দেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। ভোটের অঙ্ক, জোটের বাস্তবতা এবং জনমতের পরিবর্তন, সব মিলিয়ে চিত্রটি জটিল। বিএনপি এক দিকে একাত্তরকে সামনে এনে জামায়াতকে মোকাবেলা করতে চাইছে, অন্য দিকে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরিসর সঙ্কুচিত করার কৌশল নিচ্ছে। এ পথ সহজ নয়। অতীতের জোট, বর্তমানের অভিযোগ এবং তরুণদের সরে যাওয়া- সব মিলিয়ে বিএনপি এখন দ্বিধার মুখে। জামায়াত সাংগঠনিক ও ভাবমর্যাদার সুবিধা নিচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, বিএনপির কৌশল কি বিদ্যমান বাস্তবতায় যথার্থ, নাকি দলের ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে?
ভোটের হিসাব বিএনপির জন্য অস্বস্তিকর
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ভোটের হিসাব নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এর ভেতরে আছে জোট রাজনীতি, ভোট স্থানান্তর এবং বাস্তব সমর্থনের জটিল চিত্র। বিএনপি জোট পেয়েছে মোট ৫১ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ ভোট। বিএনপির নিজস্ব প্রাপ্তি ৪৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ। অন্য দিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট পেয়েছে ৩৮ দশমিক ৫০ শতাংশ ভোট। জামায়াত এককভাবে পেয়েছে ৩১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। দুই জোটের ব্যবধান ১২ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
এখানেই শেষ নয়। আরো গভীরে গেলে ভিন্ন চিত্র মেলে। বিএনপির প্রাপ্ত ভোটের প্রায় ২০ শতাংশই আওয়ামী লীগ সমর্থিত ভোটারদের দান। বিশেষ করে সংখ্যালঘু ভোট। ফলে এ অংশ বাদ দিলে বিএনপির নিজস্ব ভোট দাঁড়ায় ২৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ। সংখ্যাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি জামায়াতে ইসলামীর এককভাবে প্রাপ্ত ভোটের চেয়ে কম; অর্থাৎ বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি বনাম জামায়াতের নিজস্ব ভোটভিত্তি নতুন প্রশ্ন তুলে আনে। আসনভিত্তিক বিশ্লেষণ আরো তাৎপর্যপূর্ণ। যেখানে বিএনপি ও জামায়াত সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে, সেখানে ব্যবধান ৮ শতাংশ। এটি সামগ্রিক ১২ দশমিক ৫৯ শতাংশ ব্যবধানের তুলনায় অনেক কম। এর মানে, মাঠের লড়াই ছিল অনেক কাছাকাছি।
মনে রাখতে হবে, এসব আসনে প্রায় ২০ শতাংশ ভোটার ছিল আওয়ামী লীগের। এ ভোটের বড় অংশ পেয়েছে বিএনপি। ফলে প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিত্র আংশিক ঢাকা পড়েছে। আরো জটিলতা আছে শরিক দলগুলোর কারণে। যেখানে বিএনপির শরিকরা লড়েছে, সেখানে বিএনপির ভোট স্থানান্তর হয়েছে। একইভাবে, জামায়াতের শরিকরা যেখানে প্রার্থী দিয়েছে, সেখানে জামায়াতের ভোটও তাদের দিকে গেছে। ফলে দলভিত্তিক নিখুঁত হিসাব করা কঠিন।
এ বাস্তবতা একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়। কাগজে-কলমে ব্যবধান যতটা বড় দেখায়, মাঠের রাজনীতি ততটা একপক্ষীয় নয়। বরং ভোটের ভেতরে আছে ধার করা সমর্থন, কৌশলগত সমন্বয় এবং পারস্পরিক নির্ভরতা। সুতরাং, এ নির্বাচন শুধু জয়ের অঙ্ক নয়। এটি শক্তির প্রকৃত চিত্র দেখার নিখুঁত আয়না।
অতীতের বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থান
বিএনপির বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট। প্রধান টার্গেট এখন জামায়াতে ইসলামী। বক্তব্য, ভাষণ, দলীয় আলোচনায় তাই প্রতিফলন। কিন্তু এ অবস্থান ইতিহাসের সাথে সাংঘর্ষিক এবং সে কারণে প্রশ্ন উঠছে।
দলের নেতাকর্মীদের কথা শুনলে মনে হয়, যেন অতীত অস্বীকার করা হচ্ছে। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় অন্তত ১৩ জন রাজনীতিক ছিলেন পাকিস্তানের অখণ্ডতায় বিশ্বাসী। এ তথ্য ইতিহাসের অংশ। এড়ানোর সুযোগ নেই। ১৯৯১ সালের কথাও মনে রাখা জরুরি। সেই সময় জামায়াতের সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠন করে। এরপর ২০০১ সালে দুই দল সরাসরি জোট বেঁধে নির্বাচন করে। শুধু নির্বাচন নয়, একসাথে সরকারও গঠন করে। এখানেই শেষ নয়। বেগম খালেদা জিয়া জামায়াতের দু’জন নেতাকে মন্ত্রিসভায় নেন। এটি ছিল আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক স্বীকৃতি।
খালেদা জিয়া জামায়াতকে রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন একাধিকবার। দলটিকে গণতান্ত্রিক শক্তির অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন বিভিন্ন সময়ে। ২০০১ সালের পর তার বক্তব্যে জামায়াতকে জোটের অপরিহার্য অংশ হিসেবে তুলে ধরতে দেখা গেছে।
তারেক রহমানও একই ধারার রাজনীতি দীর্ঘদিন অনুসরণ করেছেন। অতীতে তিনি প্রকাশ্যে জামায়াতকে জোটের সহযোগী শক্তি হিসেবে স্বীকার করেন। তিনি ঐক্যের রাজনীতি, জোটবদ্ধ আন্দোলন এবং সরকার গঠনের প্রয়োজনে একসাথে কাজ করার কথা বলেন। জামায়াতকে বিচ্ছিন্ন করার কোন ইঙ্গিত তখন তার বক্তব্যে ছিল না। এ প্রেক্ষাপটে বর্তমান অবস্থান আরো তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। অতীতে যে দল ছিল ঘনিষ্ঠ মিত্র আজ সেটিকেই প্রধান প্রতিপক্ষ বানানো হচ্ছে। এ পরিবর্তন কী আদর্শগত? নাকি কেবল রাজনৈতিক কৌশল?
বাস্তবতা হলো, রাজনীতিতে সময়ের সাথে অবস্থান বদলায়। কিন্তু ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না। অতীতের সিদ্ধান্ত, বক্তব্য এবং জোট রাজনীতি বর্তমান অবস্থানকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।
আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন নয়, আত্তীকরণ
বিএনপির বর্তমান রাজনৈতিক কৌশল পরিষ্কার। আওয়ামী লীগের জন্য রাজনীতির মাঠ সঙ্কুচিত করা। বলতে গেলে, আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করার সুযোগ না দেয়া। এর পেছনে মূল যুক্তি, ভোটের হিসাব।
বিএনপি মনে করছে, ভবিষ্যতে রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে। জামায়াতে ইসলামী হয়ে উঠতে পারে নিয়ামক শক্তি। আর আওয়ামী লীগও যদি মাঠে থাকে, তাহলে বিএনপির অবস্থান তৃতীয় স্থানে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এ আশঙ্কা থেকে দলটির কৌশল আরো আক্রমণাত্মক।
বিএনপির আরেকটি লক্ষ্য স্পষ্ট। তারা চায়, আওয়ামী লীগের সমর্থক ও কর্মীরা ধীরে ধীরে বিএনপিতে যুক্ত হোক। প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কতটা বাস্তবসম্মত? রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের দলীয় পরিচয়, আদর্শ এবং অবস্থান এত সহজে বদলায় না। ফলে এ কৌশল কতটা সফল হবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।
এ পরিস্থিতিতে জাতীয় সংসদে একটি মন্তব্য নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেছেন, ‘আজকে যারা সরকারি দলের আসনে আছেন, তারা বোধ হয় আওয়ামী লীগ থেকে এসেছেন, ঠিক আজকে সরকারি দলের পক্ষ থেকে আমরা একই ধরনের আচরণ লক্ষ করছি।’ এ বক্তব্য ইঙ্গিতপূর্ণ।
বোঝা যায়, সংসদের ভেতরেও রাজনৈতিক পরিচয় এবং অবস্থান নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। এটি শুধু একটি মন্তব্য নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন।
সব মিলিয়ে চিত্রটি জটিল। বিএনপি এক দিকে প্রতিযোগিতার মাঠ পুনর্গঠন করতে চায়। অন্য দিকে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার কৌশল নিচ্ছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন যে বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে তাতে বিএনপি চ্যালেঞ্জের মুখে। রাজনৈতিকভাবে জামায়াতের মোকাবেলা করা এখন তাদের জন্য ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর পরিস্থিতি বদলেছে। বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও দখলবাজির অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগ শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ভাষ্য নয়। সাধারণ মানুষ নিজের চোখে দেখছে। ফলে এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে জনসমর্থনে। অনেক নেতাকর্মীর কাছে দলীয় কার্যক্রমের চেয়ে আর্থিক লাভ-লোকসানের হিসাব প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে, এমন অভিযোগও জোরালো।
এমন পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে। আসন সংখ্যায় পিছিয়ে থাকলেও ভোটের হিসাবে বিএনপির কাছাকাছি জামায়াত।
অন্য দিকে জামায়াতের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ খুব কম। তাদের বিরুদ্ধে স্পষ্টভাবে চাঁদাবাজি বা দখলবাজির অভিযোগ ওঠেনি। রাজনীতিতে ‘নৈতিক উচ্চভূমি’ একটি বড় সম্পদ; এ কথা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বহুবার বলেছেন। মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট ডাল গণতন্ত্রে বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতার গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেছেন। সে দিক থেকে জামায়াত সুবিধাজনক অবস্থানে।
তরুণদের মধ্যেও পরিবর্তন স্পষ্ট। বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণরা বিএনপি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এর প্রমাণ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি। পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদলের ভরাডুবি এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের জয়জয়কার একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়। এটি বিএনপির জন্য গুরুতর সতর্কসঙ্কেত।
কৌশলের সঙ্কট ও ’৭১-এর পুনরাবৃত্তি
বিএনপির বড় সমস্যা হলো, তারা প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করার কার্যকর পয়েন্ট খুঁজে পাচ্ছে না। ফলে বিএনপিকে ফিরে যেতে হচ্ছে একাত্তরের প্রসঙ্গে। জামায়াতের স্বাধীনতাযুদ্ধকালীন ভূমিকা সামনে এনে রাজনৈতিক আক্রমণ চালাচ্ছে। এটিই তাদের প্রধান কৌশল। বলা যায়, একমাত্র কৌশল। প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কতটা কার্যকর? অতীতে এ কৌশল ব্যবহার করেছে আওয়ামী লীগও। কিন্তু শেষ পরিণতি সবার জানা।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি পরিচিত ধারণা হলো, ‘ইস্যু এগজসশন’ (Issue Exhaustion)); অর্থাৎ একটি ইস্যু বারবার ব্যবহার করলে তার প্রভাব কমে যায়। জার্মান চিন্তাবিদ ম্যাক্স ওয়েবার রাজনৈতিক বৈধতার উৎস নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, মানুষ শেষ পর্যন্ত বর্তমান বাস্তবতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়। অতীতনির্ভর রাজনীতি দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা কঠিন।
তবে বিএনপিকে পুরোপুরি দোষ দেয়াও সহজ নয়। রাজনীতির নিয়মই হলো প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা। যেকোনো কার্যকর অস্ত্র ব্যবহার করা। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি কৌশল মাত্র। কিন্তু বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে কৌশল প্রণয়ন জরুরি।
আদর্শিক বিচ্যুতি ও নতুন বিতর্ক
এক সময় বিএনপিকে মধ্যপন্থী দল বলা হতো। তবে বাস্তবে ডানপন্থার দিকে ঝোঁক ছিল। এখন দলটি, অনেকের মতে, বামদিকে ঝুঁকে গেছে। দলের রাজনৈতিক বক্তব্যেও এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। এমন অভিযোগও উঠছে যে, একাত্তরের প্রসঙ্গ সামনে আনা শুধু জামায়াতকে আক্রমণ নয়। অনেকে এটিকে আওয়ামী লীগকে আত্তীকরণের চেষ্টা বলে মনে করছেন। অর্থাৎ, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভাষা ও অবস্থান ধার করা হচ্ছে।
ভারতের প্রসঙ্গে বিএনপির নীরবতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনেকে বলছেন, দলটি ভারতপন্থী হয়ে উঠছে। অভিযোগ সত্য হোক বা না হোক, জনমনে এর প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে।
আরেকটি বিতর্কিত বিষয় হলো গণভোটের ফল। বিএনপি তা পুরোপুরি মেনে নিতে চাচ্ছে না। জুলাই সনদ নিয়েও ‘চালাকি’র আশ্রয় নিচ্ছে। এখন অনেকের কাছে পরিষ্কার, বিএনপির পক্ষ থেকে এ সনদ বাস্তবায়ন না করার আশঙ্কা প্রবল। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জাতীয় সংসদে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে ‘অবৈধ’ ও ‘সংবিধানবহির্ভূত’ বলেছেন। তিনি বলেন, সংবিধানের বাইরে গিয়ে কোনো চাপিয়ে দেয়া আদেশ মেনে নেয়া হবে না। তার স্বীকারোক্তি, সংস্কারের বাহানায় নির্বাচন আটকে দেয়া রোধ করতে বিএনপি বাধ্য হয়ে এ সনদে স্বাক্ষর করেছিল। এ অবস্থান দলটির বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
উত্তরাধিকার বনাম বর্তমান বাস্তবতা
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু নাম শুধু রাজনৈতিক পরিচয় নয়, আবেগেরও অংশ। সেই নাম জিয়াউর রহমান । খালেদা জিয়াও তাই। তাদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলার দুঃসাহস খুব কম মানুষ দেখিয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপির মূল শক্তি ছিল মানুষের এ বিশ্বাস ও আস্থা। কিন্তু রাজনীতি স্থির থাকে না। সময়ের সাথে দলও বদলায়। এখন প্রশ্ন উঠছে, বর্তমান বিএনপি কি সেই পুরনো ধারার প্রতিনিধিত্ব করছে? নাকি নিজের রাজনৈতিক চরিত্র হারাচ্ছে?
অনেকে মনে করছেন, বিএনপির কিছু নেতার কণ্ঠে আওয়ামী লীগের সুর। কেউ বলছেন, তাদের বক্তব্যে দিল্লিমুখী অবস্থানের ছাপ স্পষ্ট। এ সমালোচনা সত্য হোক বা অতিরঞ্জিত, রাজনীতিতে শেষ পর্যন্ত পারসেপশনই বড় বাস্তবতা। ফরাসি কূটনীতিক, রাজনৈতিক দার্শনিক এবং ইতিহাসবিদ অ্যালেক্সিস চার্লস হেনরি ক্লেরেল বলেন, ‘জনমতই গণতন্ত্রের প্রকৃত চালিকাশক্তি। সেই জনমত যদি সরে যায়, তাহলে সাংগঠনিক শক্তি টিকিয়ে রাখা কঠিন।’ বিএনপির সামনে তাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নির্বাচন নয়, জনবিশ্বাস। দলকেই ঠিক করতে হবে, তারা কোন পথে হাঁটবে।
কৌশলের রাজনীতি, নাকি আত্মপরিচয়ের সঙ্কট
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি এখনো বড় শক্তি। তাদের জনভিত্তি আছে। আন্দোলনের স্মৃতি আছে। ইতিহাস আছে। কিন্তু শুধু অতীত দিয়ে রাজনীতি টেকে না।
বিএনপির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে ভেতরে বাইরে আলোচনা বাড়ছে। এক দিকে নেতাদের কঠোর বক্তব্য, অন্য দিকে কিছু ইস্যুতে এমন অবস্থান, যা তাদের পুরনো পরিচয়ের সাথে ঠিক মেলে না। এখানে তৈরি হচ্ছে বিভ্রান্তি। অনেকের ধারণা, দলটি কৌশলগত দ্বৈততার মধ্যে পড়েছে।
রাজনীতিতে কৌশল অবশ্যই দরকার। সময় বুঝে অবস্থান বদলাতেও হয়। কিন্তু একটি দলের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিশ্বাসযোগ্যতা। মানুষ যদি মনে করে, দলটি নিজের মূল অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছে, তাহলে সঙ্কট তৈরি হয়। কারণ, ভোট শুধু সংগঠনের ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে আস্থার ওপর। বিএনপির সামনে এখন সেই আস্থার প্রশ্ন।
ইতিহাস বলে, শুধু প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা যায় না। বিকল্প রাজনৈতিক দর্শনও সামনে আনতে হয়। মানুষ জানতে চায়, দলটি আসলে কোন দিকে আছে? কী করতে চায়? কোন পথে দেশকে নিতে চায়।
বিএনপির সামনে এখন দু’টি পথ। এক, বর্তমান কৌশল চালিয়ে যাওয়া। দুই, দলের রাজনৈতিক পুনর্গঠন। সিদ্ধান্ত তাদেরই নিতে হবে।
লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন



