নতুন করে খাল খনন কর্মসূচি

খাল খনন কর্মসূচি একটি দ্বিমুখী বাস্তবতা বহন করে— এটি যেমন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে, তেমনি ব্যর্থ হলে এটি একটি বড় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ইতিহাসের অভিজ্ঞতা, বর্তমানের বাস্তবতা এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ— এই তিনটি বিষয়কে একত্রে বিবেচনা করেই এই কর্মসূচির সফলতা নির্ধারিত হবে।

বাংলাদেশের উন্নয়ন-রাজনীতিতে খাল খনন একটি পরিচিত শব্দ; কিন্তু এর তাৎপর্য শুধু অবকাঠামোগত নয়— এটি একটি রাজনৈতিক দর্শন, অর্থনৈতিক কৌশল ও পরিবেশগত বাস্তবতার সম্মিলন। ইতিহাসে ফিরে তাকালে দেখা যায়, জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচির মাধ্যমে খাল খনন শুধু একটি প্রকল্প ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রের কৃষিভিত্তিক পুনর্গঠনের একটি কৌশল। সেই সময়ের বাস্তবতায় খাল খনন খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় অর্থনীতির পুনর্জাগরণে কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল।

বর্তমানে তারেক রহমানের নেতৃত্বে দিনাজপুরের কাহারোলে খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন সেই ঐতিহাসিক ধারার পুনরাবৃত্তি হলেও, এর পেছনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এটি কেবল উন্নয়ন প্রকল্প নয়; বরং একটি রাজনৈতিক বার্তা— গ্রাম, কৃষক এবং উৎপাদনমুখী অর্থনীতিকে আবার কেন্দ্রস্থলে আনার চেষ্টা।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো— ‘জনগণই ক্ষমতার উৎস’ এই ধারণা পুনর্ব্যক্ত করা। উন্নয়নকে তিনি সরাসরি জনগণের অংশগ্রহণের সাথে যুক্ত করেছেন। কিন্তু এখানে একটি বাস্তব প্রশ্ন উঠে আসে— বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে জনগণের অংশগ্রহণ কতটা কার্যকরভাবে নিশ্চিত হয়? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, পরিকল্পনা হয় কেন্দ্র থেকে, বাস্তবায়ন হয় আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর মাধ্যমে, আর জনগণ থাকে সুবিধাভোগীর ভূমিকায়। এই কাঠামো পরিবর্তন না হলে খাল খনন কর্মসূচিও একই সীমাবদ্ধতার মধ্যে আটকে যেতে পারে।

অর্থনৈতিক দিক থেকে এই কর্মসূচির সম্ভাবনা বিশাল। ১২ কিলোমিটার খাল খননের মাধ্যমে ৩১ হাজার কৃষকের সেচসুবিধা, এক হাজার ২০০ হেক্টর জমির আওতা বৃদ্ধি এবং ৬০ হাজার মেট্রিক টন অতিরিক্ত উৎপাদনের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়ন হলে স্থানীয় অর্থনীতিতে বহুগুণ প্রভাব পড়বে। কৃষি উৎপাদন বাড়লে খাদ্যনিরাপত্তা যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি গ্রামীণ বাজারে নগদ প্রবাহও বাড়বে।

তবে অর্থনীতির আরেকটি দিকও বিবেচনায় নিতে হবে— এ ধরনের প্রকল্পের ব্যয়-সাশ্রয়িতা। খাল খনন একটি ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া এবং এর রক্ষণাবেক্ষণ আরো বেশি ব্যয়বহুল। যদি খালগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করা হয়, যদি দখলমুক্ত রাখা না যায়, তাহলে কয়েক বছরের মধ্যেই এই বিনিয়োগ অকার্যকর হয়ে পড়বে। অতীতে বহু প্রকল্পে এই চিত্রই দেখা গেছে।

এখানে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমানের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যে দুর্নীতির প্রশ্ন তুলেছেন, তা অমূলক নয়। নদী শাসন, ড্রেজিং ও জলাধার সংস্কারের নামে অতীতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও তার দৃশ্যমান সুফল সীমিত। ফলে নতুন করে খাল খনন কর্মসূচি গ্রহণ করা মানেই পুরনো ভুলগুলো পুনরাবৃত্তি করার ঝুঁকি তৈরি হওয়া।

পরিবেশগত দিক থেকেও এই কর্মসূচির গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশ বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। বর্ষায় অতিরিক্ত পানি এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির সঙ্কট— এই দুই চরম পরিস্থিতি মোকাবেলায় খাল খনন একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। যদি উজান থেকে আসা পানি সংরক্ষণ করা যায় এবং তা সঠিকভাবে বিতরণ করা যায়, তাহলে কৃষি উৎপাদনে স্থিতিশীলতা আসবে।

কিন্তু এখানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো— বাংলাদেশের নদী ও খাল ব্যবস্থার আন্তঃসংযোগ ভেঙে পড়া। অনেক খালই এখন বিচ্ছিন্ন, অনেক নদী নাব্যতা হারিয়েছে। ফলে শুধু খাল খনন করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না, যদি না এটি একটি সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনার অংশ হয়।

রাজনৈতিকভাবে এই কর্মসূচি একটি বড় পরীক্ষা। কারণ এটি সরাসরি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সাথে সরকারের সম্পর্ককে প্রভাবিত করবে। যদি প্রকল্প সফল হয়, তাহলে এটি সরকারের প্রতি আস্থা বাড়াবে; আর যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে এটি রাজনৈতিকভাবে বিপরীত ফল বয়ে আনতে পারে।

এ ছাড়া এই কর্মসূচি একটি নতুন রাজনৈতিক ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টা হিসেবেও দেখা যেতে পারে। শহরকেন্দ্রিক উন্নয়ন থেকে সরে এসে গ্রামকেন্দ্রিক উন্নয়নের দিকে ঝোঁক— এটি একটি কৌশলগত পরিবর্তন। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে এখনো বড় একটি জনগোষ্ঠী গ্রামে বসবাস করে, সেখানে এ ধরনের উদ্যোগ রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— শাসন ব্যবস্থা। একটি প্রকল্প যতই ভালো হোক, যদি তার বাস্তবায়ন দুর্বল হয়, তাহলে তার সুফল পাওয়া যায় না। তাই খাল খনন কর্মসূচির ক্ষেত্রে কিছু মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন—

প্রথমত, প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। স্যাটেলাইট ইমেজিং, জিআইএস ম্যাপিং এবং ডিজিটাল মনিটরিংয়ের মাধ্যমে কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত না করলে এই প্রকল্প টেকসই হবে না।

তৃতীয়ত, পরিবেশগত মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে। খাল খননের ফলে কোনো পরিবেশগত ক্ষতি হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

চতুর্থত, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি প্রকল্পের ব্যয়, অগ্রগতি এবং ফলাফল জনগণের কাছে প্রকাশ করতে হবে।

সবশেষে বলা যায়, খাল খনন কর্মসূচি একটি দ্বিমুখী বাস্তবতা বহন করে— এটি যেমন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে, তেমনি ব্যর্থ হলে এটি একটি বড় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ইতিহাসের অভিজ্ঞতা, বর্তমানের বাস্তবতা এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ— এই তিনটি বিষয়কে একত্রে বিবেচনা করেই এই কর্মসূচির সফলতা নির্ধারিত হবে।

বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— এই উদ্যোগ কি সত্যিই একটি টেকসই উন্নয়ন মডেলে রূপ নেবে, নাকি এটি আরেকটি রাজনৈতিক স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকবে? উত্তর নির্ভর করছে বাস্তবায়নের ওপর।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক