন অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এনবিআরে এসে ভ্যাট বিষয়ে আমাদের একটি উপস্থাপনা গ্রহণ করেন তিনি। কিছুক্ষণ শোনার পর আশঙ্কা প্রকাশ করেন, বিষয়টি সরাসরি ক্যাবিনেটে উপস্থাপন করলে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। পরে নিজেই এর একটি বাস্তবসম্মত সমাধান বের করেন- ফাইলটি সরাসরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছে এককভাবে উপস্থাপন করবেন, বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তার সম্মতি নেবেন। এই প্রজ্ঞাপূর্ণ উদ্যোগের মাধ্যমেই শেষ পর্যন্ত ভ্যাট আইনটি কার্যকর আইনি রূপ লাভ করে।

রাষ্ট্র সংস্কারে অবিস্মরণীয় ভূমিকা
ভ্যাট বাস্তবায়নের পুরো প্রক্রিয়াজুড়েই আমরা তিনটি ভিন্ন সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। এই দীর্ঘ ও জটিল সংস্কারযাত্রায় শাহ্ আবদুল হান্নান ছিলেন কেন্দ্রীয় ভূমিকায়। এই সাফল্যের জন্য তার অবদান নিয়ে আমরা গর্ব করতেই পারি। কারণ, এই অর্জনের পেছনে তার ব্যক্তিগত নিষ্ঠা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও নৈতিক দৃঢ়তা ছিল অনস্বীকার্য।

আমার দৃঢ়বিশ্বাস, ব্রিটিশ আমলের The Salt and Excise Tax Act-এর পর বাংলাদেশের করব্যবস্থায় ১৯৯১ সালের ভ্যাট প্রবর্তনই ছিল সবচেয়ে বড় আইনগত সংস্কার। এই দীর্ঘ সময়ে এ ধরনের ব্যাপক ও কাঠামোগত পরিবর্তন আর দেখা যায়নি। একই সাথে ব্যাংকিং খাতেও যে মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়িত হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রেও শাহ্ আবদুল হান্নানের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী।

বিশ্বব্যাংকের নির্দেশনায় চালু হওয়া ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর রিফর্ম প্রোগ্রামের মূল লক্ষ্য ছিল ব্যাংকিংব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা। এর আওতায় ঋণ শ্রেণীকরণ, ঝুঁকিভিত্তিক মূলধন পর্যাপ্ততা, ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) প্রতিষ্ঠা এবং ঋণ ও ক্রেডিট ঝুঁকি বিশ্লেষণ ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়। এই সমগ্র সংস্কার প্রক্রিয়ার নকশা ও বাস্তবায়নে শাহ্ আবদুল হান্নান ছিলেন প্রধান রূপকার।

একইভাবে, প্রচলিত ব্যাংক কোম্পানি আইনের আওতায় ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করাও ছিল জটিল ও সংবেদনশীল। আইনের কিছু ধারায় ইসলামী ব্যাংকিংয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রমের সাথে অসামঞ্জস্য ছিল। প্রয়োজনীয় সংস্কার ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে এই প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করে ইসলামী ব্যাংকিংকে প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি ভিত্তি প্রদানেও শাহ্ আবদুল হান্নান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরে তিনি ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবেও দক্ষতা দেখান।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে ভ্যাট প্রবর্তন, ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর রিফর্ম প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন এবং ইসলামী ব্যাংকিংয়ের জন্য ব্যাংক কোম্পানি আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার- এই তিন উদ্যোগই দীর্ঘমেয়াদি প্রভাববাহী রাষ্ট্রসংস্কার হিসেবে বিবেচিত হবে। এসব সংস্কারের সাথে শাহ্ আবদুল হান্নানের নাম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হবে। এর সুফল যুগ যুগ ধরে ভোগ করবে বাংলাদেশ।

শাহ্ আবদুল হান্নান ছিলেন নীরব কিন্তু দৃঢ় রাষ্ট্রসংস্কারক। যার অবদান সময়ের সাথে আরো গভীরভাবে মূল্যায়িত হবে।

লেখক : সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক, সাবেক চেয়ারম্যান, ব্র্যাক ব্যাংক

সাবেক সিনিয়র আবাসিক প্রতিনিধি, আইএমএফ