চামড়াশিল্প পুনর্জাগরণের সম্ভাবনা

চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে আধুনিক প্রযুক্তি, ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং দক্ষতা উন্নয়ন জরুরি। একই সাথে ওয়াক্ফভিত্তিক একটি কেন্দ্রীয় কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে, যাতে চামড়ার অর্থ সঠিকভাবে সমাজের দরিদ্র অংশে পৌঁছে। সঠিক নীতি, সুশাসন ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প আবারো বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের শক্তিশালী খাতে পরিণত হতে পারে।

কোরবানি ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের অংশ। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এর লক্ষ্য। হজরত ইবরাহিম আ:-এর আত্মত্যাগ ও আনুগত্যের অনন্য দৃষ্টান্তের স্মরণে মুসলমানরা এই ইবাদত করেন। তবে কোরবানি কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সাথে জড়িয়ে আছে সামাজিক ন্যায়বিচার, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং অর্থনৈতিক কল্যাণের বিষয়ও। বিশেষত কোরবানির পশুর চামড়া এক মূল্যবান সম্পদ। ইসলামে এই সম্পদ সমাজের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের নির্দেশনা রয়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোরবানির চামড়া একটি বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনার উৎস। দেশে প্রতি বছর প্রায় ৯০ লাখ থেকে এক কোটি পশু কোরবানি হয়, যার অর্ধেকেরও বেশি গরু। ইসলামের সামাজিক ন্যায্যতার উদ্দেশ্য অনুযায়ী এই বিপুল সম্পদ দরিদ্রদের মধ্যে প্রবাহিত হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে এর বড় অংশ ব্যবস্থাগত দুর্বলতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই বিপুল কাঁচা চামড়ার সম্ভাব্য বাজারমূল্য কয়েক হাজার কোটি টাকা। সঠিক ব্যবস্থাপনায় এই খাত থেকে বছরে চার হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করা সম্ভব এবং প্রক্রিয়াজাত শিল্পের মাধ্যমে তা আরো বাড়তে পারে; কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বাস্তবে এটি সঙ্কটে পরিণত হয়েছে।

গত এক দশকে কাঁচা চামড়ার দামে অস্বাভাবিক পতন দেখা গেছে। ২০১৫ সালে যেখানে একটি গরুর চামড়ার দাম ছিল গড়ে এক হাজার ২০০ থেকে দেড় হাজার টাকা, সেখানে ২০২৪-২৫ সালে তা অনেক ক্ষেত্রে নেমে ১০০ থেকে ২০০ টাকায় দাঁড়ায়। একই সময়ে গরুর দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। এই বৈপরীত্য বাজারব্যবস্থার গভীর সঙ্কট নির্দেশ করে। অনেক স্থানে কোরবানির চামড়া বিক্রি না হওয়ায় তা পচে গেছে বা বিনামূল্যে দিয়ে দিতে হয়েছে। তুরস্ক, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের মতো দেশে কোরবানির চামড়ার দাম তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। এসব দেশে চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুসংগঠিত ব্যবস্থায় পরিচালিত হয়। কোথাও ওয়াক্ফ ব্যবস্থা, কোথাও সরকার নিয়ন্ত্রিত সংস্থা, আবার কোথাও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে। ফলে অপচয় কম হয় এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হয়।

বাংলাদেশে এমন ব্যবস্থা নেই। চামড়া সংগ্রহপ্রক্রিয়া অগোছালো ও বিচ্ছিন্ন, যেখানে ব্যক্তি উদ্যোগ ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভরতা বেশি। সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাব, বিশেষ করে লবণ প্রয়োগ, দ্রুত পরিবহন ও কোল্ডস্টোরেজ সুবিধার ঘাটতির কারণে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, সঠিকভাবে সংরক্ষণ না হওয়ায় প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ চামড়া ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

কোরবানির চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের দুর্বলতাও বড় সমস্যা। দেশে ট্যানারি শিল্প থাকলেও তা এখনো পুরোপুরি আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনায় উন্নীত হয়নি। সাভারে চামড়া শিল্পনগরীতে স্থানান্তরের পরও অনেক কারখানায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষিত জনবলের ঘাটতি রয়েছে। ফলে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের হার মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশে সীমিত, যেখানে উন্নত দেশে এটি ৭০ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত। এই সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের চামড়াশিল্পকে মূলত কাঁচা বা আধা-প্রক্রিয়াজাত রফতানির ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে, যার বাজারমূল্য তুলনামূলকভাবে কম।

বাংলাদেশের চামড়াশিল্প একসময় ছিল তৈরী পোশাক খাতের পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি খাত। অথচ আজ এটি জটিল ও বহুমাত্রিক সঙ্কটকাল অতিক্রম করছে। প্রতি বছর দেশে আনুমানিক ১৮-২০ কোটি বর্গফুট কাঁচা চামড়া উৎপাদিত হয়, যার প্রায় ৫০-৬০ শতাংশই আসে কোরবানির ঈদে। এত বিপুল কাঁচামালের জোগান থাকা সত্ত্বেও মৌসুমে চামড়ার দাম অনেক ক্ষেত্রে সংগ্রহ ব্যয়ের নিচে নেমে যায়- যা বাজার কাঠামোর গভীর দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। একই সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে বিপুল চামড়াজাত পণ্য, বিশেষত সিন্থেটিক জুতা ও উপকরণ আমদানি করতে হচ্ছে, যা এই খাতের অদক্ষতা ও ভ্যালু অ্যাডিশনের ঘাটতির একটি স্পষ্ট প্রতিফলন।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাত থেকে রফতানি আয় প্রায় ১৪০ কোটি ডলারে পৌঁছালেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা ১০০ থেকে ১২০ কোটি ডলারে নেমেছে। বিপরীতে চীন, ভারত, ব্রাজিল ও অস্ট্রেলিয়া থেকে কাঁচা চামড়া, ফিনিশড লেদার ও সিন্থেটিক পণ্যের আমদানি বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ চামড়াজাত পণ্য আমদানি হয়। এই বৈপরীত্যের অন্যতম প্রধান কারণ আন্তর্জাতিক মান ও সনদ প্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা। বৈশ্বিক বাজারে বড় ক্রেতারা এখন Leather Working Group (LWG) সনদকে পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করে; কিন্তু সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীতে স্থাপিত কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (CETP) এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় কার্যকর হয়নি। অধিকাংশ ট্যানারি পরিবেশগত আন্তর্জাতিক মান পূরণ করতে পারছে না। এর ফলে উচ্চমূল্যের ইউরোপীয় ও আমেরিকান বাজারে প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং দেশ বছরে কয়েক শ’ মিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য রফতানি আয় হারাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। কোরবানির সময় হঠাৎ বিপুল কাঁচা চামড়া বাজারে এলেও পর্যাপ্ত লবণ সংরক্ষণ, গুদামজাতকরণ ও কোল্ড চেইন অবকাঠামোর অভাবে চামড়া দ্রুত নষ্ট হতে শুরু করে। এই পরিস্থিতিতে মধ্যস্বত্বভোগী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর আধিপত্য থেকে গেছে, যা বাজার প্রতিযোগিতাকে বিকৃত করে।

তৃতীয়ত, হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর পরিবেশগতভাবে প্রয়োজনীয় হলেও পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ঘাটতির কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে এবং অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারেননি। এ শিল্পের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা কমেছে। চতুর্থত, বৈশ্বিক বাজারে সিন্থেটিক বিকল্পের উত্থানও বড় চ্যালেঞ্জ। কম দাম, দ্রুত উৎপাদন এবং পরিবেশগত দাবি পূরণের কারণে সিন্থেটিক ফুটওয়্যার বিশ্ববাজারে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম প্রযুক্তিগত অভিযোজনের মাধ্যমে বছরে ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রফতানি আয় করছে- যা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

তবে এই সঙ্কটের মধ্যেও সম্ভাবনা অম্লান। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, সঠিক নীতি, প্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে চামড়াশিল্পে দ্রুত অগ্রগতি সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, ইতালি উচ্চমানের ফিনিশড লেদার ও বিলাসবহুল পণ্যের মাধ্যমে কম কাঁচামাল ব্যবহার করেও বিপুল রফতানি আয় করে। চীন স্কেল ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে আধিপত্য বজায় রেখেছে, আর ভারত ক্লাস্টারভিত্তিক উন্নয়ন, স্কিল ট্রেনিং ও পরিবেশবান্ধব ট্যানারি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বছরে পাঁচ থেকে ছয় বিলিয়ন ডলার রফতানি আয় নিশ্চিত করছে।

এই অভিজ্ঞতাগুলো কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ সেমি-প্রসেসড চামড়া রফতানির পরিবর্তে ফিনিশড লেদার, ব্র্যান্ডেড জুতা, ব্যাগ ও অন্যান্য লেদার গুডস উৎপাদনে জোর দিলে প্রতি ইউনিট চামড়া থেকে আয় তিন থেকে পাঁচগুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে ২০৩০ সালের মধ্যে এই খাত থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলার বা তারও বেশি রফতানি আয় অর্জন একটি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে।

এ জন্য কয়েকটি কাঠামোগত সংস্কার অত্যাবশ্যক। প্রথমত, সাভার শিল্পনগরী পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কাঁচা চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, যেমন- ইউনিয়ন পর্যায়ে লবণ সরবরাহ, আঞ্চলিক সংরক্ষণকেন্দ্র এবং ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস প্রবর্তন করতে হবে। তৃতীয়ত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ, প্রযুক্তি আপগ্রেডে ভর্তুকি এবং রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠানের জন্য কর-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়িয়ে উচ্চমূল্যের বাজারে প্রবেশের কৌশল নিতে হবে। পঞ্চমত, বাজার তদারকি জোরদার করে সিন্ডিকেট ভাঙা এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন অপরিহার্য- বিশেষ করে ট্যানিং প্রযুক্তি, ডিজাইন ও ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে।

গ্রামাঞ্চলে দক্ষ কর্মীর অভাব এবং সঠিকভাবে চামড়া ছাড়ানোর অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণে ক্ষত ও কাটাছেঁড়া তৈরি হয়, যা পরবর্তী প্রক্রিয়াজাতকরণে বড় বাধা সৃষ্টি করে। এসব সমস্যার ফলে চামড়ার মান কমে যায় এবং বাজারমূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের চামড়ার অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে।

২০১৭ সালের পর চীন, ইতালি ও ভিয়েতনামের মতো প্রধান বাজারে রফতানি কমেছে। এর কারণ মান নিয়ন্ত্রণের অভাব, পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থতা এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার। অভ্যন্তরীণ বাজারেও সিন্থেটিক পণ্যের ওপর নির্ভরতা বাড়ায় দেশীয় চামড়ার ব্যবহার কমছে। পাশাপাশি সিন্ডিকেট ও বাজার নিয়ন্ত্রণের কারণে কোরবানির সময় কৃত্রিমভাবে দাম কমিয়ে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে, ফলে সংগ্রাহক ও দানকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। এই সঙ্কটের প্রভাব সামাজিক খাতেও পড়ছে। বহু মাদরাসা, এতিমখানা ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান চামড়া বিক্রির আয় দিয়ে পরিচালিত হয়। দাম পতনের কারণে তারা আর্থিক সঙ্কটে পড়েছে, যা শিক্ষা ও সামাজিক সেবাকে ব্যাহত করছে। এটি উদ্বেগজনক, কারণ কোরবানির চামড়া মূলত গরিব ও দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের হক। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় একটি সমন্বিত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা প্রয়োজন। সরকার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।

চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে আধুনিক প্রযুক্তি, ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং দক্ষতা উন্নয়ন জরুরি। একই সাথে ওয়াক্ফভিত্তিক একটি কেন্দ্রীয় কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে, যাতে চামড়ার অর্থ সঠিকভাবে সমাজের দরিদ্র অংশে পৌঁছে। সঠিক নীতি, সুশাসন ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প আবারো বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের শক্তিশালী খাতে পরিণত হতে পারে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

[email protected]