মিয়া গোলাম পরওয়ার
(প্রথম কিস্তি)
আজ পয়লা মে। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক আন্দোলন-সংগ্রামের প্রতীকী দিবস। শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে পয়লা মে একটি অনন্য গৌরবময় দিন। আজ থেকে ১৩১ বছর আগে ১৮৮৬ সালের পয়লা মে আমেরিকার শিকাগো শহরে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শ্রমজীবী মানুষের আট কর্মঘণ্টার দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় মেহনতী মানুষের বহু ন্যায্য অধিকারের দাবি আজও দুনিয়ার দেশে দেশে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়। আমেরিকার শিকাগো থেকে শুরু করে দেশে দেশে মেহনতী মানুষের অধিকারের দাবিতে আত্মদান যেন তাদের অধিকারের পক্ষে মূর্ত আর্তনাদ।
এ কথা কে না বিশ্বাস করবেন, আধুনিক বিশ্বের শিল্প, অর্থনীতি ও সভ্যতার বিকাশের সাথে মিশে আছে শ্রমজীবী মানুষের রক্ত আর ঘাম। হাড়ভাঙা পরিশ্রমের বিনিময়ে গড়ে উঠেছে গগনচুম্বী প্রাসাদ আর অট্টালিকার সারি। অর্থনীতির চাকা ঘুরছে মেহনতী মানুষের রক্ত পানি করা শ্রমশক্তির ওপরে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শিল্পবিপ্লব তথা সভ্যতার বিকাশের সূচনা পর্বে শ্রমিকের অধিকার বলতে তেমন কিছু ছিল না। না ছিল ন্যায়সঙ্গত মজুরি, না ছিল নির্ধারিত কোনো কর্মঘণ্টার সীমানা। শ্রমক্ষেত্রে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করানো হতো। প্রাচীন মিসরের শ্রমদাসদের চেয়েও তাদের অবস্থা শোচনীয় ছিল। শোষণ, বঞ্চনা, অত্যাচার ও নির্যাতন যখন অসহনীয় পর্যায়ে চলে যায়, তখন শোষিত, বঞ্চিত, নির্যাতিত শ্রমিকসমাজ তা রুখে দিতে বাধ্য হয়। মে দিবস মূলত এমন প্রেক্ষাপটের সৃষ্টি।
ট্রেড ইউনিয়ন
পয়লা মে বিশেষ এক দিনের কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং সুদীর্ঘ শতাব্দী ধরে ঘটে আসা বঞ্চনা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে শ্রমিক আন্দোলনের পরিপূর্ণ বিকাশ। এক দিকে দুনিয়াব্যাপী শ্রমজীবীদের অধিকারের জন্য সংগ্রাম যেমন ছড়িয়ে পড়তে থাকে; তেমনি শিল্পবিপ্লব তথা সভ্যতার বিকাশে শ্রমিকশ্রেণীর অবদান ও গুরুত্ব ধীরে ধীরে স্বীকৃতি পায়। শ্রমিক সমস্যা, তাদের অধিকার তথা শিল্পশ্রমিক নিয়ে দেশে দেশে শুরু হয় মূল্যায়ন, নীতি নির্ধারণ ও আইনপ্রণয়ন। রাষ্ট্র, সরকার তথা আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক গুরুত্ব পেতে থাকে শিল্পশ্রমিক প্রসঙ্গ। পর্যায়ক্রমে শ্রম ও শ্রমিক বিষয়ে তৈরি হয় শ্রম আইন। গড়ে ওঠে শ্রম আদালত, শ্রম দফতর, শ্রম মন্ত্রণালয়। প্রতিষ্ঠা পায় ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাজেশন (আইএলও) বা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা। তৈরি হয় শ্রমিক অধিকারসংবলিত আইএলও কনভেনশন, যা দেশে দেশে পর্যায়ক্রমে গৃহীত ও প্রতিপালন হতে থাকে। বদলে যায় ‘শ্রমিক’ শব্দটির আইনগত অর্থ ও ব্যাখ্যা।

শাব্দিক অর্থে যদিও ‘শ্রমিক’ অর্থ ‘যিনি শ্রম দেন বা কায়িক পরিশ্রম করেন তিনি’। কিন্তু আইনগতভাবে শ্রমিক শব্দের অর্থ দাঁড়ায় ‘অর্থের বিনিময়ে কায়িক শ্রম বিক্রয় করেন যিনি’। সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের দ্বান্দ্বিক যাত্রাপথে এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব পরিস্থিতিতে মুক্ত বাজার অর্থনীতির দিকে ধাবিত হতে থাকে ‘শিল্প ও শ্রমিক’। কর্মস্থলে শ্রমিকের সুরক্ষা এবং দরকষাকষির প্রয়োজনে সময়ের দাবি অনুযায়ী ট্রেড ইউনিয়ন আইন প্রতিষ্ঠা পায়। এক দিকে ট্রেড ইউনিয়নকে সমাজতান্ত্রিক ব্যাখ্যায় স্কুল অব কমিউনিজম হিসেবে গ্রহণ করে ধনতন্ত্র বা পুঁজিবাদ বিলুপ্ত করে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে শ্রমিকরাজ তথা শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার ধারণা দেয়া হতে থাকে। অন্য দিকে মুক্ত বিশ্বে (ফ্রি ওয়ার্ল্ড) ট্রেড ইউনিয়নের সংজ্ঞা হলো- ‘শ্রমিকদের, শ্রমিকদের দ্বারা, শ্রমিকদের জন্য, স্বেচ্ছাসৃষ্ট এক ধারাবাহিক স্থায়ী ও গণতান্ত্রিক সংগঠন।’ এ ব্যাখ্যা মোতাবেক ট্রেড ইউনিয়নের উদ্দেশ্য হলো কর্মস্থলে নিজেদের রক্ষা করা, যৌথ দরকষাকষির মাধ্যমে নিজেদের কাজের শর্তাবলির উন্নতি সাধন করা, নিজের জীবনের মান উন্নততর করে তোলা, স্বাভাবিক ও মৌলিক অধিকারগুলো রক্ষা করা, সামাজিক-রাজনৈতিক সমস্যা সম্পর্কে শ্রমিকদের মতামত প্রকাশের উদ্দেশ্যে উপযুক্ত উপায় নির্ধারণ করা।
অভিধানে ট্রেড ইউনিয়নের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘ট্রেড ইউনিয়ন মিনস ইউনিয়ন অ্যামং দ্য মেন অব দ্য সেম ট্রেড টু মেইনটেইন দেয়ার রাইটস। অর্থাৎ, নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠিত একই পেশার লোকদের সঙ্ঘ।
ট্রেড ইউনিয়ন বলতে প্রধানত শ্রমিকের সাথে মালিকের অথবা শ্রমিকের সাথে শ্রমিকের অথবা মালিকের সাথে মালিকের সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে অথবা কোনো বাণিজ্য কিংবা ব্যবসায় পরিচালনার ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক শর্ত আরোপে গঠিত শ্রমিকদের অথবা মালিকের কোনো সঙ্ঘ বুঝাবে। এ সংজ্ঞার আলোকে- ট্রেড ইউনিয়নের কাজ তিনটি- ১. একই পেশার লোকের অধিকার আদায়; ২. সম্পর্ক বজায় রাখা; ৩. আচরণের ওপর শর্তরোপ করা, আচরণবিধি আরোপ করা। ওই সংজ্ঞায় এটিও জানা যায়, শ্রমিক কর্মচারীরাও ইউনিয়ন বা সঙ্ঘ, সমিতি বা দল গড়তে পারেন। আবার মালিক কর্তৃপক্ষও সঙ্ঘ, সমিতি বা দল করতে পারেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৯ সালের ১১ এপ্রিল আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) গঠিত হয় ভার্সাই চুক্তির ফলে লিগ অব নেশন্সের অঙ্গ-সংগঠন হিসেবে। এটি ১৯৪৬ সালে জাতিসঙ্ঘের স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি পায়। বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে আইএলও সদস্যপদ লাভ করে। ১৯৭৩ সালের ২৫ জুন আইএলও ঢাকা অফিসের কার্যক্রম শুরু করে। শ্রম অধিকার প্রতিষ্ঠায় আইএলওর মোট ১৮৯টি কনভেনশন আছে, যার মধ্যে থেকে বাংলাদেশ এই পর্যন্ত ৩৫টি কনভেনশন অনুসমর্থন করেছে এবং তা কার্যকর আছে।
বাংলাদেশে ১৯৬৫ সালে শ্রমিক নিয়োগ স্থায়ী আদেশ (এমপ্লয়মেন্ট অব লেবার অ্যাক্ট স্ট্যান্ডিং অর্ডার ১৯৬৫) আইন হয়। ১৯৬৯ সালে শিল্প সম্পর্ক অধ্যাদেশ (ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশন অর্ডিন্যান্স ১৯৬৯) হয়, যার ভিত্তিতে ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম চলছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা প্রায় আট হাজার। মালিক সমিতি প্রায় এক হাজার। সেই সাথে জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন সংখ্যা ৩৭টি। অন্তর্ভুক্ত ইউনিয়ন সংখ্যা প্রায় দুই হাজার, যার সদস্য সংখ্যা আনুমানিক ১২ লাখ।
বর্তমানে ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা ও উন্নয়ন ধারণাও যুক্ত হয়েছে। এ লক্ষ্যে আইন অনুযায়ী সিবিএ (কালেক্টিভ বার্গেনিং এজেন্ট) সম্মিলিত দরকষাকষি এজেন্ট শ্রমিক প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে। শ্রমিক, মালিক ও সরকার টিটিসি (ট্রাইপারটিট কনসালটেটিভ কমিটি) বা ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদও কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে; কিন্তু বেদনার বিষয় হলো, এত পরিকল্পনা, আইন ও উদ্যোগের পরও শ্রমিকসমাজ আজও উপেক্ষিত। অধিকার বঞ্চিত। আইন আছে; কিন্তু তার যথাযথ প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদে সমিতি বা সঙ্ঘ করার যে অধিকার দেয়া হয়েছে, তার অধীনে ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার স্বীকৃত। জাতিসঙ্ঘ ঘোষিত সর্বজনীন মানবাধিকার দলিলে ২৩ (৪) অনুচ্ছেদে এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থায় (আইএলও) ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের অধিকার দেয়া হয়েছে। অথচ এত সব অধিকার ও আইন থাকা সত্ত্বেও শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্যের আজও বদল হয়নি; বরং একশ্রেণীর সুবিধাভোগী শক্তি শ্রমিকদের সংবেদনশীল স্বার্থগুলো মাধ্যম হিসেবে কাজে লাগিয়ে মুখরোচক স্লোগান ব্যবহার করে শ্রমিকসমাজকে ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করছে। বিশেষ করে সাম্রাজ্যবাদী, সমাজতন্ত্রী এবং ধর্মনিরপেক্ষতাবাধী নেতৃত্ব নিজেদের হীনস্বার্থে শ্রমিকদের ব্যবহার করে শুধু তাদের কপাল বদলিয়েছে; কিন্তু শ্রমিকদের কপালে দুঃখ-কষ্টের আগুন আজও দাউ দাউ করে জ্বলছে।
মহানবীর আদর্শই শ্রমিকের প্রকৃত মুক্তির পথ
এক দিকে শ্রমিক আন্দোলনের নামে যেমন শুধু অধিকারের ফাঁকা আওয়াজ তুলে প্রতারিত করা হয়েছে শ্রমিকসমাজকে। তাদের কর্তব্য, দক্ষতা, নৈতিক শিক্ষার বিষয়টি উপেক্ষা করে কখনো উৎপাদনশীলতা, অর্থনীতি ও সমাজের শান্তি স্থিতিশীলতাও হুমকিতে ঠেলে দেয়া হয়েছে। অন্য দিকে মালিক-শ্রমিক সুসম্পর্ক, ভ্রাতৃত্ববোধ, সমঝোতা ও দেশপ্রেম হীনস্বার্থে ধ্বংস করা হয়েছে। অধিকারের পাশাপাশি কর্তব্য ও দায়িত্বের উপলব্ধি তথা মূল্যবোধ জাগ্রত করাও যে নেতৃত্বের কাজ, সেসব বেশির ভাগ সময় তারা বেমালুম ভুলে থেকেছেন। বস্তুত ট্রেড ইউনিয়ন, প্রচলিত শ্রমনীতি, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা- ইত্যাদি সম্পর্কেও বলতে গেলে শ্রমিকসমাজ অন্ধকারে রয়ে গেছে। এমনকি মানবতার আদর্শ মহানবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা: প্রদর্শিত ইসলামী শ্রমনীতির শাশ্বত বিধান সম্পর্কেও শ্রমিক সমাজকে জানতে দেয়া হয়নি। তার কোনো সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ প্রচেষ্টা আজও দৃশ্যমান নয়। (চলবে)
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য, সেক্রেটারি জেনারেল, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী



