খাদ্য নিরাপত্তা

২০৫০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক খাদ্যের চাহিদা ৬০ শতাংশ বাড়ার সম্ভাবনা। বাংলাদেশের খাদ্য চাহিদাও সমতালে বাড়বে। এই বাড়তি চাহিদার জোগান দিতে খাদ্য উৎপাদন বর্তমানের দ্বিগুণ করার বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে আমদানি-নির্ভর হলে সমূহ বিপত্তি দেখা দেবে। এ জন্য বালাই প্রতিরোধী, উচ্চ ফলনশীলন ফসলের জাত উদ্ভাবনে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন।

স্বাধীনতার পর তলাবিহীন ঝুড়ির তকমা পেয়েছিল বাংলাদেশ। সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছে উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তির পরিচয়ে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, শিল্পায়ন- সব ক্ষেত্রেই এগিয়েছে এ দেশ। স্বাধীনতার পর খাদ্যাভাবে বেওয়ারিশ লাশের সারি থেকে বেরিয়ে এসে এখন পৃথিবীর অন্যতম শীর্ষ ধান উৎপাদনকারী দেশ। উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতি, কৃষির যান্ত্রিকীকরণ, উন্নত বীজ, সার, সেচ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন এক ফসলি থেকে তিন ফসলি জমিতে রূপান্তর ঘটিয়ে মিশ্র চাষের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদনে এখন বিশ্বের সামনের সারিতে। মঙ্গা এখন হিমঘরে। না খেয়ে মরার সংবাদ মিউজিয়ামে। দুর্ভিক্ষ, খাদ্যসহায়তার যে চ্যালেঞ্জ ছিল আজ তা অপসৃত। এর পরেও খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো ঝুঁকিমুক্ত হতে পারেনি। পারেনি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।

সত্য যে, আমাদের খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে বহুগুণে, বেড়েছে মাছ ও সবজি উৎপাদন। কিন্তু নিশ্চিত হয়নি খাদ্য নিরাপত্তা। আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা, পরিবেশ বিপর্যয়, সার এবং বীজের সিন্ডিকেট, সেচের পানি ও বিদ্যুৎ প্রাপ্তির অনিশ্চয়তা- সব মিলিয়ে কৃষিজ উৎপাদনের অনিশ্চিত পরিপ্রেক্ষিত তৈরি করেছে। এ বছর আগাম বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও সিলেটের হাওর অঞ্চলের তলিয়ে যাওয়া ফসলের কারণে লাখ লাখ পরিবার শুধু খাদ্য সংস্থান নয়; বার্ষিক সংসার ব্যয়ের চাপে দিশেহারা। চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে সরকারের খাদ্য সংগ্রহ কর্মসূচিও। মাত্র ক’বছর আগেও বিশেষ করে বরেন্দ্র ও উত্তরাঞ্চলের আমন-পরবর্তী গমের ক্ষেত খাদ্য নিরাপত্তার উৎস হিসেবে কাজ করেছে। সঠিক মূল্য না পাওয়ায় গমের চাষ প্রায় বিলুপ্তির পথে। বিকল্প হিসেবে ভুট্টার আবাদ এখন বেড়েছে। এর আবাদও আবহাওয়ার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। এ বছর রমজানের শেষের দিকে দেশব্যাপী ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভুট্টার চাষ। ক্ষেতে পানি জমে যাওয়ায় আলু, পেঁয়াজ ও রসুনের ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ সবের পরিপ্রেক্ষিতে কৃষক এখন কৃষির পরিবর্তে অন্য পেশায় ঝুঁকছেন। একই সাথে গ্রামকেন্দ্রিক নগরায়ণ প্রক্রিয়ায় প্রতি বছর প্রায় ৬৮ হাজার থেকে ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমি অকৃষি খাতে রূপান্তরিত হচ্ছে। অন্য দিকে বাড়ছে জনসংখ্যা, বাড়ছে বাড়তি খাদ্যের চাহিদা। এর ফলে খাদ্য নিরাপত্তার সাথে সাথে ক্রমশই পুষ্টি নিরাপত্তাও হুমকির মুখে। ক্রমবর্ধমান খর্বকায় শিশু এবং মহিলাদের রক্তস্বল্পতার সংখ্যা এর প্রমাণ।

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খাদ্য সংগ্রহ, সুষ্ঠু সংরক্ষণ এবং বিপণনের গুরুত্ব অপরিসীম। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী, কিছু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর কারসাজিতে এই ব্যবস্থাও প্রশ্নবিদ্ধ। প্রশ্নবিদ্ধ সরকারি তথ্য-উপাত্ত। এসব কারণে খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি এবং সরকারের খাদ্য সংগ্রহ বিপত্তির মুখে পড়ে। বিদ্যমান অবস্থায় খাদ্য নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিপণনের নিশ্চিত টেকসই পদ্ধতি। প্রয়োজন বহুমুখী ফসলের চাষাবাদ। ইদানীং বন্যা-সহনীয় ধানের কথা শোনা যাচ্ছে। এ ধরনের আবহাওয়া-সহিষ্ণুু ফসলের গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। অপ্রয়োজনীয় শৌখিন ফল আমদানি না করে সেই অর্থ এ খাতে বিনিয়োগ করার কথা ভাবা যেতে পারে। শোনা যায়, শুধু শৌখিন ফল আমদানির ব্যয় প্রায় ৪০০ মিলিয়ন আমেরিকান ডলারের কাছাকাছি। টাকায় যা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। এ অর্থের বেশির ভাগ ব্যয় হয় আপেল, মাল্টা ও খেজুর আমদানিতে। এখান থেকে পরিকল্পিতভাবে অর্থ সাশ্রয় করে কৃষি গবেষণা এবং উদ্ভাবনে বিনিয়োগ করা হলে ভবিষ্যতে জাতি উপকৃত হবে। এ অর্থ বিনিয়োগ করা যেতে পারে কৃষকদের প্রশিক্ষণে।

খাদ্য নিরাপত্তা শুধু খাদ্যশস্যের প্রচুর উপাদন নয়; এটি খাদ্যের সহজলভ্যতা, পুষ্টিসহ সামাজিক অর্থনৈতিক এবং আবহাওয়ার সাথেও সম্পৃক্ত। এ ব্যাপারে কৃষকদের প্রশিক্ষিত করতে পারলে ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার ব্যাপারে স্বস্তিকর অবস্থা সৃষ্টি হবে। যা পৃথিবীর ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো সামলে নেয়ার ক্ষেত্রে গৌরবময় অবদান রাখতে পারে। এ ব্যাপারে প্রয়োজন কৃষকদের আপৎকালীন সহায়তা, উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্যের নিশ্চয়তা। উচ্চ ফলনশীল ফসলের জাত সম্পর্কে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও উদ্বুদ্ধকরণের পাশাপাশি দরকার ন্যায্যমূল্যে বীজ ও সার সরবরাহের নিশ্চয়তা এবং বহুমুখী শস্য আবাদের কর্মসূচির বাস্তবায়ন। গ্রামীণ পর্যায়ে শস্য সংরক্ষণের পদ্ধতি সম্পর্কে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেয়াও প্রয়োজন।

২০৫০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক খাদ্যের চাহিদা ৬০ শতাংশ বাড়ার সম্ভাবনা। বাংলাদেশের খাদ্য চাহিদাও সমতালে বাড়বে। এই বাড়তি চাহিদার জোগান দিতে খাদ্য উৎপাদন বর্তমানের দ্বিগুণ করার বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে আমদানি-নির্ভর হলে সমূহ বিপত্তি দেখা দেবে। এ জন্য বালাই প্রতিরোধী, উচ্চ ফলনশীলন ফসলের জাত উদ্ভাবনে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন।

প্রসঙ্গত, রোগ-বালাই ও পোকামাড়কের আক্রমণে দেশে প্রায় ৪০ শতাংশ ফসল নষ্ট হয়। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন পোকামাকড়ের জিনোমিক বৈশিষ্ট্য ও প্রতিরোধ ক্ষমতা বিশ্লেষণ করে প্রতিরোধী ব্যবস্থা গ্রহণ খাদ্য নিরাপত্তাকে আরো বেগবান করবে। টেকসই খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টির মান নিশ্চিত করতে কৃষি ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও উদ্ভাবনী গবেষণায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ দরকার। সাথে সাথে বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থার বাস্তবায়ন খাদ্য নিরাপত্তাকে গতিশীল করবে নিঃসন্দেহে।

লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ

[email protected]