মদিনা থেকে হরমুজ

সমরশক্তির নেপথ্যে অর্থনৈতিক আধিপত্য

মুসলিম বিশ্বের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনৈতিক বলয় গড়ে তোলা। এর জন্য প্রয়োজন প্রযুক্তি, শিল্প, জ্বালানি এবং বাণিজ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা। বিচ্ছিন্ন অর্থনীতির পরিবর্তে সমন্বিত অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যেখানে উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং বাণিজ্য একে অপরকে শক্তিশালী করবে। শিক্ষা ও গবেষণায় বিনিয়োগ, মানবসম্পদের উন্নয়ন এবং ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ ছাড়া এটি সম্ভব নয়।

ডা: মো: এনামুল হক
রাষ্ট্র, সাম্রাজ্য এবং সভ্যতার ইতিহাস মনোযোগ দিয়ে পাঠ করলে একটি অনিবার্য সত্য ধরা পড়ে, ক্ষমতার প্রকৃত ভিত্তি কেবল তরবারির ধার নয়, বরং অর্থনীতির অদৃশ্য স্রোতধারা। যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয় অনেক সময় দৃশ্যমান, কিন্তু সেই বিজয়ের ভিত নির্মিত হয় বাণিজ্যপথ, সম্পদ প্রবাহ, করব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের জটিল বিন্যাসে। ইসলামের ইতিহাসও এর ব্যতিক্রম নয়; বরং এখানে আমরা দেখতে পাই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সামরিক কৌশল এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার গভীর সমন্বয়।

রাসূলুল্লাহ সা:-এর মদিনা-পর্বে যে রাজনৈতিক সত্তার জন্ম হয়, তার প্রথম দিককার কৌশলগুলোর একটি ছিল শত্রুপক্ষের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করা। মক্কার কুরাইশরা কেবল ধর্মীয় বিরোধী ছিল না; তারা ছিল আরবের প্রধান বাণিজ্যিক শক্তি, যাদের কাফেলা শাম ও ইয়েমেনের মধ্যে পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে বিপুল সম্পদ আহরণ করত। এই বাস্তবতায় মদিনার নবগঠিত রাষ্ট্র কুরাইশদের যুদ্ধ প্রস্তুতি বন্ধ করতে তাদের বাণিজ্য কাফেলাকে লক্ষ্য করে যে কৌশল গ্রহণ করে, তা নিছক সামরিক পদক্ষেপ ছিল না; বরং ছিল অর্থনৈতিক ভারসাম্য পুনর্গঠনের প্রয়াস। বদরের পূর্ববর্তী অভিযাত্রাগুলো কিংবা নাখলার ঘটনাকে এই বৃহত্তর অর্থনৈতিক প্রতিরোধের প্রেক্ষাপটে বুঝতে হয়। এখানে লক্ষ্য ছিল শত্রুর অর্থপ্রবাহ দুর্বল করা, যাতে তার সামরিক শক্তিও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।

খিলাফতে রাশেদার যুগে অর্থনীতি ও রাজনীতির এই সম্পর্ক আরো সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। জাকাত অস্বীকারকারী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান ছিল রাষ্ট্রের আর্থিক ভিত্তি অটুট রাখার সংগ্রাম। অর্থনৈতিক অবাধ্যতা এখানে রাজনৈতিক বিদ্রোহের সমার্থক হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ অর্থনীতি হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের কেন্দ্রবিন্দু।

উমাইয়া যুগে এসে এই প্রবণতা একটি সাম্রাজ্যিক মাত্রা পায়। সমুদ্রপথে নৌবাহিনীর উত্থান এবং ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যে প্রবেশ মুসলিম শক্তিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। কনস্ট্যান্টিনোপলের দীর্ঘ অবরোধ কেবল একটি রাজধানী দখলের প্রয়াস ছিল না; এটি ছিল একটি অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড চেপে ধরার কৌশল। খাদ্য সরবরাহ, বাণিজ্যপ্রবাহ এবং সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একটি সাম্রাজ্যকে শ্বাসরুদ্ধ করার প্রচেষ্টা। একই সাথে সাইপ্রাস ও অন্যান্য দ্বীপে প্রভাব বিস্তার বাইজেন্টাইন বাণিজ্য একচেটিয়াকে ভেঙে দেয়, যা অর্থনৈতিক শক্তির পুনর্বণ্টনের দিকে নিয়ে যায়।

আব্বাসীয় যুগে এসে অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরো সূক্ষ্ম ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। সিল্ক রোডের ওপর নিয়ন্ত্রণ, বাগদাদের বাজারব্যবস্থা, করনীতিÑ সব কিছু মিলিয়ে একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় মুসলিম শাসন। এখানে যুদ্ধের চেয়ে বাণিজ্যই হয়ে ওঠে আধিপত্যের প্রধান মাধ্যম। কিন্তু যখনই রাজনৈতিক বিদ্রোহ দেখা দিয়েছে, তখনই খাদ্য ও সরবরাহ বন্ধ করে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা হয়েছেÑ যা প্রমাণ করে, অর্থনীতি ছিল ক্ষমতা রক্ষার অন্যতম অস্ত্র।

মধ্যযুগে ক্রুসেডের সময় এই বাস্তবতা আরো নগ্নভাবে প্রতিভাত হয়। সালাহউদ্দিনের কৌশল কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি শত্রুপক্ষের রসদ সরবরাহ, পানি উৎস এবং বাণিজ্যিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে তাদের দুর্বল করে দেন। আন্দালুসিয়া কিংবা ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের ক্ষেত্রেও দেখা যায় বাজার নিয়ন্ত্রণ, মূল্য নির্ধারণ এবং বাণিজ্য শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় শক্তি সুসংহত করার প্রচেষ্টা।

আধুনিক বিশ্বে এই একই কৌশল আরো পরিশীলিত রূপ ধারণ করেছে। আজকের যুদ্ধক্ষেত্র অনেকাংশেই অদৃশ্য; ব্যাংকিং নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্য অবরোধ, জ্বালানি রুট নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক বিচ্ছিন্নতার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে পরাস্ত করা হয়। একটি দেশের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তার মুদ্রা, শিল্প এবং জনগণের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত করা হয়, যার ফলে সে রাষ্ট্র নতি স্বীকারে বাধ্য হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক নানা সঙ্ঘাতে দেখা গেছে, অর্থনৈতিক অবরোধ কখনো সরাসরি সামরিক আক্রমণের চেয়েও কার্যকর।

এই প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালীর তাৎপর্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশ্বে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ তেল পরিবাহিত হয়, তার ২০ শতাংশ এই নৌ-পথ দিয়ে যায়। এখানে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেই বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে, শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি অনিশ্চয়তায় পড়ে। ইতিহাসে সুয়েজ খালের নিয়ন্ত্রণ যেমন একটি সাম্রাজ্যের পতনের সাথে জড়িত ছিল, তেমনি হরমুজ প্রণালী আজকের বিশ্বে এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু। এখানে শক্তির প্রকৃত মাপকাঠি হচ্ছে, কে এই প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ইরান সীমিত ভৌগোলিক পরিসর নিয়েও যখন প্রণালী ও প্রতিরোধের কৌশলে পরাশক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানায়, তখন তা কেবল সামরিক বার্তা নয়, অর্থনৈতিক আধিপত্যেরও ভাষ্য হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতা মুসলিম বিশ্বের সামনে নতুন এক প্রশ্ন উত্থাপন করে : বিচ্ছিন্ন শক্তি নয়, সমন্বিত সক্ষমতার পথে কি এবার যাত্রা শুরু হবে?

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও অর্থনীতির এই প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। রাজনৈতিক বিচার, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং অর্থনৈতিক শক্তির সম্পর্ক প্রায়ই একে অপরের সাথে জড়িয়ে থাকে। বুঝতে হবে, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, পুঁজির প্রবাহ ও ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কÑ সবই রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামোকে প্রভাবিত করে এবং কখনো তা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেও প্রতিফলিত হয়।

অতএব, একটি মৌলিক সত্য আবারো সামনে আসে, অর্থনীতিই রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে, আর রাজনীতি সামরিক শক্তিকে চালায়। যে রাষ্ট্রের অর্থনীতি শক্তিশালী, তার কূটনীতি দৃঢ় হয়, সামরিক অবস্থানও সুসংহত হয়।

এই বাস্তবতায় মুসলিম বিশ্বের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনৈতিক বলয় গড়ে তোলা। এর জন্য প্রয়োজন প্রযুক্তি, শিল্প, জ্বালানি এবং বাণিজ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা। বিচ্ছিন্ন অর্থনীতির পরিবর্তে সমন্বিত অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যেখানে উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং বাণিজ্য একে অপরকে শক্তিশালী করবে। শিক্ষা ও গবেষণায় বিনিয়োগ, মানবসম্পদের উন্নয়ন এবং ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ ছাড়া এটি সম্ভব নয়।

সামরিক বিজয় ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, কিন্তু অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা একটি সভ্যতাকে দীর্ঘস্থায়ী করে। ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়, যে জাতি অর্থনৈতিক শক্তি সুসংহত করতে পারে, সেই জাতিই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে, নেতৃত্ব দেয় এবং বিশ্বব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। তাই আজকের প্রশ্নটি কেবল রাজনৈতিক বা সামরিক নয়; এটি মূলত অর্থনৈতিক অস্তিত্বের প্রশ্ন।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক

[email protected]