শুভ নববর্ষ

বাংলা নববর্ষের সাথে জড়িয়ে আছে প্রকৃতি, কৃষি ও মানুষের জীবনযাত্রার গভীর সম্পর্ক। ভোরের প্রথম সূর্যের আলোয় নতুন বছরের সূচনা-এই ধারণা বাংলা সনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। যেখানে হিজরি সন চাঁদের হিসাব অনুযায়ী সন্ধ্যায় শুরু হয় এবং খ্রিষ্টীয় সন মধ্যরাতে, সেখানে বাংলা সন শুরু হয় সূর্যোদয়ের সাথে। তাই ভোরের শিশিরভেজা বাতাসে, নতুন সূর্যকে বরণ করেই শুরু হয় পহেলা বৈশাখের উৎসব।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
মো: মামুন হাসান
মো: মামুন হাসান |নয়া দিগন্ত

মো: মামুন হাসান

পহেলা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন, বাঙালির প্রাণের উৎসব-বাংলা নববর্ষ। পহেলা বৈশাখ আজ শুধু একটি উৎসব নয় বরং বাঙালির ঐক্য, সংস্কৃতি ও নবজাগরণের প্রতীক। এই দিনটি আমাদের অতীতকে স্মরণ করিয়ে দেয়, বর্তমানকে উদযাপন করতে শেখায় এবং ভবিষ্যতের জন্য নতুন স্বপ্ন দেখায়। শুধু বাংলাদেশেই নয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায় বসবাসরত বাঙালিরাসহ বিশ্বজুড়ে বসবাসকারী বাঙালিরা পহেলা বৈশাখে অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করেন। ফলে পহেলা বৈশাখ কেবল একটি তারিখ নয়; এটি বাঙালির সর্বজনীন লোকউৎসব, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।

বাংলা নববর্ষের সাথে জড়িয়ে আছে প্রকৃতি, কৃষি ও মানুষের জীবনযাত্রার গভীর সম্পর্ক। ভোরের প্রথম সূর্যের আলোয় নতুন বছরের সূচনা-এই ধারণা বাংলা সনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। যেখানে হিজরি সন চাঁদের হিসাব অনুযায়ী সন্ধ্যায় শুরু হয় এবং খ্রিষ্টীয় সন মধ্যরাতে, সেখানে বাংলা সন শুরু হয় সূর্যোদয়ের সাথে। তাই ভোরের শিশিরভেজা বাতাসে, নতুন সূর্যকে বরণ করেই শুরু হয় পহেলা বৈশাখের উৎসব।

এই উৎসবের ইতিহাস খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় মোগল আমলে। ঐতিহাসিকদের মতে, মোগল সম্রাট আকবর রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তার নির্দেশে রাজসভার বিশিষ্ট পারসিক বহুবিদ্যাবিশারদ, বিজ্ঞানী, জ্যোতির্বিদ আমীর ফতেহউল্লাহ সিরাজী স্থানীয় সৌর সন ও আরবি হিজরি সনের সমন্বয়ে একটি নতুন পঞ্জিকা তৈরি করেন। তার উদ্যোগেই প্রবর্তিত এই বর্ষপঞ্জি থেকেই সম্রাট আকবরের শাসনামলে ১৫৮৪ সালে এই ‘ফসলি সন’-এর প্রচলন শুরু হয়, যা পরবর্তী সময়ে বাংলা সন হিসেবে পরিচিতি পায়।

তবে আজকের মতো আনন্দঘন উৎসব হিসেবে পহেলা বৈশাখের সূচনা হয়নি। একসময় এই দিনটি ছিল কৃষকদের জন্য খাজনা পরিশোধের দিন-ভয়ের ও উদ্বেগের প্রতীক। জমিদারদের ‘হালখাতা’ অনুষ্ঠানে প্রজাদের আমন্ত্রণ জানানো হতো, মিষ্টিমুখ করানো হতো বটে, কিন্তু সেটি ছিল এক ধরনের সামাজিক প্রথা, আনন্দের নয়। সাধারণ মানুষের কাছে এই দিনটি ছিল দায়মুক্তির দিন, উৎসবের নয়।

দেশভাগের পর ১৯৫২ সালে ভারত সরকারের তত্ত্বাবধায়নে বাংলা পঞ্জিকার সংস্কার কাজ শুরু হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা। পরে ১৯৬৩ সালে বাংলা সনের হিসাব নির্দিষ্ট করতে বাংলা একাডেমি একটি সংস্কার কমিটি গঠন করে, যার সভাপতি ছিলেন ড. মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। অবশেষে ১৯৮৮ সালে সরকারি ব্যবহারে খ্রিস্টীয় সনের পাশাপাশি বাংলা সাল লেখার রীতি চালু হলে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর হয়।

উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে, বঙ্গাব্দের ১২ মাসের নামকরণ করা হয়েছে নক্ষত্রমণ্ডলে চন্দ্রের আবর্তনে বিশেষ করে তারার অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে। জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক প্রাচীন গ্রন্হ সূর্যসিদ্ধান্ত থেকে নেয়া হয়েছে মাসগুলোর নাম। নক্ষত্রের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে বিশাখা থেকে বৈশাখ, জায়ীস্থা থেকে জ্যৈষ্ঠ, শার থেকে আষাঢ়, শ্রাবণী থেকে শ্রাবণ, ভদ্রপদ থেকে ভাদ্র, আশ্বায়ানি থেকে আশ্বিন, কার্তিকা থেকে কার্তিক, আগ্রায়হণ থেকে অগ্রহায়ণ, পউস্যা থেকে পৌষ, ফাল্গুনি থেকে ফাল্গুন এবং চিত্রা নক্ষত্র থেকে চৈত্র বারোটি মাসের নাম নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে, বাংলা সন শুধু সংস্কৃতির নয়, জ্ঞান-বিজ্ঞানেরও এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সময়ের পরিবর্তনে এখন পহেলা বৈশাখ মানেই আনন্দ, রঙ ও উচ্ছ্বাস। নগরজীবনে এই উৎসব আরো বর্ণিল ও জাঁকজমকপূর্ণ রূপ নিয়েছে। ভোরে উদীয়মান সূর্যকে স্বাগত জানাতে মানুষ জড়ো হয় উদ্যান বা খোলা প্রান্তরে। শিল্পীরা গান পরিবেশন করেন, নতুন বছরের বার্তা ছড়িয়ে দেন। লাল-সাদা শাড়ি, পাঞ্জাবি-পাজামা, ফুলের সাজ-সব মিলিয়ে সৃষ্টি হয় এক অনন্য আবহ।

খাবারের ক্ষেত্রেও এসেছে নতুন মাত্রা। আজকাল পান্তা-ইলিশ যেন পহেলা বৈশাখের প্রতীক। যদিও ইতিহাস বলে, একসময় শ্রমজীবী মানুষ এভাবে নববর্ষ উদযাপন করতেন না। তাদের উৎসব ছিল জীবনের সংগ্রামে, ধানের ভাতে। তবুও এই পান্তা-ইলিশ আজ বাঙালির ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে-সময়ের সাথে গড়ে ওঠা এক নতুন সংস্কৃতি।

পহেলা বৈশাখের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সর্বজনীনতা। একসময় যে উৎসব ছিল কৃষক ও ব্যবসায়ী সমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ, আজ তা সমাজের সব স্তরের মানুষের উৎসব। শহর-গ্রাম, ধনী-গরিব, সকলেই এই দিনে এক হয়ে যায়। এমনকি দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষরাও নিজেদের ঐতিহ্য বজায় রেখে এই উৎসবে অংশগ্রহণ করেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ঘোষণা করেছে পার্বত্য অঞ্চলের প্রতিটি সম্প্রদায়ের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি জাতীয় ঐতিহ্যের অংশ। তাই এখন থেকে ‘বৈসাবি’ নামে একসাথে নয়, বরং প্রতিটি সম্প্রদায় তাদের নিজস্ব রীতি ও স্বকীয়তায় নববর্ষের উৎসব পালন করবে। যা নববর্ষ ও চৈত্রসংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে আয়োজিত হয়। এটি তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ দিনে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা তাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনদর্শনের প্রকাশ ঘটায়, যা পহেলা বৈশাখের সার্বজনীনতাকে আরো সমৃদ্ধ করে।

কালের বিবর্তনে নববর্ষের সাথে সম্পর্কিত অনেক পুরোনো উৎসব হারিয়ে গেছে, আবার সংযোগ ঘটেছে অনেক নতুন উৎসবের। এক সময় ঢাকার ঘুড়ি ওড়ানো, মুন্সিগঞ্জের গরুর দৌড়, নৌকা বাইচ, ষাঁড়ের লড়াই, মোরগের লড়াই, পায়রা ওড়ানো, বহুরূপী সাজ ইত্যাদি গ্রামবাংলার জনপ্রিয় খেলা ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। আজ এসবের অনেকটাই বিলুপ্তপ্রায়। তবে চট্টগ্রামের বলীখেলা বা রাজশাহীর গম্ভীরার মতো কিছু আঞ্চলিক উৎসব এখনো টিকে আছে, যা আমাদের ঐতিহ্যকে জীবন্ত রাখছে।

বর্তমানে নগরজীবনে পহেলা বৈশাখ এক অনন্য জাঁকজমকপূর্ণ রূপ ধারণ করেছে। নববর্ষের প্রভাতে উদীয়মান সূর্যকে স্বাগত জানানোর মধ্য দিয়েই শুরু হয় উৎসবের মূল আয়োজন। ভোরের কোমল আলোয় উদ্যান, লেকপাড় কিংবা বৃহৎ বৃক্ষের ছায়াতলে মানুষ সমবেত হয় নতুন বছরের প্রথম সূর্যকে বরণ করতে। শিল্পীদের কণ্ঠে ভেসে ওঠে শুভ নববর্ষের গান, যা পরিবেশকে করে তোলে আরো প্রাণবন্ত ও উৎসবমুখর। এই দিনে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী পোশাক যেন উৎসবের অন্যতম সৌন্দর্য। তরুণীরা লালপাড় সাদা শাড়িতে সেজে ওঠে, হাতে রঙিন চুড়ি, খোপায় ফুল, গলায় ফুলের মালা আর কপালে লাল টিপ-এক অপূর্ব বাঙালি রূপ। অন্যদিকে ছেলেরা পাঞ্জাবি-পাজামা কিংবা ধুতি-পাঞ্জাবিতে সজ্জিত হয়ে উৎসবে যোগ দেয়।

খাবারের ক্ষেত্রেও পহেলা বৈশাখ পেয়েছে নিজস্ব পরিচিতি। সকালবেলার পান্তা ভাত ও ইলিশ ভাজা এখন যেন এক প্রতীকী রীতিতে পরিণত হয়েছে। তবে এই আনন্দের আড়ালে একটি উদ্বেগজনক দিকও রয়েছে-ইলিশ খাওয়ার প্রবণতায় অসংখ্য জাটকা নিধন হচ্ছে, যা ভবিষ্যতের ইলিশ সম্পদের জন্য হুমকি। ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও টেকসই সংরক্ষণের লক্ষ্যে দেশে ৭ থেকে ১৩ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত ‘জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ ২০২৬’ পালিত হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতি বছর ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দুই মাস দেশের অভয়াশ্রমগুলোতে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে। পহেলা বৈশাখের আনন্দ উদযাপনের পাশাপাশি আমাদের সচেতন হওয়া জরুরি। জাটকা সংরক্ষণে দায়িত্বশীল আচরণই পারে আমাদের জাতীয় সম্পদ ইলিশকে রক্ষা করতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে।

এবছর পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে দেশের ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য সরকার ‘কৃষক কার্ড’ চালু করছে। তিন ধাপে সারাদেশের কৃষকদের হাতে এ কার্ড তুলে দেয়া হবে। এর আওতায় কৃষকরা বছরে আড়াই হাজার টাকাসহ বিভিন্ন সুবিধা পাবেন, যা কৃষকদের জন্য আনন্দের সংবাদ।

নতুন বছরের প্রারম্ভে আমাদের প্রত্যাশা-দেশ ও জাতির কল্যাণ, মানুষের মধ্যে দেশপ্রেমের জাগরণ এবং সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন। বিশ্বদরবারে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াক-এই হোক পহেলা বৈশাখের অঙ্গীকার।

শুভ নববর্ষ!

লেখক : সিনিয়র তথ্য অফিসার, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়