জেন-জি, মিলেনিয়াল, জেন-এক্স ইত্যাদি প্রজন্মভিত্তিক বিভাজন পাশ্চাত্যের একটি প্রকল্প। এতে নিহিত আছে মানুষের পরিচয়, মূল্যবোধ ও নৈতিকতা কাঠামো পুনর্গঠনের সূক্ষ্ম বুদ্ধিবৃত্তিক পদ্ধতি। প্রজন্মভিত্তিক শ্রেণিবিভাগের প্রকৃতি মূলত সোশ্যাল কনস্ট্রাকশন বা সামাজিক নির্মাণ। এটি কোনো প্রাকৃতিক বা জৈবিক বাস্তবতার প্রতিফলন নয়। প্রকৃত অর্থে জেনারেশন ধারণা আধুনিক জ্ঞানতত্ত্ব, ইতিহাসচিন্তা এবং পুঁজিবাদী বাজার ব্যবস্থার গর্ত থেকে তৈরি একটি আকলি কাঠামো।
কার্ল ম্যানহাইম দাবি করেন, একই সময়ে জন্ম নেয়া মানুষদের মধ্যে একটি বিশেষ মানসিক কাঠামো তৈরি হয়। এটি শুধু বয়সের ভিত্তিতে নয়; বরং গঠিত হয় অভিন্ন ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার কারণে। তিনি তিনটি স্তর চিহ্নিত করেন :
ক. জন্মকাল বা ঐতিহাসিক অবস্থান।
খ. নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনার যৌথ অভিজ্ঞতা।
গ. একই প্রজন্মের ভেতরে ভিন্ন আদর্শিক গোষ্ঠী।
একই সাথে পিটার এল বার্জার এবং থমাস লাকমান দাবি করেন, সমাজের যেকোনো বাস্তবতা মানুষের তৈরি এবং তা সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রবর্তিত হয়। প্রজন্মভিত্তিক পরিচয়ও তারই অংশ। এটি প্রকৃতির নিয়ম নয়; বরং সামাজিক নির্মাণ, আকলি কাণ্ড।
আধুনিক সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক কাঠামো এই প্রজন্মভিত্তিক পরিচয়কে আরো শক্তিশালী করেছে। মিডিয়া, করপোরেট মার্কেটিং এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এই লেবেলগুলোকে জনপ্রিয় করেছে। মানুষকে শেখাচ্ছে, তার নৈতিকতা, জীবনধারা এবং পরিচয় প্রজন্মভিত্তিক ফ্রেমে সংজ্ঞায়িত করার সবক। ফলে, প্রজন্মভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস আজ আর কেবল তাত্ত্বিক ধারণা নয়, হয়ে উঠেছে আধুনিক সমাজে জ্ঞান, ক্ষমতা ও নৈতিকতার সাথে যুক্ত একটি সামগ্রিক ন্যারেটিভ। যা নতুন করে মানুষের আচরণ ও আত্মপরিচয় গঠনের কাজ করছে।
ম্যানহাইমের মতে, সমাজে একই সময়ে জন্ম নেয়া মানুষদের মধ্যে কেবল বয়সের মিলই থাকে না। তারা একই ধরনের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যায়। যুদ্ধ, রাজনৈতিক বদল, প্রযুক্তিগত ইনকিলাব কিংবা সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মতো ঘটনাগুলো একটি নির্দিষ্ট অক্তে বেড়ে ওঠা মানুষের চিন্তা ও মানসিকতার উপর গভীর আসর ফেলে। ফলে তাদের মধ্যে এক ধরনের অভিন্ন নজরিয়া বা মানসিক কাঠামো তৈরি হয়। এর মানে, প্রজন্ম কোনো প্রাকৃতিক বা জৈবিক শ্রেণিবিভাগ নয়; বরং ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বোঝার একটি তফসিলি কাঠামো।
কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই তাত্ত্বিক ধারণা তার মূল সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট অতিক্রম করে এক ভিন্ন সাংস্কৃতিক অর্থ ধারণ করে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর পশ্চিমা সমাজে মিডিয়া, বিজ্ঞাপন শিল্প এবং বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো এই ধারণাকে ব্যবহার করতে শুরু করে ভোক্তা আচরণ বোঝার জন্য। এর ফলে প্রজন্ম ধারণা ধীরে ধীরে একটি সাংস্কৃতিক লেবেলিং সিস্টেমে পরিণত হয়।
এই রূপান্তরটি বোঝার জন্য সামাজিক নির্মাণ তত্ত্বটি গুরুত্বপূর্ণ। সমাজতাত্ত্বিক বার্জার ও লাকমান দেখাচ্ছেন, বাস্তবে মানুষের জন্মবছর একটি ধারাবাহিক ঐতিহাসিক প্রবাহের অংশ; কিন্তু সেই ধারাবাহিকতাকে হঠাৎ করে কিছু নির্দিষ্ট সীমারেখা টেনে ভাগ করা হয়। যেমন ১৯৪৬-৬৪ সালে জন্ম নেয়া ব্যক্তিরা হবেন বুমার্স জেনারেশনের, ১৯৬৫-৮০ সালে জন্ম নেয়া ব্যক্তিরা হবেন জেনারেশন এক্স, ১৯৮১-৯৬ এর মধ্যে জন্ম নেয়া যে কেউ হবেন জেনারেশন ওয়াই, ১৯৯৭-২০১২ এর মধ্যে জন্ম নেয়ারা হবেন জেন-জি।
প্রজন্ম ধারণার পেছনে আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতার একটি বিশেষ সময়চেতনা কাজ করে। আধুনিকতা ইতিহাসকে একটি অবিরাম পরিবর্তনের ধারায় দেখতে অভ্যস্ত। যেখানে প্রতিটি যুগ নতুন মানুষ, নতুন চিন্তা এবং নতুন মূল্যবোধ তৈরি করে। ইতিহাসচিন্তার এই দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ করেছেন জার্মান ইতিহাসতত্ত্ববিদ রেইনহার্ট কোসেলেক। তার মতে আধুনিক যুগে মানুষ ইতিহাসকে দ্রুত পরিবর্তনের একটি গতিশীল ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে শুরু করে। ফলে প্রতিটি সময়পর্বকে একটি নতুন প্রজন্মের আবির্ভাব হিসেবে হাজির করা যায়। এই দাবি মূল্যবান করে তোলা হয় আরেক দাবির মাধ্যমে। সেটি হচ্ছে- জেনারেশনতত্ত্ব আধুনিকতার আগের সমাজের ধীরগতির ঐতিহাসিক চেতনাকে দ্রুততায় বদলাবে। এটি প্রগতি।
এই ধারণাটি সবচেয়ে শক্তিশালীভাবে ব্যবহৃত হয় পুঁজিবাদী বাজার বিশ্লেষণে। করপোরেট মার্কেটিং ও বাজার গবেষণায় মানুষের আচরণ বোঝার জন্য ভোক্তাদের বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করা হয়। সেখানে প্রজন্ম একটি সুবিধাজনক বিশ্লেষণী কাঠামো হিসেবে ব্যবহৃত হয়- যার মাধ্যমে প্রযুক্তি ব্যবহার, ক্রয়ক্ষমতা, জীবনধারা এবং ভোগের ধরন বিশ্লেষণ করা যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা হয়, জেন-জি হলো ‘ডিজিটাল নেটিভ’ আর মিলেনিয়ালরা অভিজ্ঞতাভিত্তিক ভোগকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এভাবে একটি সমাজতাত্ত্বিক ধারণা ধীরে ধীরে বাজারের ভাষায় রূপান্তরিত হয় এবং করপোরেট পরিকল্পনার উপকরণে পরিণত হয়।
এরপর মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক শিল্প এই ধারণাকে জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ করে তোলে। চলচ্চিত্র, বিজ্ঞাপন, সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বারবার ‘জেন-জি সংস্কৃতি’, ‘মিলেনিয়াল লাইফস্টাইল’ ইত্যাদি পরিভাষা ব্যবহার হতে থাকে। ফলে ধারণাটি ক্রমশ মানুষের আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে যায়। সমাজতত্ত্বে এই প্রক্রিয়াকে performative identity বলা হয়, যেখানে মানুষ কোনো একটি লেবেলকে কেবল বর্ণনা হিসেবে গ্রহণ করে না; বরং সেই লেবেলের আলোকে নিজের আচরণ ও পরিচয় গঠন করতে শুরু করে।
এভাবে প্রজন্মভিত্তিক শ্রেণিবিভাগ শেষ পর্যন্ত একটি নতুন ধরনের পরিচয় রাজনীতির জন্ম দেয়। অতীতে সমাজে মানুষের পরিচয়ের প্রধান ভিত্তি ছিল ধর্ম, সভ্যতা, জাতি বা পরিবার। কিন্তু আধুনিক সমাজে ক্রমশ নতুন পরিচয়ের কাঠামো তৈরি হয়- যেমন প্রজন্ম, জীবনধারা বা সাংস্কৃতিক পছন্দ। এর ফলে প্রজন্ম ধারণা কেবল একটি বিশ্লেষণী শব্দ নয়; এটি ধীরে ধীরে একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কাঠামোতে রূপান্তরিত হয়, যার মাধ্যমে মানুষ নিজেকে ও অন্যদেরকে বোঝার চেষ্টা করে।
পাশ্চাত্যের আধুনিকতার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো মানুষের পরিচয়কে ক্রমাগত ভেঙে ছোট ছোট বিভাগে রূপান্তর করা। আধুনিক সমাজতত্ত্ব ও রাজনীতির ভাষায় এই প্রবণতাকে বলা যায় পরিচয়ের খণ্ডীকরণ (fragmentation of identity)। এখানে মানুষকে একটি সমন্বিত নৈতিক সত্তা বা একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক সভ্যতার ধারাবাহিক অংশ হিসেবে না দেখে; বরং বিভিন্ন সামাজিক পরিচয়ের সমষ্টি হিসেবে বোঝার চেষ্টা করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় মানুষের পরিচয়কে বিভিন্ন শ্রেণীতে ভাগ করা হয়, যেমন- জাতি (race), লিঙ্গ (gender), শ্রেণী (class) এবং প্রজন্ম (generation)। প্রত্যেকটি বিভাগ মানুষের অভিজ্ঞতার একটি নির্দিষ্ট দিককে সামনে নিয়ে আসে; কিন্তু একই সাথে মানুষের সামগ্রিক অস্তিত্বকে ভেঙে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
আধুনিক পাশ্চাত্য চিন্তায় এই প্রবণতার শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় আধুনিকতার জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রকল্পে। আধুনিকতা বিশ্বকে বোঝার জন্য বিশ্লেষণী পদ্ধতি ব্যবহার করে, যেখানে বাস্তবতাকে ছোট ছোট অংশে বিভক্ত করে বিশ্লেষণ করা হয়। কিন্তু যখন এই পদ্ধতি সমাজ ও মানুষের পরিচয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়, তখন তা নতুন ধরনের একটি সামাজিক কল্পনা তৈরি করে। যেখানে সমাজকে সমন্বিত সভ্যতার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হয় না; বরং বিভিন্ন স্বতন্ত্র পরিচয়ের সমষ্টি হিসেবে কল্পনা করা হয়। ফলে মানুষ আর শুধু মানুষ নয়; সে মুখ্যত নারী, কৃষ্ণাঙ্গ, মধ্যবিত্ত, মিলেনিয়াল ইত্যাদি বিভিন্ন পরিচয়ের ধারক হয়ে ওঠে।
এই প্রবণতাকে আধুনিক ক্ষমতা ও জ্ঞানের সম্পর্কের আলোচনায় বিশ্লেষণ করেছেন মিশেল ফুকো। তার মতে- আধুনিক সমাজে জ্ঞান ও ক্ষমতা পরস্পর গভীরভাবে যুক্ত। সমাজকে বিভিন্ন শ্রেণী ও পরিচয়ে বিভক্ত করার মাধ্যমে ক্ষমতার কাঠামো মানুষকে বিশ্লেষণ, নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করার নতুন উপায় তৈরি করে। অর্থাৎ- মানুষকে যত বেশি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়, তাকে বোঝা ও পরিচালনা করাও তত সহজ হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে পরিচয়ের খণ্ডীকরণ কেবল একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রবণতা নয়; এটি আধুনিক ক্ষমতার একটি সূক্ষ্ম কৌশল।
এই খণ্ডীকরণের গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হলো সমাজকে একটি ধারাবাহিক ঐতিহাসিক ও নৈতিক ঐক্য হিসেবে দেখার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যাওয়া। প্রতিটি সভ্যতা সাধারণত মানুষকে বৃহৎ নৈতিক ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে কল্পনা করেছে। সেখানে পরিবার, ঐতিহ্য, ধর্ম এবং সভ্যতার ধারাবাহিকতা মানুষের পরিচয় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু আধুনিকতার পরিচয়-রাজনীতিতে সেই ধারাবাহিকতার ধারণা ক্রমে ক্ষীণ হয়ে যায়। সমাজকে দেখা হয় বিভিন্ন স্বতন্ত্র অভিজ্ঞতাসম্পন্ন গোষ্ঠীর সমষ্টি হিসেবে।
প্রজন্মভিত্তিক বিভাজন এই বৃহত্তর পরিচয়-খণ্ডীকরণের ধারার একটি বিশেষ উদাহরণ। যখন সমাজকে প্রজন্মভিত্তিকভাবে ভাগ করা হয়, যেমন- মিলেনিয়াল, জেন-জি ইত্যাদি, তখন একটি সূক্ষ্ম ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয় যে, প্রতিটি প্রজন্মের নিজস্ব বাস্তবতা, নিজস্ব মূল্যবোধ এবং নিজস্ব নৈতিকতা আছে। এই ধারণা ধীরে ধীরে একটি সাংস্কৃতিক মতবাদে পরিণত হয়। ফলে দীর্ঘ ঐতিহাসিক নৈতিক ধারাবাহিকতার ধারণা দুর্বল হয়ে যায়।
সভ্যতাগুলোর নৈতিকতায় সত্য ও নৈতিকতাকে স্থায়ী বাস্তবতা হিসেবে দেখা হতো। যা পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে। আধুনিক সমাজে নৈতিকতাকে প্রায়ই ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের ফল হিসেবে দেখা হয়। এর ফলে একটি আপেক্ষিক নৈতিকতা জন্ম নেয়, যেখানে সত্যকে স্থির ও সর্বজনীন হিসেবে নয়; বরং নির্দিষ্ট সময়, সমাজ বা গোষ্ঠীর অভিজ্ঞতার সাথে সম্পর্কিত কিছু হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
প্রজন্মভিত্তিক পরিচয় এই আপেক্ষিকতার ধারণাকে আরো শক্তিশালী করে। যদি প্রতিটি প্রজন্মের অভিজ্ঞতা আলাদা হয়, তাহলে তাদের সত্য ও নৈতিকতার ধারণাও আলাদা হতে পারে, এমন একটি চিন্তা ধীরে ধীরে সামাজিক কল্পনায় স্থান করে নেয়। এর ফলে নৈতিকতা আর একটি দীর্ঘ ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা থাকে না; বরং প্রতিটি যুগে নতুন করে সংজ্ঞায়িত হওয়া একটি পরিবর্তনশীল ধারণা হয়ে ওঠে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক সমাজের চিন্তায় গভীর প্রভাব ফেলেছে এবং মানুষের আত্মপরিচয়, নৈতিকতা ও ইতিহাসবোধের উপর দীর্ঘস্থায়ী অবক্ষয় ডেকে আনছে।
আধুনিক পাশ্চাত্য সমাজে নৈতিকতার দারিদ্র্য ভয়াবহ। এই দারিদ্র্যকে সে আড়াল করছে নৈতিকতার ধারণা পুনর্গঠনের মাধ্যমে। এই পুনর্গঠনের কেন্দ্রে আছে নৈতিকতার সময়ভিত্তিকীকরণ। অর্থাৎ- নৈতিক মূল্যবোধকে একটি নির্দিষ্ট যুগ বা প্রজন্মের সাথে যুক্ত করে দেখা। যখন জনপরিসরে বলা হয়- এটি জেন-জি-এর মূল্যবোধ অথবা এটি বুমারদের নৈতিকতা, তখন নৈতিকতার ধারণা আর সর্বজনীন বা চিরন্তন হিসেবে উপস্থিত থাকে না; বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়, যা নির্দিষ্ট সময়ের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই ভাষা ব্যবহার করার মাধ্যমে ধীরে ধীরে একটি সূক্ষ্ম ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয় যে, নৈতিকতা কোনো স্থায়ী সত্য নয়; এটি প্রজন্মের সাথে বদলে যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গির তাত্ত্বিক রূপ বিভিন্ন আধুনিক দার্শনিক আলোচনায় দেখা যায়, বিশেষত উত্তরাধুনিক চিন্তায়, যেখানে সর্বজনীন সত্যের ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। বাংলাদেশসহ বহু মুসলিম রাষ্ট্রে এই দৃষ্টিভঙ্গির উপাসনা করা হচ্ছে পরিণতি ভাবনা ছাড়াই। ইসলাম যেখানে নৈতিকতার চিরন্তনতার উপর সুস্থির, জেনারেশনভিত্তিক নৈতিকতাভাবনা এর সাথে যুদ্ধরত।
অধিকাংশ ঐতিহাসিক সভ্যতায় নৈতিক মূল্যবোধকে একটি ধারাবাহিক প্রবাহ হিসেবে কল্পনা করা হয়। যেখানে জ্ঞান, নৈতিকতা ও অভিজ্ঞতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়। এই ধারাবাহিকতা পরিবার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মাধ্যমে টিকে থাকে। কিন্তু ‘জেন-জি বনাম বুমার’ ধরনের ভাষা একটি কৃত্রিম দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে, যেখানে পুরনো প্রজন্মকে উপস্থাপন করা হয় সেকেলে ও পশ্চাৎমুখী হিসেবে এবং নতুন প্রজন্মকে দেখানো হয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রগতিশীল ও মুক্তচিন্তার প্রতীক হিসেবে। এই প্রক্রিয়াটি আধুনিক সাংস্কৃতিক ভাষ্যে এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে, মানুষ প্রায়ই বুঝতে পারে না- এটি একটি বানানো বয়ান। এর ফলে একটি সভ্যতার ঐতিহাসিক স্মৃতি ও নৈতিক ধারাবাহিকতা দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই প্রক্রিয়ার তৃতীয় স্তর হলো নৈতিকতার বাজারীকরণ। আধুনিক পুঁজিবাদী সংস্কৃতিতে নৈতিকতা কেবল দর্শনের বিষয় নয়; এটি ধীরে ধীরে একটি ভোক্তা-সংস্কৃতির অংশে পরিণত হয়। মিডিয়া, বিজ্ঞাপন এবং করপোরেট সংস্কৃতি প্রজন্মভিত্তিক পরিচয়কে ব্যবহার করে নতুন জীবনধারা নির্মাণ করে। এর ফলে জেন-জি নৈতিকতা, জেন-জি সম্পর্কের ধারণা কিংবা জেন-জি প্রবণতার মতো ধারণা তৈরি হয়। এখানে নৈতিকতা একটি সাংস্কৃতিক ব্র্যান্ডে পরিণত হয়।
পুরো প্রক্রিয়াটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রজন্মভিত্তিক বিভাজন কেবল একটি নিরপেক্ষ সমাজতাত্ত্বিক ধারণা নয়; এটি আধুনিক সাংস্কৃতিক রাজনীতির একটি শক্তিশালী উপকরণ। এর মাধ্যমে নৈতিকতাকে সময়ের সাথে আপেক্ষিক করা হয়, ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা দুর্বল করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত নৈতিকতাকে বাজারের ভাষায় বদলে দেয়া হয়। ফলে মানুষের নৈতিক বোধ গভীর দার্শনিক ভিত্তি থেকে সরে এসে সাংস্কৃতিক প্রবণতা ও জীবনধারার আলোচনায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এই রূপান্তর নৈতিকতার ধারণাকে আপেক্ষিক বিষয়ে পরিণত করছে। শুধু আপেক্ষিক নয়, ক্রমবর্ধমান মাত্রায় অপ্রাসঙ্গিকও। রাজনীতিতে এর প্রতিফলন অনেক দৃশ্যমান হলেও সমাজের গভীর স্তর অবধি তা ভয়াবহ ফাটল তৈরি করছে। নৈতিকতাকে নির্দিষ্ট জেনারেশনের প্রবণতা হিসেবে ব্যাখ্যার ভেতর দিয়ে এমন জেনারেশন তৈরি হচ্ছে, যারা নৈতিকতার শাশ্বত আবেদনকে অপ্রাসঙ্গিক মনে করে।
পশ্চিমা মূল্যবোধের জন্য এটি আরামদায়ক হলেও ইসলামের জন্য ভীষণ ও বিপজ্জনক মাত্রায় উদ্বেগের। আমাদের ঐতিহ্যবাহী সমাজসত্তার জন্য একদম আত্মঘাতী।
লেখক : কবি, গবেষক



