বাঙালিরা যোদ্ধা জাতি (Martial Race) নয়, এই অপবাদটা কলকাতার বাবু বৃদ্ধিজীবী এবং মুসলিমবিদ্বেষী ইংরেজ রাজকর্মচারীদের অত্যন্ত সুপরিকল্পিত একটা বানোয়াট বয়ান। এই অপবাদের প্রথম জবাব দিয়েছিলেন কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ নিজে। ঢাকায় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট উদ্বোধন করতে এলে বাঙালি-দরদি জিল্লাহ্ দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছিলেন, Bengal race. But they were disarmed by the Britishers. It is time now you take up your arms. . (বাঙালিরা চিরকালই যোদ্ধার জাতি। তাদেরকে নিরস্ত্র করেছিল ব্রিটিশরা। এখন আপনারা সেই হাতিয়ার নিয়ে আবার গর্জে উঠুন)। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, খোদ জাতির পিতা কায়েদে আযম যখন বাঙালিদেরকে ‘যোদ্ধার জাতি’ বলে সম্মান দিয়ে গেছেন তখন তার অনুসারী পশ্চিম পাকিস্তানি সমাজপতি, বিশেষ করে, ব্রিটিশ-প্রশিক্ষিত এবং বাঙালিবিদ্বেষী সেনা কর্মকর্তারা ইতিহাসের দৃষ্টান্তগুলো বেমালুম চেপে গিয়ে ভাতখেকো বাঙালি সিপাহি ও অফিসারদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য জ্ঞান করতে থাকে। তাদের ওই বাঙালিবিদ্বেষী মনোভাব বাঙালিদের পৃথক আবাসভূমি বাংলাদেশ সৃষ্টিতে অন্যতম প্রধান ভূমিকা রাখে।
তবে সিপাহিদের ও অফিসারদের অবিশ্বাস্য সাহস ও যুদ্ধ কৌশলে ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে বাঙালি সৈনিক ও কর্মকর্তারা গোটা উপমহাদেশকে চমকে দেয়। চমকে দেয় স্যান্ড হার্টসের মতো জগদ্বিখ্যাত সামরিক কলেজের যুদ্ধ-গবেষকদেরও। প্রকৃত এবং ঐতিহাসিক সত্যটা হলো, এদেশের দেশপ্রেমিক বারো-ভূঁইয়াদের যৌথ সেনাদলের কাছ থেকেই বিজয়ী মোঘলরা প্রথম সামরিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিল। গোটা ভারতবর্ষের জন্মসূত্রে ‘যোদ্ধার জাতি’ শিখ, জাঠ, রাজপুত, গুর্খা, পাঠান প্রভৃতি বাহিনী বিনা প্রতিরোধে মোঘল বশ্যতা কবুল করে নিয়েছিল তখন এই বাংলার, বিশেষ করে পূর্ববাংলার প্রকৃত যোদ্ধারা ঠেকিয়ে দিয়েছিল শক্তিধর মোঘলদেরকে। মোঘলরা অশ্বারোহী, ধাতব বর্মধারী, তীরন্দাজ, গোলন্দাজ শক্তির নিরিখে বাংলার সিপাহিদের চেয়ে অনেক শক্তিশালী অবস্থানে ছিল। তবুও যুদ্ধে জেতার যে প্রধান শক্তি (High Morale), সেই শক্তিতে বারো-ভূঁইয়াদের দেশাল ফৌজ ছিল নজিরবিহীন মাত্রায় শক্তিধর।

১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি যোদ্ধাদেরকে খেতাব পরিয়ে দিচ্ছেন ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর লেখা অন্তত ২০ জন সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও গবেষকের যুদ্ধস্মৃতি গ্রন্থের ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে বাঙালি সেনা, অফিসার ও দুঃসাহসী অসামরিক মুক্তিবাহিনী সদস্যদের বিরল যুদ্ধকৌশল ও মনোবলের অসংখ্য দৃষ্টান্ত। জেনারেল জে. এফ. আর. জ্যাকব তো বলেই ফেলেছেন, ‘এই যুদ্ধ ছিল আপনাদেরই যুদ্ধ। আপনারা দেশপ্রেমের দীক্ষা নিয়ে এই যুদ্ধ করেছেন এবং বিজয় অর্জন করেছেন। আমরা ছিলাম আপনাদের সহায়ক শক্তি। প্রশিক্ষণ দিয়ে এবং পিছন থেকে কামানের সমর্থন দিতে আমরা আপনাদেরকে সাহায্য করেছি।’
আর এক শীর্ষ ভারতীয় জেনারেল ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে সঙ্ঘটিত ইন্দিরা-জগজীবন রাম ও ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল মানেক শ-এর বৈঠকের প্রসঙ্গ ধরে বলেছেন, ওই সভায় যুদ্ধ করে ঢাকা দখলের আগাম নির্দেশনাকে ইন্দিরা গান্ধীর মুখের ওপর ‘না’ বলার যে প্রস্তাব মানেক শ করেছিলেন, তাতে তিনি বলেছিলেন, এখন যদি আমরা পূর্ব পাকিস্তান আক্রমণ করে দখল করে নিই তাহলে আমাদের পরাজয় ১০০% নিশ্চিত। আপনি যদি আমাকে আর ছয়টা মাস সময় দেন, সেক্ষেত্রে আমাদের বিয়ে ১০০% সুনিশ্চিত। ফিল্ড্ মার্শাল মানেক শ’র এই বক্তব্যের অনেকে অনেকভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তবে শিখ জেনারেল মানেক শ’র মেয়ে মধ্য প্রদেশের সামরিক ও কৌশলগত গবেষণা সংস্থা প্রকাশিত এক নিবন্ধের উপর আলোচনায় লিখেছেন যে, ফিল্ড মার্শাল মানেক শ যে ছয় মাস সময় চেয়েছিলেন, তার ধারণা ছিল, এই ছয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব চিত্র পুরোপুরি বদলে যাবে। যুদ্ধচিত্র পুরোপুরি বদলে যাওয়ার যে হিসাব ভারতীয় সেনাপ্রধান করেছিলেন, তা মোটেই হিমালয়ের বরফ ঢাকা হিমবাহ গলিয়ে চীনা আগ্রাসন প্রাকৃতিকভাবে গতিরুদ্ধ হওয়ার হিসাবের মতো নয়। সেই হিসাবের মূলে ছিল দেশপ্রেমিক বাঙালি সিপাহি এবং অফিসারদের সুউচ্চ মনোবলের সাথে যদি প্রাথমিক কিছু সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া যায়, তাহলে এই বাঙালিদের যুদ্ধযজ্ঞ নজিরবিহীন হিসাবে প্রমাণিত এবং প্রতিষ্ঠিত হবে। শেষ পর্যন্ত বাস্তবে সেটাই ঘটেছিল। জনৈক ভারতীয় জেনারেল এই মর্মে মন্তব্য করেন যে, মাত্র দুই সপ্তাহের প্রশিক্ষণ পেয়েই বাঙালি যোদ্ধারা এক একজন গুর্খা সৈন্যের শক্তি ও সাহস নিয়ে ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে বেরিয়েছে। এই দেশপ্রেমিক বাঙালি যুবারা দিনে একটা কাঁঠাল ভাগ করে খেয়ে এবং পুরো জুন-জুলাইয়ের বর্ষাকাল বাঁশের তৈরি চৌকিতে শুয়ে দিনাতিপাত করেছে। এই মন্তব্যটিও করেছেন ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার জেনারেল জ্যাকব (গ্রন্থসূত্র : Freedom of Bangladesh : Surrender at Dacca by Lt. Gen. JFR Jacob).
১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা কাঠামোতে বাঙালিদের অবস্থান রাতারাতি বেড়ে যেতে থাকে। ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত যেখানে ৮০৪ জন ঊর্ধ্বতন অফিসারের মধ্যে মাত্র ১৪ জন ছিলেন বাঙালি, তখন এর ১৩ বছর পর সেই ১৪ জনের সাথে যুক্ত হয় মধ্যম ও উচ্চ র্যাংকের আরো ১৮৬ জন বাঙালি অফিসার। এই ২০০ জনের মধ্যে ৯৮ জন ১৯৭১ সালে সরাসরি যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে; বাকি ১০২ জন নানাবিধ কারণে পাকিস্তানের প্রতি সংহতি প্রকাশ ভয়ে থেকে যান পাঁচটি প্রদেশের বিভিন্ন ছাউনিতে ও সেনা স্থাপনায়। তবে ১৯৫৬ সালের ১৪ জন থেকে ১৯৭০ নাগাদ ২০০ বাঙালি অফিসারের এই নাটকীয় সংখ্যানুপাতের পেছনে যে স্পষ্ট রেখাটি ছিল, সেটাই হলো ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ। এই যুদ্ধের পর থেকেই বাঙালি তরুণ ও যুবক আর্মি অফিসারদের সাথে পশ্চিম পাকিস্তানের বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের এক উল্লেখযোগ্য সামাজিক সম্প্রীতি ও আত্মীয়তার বন্ধন। ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধে গো-হারা হেরে ভারত এই জঘন্য গোয়েন্দা বাহিনী তৈরি করে। চীনের কেশাগ্র স্পর্শ করতে না পারলেও এই কুখ্যাত গোয়েন্দা শক্তিকে পরিপূর্ণ কাজে লাগায় ভারত পাকিস্তান ভাঙার শঠতা ও ষড়যন্ত্রে, যার পূর্ণতা ঘটে ১৯৭১ এর বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে।
লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক



