সরকারের ১০০ দিন : আস্থা ফিরেছে, রাষ্ট্র কি বদলাচ্ছে

বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনের মূল্যায়ন এক কথায় করা সম্ভব নয়। এটি কোনো বিপ্লবী সাফল্যের গল্প নয়। আবার সম্পূর্ণ ব্যর্থতার গল্পও নয়; বরং এটি এমন একটি সরকারের গল্প। যে জনগণের আস্থার একটি অংশ ফিরে পেয়েছে; কিন্তু এখনো প্রমাণ করতে পারেনি যে, সে রাষ্ট্রকে বদলাতে পারবে। আগামী ১০০ দিন তাই আগের ১০০ দিনের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নির্বাচনে জয়লাভ করা কঠিন; কিন্তু জনগণের আস্থা ধরে রাখা তার চেয়েও কঠিন। আর এখন সেই পরীক্ষার মুখোমুখি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সরকার

মোহাম্মাদ ওয়ালিউদ্দিন তানভীর
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার পরিবর্তন নতুন কিছু নয়। কিন্তু ২০২৬ সালের ক্ষমতার পরিবর্তন ছিল ভিন্ন ধরনের একটি রাজনৈতিক ঘটনা। এটি শুধু একটি সরকারের বিদায় এবং আরেকটি সরকারের আগমন ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, গণতান্ত্রিক সঙ্কট, প্রশাসনিক অবক্ষয় এবং জন-আস্থার ভাঙনের পর রাষ্ট্রকে নতুনভাবে গড়ে তোলার একটি প্রতিশ্রুতি। সেই কারণেই বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনকে সাধারণ রাজনৈতিক মধুচন্দ্রিমা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জনগণ এই সরকারকে শুধু ক্ষমতা পরিচালনার জন্য ভোট দেয়নি; তারা ভোট দিয়েছে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশায়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন শপথ নেন, তখন দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল অস্বাভাবিকভাবে উত্তেজনাপূর্ণ। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে প্রশাসনিক দ্বিধা, আইনের দুর্বল প্রয়োগ, জননিরাপত্তাহীনতা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সমাজকে অনেকটা অস্থির করে তুলেছিল। সেই বাস্তবতায় একটি নির্বাচিত সরকারের প্রত্যাবর্তন মানুষের মধ্যে অন্তত একটি মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তি ফিরিয়ে আনে। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকও মনে করেন, বিএনপি সরকারের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় অর্জন অর্থনৈতিক বা প্রশাসনিক নয়; বরং রাজনৈতিক। রাষ্ট্র পরিচালনায় বৈধতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতার অনুভূতি ফিরিয়ে আনা।

কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে। রাজনৈতিক বৈধতা ফিরে আসা আর রাষ্ট্রযন্ত্রের পরিবর্তন এই দু’টি এক বিষয় নয়। ইতিহাস বলছে, বাংলাদেশে বহুবার সরকার বদলেছে; কিন্তু রাষ্ট্রের চরিত্র খুব বেশি বদলায়নি। ক্ষমতার কেন্দ্র বদলেছে; কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই দলীয় প্রভাবের বাইরে যেতে পারেনি। ফলে প্রথম ১০০ দিনের মূল্যায়নে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত; রাষ্ট্র কি বদলাতে শুরু করেছে?

সরকারের পক্ষে কিছু ইতিবাচক দিক অবশ্যই রয়েছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কিছু অংশ দ্রুত বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়েছে। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি, কৃষকদের জন্য ‘ফার্মার কার্ড’, ক্ষুদ্র কৃষিঋণ মওকুফ, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সম্প্রসারণ, খাল পুনঃখনন এবং কিছু ডিজিটাল প্রশাসনিক উদ্যোগ জনগণের মধ্যে একটি ইতিবাচক বার্তা পাঠিয়েছে। সরকার অন্তত এ ধারণা দেয়ার চেষ্টা করেছে যে, নির্বাচনী ইশতেহার শুধু রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়, নীতিগত অঙ্গীকারও হতে পারে।

তবে এই ইতিবাচক পদক্ষেপগুলোর আড়ালেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে সুস্পষ্ট নীতিমালার অনুপস্থিতি, তদারকির সীমাবদ্ধতা এবং মাঠপর্যায়ে অনিয়মের অভিযোগ দেখিয়েছে যে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা একা যথেষ্ট নয়। কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজন দক্ষ প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহিতা ও সুশাসন। কারণ একটি রাষ্ট্রের সক্ষমতা শেষ পর্যন্ত তার ঘোষণায় নয়; বরং সেই ঘোষণাকে বাস্তবে কতটা সফলভাবে রূপ দেয়া যায়, তার মধ্যেই প্রতিফলিত হয়।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও সরকারের সামনে কঠিন বাস্তবতা ছিল। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরান সঙ্ঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন স্থানে পেট্রলপাম্পে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। মানুষ জ্বালানি মজুদ করতে শুরু করে। সরকার প্রথম দিকে ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করে; কিন্তু জনগণকে প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট বার্তা দিতে ব্যর্থ হয়। ফলে সঙ্কটের একটি অংশ বাস্তব ছিল, আরেকটি অংশ ছিল তথ্যঘাটতি থেকে সৃষ্ট আতঙ্ক। পরবর্তীতে সরকার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি করে। অর্থনৈতিকভাবে সিদ্ধান্তটি হয়তো অযৌক্তিক ছিল না; কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এটি সরকারের জনপ্রিয়তার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।

এর প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। পরিবহনব্যয় বেড়েছে, নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে এবং সামনে নতুন বাজেটে করের বোঝা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী এখন প্রশ্ন করতে শুরু করেছে সংস্কারের খরচ কি শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হবে?

তবে অর্থনীতি নয়, সরকারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সম্ভবত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। প্রথম দিকে মানুষ আশা করেছিল, নতুন সরকার দ্রুত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনবে। কিন্তু শিশু ধর্ষণ, যৌন সহিংসতা, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং এবং স্থানীয় সন্ত্রাসী তৎপরতার ঘটনাগুলো জনমনে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে একের পর এক শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছে। একটি রাষ্ট্রের নৈতিক শক্তি পরিমাপ করা হয় সে তার শিশুদের কতটা নিরাপদ রাখতে পারে তার মাধ্যমে। সেই পরীক্ষায় সরকার এখনো সন্তোষজনক অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি।

এর সাথে যুক্ত হয়েছে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব। হাজার হাজার সংক্রমণ এবং শত শত শিশুমৃত্যু বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে নগ্নভাবে প্রকাশ করেছে। স্বাস্থ্য খাতের সঙ্কটের পেছনে আগের প্রশাসনের ব্যর্থতা থাকলেও বর্তমান সরকারও দায় এড়াতে পারে না। সঙ্কট দৃশ্যমান হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া আরো দ্রুত, সমন্বিত এবং মানবিক হতে পারত।

তবে সরকারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ব্যর্থতা এখন পর্যন্ত সংস্কার প্রশ্নে। নির্বাচনপূর্ব সময়ে বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, পুলিশ প্রশাসন, মানবাধিকার কাঠামো এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, ক্ষমতায় আসার পর সেই গতিশীলতা অনেকটাই থমকে গেছে; বরং কয়েকটি সংস্কারমুখী অধ্যাদেশ বাতিল করার সিদ্ধান্ত জনমনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। জনগণ শুধু নতুন সরকার চায়নি; তারা পুরনো রাষ্ট্রকাঠামোর পরিবর্তন চেয়েছিল। যদি সরকার শেষ পর্যন্ত পুরনো ব্যবস্থাকেই নতুন নেতৃত্বের অধীনে পরিচালনা করে, তাহলে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটবে; কিন্তু রাষ্ট্রের পরিবর্তন ঘটবে না।

বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিও এই সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে অনেকেই আশা করেছিলেন, ক্যাম্পাসে স্থায়ী শান্তি আসবে। এ ব্যাপারে সরকারের অবস্থান এখনো বিশ্বাসযোগ্য নয়। তারা ক্যাম্পাসে ছাত্রদলকে আগের মতো পৃষ্ঠপোষকতা দিতে পারে সেই আশঙ্কা রয়েছে। পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনো জীবিত। বাস্তবতা হলো— দেশের অনেক বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল আর একচ্ছত্র জনপ্রিয় ছাত্রসংগঠন নয়। গত এক দশকে ছাত্রশিবির কল্যাণমূলক রাজনীতি, শিক্ষাসহায়তা এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলার মাধ্যমে নিজেদের একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। ফলে প্রতিযোগিতা বেড়েছে; কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার জবাব যদি দখলদারিত্ব বা সহিংসতা হয়, তাহলে তা রাষ্ট্রের জন্য অশনিসঙ্কেত।

চট্টগ্রামে ছাত্রশিবিরের এক নেতার পা কেটে দেয়ার ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়; এটি রাষ্ট্রের আইনের সমান প্রয়োগের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো— ঘটনার পরও দৃশ্যমান বিচারিক অগ্রগতি দেখা যায়নি। একটি সরকার যদি তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বলয়ের লোকদের ক্ষেত্রেও আইন প্রয়োগে ব্যর্থ হয়, তাহলে আইনের শাসনের প্রতিশ্রুতি দুর্বল হয়ে পড়ে।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও মিশ্র সঙ্কেত দেখা গেছে। বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং অনলাইন দমননীতির সমালোচনা করেছে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনামূলক কণ্ঠের বিরুদ্ধে কিছু পদক্ষেপ এবং গ্রেফতার নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সরকারের সমর্থকরা এগুলোকে আইনশৃঙ্খলার অংশ বললেও সমালোচকরা বলছেন, সাইবার স্পেসে বিরোধী মতকে নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি সমর্থকদের প্রশংসায় নয়; বিরোধীদের সমালোচনা সহ্য করার সক্ষমতায়। এই পরীক্ষায় সরকারকে আরো সতর্ক হতে হবে।

রাজনৈতিকভাবে আরেকটি বাস্তবতা হলো— বিএনপি কার্যত একা। বড় কোনো শক্তিশালী মিত্রজোট ছাড়া সরকার পরিচালনা করছে। বাংলাদেশের মতো গভীরভাবে বিভক্ত সমাজে রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা কঠিন।

সবশেষে আসে বিচার ও জবাবদিহির প্রশ্ন। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং অতীত শাসনামলের নানা অভিযোগের বিচার কিভাবে হবে, তার একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ এখনো জনগণের সামনে আসেনি। জনগণ প্রতিশোধ নয়; বরং বিশ্বাসযোগ্য বিচার চায়। কিন্তু দীর্ঘ নীরবতা রাজনৈতিক গুঞ্জন ও অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে।

তবুও এই সমালোচনার মধ্যেও একটি বিষয় স্পষ্ট। বাংলাদেশের জনগণ এখনো বিএনপি সরকারকে সময় দিতে প্রস্তুত। তারা জানে, ১০০ দিনে একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্র পুনর্গঠন করা যায় না। তারা এখনই সরকারের ব্যর্থতা ঘোষণা করতে চায় না। তারা চায় সরকার পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করুক। তারা চায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকুক। তারা চায় সংস্কারপ্রক্রিয়া বাস্তবে এগিয়ে যাক।

সুতরাং বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনের মূল্যায়ন এক কথায় করা সম্ভব নয়। এটি কোনো বিপ্লবী সাফল্যের গল্প নয়। আবার সম্পূর্ণ ব্যর্থতার গল্পও নয়; বরং এটি এমন একটি সরকারের গল্প। যে জনগণের আস্থার একটি অংশ ফিরে পেয়েছে; কিন্তু এখনো প্রমাণ করতে পারেনি যে, সে রাষ্ট্রকে বদলাতে পারবে। আগামী ১০০ দিন তাই আগের ১০০ দিনের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নির্বাচনে জয়লাভ করা কঠিন; কিন্তু জনগণের আস্থা ধরে রাখা তার চেয়েও কঠিন। আর এখন সেই পরীক্ষার মুখোমুখি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সরকার।

লেখক : যুক্তরাজ্য প্রবাসী আইনজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক