মো: সহিদুল ইসলাম সুমন
বাংলাদেশের উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা খুঁজতে গেলে ফিরে আসতে হয় পার্বত্য চট্টগ্রামের দিকে। রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি— এই তিন পার্বত্য জেলা শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধারই নয়; এগুলো হতে পারে ভবিষ্যৎ অর্থনীতির অন্যতম শক্তিকেন্দ্র। পাহাড়, নদী, ঝরনা, হ্রদ, বনভূমি ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই অঞ্চল সম্ভাবনার আলো ছড়ালেও বাস্তব উন্নয়নের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে অবহেলিত। পরিকল্পিত উদ্যোগ ও টেকসই নীতিমালার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামকে পর্যটনভিত্তিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের মডেলে পরিণত করা সম্ভব।
বিশ্বে পর্যটন কেবল বিনোদন খাত নয়; এটি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। থাইল্যান্ড, নেপাল, ভিয়েতনাম কিংবা মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, পর্যটন খাত গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও পর্যটন হতে পারে সম্ভাবনার নতুন দ্বার। পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মিলিয়ে বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার বাস্তব সুযোগ রয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় শক্তি এর ভূপ্রাকৃতিক বৈচিত্র্য। বান্দরবানের নীলগিরি, নীলাচল, বগালেক, কেওক্রাডং, তাজিংডং কিংবা থানচির পাহাড়ি সৌন্দর্য ইতোমধ্যে দেশীয় পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদ, শুভলং ঝরনা, ঝুলন্ত সেতু, সাজেক ভ্যালি এবং খাগড়াছড়ির আলুটিলা, জেলা পরিষদ পার্ক, মায়াবিনী লেক ও রিসাং ঝরনা দেশের পর্যটন মানচিত্রে বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছে। বিশেষ করে সাজেক ভ্যালি বর্তমানে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিপুল পর্যটন সম্ভাবনাকে কতটা সংগঠিত অর্থনৈতিক কাঠামোয় রূপ দেয়া গেছে!
পার্বত্য অঞ্চলের পর্যটন কার্যক্রম এখনো অনেকাংশে অনানুষ্ঠানিক, মৌসুমনির্ভর এবং অপরিকল্পিত। উন্নত পর্যটন ব্যবস্থায় সাধারণত হোটেল, পরিবহন, স্থানীয় খাদ্য, হস্তশিল্প, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কৃষিপণ্য এবং ক্ষুদ্র ব্যবসাকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক চক্র গড়ে ওঠে; কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে সেই সমন্বিত কাঠামো এখনো জোরদার হয়নি। পর্যটনের প্রকৃত অর্থনৈতিক সুফল সীমিত পরিসরে আটকে রয়েছে।
এখানেই ‘ট্যুরিজম টু ট্রান্সফরমেশন’ ধারণার গুরুত্ব। পর্যটনকে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক খাতে পরিণত করতে হবে। অর্থাৎ, পর্যটন ঘিরে স্থানীয় কৃষি, হস্তশিল্প, পরিবহন, আবাসন, খাদ্যসেবা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এতে পর্যটন কেবল রাজস্ব আয়ের উৎস হবে না; বরং এটি আঞ্চলিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক পরিবর্তনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠবে।
এ ক্ষেত্রে উপজেলাভিত্তিক পর্যটন উন্নয়ন পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি উপজেলার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কোথাও পাহাড়ি ট্রেকিংয়ের সম্ভাবনা, কোথাও ঝরনা ও নদীকেন্দ্রিক পর্যটন, আবার কোথাও রয়েছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি। এই বৈচিত্র্যকে কাজে লাগিয়ে বিকেন্দ্রীভূত পর্যটন মডেল গড়ে তোলা গেলে প্রত্যন্ত এলাকাগুলোও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হবে।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটনের মূল অংশীদার করা ছাড়া এই খাতের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, তঞ্চঙ্গ্যা ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর রয়েছে সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারা, যা আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। এই সাংস্কৃতিক উপাদানকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সংবেদনশীলতা ও ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি যেন প্রদর্শনীর বস্তুতে পরিণত না হয়; বরং তারা যেন পর্যটন অর্থনীতির অংশীদার হতে পারে, সেই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। যথাযথ প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ সহায়তা ও বাজারসংযোগ নিশ্চিত করা গেলে স্থানীয় জনগণ হোমস্টে, ট্যুর গাইডিং, পাহাড়ি খাদ্যসেবা, লোকজ সংস্কৃতি প্রদর্শন এবং হস্তশিল্প উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
অবকাঠামোগত উন্নয়নও পর্যটন বিকাশের অন্যতম পূর্বশর্ত। উন্নত ও নিরাপদ সড়ক যোগাযোগ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, আধুনিক টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট সুবিধা ছাড়া আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনশিল্প গড়ে তোলা সম্ভব নয়। বর্ষাকালে পাহাড়ধস ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা পর্যটনের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পাশাপাশি জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও পর্যটকদের আস্থায় প্রভাব ফেলে।
তবে অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ভারসাম্যের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যটনের নামে প্রকৃতি ধ্বংস করা হলে দীর্ঘমেয়াদে পর্যটন টেকসই হবে না। তাই ‘ইকো-ট্যুরিজম’ মডেলকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পর্যটন উন্নয়নে পরিবেশ সংরক্ষণ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং অর্থনৈতিক লাভ— এই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দেয়া হয়। বাংলাদেশেও সেই পথ অনুসরণ করা জরুরি।
বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও কার্যকর নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে কর-সুবিধা, সহজ অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য ক্ষুদ্রঋণ, স্টার্টআপ সহায়তা এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি বাড়াতে হবে। কারণ বড় বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাই এই অঞ্চলের প্রকৃত অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হতে পারে।
একই সাথে সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় প্রশাসন, জেলা পরিষদ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি প্রায়ই উন্নয়ন কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে। একটি সুস্পষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি পর্যটন মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া এই অঞ্চলের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব নয়। ‘ট্যুরিজম ইকোনমিক জোন’ গঠনের বিষয়টিও এ ক্ষেত্রে বিবেচনা করা যেতে পারে।
পার্বত্য চট্টগ্রামকে অর্থনৈতিক শক্তিকেন্দ্রে রূপান্তর করতে হলে বিদেশী পর্যটক আকর্ষণে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে প্রবেশ করতে পারলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনা তৈরি হবে। এ জন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানের ব্র্যান্ডিং ও প্রচারণা। ‘হিল ট্র্যাক্টস অব বাংলাদেশ’ নামে একটি স্বতন্ত্র পর্যটন ব্র্যান্ড গড়ে তোলা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যটনমেলা, ডিজিটাল মার্কেটিং, ট্র্যাভেল ডকুমেন্টারি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লক্ষ্যভিত্তিক প্রচারণা চালানো জরুরি।
ভিসা-প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও পর্যটকবান্ধব নীতিও বিদেশী পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনলাইন ভিসা, অন-অ্যারাইভাল সুবিধা সম্প্রসারণ এবং পর্যটকদের জন্য বিশেষ ট্র্যাভেল পাস চালুর মতো উদ্যোগ বিদেশীদের আগ্রহ বাড়াতে পারে। আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধিও পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পর্যটন সার্কিটের সাথে এই অঞ্চলকে যুক্ত করা গেলে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে এটি আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। নিরাপত্তা ইস্যু, ভূমি বিরোধ, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং অপরিকল্পিত পর্যটন কার্যক্রম— এসব সমস্যা সমাধান না করলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হবে না। বিশেষ করে পাহাড় ও বনভূমি সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রকৃতিই এই অঞ্চলের প্রধান সম্পদ।
পরিকল্পিত নীতি, সুশাসন, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে এই অঞ্চল একটি টেকসই উন্নয়ন মডেলে পরিণত হতে পারে। ‘ট্যুরিজম টু ট্রান্সফরমেশন’ কেবল একটি স্লোগান নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের বাস্তব সম্ভাবনা। এখন প্রয়োজন দূরদর্শী রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং দায়িত্বশীল বাস্তবায়ন।
লেখক : কলামিস্ট ও সদস্য, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ



