উপকূলের কান্না : শহরের দীর্ঘশ্বাস আর বহুমুখী কর্মসংস্থান

উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষা এবং নগর দারিদ্র্যবিমোচন- এ দুই ক্ষেত্রকে এখন আলাদাভাবে দেখার অবকাশ নেই। জলবায়ু পরিবর্তনে যে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটছে, তার সমাধান কেবল পরিবেশগত অভিযোজনে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। আমাদের প্রয়োজন একটি ‘লাইভলিহুড রেজিলিয়েন্স’ বা জীবিকার সহনশীলতা বাড়ানো। বহুমুখী কর্মসংস্থান ঘিরে যদি একটি সমন্বিত জাতীয় নীতি গ্রহণ করা না হয়, তবে এ জলবায়ু ঝুঁকি কেবল পরিবেশগত বিপর্যয় হিসেবে থাকবে না, এটি একটি জাতীয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সঙ্কটে রূপ নেবে।

বাংলাদেশের মানচিত্রের নিচের অংশটুকু, যেখানে লোনাপানি আর সবুজের মিতালি, সেখানে আজ এক নীরব হাহাকার। জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক আলোচনায় আমরা প্রায়ই পরিসংখ্যানের বেড়াজালে আটকে যাই- সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কত ইঞ্চি বাড়ল কিংবা কতটি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানল। কিন্তু এ পরিসংখ্যানের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় হাজারো মানুষের দীর্ঘশ্বাস, যারা ভিটেমাটি হারিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাচ্ছেন। সম্প্রতি কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম চৌধুরী উপকূলীয় অঞ্চলের এ জীবন-সংগ্রামের এক নিপুণ চিত্র তুলে ধরেছেন, যা আমাদের নীতিনির্ধারকদের জন্য এক জরুরি সতর্কবার্তা।

অদৃশ্য এক স্রোত এবং ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু’
উপকূলীয় অঞ্চলে এখন আর কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, শুরু হয়েছে এক ‘অদৃশ্য অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু স্রোত’। ১৯৫১ সালের জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, ‘শরণার্থী’ বা ‘উদ্বাস্তু’ বলতে সাধারণত রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার মানুষদের বোঝানো হয়। কিন্তু সুন্দরবন বা বঙ্গোপসাগরের কূলঘেঁষে বাস করা মানুষ যখন লবণাক্ততা আর নদীভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে পৈতৃক ভিটা ছাড়েন, তখন তাদের এ বাস্তুচ্যুতি কোনো রাজনৈতিক নিপীড়নের চেয়ে কম যন্ত্রণাদায়ক নয়। রেজাউল করিম চৌধুরী যথার্থ বলেছেন, এসব মানুষ আধুনিক বিশ্বের ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু’। তারা কোনো অপরাধ না করেও বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের মাশুল দিচ্ছেন নিজ ভূখণ্ড থেকে বিচ্যুত হয়ে।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল : একটি ধসে পড়া অর্থনীতি
খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের মতো জেলাগুলো এখন কেবল পরিবেশগত ঝুঁকির কেন্দ্রবিন্দু নয়, বরং এগুলো এক একটি অর্থনৈতিক চাপের উপকেন্দ্র। এক সময়কার সোনার ফসল ফলানো জমিতে এখন লোনা পানির রাজত্ব। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ভেঙে পড়ায় কর্মহীন হয়ে পড়ছেন লাখো মানুষ। এর প্রভাব কেবল উপকূলীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকছে না। জীবন ও জীবিকার তাগিদে এ বিশাল জনগোষ্ঠী ঢাকামুখী হচ্ছে। ঢাকার কড়াইল, ভোলা কিংবা ভাষানটেক বস্তির দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে বসবাসরত বেশির ভাগ মানুষ উপকূল থেকে আসা এ জলবায়ু উদ্বাস্তু। তারা শহরের অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছেন- কেউ রিকশা চালাচ্ছেন, কেউ দিনমজুরের কাজ করছেন। কিন্তু এই অপরিকল্পিত নগরায়ন ঢাকার মতো মেগাসিটির ওপর যে বিশাল জনতাত্ত্বিক-সামাজিক চাপ তৈরি করছে, তা আমাদের ভবিষ্যৎ নগর ব্যবস্থাপনায় একটি বড় হুমকি।

ত্রাণ নয়, প্রয়োজন সক্ষমতা
সাধারণত আমরা দুর্যোগের পর ত্রাণ বা নগদ সহায়তা দিয়ে দায়িত্ব শেষ মনে করি। কিন্তু রেজাউল করিম চৌধুরী যে সমাধানের কথা বলছেন, তা বেশ গভীর ও টেকসই। তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন, ‘দক্ষতা উন্নয়ন’ ও ‘কারিগরি শিক্ষার’ ওপর। উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে যদি মৌচাষ, আধুনিক মৎস্য চাষ, পোল্ট্রি এবং পরিবেশবান্ধব হস্তশিল্পে দক্ষ করে তোলা যায়, তবে তাদের স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব। সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় যে বিকল্প জীবিকা কর্মসূচি আছে, সেগুলো সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ে আরো বিস্তৃত করতে হবে। পাশাপাশি যারা ইতোমধ্যে শহরে চলে এসেছেন, তাদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি জরুরি। কড়াইল বা ভোলার বস্তির বেকার তরুণদের যদি ড্রাইভিং, প্লাম্বিং, ইলেকট্রিক্যাল বা মোবাইল সার্ভিসিংয়ের মতো টেকনিক্যাল ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেয়া যায়, তবে তারা শহরের বোঝা না হয়ে সম্পদে পরিণত হবেন। এটিই মূলত বহুমুখী কর্মসংস্থানের মূল দর্শন।

নীতিগত পরিবর্তনের তিন স্তম্ভ
এ সঙ্কট মোকাবেলায় আমাদের নীতিনির্ধারকদের তিনটি প্রধান জায়গায় নজর দেয়া প্রয়োজন। ১. কর্মসংস্থান ও অভিবাসনের একটি নিয়মিত নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। ২. স্থানীয় অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে খাল খনন, বাঁধ নির্মাণ ও পরিবেশ পুনরুদ্ধার প্রকল্পগুলো ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য’ বা ‘কাজের বিনিময়ে টাকা’র মতো কর্মসূচির মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সাথে সরাসরি যুক্ত করা। এতে পরিবেশও রক্ষা পাবে, মানুষের হাতে টাকাও আসবে। আর তিন নম্বর হচ্ছে- শহুরে বস্তি এলাকাগুলোতে দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিকে বাধ্যতামূলক করা।

পরিবেশ ও দারিদ্র্যের এক সুতো
উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষা এবং নগর দারিদ্র্যবিমোচন- এ দুই ক্ষেত্রকে এখন আলাদাভাবে দেখার অবকাশ নেই। জলবায়ু পরিবর্তনে যে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটছে, তার সমাধান কেবল পরিবেশগত অভিযোজনে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। আমাদের প্রয়োজন একটি ‘লাইভলিহুড রেজিলিয়েন্স’ বা জীবিকার সহনশীলতা বাড়ানো। বহুমুখী কর্মসংস্থান ঘিরে যদি একটি সমন্বিত জাতীয় নীতি গ্রহণ করা না হয়, তবে এ জলবায়ু ঝুঁকি কেবল পরিবেশগত বিপর্যয় হিসেবে থাকবে না, এটি একটি জাতীয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সঙ্কটে রূপ নেবে। উপকূলের লোনাপানি আমাদের জাতীয় অর্থনীতির মিঠাপানিকেও গ্রাস করতে শুরু করেছে। আমরা যদি আজ উপকূলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হই, তবে কাল শহরের বস্তিগুলো জনবিস্ফোরণে ফেটে পড়বে।

রেজাউল করিম চৌধুরীর পর্যবেক্ষণগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, সময়ের কাজ সময়ে না করলে ভবিষ্যতে বড় খেসারত দিতে হবে। টেকসই উন্নয়ন মানে কেবল বড় বড় স্থাপনা নয়, বরং সেই মানুষদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, যারা ঝড়ের রাতে ভিটেমাটি আগলে রাখার যুদ্ধে একা লড়ছেন। বহুমুখী কর্মসংস্থান হতে পারে সেই লড়াইয়ের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক