সাময়িক প্রসঙ্গ : কোরবানি

বিশ্বাসবোধ, সাংস্কৃতিক চেতনা ও মূল্যবোধের বৈপরীত্যের কারণেই কোরবানি নিয়ে ইদানীং একটি বিশেষ মহলের বিরূপ প্রচারণা লক্ষ করা যাচ্ছে। কথিত পশুপ্রেমীদের একটি গোষ্ঠী কোরবানিকে পশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা বলে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন; অথচ ব্রাজিল বা ভারতের মতো দেশে, যেখানে উৎপাদিত হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি গরুর গোশত; সেসব দেশের এই গো-হত্যার ব্যাপারে তাদের মুখে কোনো কথা নেই! পশু প্রেমের দোহাই দিয়ে তারা প্রকারান্তরে ইসলামী জীবনবিধানের একটি মৌলিক বিশ্বাসকে নির্বাসিত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।

কোরবানি ইসলামের একটি ধর্মীয় বিধান, যা আল্লাহর প্রতি গভীর বিশ্বাস ও কৃতজ্ঞতাবোধ থেকে উজ্জীবিত। আল্লাহর সাথে মানুষের নিজের সত্তা বিলীন করে দেয়ার মূর্ত প্রকাশ হচ্ছে কোরবানি। এতে এক দিকে যেমন রয়েছে বিশ্বাসের গভীরতা, তেমনই রয়েছে নিজের প্রয়োজন মিটিয়ে দুস্থ ও নিঃসম্বলদের মধ্যে কোরবানির গোশত বিলিয়ে দেয়ার মাধ্যমে সামাজিক সম্পর্কের গভীরতা সৃষ্টির বাস্তব ব্যবস্থাপনা। বিত্তবান ও বিত্তহীনদের মধ্যে চমৎকার সামাজিক মেলবন্ধন সৃষ্টির অপার্থিব সুযোগ কোরবানি।

লোভ, সম্পদ, ক্ষমতা কুক্ষিগতকরণ ও সামাজিক প্রতিপত্তি মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। এসবের প্রতি মানুষের চিত্ত স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল। এই দুর্বলতা জয় করে সব কিছুতেই আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দিয়ে নিজেকে আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠভাবে নিবেদনের আনুষ্ঠানিক বহিঃপ্রকাশ কোরবানি। আল্লাহ তায়ালার সুস্পষ্ট ঘোষণা- ‘মনে রেখো, কোরবানির গোশত বা রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না। আল্লাহর কাছে পৌঁছায় তাদের তাকওয়া বা খোদাভীতি।’ (সূরা হজ : ৩৭-৩৮)

বস্তুত হজরত ইবরাহিম আ:-এর সময় থেকে হজ ও কোরবানি মুসলিম জাতির এবং বিশেষ করে ইসলামের সাংস্কৃতিক চেতনার বাহ্যিক রূপ। এই চেতনাই লাখ লাখ বিশ্বাসী মানুষকে দূর-দূরান্ত থেকে কষ্টকর সফরের মাধ্যমে আরাফাতের প্রান্তরে জমায়েত করে। তারা সেখানে সমবেত হন নিঃশর্তভাবে আল্লাহর প্রতি নিবেদনের আকাক্সক্ষায়। একই পোশাকে, একই ধ্বনিতে মুখরিত (লাব্বায়িক আল্লাহুম্মা লাব্বায়িক) আরাফাত প্রান্তর হয়ে ওঠে বেহেশতের প্রতিচ্ছবি। এই প্রতিচ্ছবির সামাজিক কল্যাণের প্রকাশ কোরবানি। কোরবানিকে কেন্দ্র করে যে অর্থনৈতিক ধারার সূচনা হয় তার কোনো তুলনা নেই। তুলনা নেই বিত্তহীনদের মাঝে কোরবানির গোশত বিলিয়ে সামাজিক সম্পর্ক আরো গভীর করার। কোরবানি সৃষ্টি করেছে শিক্ষার এক বিকল্প ধারা। অসংখ্য মাদরাসা, এতিমখানা, লিল্লাহ বোডিং পরিচালিত হয় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কোরবানির পশুর চামড়ার ব্যবসা ঘিরে।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘কোরবানি’ ও ‘বকরিদ’ কবিতা দু’টিতে ফুটে উঠেছে আত্মত্যাগের এই অপূর্ব দর্শন। নিজের ভেতরের পশুত্ব ও অহঙ্কার বিসর্জন দিয়ে মনুষ্যত্ববোধের প্রকাশের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে, ‘সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন’ হিসেবে। ভীরুতা ও দুর্বলতাকে জয় করে সত্য ও ন্যায়ের পথে জীবন গঠনের কথাই উচ্চকিত হয়েছে কোরবানি কবিতায়; যা কোরবানির মর্মবাণী।

মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই আদিম মানুষের কাছে বিভিন্ন চতুষ্পদ জন্তু বিশেষ করে গরু পূজিত হয়েছে দেবতা হিসেবে। বিশ্বাসীদের কাছে এই চতুষ্পদ জন্তুটি নিছক একটি জানোয়ার, যাকে পোষ মানানো যায়, গৃহস্থালির কাজে লাগানো যায়, পান করা যায় এর দুধ ও গোশত। এর হাড় দিয়ে তৈরি করা যায় শৌখিন হস্তশিল্পজাত দ্রব্যাদি। এর গোবর উৎকৃষ্ট সার হিসেবে বিবেচিত। এর গোবর ও মূত্র মুসলিমদের কাছে অপবিত্র। কিন্তু গো-পূজকদের কাছে পবিত্র হওয়ার উপাদান। স্বাভাবিকভাবেই প্রথম থেকেই গরু দুই সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিপরীত ধারায় অবস্থান করেছে। সাংস্কৃতিক চেতনার এই বিপরীতমুখী ধারার কারণে কোরবানি নিয়ে বিপত্তির সৃষ্টি হয়েছে দুই সম্প্রদায়ের ভেতর। ইসলাম অনুসারীদের কাছে উপমহাদেশে কোরবানির সবচেয়ে পছন্দনীয় পশু হলো গরু। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। এর বদৌলতে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার বিশাল অর্থনৈতিক লেনদেন হয়। এই সাথে কোরবানির পশুর চামড়াকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে চামড়া শিল্প, কর্মযোগ ঘটেছে লাখ লাখ শ্রমিকের। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি প্রধান খাত হিসেবে আবির্ভাব ঘটেছে চামড়া শিল্পের। কোরবানি সৃষ্টি করেছে শিল্প ও কর্মযোগ। সমৃদ্ধ করেছে অর্থনীতির চাকাকে; রসদ জুগিয়েছে শিক্ষার ক্ষেত্রে, যা হাজার বছর ধরে সমাজকে সমৃদ্ধ করেছে। কল্যাণমুখী সমাজ নির্মাণে কোরবানি এভাবেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

বিশ্বাসবোধ, সাংস্কৃতিক চেতনা ও মূল্যবোধের বৈপরীত্যের কারণেই কোরবানি নিয়ে ইদানীং একটি বিশেষ মহলের বিরূপ প্রচারণা লক্ষ করা যাচ্ছে। কথিত পশুপ্রেমীদের একটি গোষ্ঠী কোরবানিকে পশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা বলে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন; অথচ ব্রাজিল বা ভারতের মতো দেশে, যেখানে উৎপাদিত হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি গরুর গোশত; সেসব দেশের এই গো-হত্যার ব্যাপারে তাদের মুখে কোনো কথা নেই! পশু প্রেমের দোহাই দিয়ে তারা প্রকারান্তরে ইসলামী জীবনবিধানের একটি মৌলিক বিশ্বাসকে নির্বাসিত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। খামারিরা যেন গরু পালতে নিরুৎসাহিত বোধ করে এ জন্য ৪০ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে পশু খাদ্যের দাম। চামড়া শিল্পনির্ভর যে শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছিল, যে কর্মযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, তা আজ মুখ থুবড়ে পড়ছে চামড়ার মূল্যে ধস নামায়। ফলে এক দিকে সৃষ্টি হয়েছে লাখ লাখ মানুষের কর্মহীন হয়ে পড়ার শঙ্কা। সাথে সাথে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের তৃতীয় খাতটির সম্ভাবনা বিলীন হওয়ার পথে। ইসলামী জীবনাচারের একটি মৌলিক চেতনার সাথে সাথে চামড়া শিল্প ও মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের খাতকে ধ্বংসের এই অপচেষ্টা রুখতে হবে এখনই।

লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ

[email protected]