বর্তমান মুসলিম বিশ্ব এক অদ্ভুত দ্বিমুখী সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে আমাদের সোনালি অতীত, অন্যদিকে বর্তমানের করুণ ও লাঞ্ছনাকর পরিস্থিতি। ফিলিস্তিন থেকে শুরু করে রোহিঙ্গা শিবির, কাশ্মির কিংবা ইয়েমেন— প্রতিটি প্রান্ত থেকে যখন নির্যাতিত মানুষের আর্তনাদ ভেসে আসে, তখন আমরা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি এক অলৌকিক সাহায্যের আশায়। আমরা মনে মনে খুঁজি ‘আবাবিল’ পাখিদের। কয়েক বছর আগে এই পত্রিকায় ‘বিভক্ত মুসলিম উম্মাহ ও আবাবিল’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। আজ উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সেই একই বিষয়ে নতুন করে আলোকপাত করা জরুরি মনে করছি। কারণ, রূঢ় বাস্তবতা হলো— যতক্ষণ আমরা নিজেদের রণকৌশল, চরিত্র আর চিন্তাচেতনা পরিবর্তন না করব, ততক্ষণ ‘আবাবিল’ অর্থা আল্লাহর সাহায্য প্রত্যাশা করা যায় কী? ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার চলমান যুদ্ধের দামামা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, মুসলিম উম্মাহ সমকালীন বিশ্বে কতটা খণ্ড-বিখণ্ড এবং অপ্রস্তুত।
শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব ও মোসাদের নীলনকশা
মুসলিম বিশ্বের অনৈক্যের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে শিয়া-সুন্নি ইস্যু। অথচ আমরা সবাই অভিন্ন আল্লাহ, তাঁর রাসূল সা: এবং মহাগ্রন্থ আল কুরআনের ওপর অবিচল আস্থা রাখি; ফলে আমাদের মধ্যকার অবশিষ্ট মতভেদগুলো একান্তই গৌণ। এই গৌণ বিষয়গুলো বড় করে তুলে মুসলিম উম্মাহকে বিভক্ত রাখার পেছনে মোসাদ এবং পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ আছে। কৌতূলোদ্দীপক হলো— বিভাজন কেবল আমাদের মধ্যে নয়; খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের মধ্যেও আছে চরম অনৈক্য। আয়ারল্যান্ডে প্রটেস্ট্যান্ট বনাম ক্যাথলিকদের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ কিংবা ইহুদিদের মধ্যে ‘আশকেনাজি’ ও ‘সেফার্ডি’দের অভ্যন্তরীণ ঘৃণা এর বড় প্রমাণ। অথচ তারা তাদের বৃহত্তর স্বার্থে একতাবদ্ধ থাকতে পারে, আর আমরা ৫০টির বেশি টুকরোয় বিভক্ত হয়ে সমুদ্রের উপরিভাগের খড়কুটো বা ফেনার মতো গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছি।
সভ্যতার সঙ্ঘাত ও বৈশ্বিক ভারসাম্যের রাজনীতি
স্যামুয়েল হান্টিংটনের ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন’ তত্ত্বের ধারাবাহিকতায় আজ ইসলামী সভ্যতা দমনের এক নীলনকশা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। জায়নবাদী শক্তি ও পশ্চিমা মিত্ররা মুসলিম উম্মাহর ঐক্যবদ্ধ উত্থান ঠেকাতে ঠাণ্ডামাথায় বিভক্তি ও গৃহযুদ্ধ চাপিয়ে দিচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘ম্যাডম্যান থিওরি’ কিংবা কট্টরপন্থীদের আস্ফালন মূলত ইরানসহ যেকোনো উদীয়মান মুসলিম শক্তি ধ্বংসের পাঁয়তারা। বর্তমানের এ এক মেরু বিশ্বব্যবস্থায় (ইউনিপোলার ওয়ার্ল্ড) রাশিয়ার বর্তমান অবস্থানে যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে, সেখানে জায়নবাদী আগ্রাসন রুখতে এবং বৈশ্বিক ‘ব্যালেন্স অব পাওয়ার’ ফিরিয়ে আনতে চীনের আরো বলিষ্ঠ ও কৌশলগত ভূমিকা এখন সময়ের দাবি।
রাজতন্ত্র ও ‘হানি ট্র্যাপ’ : গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কূটকৌশল
মুসলিম বিশ্বের অনৈক্য এবং অনেক মুসলিম শাসকের মেরুদণ্ডহীন আচরণের পেছনে আছে এক অন্ধকার জগত। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কীভাবে প্রভাবশালীদের ফাঁদে ফেলে স্বার্থ হাসিল করে, তার স্বরূপ একটু আধটু জানা সম্ভব হলেও পুরোটা জানা সম্ভব নয়; যদি কেউ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোতে কাজ না করেন। আধুনিক গোয়েন্দা দাপটে ‘হানি ট্র্যাপ’ বা নারী ও রোমান্টিক সম্পর্কের মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইল করা একটি অতি পুরনো কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর অস্ত্র। ১৯৫৯ সালের একটি কুখ্যাত উদাহরণ এখানে প্রাসঙ্গিক বলে উল্লেখ করছি। তৎকালীন জর্দানের ২৩ বছর বয়সী তরুণ বাদশাহ হোসেন যখন যুক্তরাষ্ট্রে আর্থিক সাহায্যের জন্য গিয়েছিলেন, তখন সিআইএ ৩২ বছর বয়সী অভিনেত্রী সুসান ক্যাবটকে লেলিয়ে দিয়ে বাদশাহকে অসহায় করার ফাঁদ পেতেছিল। আজ মোসাদ এবং ভারতের ‘র’ (আরএডব্লিউ) বলিউড অভিনেত্রীদের ব্যবহার করে আরব শাসকদের নৈতিক স্খলন ঘটানো এবং পরবর্তীতে সেই তথ্য দিয়ে তাদের অসহায় করা।
গোয়েন্দা ফাঁদ : বাদশাহ থেকে প্রেসিডেন্ট— কেউ নিরাপদ নন
এ ফাঁদ কেবল মুসলিম শাসকদের জন্য নয়; খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্টরাও এর শিকার। কুখ্যাত জেফরি এপস্টেইন মামলার দিকে তাকালে দেখা যায়, কীভাবে বিশ্বের রথী-মহারথীরা এ ‘পিজ্জাগেট’ ও যৌন কেলেঙ্কারির জালে আটকা পড়েছেন। এপস্টেইনের মতো ব্যক্তিরা মূলত গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর হয়ে বিশ্বনেতাদের ব্যক্তিগত জীবনের গোপন ভিডিও ধারণ করে রাখতেন, যাতে পরবর্তীতে তাদের দিয়ে নিজেদের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করা যায়। যখন বিশ্বনেতারা নিজেরা ব্ল্যাকমেইলের শিকার, তখন তারা কীভাবে ইনসাফ কায়েম করবেন?
উত্তরাধিকার ও পশ্চিমা প্রভাব : জর্দান ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা
উত্তরাধিকার পরিবর্তনের মাধ্যমে কীভাবে পশ্চিমা শক্তি নিজেদের অনুগত শাসক বসায়, তার উদাহরণও জর্দান রাজবংশ। বাদশাহ হোসেন ১৯৬৫ সালে তার ভাই হাসানকে উত্তরাধিকারী করেছিলেন। কিন্তু ১৯৯৯ সালে মৃত্যুর ঠিক আগে নাটকীয়ভাবে তিনি হাসানকে সরিয়ে তার ছেলে আবদুল্লাহকে মনোনীত করেন। আবদুল্লাহর পশ্চিমা শিক্ষা এবং ইংরেজ মায়ের বংশপরিচয় তাকে পশ্চিমা শক্তির কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল।
আমার নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও এর সাক্ষ্য দেয়। ২০০৬ সালে এনডিসি সফরের সময় বাদশাহ আবদুল্লাহর সাথে আমাদের সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল। সেই বৈঠকে অনুভব করেছি, তিনি কতটা মার্কিন-ঘনিষ্ঠ। তিনি অত্যন্ত গর্বের সাথে আমাদের জানিয়েছিলেন, সে দিনও প্রেসিডেন্ট বুশের সাথে তার সরাসরি ও বন্ধুত্বপূর্ণ কথা হয়েছে। এই যে পশ্চিমা শক্তির ওপর অতিনির্ভরশীলতা, এটি আজ মুসলিম বিশ্বের সার্বভৌমত্ব গ্রাস করছে।
ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব
ইরান আজ একাই লড়ছে। পারস্যের একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস আছে; যা কোনো দিগ্বিজয়ী পুরোপুরি পদানত করতে পারেননি। ইরান যদি হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি গ্রহণ করে বা এটি অবরোধ করে, তবে তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক মহাবিপর্যয় বা ‘ক্যাটাস্ট্রফিক ইভেন্ট’ হিসেবে দেখা দেবে। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১২৫টি জাহাজ এ এলাকা দিয়ে চলাচল করে। পথটি যদি অচল হয়ে পড়ে, তবে তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১২০ থেকে ১৫০ ডলারে গিয়ে ঠেকবে। বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন কোভিড-১৯ মহামারীর চেয়েও বড় সঙ্কটের মুখে পড়বে। বর্তমানে আমেরিকা অ্যাসকর্ট সার্ভিসের মাধ্যমে এ পথ সচল রাখার চেষ্টা করলেও, প্রতিদিনের ১২৫টি জাহাজ সুরক্ষা দেয়ার মতো যথেষ্ট পরিমাণ ‘ডেস্ট্রয়ার’ বা যুদ্ধজাহাজ মার্কিন নৌবাহিনীর হাতে নেই। এটি আমেরিকার জন্য এক চরম সামরিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার সঙ্কেত।
মোদি-নেতানিয়াহু অক্ষ ও আঞ্চলিক চক্রান্ত
সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইসরাইলি পার্লামেন্ট-নেসেটে দাঁড়িয়ে আফগানিস্তানের জন্য যে বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন, তা মূলত পাকিস্তান ও ইরানকে দুই দিক থেকে ঘিরে ফেলার একটি গভীর নীলনকশা। ইসরাইল আজ ভারতের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে। জায়নবাদী শক্তি এখন ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তাদের ‘লুক ইস্ট’ পলিসির মাধ্যমে নতুন সহযোগী খুঁজছে। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো অস্থির নেতারা আজ এক মেরু বিশ্বব্যবস্থা পুঁজি করে পৃথিবীকে অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিচ্ছেন। এ ভারসাম্যহীনতা রোধে চীনের বলিষ্ঠ ভূমিকা অপরিহার্য।
ঘৃণা বনাম যোগ্যতা : নিজেদের দিকে ফিরে দেখা
ইহুদি বা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে কেবল ঘৃণা পোষণ করলে মুক্তি মিলবে না। শত্রুপক্ষ আজ জ্ঞানে, বিজ্ঞানে ও কৌশলে আমাদের চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে। আমরা যতক্ষণ অলসতা আর ভোগবিলাসে মত্ত থাকব, ততক্ষণ আমাদের বিজয় অসম্ভব। আজ মুসলিম বিশ্বের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ হচ্ছে বিলাসিতা আর অস্ত্র আমদানিতে। অথচ আমরা জ্ঞান-বিজ্ঞান বা গবেষণায় কোনো স্বতন্ত্র বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারিনি। আমরা পশ্চিমের ‘নোবেল’ পুরস্কারের দিকে তাকিয়ে থাকি স্বীকৃতির জন্য; কিন্তু নিজেদের প্রতিভার মূল্যায়ন করার মতো কোনো প্ল্যাটফর্ম আমাদের নেই। এ অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরনির্ভরশীলতা আমাদের পরাধিনতার মূল কারণ।
কুরআনের সতর্কবাণী ও বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ : ঐশ্বরিক সাহায্যের শর্ত
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-মায়িদার ৫১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পরিষ্কারভাবে সতর্ক করেছেন— ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের বন্ধু (আউলিয়া) হিসেবে গ্রহণ করো না; তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যারা তাদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে, সে তাদের একজন বলে গণ্য হবে।’ কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো— আজকের মুসলিম শাসকরা তাদের গদি রক্ষা ও নিরাপত্তায় সেই ইহুদি-খ্রিষ্টান শক্তির আশ্রয় নিচ্ছেন। তারা মনে করছেন, এই মিত্রতা তাদের রক্ষা করবে, অথচ তারা মূলত নিজেদের ধ্বংস নিজেরা ডেকে আনছেন।
পবিত্র কুরআনে দলবদ্ধভাবে (আবাবিল) পাখির মাধ্যমে কাবা শরিফ রক্ষার যে বর্ণনা আছে, সেটি ছিল এক বিশেষ পরিস্থিতি। আজ আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন বিশাল ভূখণ্ড, অফুরন্ত সম্পদ আর শত কোটি মানুষের জনশক্তি। এ জনশক্তি কাজে না লাগিয়ে অলস বসে থেকে অলৌকিক সাহায্যের অপেক্ষা করা কুরআনের শিক্ষার পরিপন্থী বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে। মূলত বিজাতীয়দের মিত্র হিসেবে গ্রহণ না করার ঐশ্বরিক নির্দেশের গূঢ় অর্থ হলো— স্বকীয়তা ও আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন করা। আমাদের আজ প্রয়োজন ‘বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রাম’ যার প্রধান স্তম্ভ হবে তিনটি :
১. কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স : নেতাদের নৈতিক অবক্ষয় রোধে শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। ২. প্যারালাল ইনস্টিটিউশন : ওআইসির বিকল্প হিসেবে কার্যকর অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা জোট গঠন করা। ৩. প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা : পশ্চিমা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা।
শেষ কথা
রমজানে সংঘটিত বদরের যুদ্ধ আমাদের শিক্ষা দেয়, সঠিক কৌশল ও ঈমানি দৃঢ়তা থাকলে জয় সম্ভব। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বিদায় পরবর্তী অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের দামামা আমাদের শেষ সতর্কবার্তা দিচ্ছে। আকাশ থেকে ‘আবাবিল’ আসবে না, যদি না আমরা মাটির পৃথিবীতে নিজেদের ‘আবাবিল’-এর মতো ক্ষিপ্র ও অদম্য করে তুলি। পশ্চিমা ব্ল্যাকমেইল ও রাজতন্ত্রের শৃঙ্খল ভেঙে যখন আমরা কুরআনের নির্দেশনায় ঐক্যবদ্ধ হবো, তখন প্রকৃত বিজয় আসবে। অন্যথায়, ইতিহাসের পাতায় আমরা কেবল এক পরাজিত জাতি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবো।
লেখক : সাবেক সহকারী নৌবাহিনী প্রধান ও উপ-উপাচার্য, বিইউপি



