যুক্তরাষ্ট্রকে কি বিশ্বাস করা যায়, ইতিহাস কী বলে

শুভবুদ্ধির উদয় হবে কি না, তা একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন হয়েই থেকে যেতে পারে। পামর ডোনাল্ড ও স্যাটানিয়াহু যে শুধু মানবতার ওপর এক কালো ছায়া ফেলেছে তাই নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক কর্মকাণ্ডও সামনে কঠিন সময়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আজ এটি অনেক বেশি সম্ভাব্য বলে মনে হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি দানবরা শান্তিচুক্তিতে সম্মত হওয়া এবং সঙ্ঘাতের অবসান ঘটানোর চেয়ে বরং আবারো ইরানিদের হত্যা করতে এবং দেশটিকে ধ্বংস করতে চাইবে

ড. জর্জ কাটসিয়াফিকাস
মাফিয়া ডন ট্রাম্প যতই নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে চান না কেন, এটি এখন বেশ স্পষ্ট যে, ইরানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এক অসম্মানজনক পরাজয় বরণ করেছে। ইরানকে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণে’ বাধ্য করানোর ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি তার ‘যুদ্ধ শুরু না করা’ এবং ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হওয়ার নির্বাচনী অঙ্গীকারের চেয়েও বেশি অন্তঃসারশূন্য। বিজয় দাবি করার একটি উপায় খুঁজতে গিয়ে ট্রাম্প সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে বিজয়ী ঘোষণা করে দিয়েছেন। এই মিথ্যাচারের প্রতি বিশ্ববাসীর সমর্থন পাওয়ার জন্য তিনি এতটাই মরিয়া যে, তিনি সেসব বিশ্বনেতার ওপর আক্রমণ শুরু করেছেন যারা তার এই উন্মাদনা সমর্থন করেন না (এমনকি এদের মধ্যে তার নিজের কিছু MAGA অনুসারীও রয়েছেন)। ইরানি সভ্যতাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়ার হুমকির পর, ট্রাম্প পোপ লিওকে ‘পরাজিত’ বলে আক্রমণ করেন এবং নিজেকে যিশুর পুনর্জন্ম হিসেবে উপস্থাপন করেন। এই বিভ্রান্ত ডোনাল্ডের জঘন্য কর্মকাণ্ডের কি কোনো শেষ নেই?

আরো খারাপ ব্যাপার হলো- তার চাটুকার অনুচরেরা তার ক্ষমতার লোভকে প্রশ্রয় দেয় এবং তার স্বৈরাচারী রীতিনীতিই অনুকরণ করে। পাকিস্তানে শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তাদের সাথে ২১ ঘণ্টা আলোচনার পর ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স যুক্তরাষ্ট্রের দাবি মেনে নিতে ইরানের ‘ব্যর্থতার’ নিন্দা করেন।

ভান্স এমনভাবে কথা বলছিলেন, যেন তিনি কোনো জমিজমা বা রিয়েল এস্টেট ব্যবসার চুক্তি করতে গেছেন। সেই ভঙ্গিতেই তিনি জোর দিয়ে বলেন, তিনি তার ‘সর্বোত্তম ও চূড়ান্ত প্রস্তাব’ ইরানকে দিয়েছেন। তিনি আসলে আলোচনা করতে ইসলামাবাদে যাননি; তিনি গিয়েছিলেন আত্মসমর্পণের শর্ত চাপিয়ে দিতে। ট্রাম্প ও ভান্সের জন্য প্রকৃত আলোচনার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তারা ইসরাইলের শর্ত অনুযায়ী একটি তাৎক্ষণিক শান্তিচুক্তি চান।

ইরান ঘোষণা করেছে, মার্কিন পক্ষ তাদের আস্থা অর্জন করতে পারেনি এবং এটিই আসল সত্য। মতপার্থক্যের শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য যখন আলোচনা চলছিল, তখন দুই দু’বার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল নির্ধারিত আলোচনা অধিবেশনের মধ্যেই ইরানে অতর্কিত হামলা চালিয়েছে, দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করেছে এবং হাসপাতাল, স্কুল ও বেসামরিক অ্যাপার্টমেন্ট ভবন ব্যাপকভাবে ধ্বংস করেছে। সঙ্গত কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের অসততা নিয়ে ইরানিদের সন্দিহান হওয়ার কারণ যথার্থ। ২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসনের আমলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিক চুক্তি (জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন) চূড়ান্ত করতে শত শত ঘণ্টা সময় লেগেছিল।

ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে, কংগ্রেসের সাথে পরামর্শ না করেই একতরফাভাবে চুক্তিটি বাতিল করে দেন এবং ইরানের ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। ইরান এখন ওই নিষেধাজ্ঞার প্রত্যাহার চায়। ২০২৩ সালে প্রেসিডেন্ট বাইডেন ইরানের শত শত কোটি ডলার ছেড়ে দিতে সম্মত হন। যুক্তরাষ্ট্র এখনো সেই সম্পদ আটকে রেখেছে। বর্তমান সঙ্কটের মূলে রয়েছে ট্রাম্পের স্বৈরাচারী আচরণ।

এখন মাত্র ২১ ঘণ্টার আলোচনার পর, ট্রাম্প তার অনুগত ঘনিষ্ঠ বৃত্তের বাইরে কারো সাথে পরামর্শ না করেই হরমুজ প্রণালী অবরোধের নির্দেশ দিয়েছেন, যা সাধারণত একটি যুদ্ধকালীন পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। ইসলামাবাদ বৈঠকে ভান্স যে অবাস্তব, এমনকি অপরিণত ভঙ্গির নমুনা তুলে ধরেন তার চরিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে মার্কিন আলোচক হেনরি কিসিঞ্জার এবং ভিয়েতনামের লে ডুক থোর সাথে তুলনা করলে। তারা ১৯৭৩ সালের প্যারিস শান্তিচুক্তি সম্পাদনে চার বছর আট মাস সময় নিয়েছিলেন। আর ভান্স এক দিনেরও কম সময়ের মধ্যে পাকিস্তান ত্যাগ করেন এবং ইরানকে সতর্ক করে বলেন, ‘আমাদের নিয়ে খেলা করো না’ যেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেয়া এই ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞ ছিল নিছক কোনো ভিডিও গেম।

দুঃখজনকভাবে ওয়াশিংটনের কোনো প্রতিশ্রুতিতে আস্থা রাখার ব্যাপারে ইরানের যে সংশয় তা আরো জোরালো ভিত্তি পায় বিভিন্ন সময় যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করা দেশগুলোর ইতিহাস। উত্তর কোরিয়া ও ভিয়েতনাম উভয়ের সাথেই শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় সাথে সাথেই যুক্তরাষ্ট্র তা লঙ্ঘন করেছিল। সংক্ষেপে বললে, প্রেসিডেন্ট পদে যিনিই থাকুন না কেন, যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করা যায় না। ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান- যে দলেরই হোক, প্রেসিডেন্টরা আসেন আর যান; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অসততা ও প্রতারণা কখনোই পাল্টায় না।

আজ ইরানি পক্ষের অন্যতম প্রধান দাবি হলো- দেশটির ধ্বংসযজ্ঞের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এ প্রসঙ্গে ১৯৭৩ সালের পয়লা ফেব্রুয়ারি ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রী ফাম ভান দংকে পাঠানো প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের চিঠি প্রাসঙ্গিক। চিঠিতে নিক্সন উল্লেখ করেন, ভিয়েতনামের যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠনে আমেরিকার অংশগ্রহণের বিষয়ে তাদের (২৭ জানুয়ারি, ১৯৭৩) স্বাক্ষরিত চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্র পূরণ করবে। নিক্সনের অনুমান অনুযায়ী, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ হবে ‘...পাঁচ বছরে প্রায় ৩.২৫ বিলিয়ন ডলারের অনুদান’। ভিয়েতনামের কর্মকর্তারা নিক্সনের কথায় বিশ্বাস করে তাদের যুদ্ধোত্তর পরিকল্পনায় সেই বিলিয়ন ডলারের বাজেট অন্তর্ভুক্তও করেছিলেন। এজেন্ট অরেঞ্জ, বি-৫২ বোমারু বিমান এবং পাঁচ লাখ আমেরিকান সেনার নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া ভিয়েতনামকে একটি কানাকড়িও কখনো দেয়নি আমেরিকা। (এজেন্ট অরেঞ্জ ছিল এক শক্তিশালী আগাছানাশক, যা মার্কিন বাহিনী ভিয়েতনাম যুদ্ধে (১৯৬২-৭১) জঙ্গল পরিষ্কার এবং খাদ্যশস্য ধ্বংস করতে ব্যবহার করে। অত্যন্ত বিষাক্ত ডাইঅক্সিন এই রাসায়নিকের এক কোটি ৯০ লাখ গ্যালনেরও বেশি স্প্রে করা হয়েছিল সারা দেশে। এটি ভিয়েতনামের জনগণ এবং সেনা- উভয়ের মধ্যেই ক্যান্সার, জন্মগত ত্রুটি ও অন্যান্য গুরুতর ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং বহু প্রজন্ম ধরে সে ক্ষতি বহন করে)।

এটিও মনে রাখা উচিত, ১৯৫৪ সালের জেনেভা চুক্তিতে ভিয়েতনামে দুই বছরের মধ্যে সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠানেরও প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। সেই সময়সীমা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিলেন, নির্বাচন হলে হো চি মিন সম্ভবত ৮০ শতাংশ বা তার বেশি ভোট পেতেন; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র কখনোই দেশটিকে অবাধ নির্বাচন করতে দেয়নি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার আদিবাসী আমেরিকান জাতিগুলোর সাথে যে পাঁচ শতাধিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল, তার মধ্যে এমন একটিও খুঁজে পাওয়া কঠিন, যার প্রতি আমেরিকার সরকার সম্মান দেখিয়েছে। ঐতিহাসিকরা এই শোচনীয় রেকর্ডকে ‘চুক্তি ভঙ্গের মহাসড়ক’ বলে অভিহিত করেন।

২০০৩ সালের এক সন্ধ্যায়, পিয়ংইয়ংয়ে উত্তর কোরীয়দের সাথে পানাহারের সময় যখন আমি এই ইতিহাসের কথা উল্লেখ করি, তারা বিস্ময়ে হাঁপিয়ে ওঠে। ‘তার মানে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সম্মানবোধ নেই?’ দুঃখের সাথে আমি মাথা নাড়ি, দেখতে পাই, ঠিক ৫০ বছর আগে স্বাক্ষরিত একটি সাধারণ যুদ্ধবিরতির পরিবর্তে, কোরীয় যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের জন্য একটি শান্তিচুক্তির ব্যাপারে তারা এত বছর ধরে যে আশা জিইয়ে রেখেছে, তা ক্রমেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এখানে আমি আরো যোগ করতে চাই, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি চুক্তির ১৫ নম্বর ধারা লঙ্ঘন করে চলেছে, যেখানে স্পষ্টভাবে বলা আছে- উভয় পক্ষই ‘কোরিয়ার ওপর কোনো ধরনের অবরোধে লিপ্ত হবে না।’ যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার ওপর চলমান অবরোধ বজায় রেখেছে, যা আন্তর্জাতিক ঋণ ও নতুন বিনিয়োগের পাশাপাশি বাণিজ্য ও ভ্রমণে বাধা সৃষ্টি করে দেশটির আর্থিক খাতকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ইরানের ওপর ট্রাম্পের নতুন অবরোধের মতোই, যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়াকে কয়লা ও খনিজ রফতানিতে সাহায্যকারী ব্যক্তি, পরিবহন সংস্থা এবং জাহাজের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে।

যুক্তরাষ্ট্র তার আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা ও চুক্তিগুলোর কোনোরকম তোয়াক্কা না করে অথবা সিনেটে সেগুলোকে কখনো ভোটে না তুলেই আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো- আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের সব সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করা, যেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে (এবং ইসরাইলকে) অব্যাহতি দেয়। আরেকটি হলো- জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত প্যারিস চুক্তি থেকে সরে আসা, যাকে আমাদের নাতি-নাতনীরা হয়তো দুঃখজনকভাবে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অপরাধ বলে মনে করবে। সুস্পষ্ট কারণেই যুক্তরাষ্ট্র কখনো আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে স্বাক্ষর করেনি।

এখন শুভবুদ্ধির উদয় হবে কি না, তা একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন হয়েই থেকে যেতে পারে। পামর ডোনাল্ড ও স্যাটানিয়াহু যে শুধু মানবতার ওপর এক কালো ছায়া ফেলেছে তাই নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক কর্মকাণ্ডও সামনে কঠিন সময়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আজ এটি অনেক বেশি সম্ভাব্য বলে মনে হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি দানবরা শান্তিচুক্তিতে সম্মত হওয়া এবং সঙ্ঘাতের অবসান ঘটানোর চেয়ে বরং আবারো ইরানিদের হত্যা করতে এবং দেশটিকে ধ্বংস করতে চাইবে।

লেখক : ভিয়েতনাম ডকুমেন্টসের সম্পাদক এবং ‘এশিয়াজ আননোন আপরাইজিংস’ গ্রন্থের লেখক।

মিডল ইস্ট মনিটরে ২০ এপ্রিল প্রকাশিত নিবন্ধ। অনুবাদ : মুজতাহিদ ফারুকী