দ্বিতীয় কিস্তি
২০০১ সালের নাইন-ইলেভেনে নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ার ধ্বংসের ঘটনা ঘেটে। এর জেরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্ররা মিলে আফগানিস্তানে ব্যাপক হামলা চালাল। অভিযোগ করা হলো, সৌদি নাগরিক উসামা বিন লাদেন ও তার সহযোদ্ধারা এই সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র তার ভূমণ্ডলীয় রাজনীতিতে এক নতুন কৌশল গ্রহণ করল- ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’। দেশটি এরূপ নীতি গ্রহণ করল যে, শত্রু আক্রমণ করতে পারে এমন আশঙ্কা করলে আগে তাকে আক্রমণ করতে হবে। দেখা গেল, তাদের আক্রমণের শিকার হতে থাকল একে একে মুসলিম দেশগুলো। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশ মুখ ফসকে বলে ফেললেন, এটি ‘ক্রুসেড’। মজার বিষয় হলো- এবার ইরান আক্রমণ করে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ‘প্রতিটি বুলেট যেন অধার্মিক শত্রুদের ওপর আঘাত হানে... যারা দয়া পাওয়ার যোগ্য নয়, তাদের ওপর যেন চরম মাত্রার সহিংসতা প্রয়োগ করা হয়। আমরা যিশুখ্রিষ্টের নামে এই লড়াই করছি।’ মার্কিনিদের ইরানবিরোধী এই আগ্রাসী কর্মকাণ্ডে যে উপসাগরীয় মুসলিম দেশগুলো সহায়তা করছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাডমিরাল কুপারের ভাষায়। তিনি বলেন, ‘আরব দেশগুলোর সাথে আমাদের সামরিক বাহিনীর খুব ভালো যোগাযোগ আছে। আমি বাহরাইনে গিয়েছিলাম দুই দিন আগে। বাহরাইনের আমির তো আমাদের সেনাদের নাম পর্যন্ত জানেন।’
মার্কিনিদের ভাষ্যমতে, সৌদি নাগরিকরা টুইন টাওয়ারে হামলা চালালেও সৌদি আরব আক্রমণের লক্ষ্য হলো না; টার্গেট হলো আফগানিস্তান, ইরাক এবং তাতে সহযোগিতা করল সৌদি আরব, মিসর ও পাকিস্তান। পরবর্তী পর্যায়ে রাসায়নিক অস্ত্র (কেমিক্যাল উইপন) তৈরির অজুহাতে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে হত্যা করা হলো। ইরাককে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনী দখলে নিলো।
লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মার গাদ্দাফিকেও একইভাবে হত্যা করে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ বাধিয়ে দেয়া হলো। মিসরে গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরশাসক হুসনি মোবারককে উৎখাতের পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইখওয়ানুল মুসলিমিনের প্রার্থী মোহাম্মদ মুরসি নির্বাচিত হয়েছিলেন; কিন্তু কিছু দিন যেতে না যেতে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তার পতন ঘটানো হলো। এতে যুক্তরাষ্ট্রের যে হাত ছিল তা পরবর্তীতে মার্কিন পদলেহী সিসির নীতি-কৌশল দেখলে বোঝা যায়। সিসি পাক্কা একজন মার্কিন পদলেহির মতো আচরণ করতে থাকেন। ইসরাইলের সাথে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেন। ফিলিস্তিনের গাজায় হামাস যোদ্ধারা দীর্ঘ দিন ধরে ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন চালিয়ে আসছিল। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তারা গাজার মতো একটি ছোট এলাকার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে হামাসের রাজনৈতিক শাখার নেতারা বিপুল ভোটে জয়লাভ করে সরকার গঠন করেছিলেন। তারা ছিলেন ইসলামপন্থী। কিন্তু তাদের সরকার চালাতে দেয়া হয়নি। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে তাদের ধ্বংস করে দেয়ার চেষ্টা চলে। ২০২৩ সালে গাজার ওপর নেমে আসে মানবেতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞ। ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে হিংসাত্মক পন্থায় প্রায় এক লাখ মানুষ হত্যা করেছে যার মধ্যে আছে ১৫ হাজার শিশু ও ৪০ হাজার নারী। আহত হয়েছেন কয়েক লাখ। শরণার্থী শিবির, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সব জনপদকে অসংখ্য বোমার আঘাতে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়। সারা পৃথিবী থেকে প্রতিবাদ এলেও ইসরাইল পাত্তা দেয়নি। দেশটি যুদ্ধাপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের রেকর্ড সৃষ্টি করে। এমনকি জাতিসঙ্ঘ মার্কিন চোখ রাঙানির মুখে নির্বিকার হয়ে বসে থাকে। সমকালের মানবসভ্যতা এরূপ জুলুম ও নৃশংসতায় স্তম্ভিত হয়ে যায়, যা এখনো চলছে। ফিলিস্তিনে একটি প্রাচীন মুসলিম জনপদ এবং তাদের ভূমি ও সম্পত্তি ইসরাইল জবরদস্তি করে দখল করে নিয়েছে। তাদের ওপর সীমাহীন নির্যাতন চালাচ্ছে। এর বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী সাধারণ মানুষ তীব্র প্রতিবাদ জানালেও প্রভাবশালী সরকারগুলো নীরবতা পালন করে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, এর মধ্যেও অনেক মুসলিম দেশ ইসরাইলের সাথে অস্ত্র ব্যবসায় চালিয়ে যাচ্ছে। দুঃখের বিষয় হলো- মুসলিম দেশগুলো গাজাবাসী মুসলিমদের ওপর চরম নির্যাতন ও ধ্বংসযজ্ঞ দেখেও নীরবতা পালন করছে। এমনকি ফিলিস্তিনের পশ্চিমতীরে মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বে যে নামকাওয়াস্তে সরকার রয়েছে তারাও হামাসকে তাদের শত্রু মনে করেন।
এরপর ধরা হয় সিরিয়াকে। সেখানে অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ লাগিয়ে দেশটিকে শেষ করে দেয়া হলো। ইরান ছিল সিরিয়ার স্বৈরশাসক বাশার আল আসাদের পক্ষে। কারণ সে ছিল ইসরাইলবিরোধী এবং ইসরাইল তার পতন চাইছিল। সিরিয়ায় বাশারের পতন হলে এবং দেশটিতে বাশারবিরোধী সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে সেটি হবে ইসরাইলের কৌশলগত বিরাট সুবিধা। সে ইরানের কাছাকাছি যেতে পারবে সহজে। ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে সিরিয়া ও লেবানন হচ্ছে একটি বাফার জোনের মতো। যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় শিয়া-সুন্নি বিরোধ লাগিয়ে দিলো। তুরস্কের প্রতিবেশী হওয়ায় তার আগ্রহ ছিল সিরিয়ার ব্যাপারে। বিশেষ করে তুরস্কের ভেতরে কুর্দি বিদ্রোহীরা রয়েছে যাদের সাথে সিরিয়া ও ইরাকের কুর্দিদের সম্পর্ক রয়েছে। জটিল রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্কের হিসাবে অবশেষে বাশারের পতন ঘটে। সিরিয়ায় ক্ষমতা দখলে নেয় এমন একটি শক্তি (যারা ইসলামপন্থী বলে পরিচিত) যাদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আশীর্বাদ রয়েছে। এর মানে এতে ইসরাইলও লাভবান হলো; ক্ষতিগ্রস্ত হলো ইরান। ওদিকে ইরাকে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার ক্ষমতায় এলো তাদের সাথে ইরানের সম্পর্কের উন্নতি হলো। এর একটি কারণ, ইরাকের রাজনীতিতে শিয়া মুসলিমদের প্রভাব রয়েছে। অবশ্য সাদ্দামের পতনের পর ইরাকে একটি শক্তিশালী মার্কিন ঘাঁটি প্রতিষ্ঠিত হয়। লক্ষণীয় যে, ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তার একচ্ছত্র সামরিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে ইরানকে চাপে ফেলার কৌশল নেয়। এর মধ্য দিয়ে তারা এক দিকে, ভবিষ্যতে অন্য কোনো আরব দেশে ইসলামী বিপ্লবের সম্ভাবনা প্রতিহত করা এবং অন্য দিকে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব নস্যাত করা। এটি করা সম্ভব হলে ইসরাইলের দুটো লাভ হবে- ১. ইরানকে পরমাণু শক্তির অধিকারী হতে না দেয়া এবং ২. মধ্যপ্রাচ্য দখল করে গ্রেটার ইসরাইল প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে ত্বরান্বিত করা।
ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যে গ্রেটার ইসরাইল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। এক দিকে পুরো ফিলিস্তিন গ্রাসের কাজটি ইতোমধ্যে প্রায় সম্পন্ন করেছে; এরপর অন্যান্য ভূখণ্ডের প্রতি হাত বাড়ানো হলো তার পরিকল্পনা। এর অংশ হিসেবে কৌশলগতভাবে আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে তাদের দাস বানিয়ে রাখা। এ ক্ষেত্রেও ইসরাইল অনেক দূর এগিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে আব্রাহাম অ্যাকর্ডের বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ইসরাইলের প্রতিবেশী মিসর ও জর্দান ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়েছে; এমনকি তাদের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গাজায় ইসরাইল যতই নৃশংসতা চালায় না কেন, তারা একেবারে চুপ রয়েছে। অন্য দিকে সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান, আরব আমিরাত- সবাই ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে নীরব। শুধু তা-ই নয়, এর মধ্যে বাহরাইন, আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের সাথে ইসরাইলের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একমাত্র ইরান, লেবানন ও ইয়েমেনকে বাগে আনা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে লেবানন একটি ছোট ও দুর্বল রাষ্ট্র হওয়ায় দখলে নিতে ইসরাইল চেষ্টা করে যাচ্ছে। ইয়েমেন অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হলেও ভৌগোলিকভাবে কৌশলগত অবস্থানে থাকায় সহজে কাবু করা যাচ্ছে না। তবে সেখানেও শিয়া-সুন্নি বিভেদ তৈরি করে রাখা হয়েছে। আমেরিকা ও ইসরাইলের পাশাপাশি সৌদি আরবও ইয়েমেনকে বহুদিন ধরে আক্রমণ করে আসছে। যদি এমনটি হতো যে, মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় দেশগুলো সবাই ইসরাইলের ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, তাহলে গাজায় যা ঘটছে তা ঠেকানো যেত। কিন্তু তার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এর কারণ উদঘাটনের চেষ্টা করা যাক।
কুয়েত
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত কুয়েত ছিল উসমানীয় খেলাফতের অধীনে একটি জেলা। প্রশাসক ছিলেন সাবা গোত্র অধিপতি মোবারক। যুদ্ধে তুরস্ক জার্মানির সাথে মিত্রতা প্রতিষ্ঠা করলে ব্রিটেন কৌশলে কুয়েতকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ব্রিটেনের আশ্রিত রাজ্য হিসেবে ঘোষণা করে। সাবাহ রাজপরিবারকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়। এর মানে হচ্ছে- কুয়েত রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছে উসমানীয় সাম্রাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ফলে। এবং তা ব্রিটেনের সহায়তায়। তুরস্ক প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় এ দিকে মনোযোগ দিতে পারেনি। কুয়েত ছিল অত্যন্ত দরিদ্র। ১৯৩০ সালে দেশটিতে তেলখনি আবিষ্কৃৃত হলে কুয়েত তেল উত্তোলনে ব্রিটেনের সাথে ১৯৩৪ সালে এক চুক্তিপত্র স্বাক্ষর করে। এখন কুয়েত বিশ্বে নবম তেল রফতানিকারক দেশ হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। ১৯৬১ সালে দেশটি ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত কমিউনিজম যাতে আরব রাষ্ট্রগুলোতে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য যুক্তরাষ্ট্র তাদের দিকে এগিয়ে আসে। শুধু তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্র নিরবচ্ছিন্নভাবে তেল সরবরাহ পেতে উপসাগরীয় সব দেশের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলে। তাদের আশ্বাস দেয়া হয়, তারা যুক্তরাষ্ট্রকে তেল সরবরাহ করবে, বিনিময় তাদের নিরাপত্তা সহায়তা দেয়া হবে। ১৯৯০ সালে ইরাক কুয়েত দখল করে নিলে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আরব দেশগুলো একজোট হয়ে কুয়েত মুক্ত করে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কুয়েতের দুর্বলতা থাকা অস্বাভাবিক নয়। এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র কুয়েতে তার একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে। কুয়েতের আরিফযান ঘাঁটি থেকে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশে বিমান আক্রমণ করার সুবিধা লাভ করে থাকে।
বাহরাইন
সৌদি আরবের কোলঘেঁষে অবস্থিত বাহরাইন ৩৩টি ক্ষুদ্র দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত। ১৮৬৮ সালে ব্রিটেন এই দ্বীপ রাষ্ট্রটিকে একটি আশ্রিত রাজ্যে পরিণত করে। ১৯৭১ সালে দেশটি স্বাধীনতা পায়। এ সময় ইরান দাবি করে, বাহরাইন ভূখণ্ড তাদের দিতে হবে। উল্লেখ্য, বাহরাইনের ৭০ শতাংশ অধিবাসী শিয়া মুসলিম। অপর দিকে, সৌদি আরব দাবি করে দেশটি তার উপকূলে অবস্থিত হওয়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে তাকে দিতে হবে। অবশেষে, জাতিপুঞ্জের সহায়তায় দেশটি স্বাধীন থাকার অনুমোদন পায়। বাহরাইনে ১৯৩৪ সালে তেলের খনি আবিষ্কৃত হয়। এখানেও তারা ব্রিটেনের সাথে তেল চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় এলাকায় তার প্রভাব বৃদ্ধির জন্য বাহরাইনের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়। এর আওতায় সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহরের জন্য স্বাগতিক দেশ হিসেবে গণ্য হয়। আজকে যে হরমুজ প্রণালী নিয়ে এত বিরোধ, এর প্রধান কারণ- বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি।
কাতার
কাতার একসময় বাহরাইনের অধীনস্থ একটি গোত্রীয় রাজ্য ছিল। ১৮৬৮ সালে ভূখণ্ডটি বাহরাইন থেকে আলাদা হয়ে যায়। ১৮৭২ সালে উসমানীয় সাম্র্রাজ্যের একটি জেলা হিসেবে গণ্য হয়। ১৯৬৮ সালে ব্রিটেন কাতারকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে যুক্ত করতে চাইলে কাতার তা মেনে নিতে অস্বীকার করে। অবশেষে ১৯৭১ সালে দেশটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কাতারে প্রচুর প্রাকৃতিক গ্যাস পাওয়া গেছে, যা আজ বিশ্বের চাহিদা পূরণে দেশটিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের মতো যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কাতারে হাত বাড়ায়। ফলে সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় বিমানঘাঁটি নির্মাণ করা হয়েছে। কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তান এবং সাম্প্রতিককালে ইরানে বোমা হামলা চালায়। কাতারে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ড সেন্টার।
সংযুক্ত আরব আমিরাত
ব্রিটেন যখন আফ্রিকা ও ভারত উপমহাদেশের উপনিবেশ শাসন করছিল, তখন প্রয়োজনীয় সমুদ্রপথগুলো নিরাপদ রাখার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। কারণ ইউরোপের সাথে তখন যোগাযোগের প্রধান পথ ছিল নৌপথ। উপসাগরীয় দেশগুলোতে চরম দারিদ্র্যের কারণে সেখানকার অধিবাসীদের একটি অংশ জলদস্যু হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করত। তাদের নিবৃত্ত করতে ব্রিটেন তাদের সাথে চিরস্থায়ী সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হয়, যার ফলে ছোট ছোট দ্বীপগুলো ‘সন্ধিসূত্র রাজ্য’ হিসেব স্বীকৃতি পায়। ১৯৬৮ সালে ব্রিটেন এ এলাকা ছাড়তে বাধ্য হলে সাতটি সন্ধিসূত্র রাজ্য বা আমিরাতকে একত্র করে সংযুক্ত আরব আমিরাত গঠন করা হয়। এগুলো স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়। আমিরাতগুলো হচ্ছে- আবুধাবি, দুবাই, শারজাহ, রাস আল খায়মা, উম্মুল কারওয়াইন, ফুজায়রা ও আজমান। এর মধ্যে আবুধাবি ও দুবাই তেলসম্পদে সমৃদ্ধ। তেলের কারণে দেশটি সম্পদশালী হয়ে এখন বিশ্বরাজনীতির অন্যতম খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দেশটি সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে সক্ষমতা অর্জন করেছে। বিমানবাহিনীও বেশ শক্তিশালী। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যৌথ সামরিক মহড়া চালিয়ে থাকে।
ওমান
সৌদি আরবের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত ওমান সাগর ও আরব সাগরের মধ্যবর্তী স্থানে ওমান অবস্থিত। পারস্য উপসাগরের প্রবেশমুখে দেশটির অবস্থান হওয়ায় এর ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি। ইরান ও ওমান হরমুজ প্রণালী যৌথভাবে ব্যবস্থাপনা করে থাকে। ১৭৪৪ সালে আল-বু সাঈদ নামে একজন স্থানীয় নেতা উসমানীয় সাম্রাজ্যের রাজধানী ইস্তান্বুল থেকে বহু দূরে অবস্থিত ওমানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শাসন পরিচালনা করতে থাকেন। এ সময় তিনি জাঞ্জিবারে রাজধানী স্থাপন করেন। ১৮৫০ সালে সেখানকার শাসক নিজেকে ‘সুলতান’ উপাধিতে ভূষিত করেন, যা উসমানীয় শাসকরা মেনে নেননি। এ সময় ব্রিটিশরা নৌপথে আধিপত্য বজায় রাখতে সুলতানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। সুলতান তখন রাজধানী স্থানান্তর করে মাসকাটে নিয়ে যান। ব্রিটিশদের সাথে চুক্তি করতে বাধ্য হন। ১৯৮০ সালে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এক চুক্তি স্বাক্ষর করে যার আওতায় সেখানে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করার অনুমতি দেয়। তবে ওমান ইরানের সাথে যুদ্ধে নিরপেক্ষ থাকার ঘোষণা দিয়েছে।
ইয়েমেন
আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত ইয়েমেন একটি সুপ্রাচীন সভ্যতার দেশ। প্রাচীনকাল থেকে অঞ্চলটি বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠী শাসন করেছে। ১৫১৭ সালে ইয়েমেন উসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে আসে। ১৮৩৯ সালে ব্রিটেন নৌপথ রক্ষার স্বার্থে ইয়েমেনের এডেন বন্দর দখল করে সেখানে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে। এমনকি আশপাশের দ্বীপ রাজ্যগুলোও এখান থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হতে থাকে। ১৯৬৩ সালে ব্রিটিশরা এলাকার সব পক্ষ নিয়ে একটি ফেডারেশন গঠনের চেষ্টা করলে সেখানে গৃহযুদ্ধ দেখা দেয়। এতে প্রতিবেশী সৌদি আরব, মিসর প্রভৃতি দেশও কোনো পক্ষ নেয়। কয়েকবার চুক্তি হলেও দেশটিতে এখানো গৃহযুদ্ধ চলমান রয়েছে। শিয়া মুসলিমদের সমর্থিত হুতি বাহিনী সেখানে ইরানের সমর্থনে ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের স্বার্থের ওপর আক্রমণ করে থাকে। লোহিত সাগরের প্রবেশ পথ বাব-এল মান্দেব প্রণালীর ওপর হুতি বাহিনীর প্রভাব আছে।
এতক্ষণের আলোচনায় এটি পরিষ্কার হলো যে, উপসাগরীয় দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক, ব্রিটিশের সাথে গাঁটছড়া বাঁধতে হয়, যা উসমানীয় খিলাফতের ক্ষয়িষ্ণুকালের দুর্বলতা হিসেবে ফুটে ওঠে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ব্রিটেনের জায়গা দখল করে নেয় যুক্তরাষ্ট্র, যা এখনো চলছে; বরং যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবাধীনে দেশগুলো আরো বেশি নাজুক অবস্থায় পতিত হয়েছে। মার্কিনিদের চাপে বাহরাইন ও আরব আমিরাত ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছে। তারা ইসরাইলের সাথে ব্যবসায়-বাণিজ্য থেকে শুরু করে নিরাপত্তা ইস্যুতেও পারস্পরিক সহযোগিতার সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছে। অপর দিকে, কুয়েত ও কাতার ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা না করলেও তারা যোগাযোগ রাখে, বিশেষ করে ইরানের সাথে যুদ্ধের বিষয়ে। সৌদি আরব প্রকাশ্যে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়নি, তবে মার্কিনিদের সাথে তার সখ্যতার সম্পর্ক এবং ইরান ইস্যুতে দেশটির ভূমিকা ইসরাইলের স্বার্থে চলে যাচ্ছে। দৃশ্যত যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যকে তার অস্ত্র ব্যবসার একটি টেকসই ও উর্বর বাজার হিসেবে পেয়েছে। যেমন- সৌদি আরব তার সমরাস্ত্রের ৭৭, কুয়েত ৬২, কাতার ৪৮, আরব আমিরাত ৪২ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্রয় করে। ২০২৬ সালে আমিরাত, কুয়েত ও জর্দান যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৬.৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ড্রোন, মিসাইল ও যুদ্ধবিমান ক্রয় করে। ২০২৫ সালে সৌদি আরব একাই ১৪২ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্রয় করে।
আমরা এখন সহজেই বুঝতে পারছি, কেন ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে মিসাইল আক্রমণ চালাচ্ছে। একে বাংলাদেশের কিছু নামধারী আলেম (ওয়ায়েজিন) শিয়া-সুন্নি বিরোধ হিসেবে গণ্য করে ফতোয়ার চাবুক চালাচ্ছে। অথচ ২০০৫ সালে পবিত্র মক্কা নগরীতে অনুষ্ঠিত ওআইসির শীর্ষ সম্মেলনে হানাফি, মালিকি, শাফেয়ি, হাম্বলি, জাফরি, জাঈদি, ইবাদি ও সাহিরি- এই আটটি মাজহাবকে অফিসিয়ালি স্বীকৃতি দেয়া হয়। এ সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাব মতে, এ মাজহাবগুলোর অনুসারীরা সবাই মুসলিম। এগুলোর মধ্যে যেকোনো একটি মাজহাবের অনুসরণ করার কারণে কাউকে ‘কাফির’ বলা কিংবা কারো জানমাল-ইজ্জত-আব্রুর ওপর কোনোরূপ হামলা করা হারাম।’ (ড. আহমদ আলী, তুলনামূলক ফিকহ)
অন্য দিকে মার্কিন-ইসরাইল হামলায় শহীদ ইমাম খামেনি পরিষ্কার বলে গেছেন, ‘আমরা মজলুমের পক্ষ নেয়ার ক্ষেত্রে অপর পক্ষের মাজহাবের দিকে তাকাই না। আমরা এটি কখনো করিনি। আমরা আমাদের লেবাননের ভাইদের যেভাবে সহযোগিতা করেছি, ঠিক সেভাবে গাজার ভাইদেরও সহযোগিতা করেছি। সেখানে কোনো পার্থক্য ছিল না। যদিও তারা (গাজার অধিবাসীরা) সুন্নি এবং লেবাননের অধিবাসীরা শিয়া। আমাদের মূল বিষয়টি হলো- ইসলামী জাতিসত্তাকে (উম্মাহ) রক্ষা করা।’ আরো উল্লেখ্য যে, ঢাকায় নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত বলেছেন, কাতার ও আরব আমিরাতের চেয়ে ইরানে বেশি সুন্নি রয়েছে।
সুতরাং এটি পরিষ্কার যে, ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যে যুদ্ধ চলছে তার মধ্যে শিয়া-সুন্নি বিরোধ যারা উসকে দিতে চাইছেন, তারা মুসলিম উম্মাহর শত্রুদের স্বার্থরক্ষায় বেসামাল কথাবার্তা বলে যাচ্ছেন; যা অত্যন্ত নিন্দনীয়। বাংলাদেশের মৌলভী সাহেবরা সঠিকভাবে বিশ্ব রাজনীতি না বুঝলেও খ্রিষ্টান পোপ লিও চতুর্দশ ঠিকই বুঝেছেন, কারা অপরাধী। তিনি বলেছেন, ‘যারা নিজেদের সামরিক ও অর্থনৈতিক লাভের জন্য ধর্ম ও ঈশ্বরের নাম ব্যবহার করে, তাদের প্রতি ধিক্কার। যেসব নেতার হাত রক্তে রঞ্জিত, তাদের প্রার্থনা ঈশ্বর গ্রহণ করেন না।’
লেখক : গবেষক ও সাবেক সচিব



