২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সংঘটিত বিডিআর হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সামরিক কাঠামো এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ইতিহাসে এক গভীর ক্ষতচিহ্ন। ‘জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদন’ এই মর্মান্তিক ঘটনার রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, নিরাপত্তা ও গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট দিকগুলো বিশ্লেষণ করে যে চিত্র তুলে ধরেছে, তাতে গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রসঙ্গটিও গুরুত্ব পেয়েছে।
কমিশনের ভাষ্যে, ঘটনাটি কেবল একটি বিদ্রোহ বা প্রশাসনিক অসন্তোষের বিস্ফোরণ ছিল না; বরং এর সাথে ছিল পরিকল্পিত ন্যারেটিভ নির্মাণ, জনমত প্রভাবিত করা এবং দায় এড়ানোর কৌশল। আর এই প্রক্রিয়ায় কিছু গণমাধ্যম প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, সঙ্কটের ৩৬ ঘণ্টাজুড়ে তথ্যপ্রবাহ ছিল একমুখী। তথ্য মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আইএসপিআর কোনো নির্ভরযোগ্য, ধারাবাহিক ও পেশাদার ব্রিফিং দিতে পারেনি। ফলে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া বিদ্রোহীদের পাঠানো চিরকুট, বার্তা ও টেলিফোনিক বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে সংবাদ প্রচার করতে থাকে। এসব চিরকুটে সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ, অশালীন ভাষা ও উসকানিমূলক বক্তব্য ছিল, যা যাচাই ছাড়াই সম্প্রচারিত হয়।
কমিশনের মতে, এতে বিদ্রোহীদের মনোবল বাড়ে এবং জনমনে তাদের প্রতি সহানুভূতি তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
প্রতিবেদনে এটিএন বাংলার নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, চ্যানেলটির মাধ্যমে সরাসরি নিউজরুম থেকে বিদ্রোহীদের সাক্ষাৎকার সম্প্রচার করা হয়। জেড আই মামুন বিদ্রোহীদের বক্তব্য প্রচার করেন, যেখানে সামরিক নেতৃত্বকে খাটো করে বিদ্রোহকে যুক্তিসঙ্গত বা ন্যায়সঙ্গত হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা দেখা যায়। কমিশন এই ধরনের সম্প্রচারকে দায়িত্বজ্ঞানহীন ও প্ররোচনামূলক হিসেবে বিবেচনা করেছে। একইভাবে মুন্নী সাহার নাম উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তার কিছু সাক্ষাৎকার ও প্রশ্ন উপস্থাপনার ভঙ্গি জনমতকে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ঘুরিয়ে দিতে ভূমিকা রেখেছিল। একজন জেসিও’র কন্যার সাক্ষাৎকারে করা প্রশ্নের উদাহরণ টেনে কমিশন বলেছে, এতে ক্ষোভ ও উত্তেজনা বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল।
মনজুরুল আহসান বুলবুলের নামও প্রতিবেদনে এসেছে এবং কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মুন্নী সাহা, মনজুরুল আহসান বুলবুল ও জ ই মামুন ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনা এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যা প্রকৃত ষড়যন্ত্রকারীদের আড়াল করতে সহায়ক হতে পারে।
হত্যাকাণ্ডের পর বর্ণনা নির্মাণের আরেকটি পর্যায় শুরু হয় প্রিন্ট মিডিয়ায়। ২০০৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, ঘটনার অবসানের পরদিন, প্রথম আলোতে প্রকাশিত সম্পাদকীয় ও নিবন্ধে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘রাজনৈতিক সমাধান’ পন্থার প্রশংসা করা হয়। আসিফ নজরুলের একটি লেখায় এমপিদের ভূমিকার প্রশংসা করে এমন মন্তব্য করা হয়েছিল যে হত্যাকারীদের সাথে আলোচনায় যুক্ত সংসদ সদস্যদের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে। কমিশন এই ধরনের বয়ানকে সঙ্কটের প্রকৃত চরিত্র ও দায় নির্ধারণ থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেছে।
১২ মার্চ ২০০৯ দ্য ডেইলি স্টার ‘Terror struck back at its buster’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে নির্দিষ্ট সূত্র ছাড়াই দাবি করা হয় যে ইসলামি জঙ্গিরা বিডিআরে অনুপ্রবেশ করে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
কমিশনের মতে, এই বয়ান প্রকৃত পরিকল্পনাকারীদের আড়াল করার একটি কৌশল হতে পারে এবং পরবর্তীতে ভারতীয় গণমাধ্যম একই তত্ত্বকে সমর্থন করতে ওই প্রতিবেদনকে ব্যবহার করে। এভাবে গণমাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ে, যার অনেকগুলো যাচাইবিহীন ছিল।
কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের নীরবতা ও তথ্য ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা এই পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে। উসকানিমূলক সম্প্রচার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ফলে ঢাকার বাইরের বিডিআর সেক্টরগুলোতেও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপটে কমিশন একটি কেন্দ্রীয় মিডিয়া সমন্বয় সেল গঠনের সুপারিশ করেছে এবং দেশের গণমাধ্যমে পেশাদার কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে।
পিলখানা হত্যাকাণ্ড কেবল সামরিক বিদ্রোহ বা প্রশাসনিক ব্যর্থতার গল্প নয়; এটি রাষ্ট্রীয় তথ্য ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং গণমাধ্যমের নৈতিকতার এক কঠিন পরীক্ষাও বটে। জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন যে প্রশ্নটি সামনে আনে, তা হলো- সঙ্কটমুহূর্তে সংবাদ পরিবেশনের দায়িত্ব কোথায় শেষ হয়, আর কোথায় শুরু হয় জনমত নির্মাণের প্রভাব? মুন্নী সাহা, মনজুরুল আহসান বুলবুল, জ ই মামুন, আসিফ নজরুল কিংবা সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়ে যে সমালোচনা প্রতিবেদনে এসেছে, তা শেষ পর্যন্ত একটি বৃহত্তর আলোচনার দরজা খুলে দেয়। রাষ্ট্র যখন নীরব, তখন গণমাধ্যম কি কেবল শূন্যতা পূরণ করে, নাকি অজান্তেই বা ইচ্ছাকৃতভাবে একটি নির্দিষ্ট বয়ানকে প্রতিষ্ঠিত করে? পিলখানার রক্তাক্ত স্মৃতি আমাদের সামনে সেই অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলোই রেখে যায়।
সাঈফ ইবনে রফিক, কবি ও সাংবাদিক



