সংবিধান সংশোধন না পুনর্লিখন

সংবিধান উপেক্ষার চূড়ান্ত পরিণতি হলো একটি রাষ্ট্রের ‘কার্যকারিতা হারানো’। যেখানে নাগরিকদের জীবনের কোনো মূল্য বা নিরাপত্তা থাকে না।

দেশের সংবিধান একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়। যদিও এই সংবিধান কার্যত ননফাংশানাল, তবু এ নিয়ে তুমুল আলোচনা প্রমাণ করে- দেশের মানুষ এ নিয়ে উৎকণ্ঠিত।

প্রকৃতপক্ষে সমাজ আইনশূন্য হলে জনজীবন হতে পারে বল্গাহীন। নিয়মহীনতা বা আইনের অনুপস্থিতি অরাজকতার সৃষ্টি করে, যার নজির সমাজে অনেকটাই দৃশ্যমান।

১৯৭২ সালের সংবিধান এখন প্রশ্নবিদ্ধ। এ যাবৎ মোট ১৭ দফা সংশোধন হয়েছে। কিছু ধারা বিলুপ্ত এবং বহু অনুচ্ছেদ কাটাছেঁড়া হয়েছে। অন্য দিকে রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন, রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে সংবিধানের বেশ কিছু মৌলিক ধারাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংস্কারের প্রস্তাব নিয়ে খসড়া তৈরি করেছে।

ঐকমত্য কমিশনের সংস্কার প্রস্তাব
কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনার ভিত্তিতে ১২টি মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবে প্রাথমিকভাবে ঐকমত্যে পৌঁছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন সংস্কার কমিশন মিলিয়ে সংবিধানের প্রায় অর্ধেক (প্রায় ৮০টিরও বেশি) অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

গায়ের জামায় অসংখ্য তালি লাগানো হলে সে জামার আর মৌলিকত্ব থাকে কি? বরং তখন নতুন জামা তৈরি করা শ্রেয়। সে বিবেচনায় সংবিধান সংস্কার সংশোধনের চেয়ে, পুনর্লিখনই যুক্তিযুক্ত। এ দায়িত্ব এখন সংসদের। সংসদ এখন ‘অন সেসন’। তর্কবিতর্ক, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়াই উত্তম।

Edi

সংবিধানের বহু ধারা আগেই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। বহু অনুচ্ছেদ আচরিত হয়নি। জনগণ সেসব ধারা থেকে সুবিধা পায়নি। এমনকি রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য। তার দু-একটির মধ্যে গণতন্ত্র, সুশাসন এবং জনগণের মৌলিক অধিকার সুরক্ষার মূল ভিত্তি হলো জবাবদিহি। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতারা ১৯৭২ সালেই অনুচ্ছেদ ৭৭-এ ‘ন্যায়পাল’ বা অম্বুডসম্যান নিয়োগের বিধান যুক্ত করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক হয়রানি থেকে সাধারণ নাগরিককে রক্ষা করা। পরিতাপের বিষয়, পাঁচ দশকেও সাংবিধানিক এই বিধানটি সম্পূর্ণ উপেক্ষিত রয়েছে।

৭৭ নং অনুচ্ছেদের বিধানগুলো হলো : সংসদ আইনের মাধ্যমে ন্যায়পালের পদ প্রতিষ্ঠার জন্য বিধান করতে পারবে। কোনো মন্ত্রণালয়, সরকারি কর্মচারী বা সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্র্তৃপক্ষের যেকোনো কার্য সম্পর্কে ন্যায়পাল তদন্ত করতে পারবেন, তার দায়িত্ব পালন সম্পর্কে বার্ষিক রিপোর্ট প্রণয়ন করবেন এবং তা জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হবে।

আইনপ্রণয়ন ও বাস্তবায়নের বাস্তবতা। সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদের আলোকে ১৯৮০ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সরকারের সময় জাতীয় সংসদে ‘ন্যায়পাল’ আইন পাস করা হয়। এই আইনে ন্যায়পাল পদে কাউকে নিয়োগ দেয়া হয়নি। শুধু ২০০৫ সালে করসংক্রান্ত নির্দিষ্ট বিষয়ের জন্য ‘কর-ন্যায়প্যাল’ আইন করা হলেও সামগ্রিক অর্থে ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠানটি আজও মৃতই।

কেন এই বিধানটি উপেক্ষিত? সাংবিধানিক এই পদ কার্যকর না হওয়ার বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা যায়।

রাজনৈতিক সরকারগুলো নিজেদের প্রশাসনিক ক্ষমতার ওপর কোনো ধরনের তদারকি বা নিয়ন্ত্রণ পছন্দ করে না। ন্যায়পাল স্বাধীনভাবে কাজ করলে নির্বাহী বিভাগের একচ্ছত্র ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ ঘটতে পারে- এই আশঙ্কায় এটি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। শক্তিশালী আমলাতন্ত্র নিজেদের জবাবদিহির আওতায় আনতে নারাজ, এটিও একটি কারণ। এ ছাড়া জনগণ এই সাংবিধানিক অধিকার সম্পর্কে তেমন সচেতন নন।

ন্যায়পালের অনুপস্থিতির ক্ষতি
ন্যায়পাল না থাকায় প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিতে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ নাগরিকরা হয়রানির শিকার হলে প্রতিকার পাওয়ার জন্য আদালত ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো বিকল্প থাকে না। এতে বিচার বিভাগের ওপর চাপ বাড়ে এবং বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়।

সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ন্যায়পালের গুরুত্ব : স্বাধীন ও শক্তিশালী ন্যায়পাল কেবল অভিযোগ তদন্তই করে না; বরং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় নিম্নলিখিত ভূমিকা পালন করতে পারে।

সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ স্বাধীনভাবে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করতে পারে; রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়ে; দাফতরিক কাজে দীর্ঘসূত্রতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করে। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়ে।

সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদ নিছক আইনি ধারা নয়। এটি ক্ষমতার ভারসাম্য ও জনগণের অধিকার সুরক্ষার এক সুপ্ত শক্তি। ন্যায়পাল নিয়োগ না করাটা প্রকারান্তরে জনগণের সাংবিধানিক অধিকার খর্ব করার শামিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে, ন্যায়পাল আইন সংশোধন করে হলেও অবিলম্বে ন্যায়পাল নিয়োগ করা সময়ের দাবি।

সংবিধানের ১৫(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। তবে এই লক্ষ্যের সাথে প্রকৃত বাস্তবতার বড় ফারাক বিদ্যমান। সংবিধানিক এই অনুচ্ছেদটি কেবল, ‘মৌলিক অধিকার’-এর অংশ নয়; বরং ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি’। মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হলে আদালতে সরাসরি রিট করা গেলেও, রাষ্ট্র এসব মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করতে না পারলে আদালতে গিয়ে প্রতিকার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

বৈষম্য এবং সম্পদের অসম বণ্টন : মেহনতি মানুষের শোষণমুক্তির কথা বলা হলেও বাস্তবে সম্পদের অসম বণ্টন এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রকট। সমাজে মেহনতি মানুষের চেয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত ধনিক গোষ্ঠীর প্রভাব বেশি।

জীবনধারণের উপকরণের ঘাটতি : খাদ্য, বস্ত্র ও আশ্রয়ের নিশ্চয়তার কথা বলা হলেও এখনো বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য পুষ্টিকর খাবার, নিরাপদ বাসস্থান বা বস্ত্রের সংস্থান করা কঠিন।

শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতের দুরবস্থা : সংবিধানে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। অথচ শিক্ষা খাতে বাণিজ্যিকীকরণ, ব্যয়বৃদ্ধি ও বৈষম্য প্রবল। তেমনি রাষ্ট্রীয় হাসপাতালে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে উন্নত চিকিৎসার নিশ্চয়তা থাকলেও বাস্তবে সাধারণ মানুষকে চিকিৎসা খরচের বেশির ভাগই নিজেকে বহন করতে হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব বিষয়কে কেবল রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে আবদ্ধ না রেখে আইনিভাবে বলবৎযোগ্য মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া উচিত।

সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক ‘জনগণ’। বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ’। এই সাংবিধানিক মালিকানার বাস্তবায়ন ও তাদের প্রতি যথাযোগ্য আচরণের বিষয় নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। জনগণের প্রতি যথাযথ আচরণের অর্থ হলো তাদের তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের মতামতের প্রতিফলন ঘটানো।

সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদ এবং মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত ধারাগুলো অমান্য বা উপেক্ষা করা হলে রাষ্ট্র ও সমাজে বিপর্যয় আসতে পারে। আইনবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এর ফলে নিম্নলিখিত দীর্ঘমেয়াদি এবং মারাত্মক পরিণতি দেখা দেয়।

আইনের শাসন লোপ পায় অর্থাৎ আইনের চোখে সবাই সমান এই নীতিটি ভেঙে পড়ে; বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিস্তার ঘটে। অপরাধীরা ছাড় পেয়ে যায় এবং নাগরিকরা ন্যায়বিচার বঞ্চিত হন; আইনের প্রতি আস্থা হ্রাস পায়, ফলে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনায় ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হয়; নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিরপেক্ষতা হারায়; রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট ও দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়; বাকস্বাধীনতা, সভা-সমাবেশের অধিকার এবং জীবনধারণের নিরাপত্তা চরমভাবে বিঘ্নিত হয়; সমাজে স্থায়ী ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়; সামাজিক অসন্তোষ বেড়ে যায়, জনগণের মধ্যে ক্ষোভ জমে। এর ফলে তীব্র গণ-আন্দোলন, সহিংসতা বা গণ-অভ্যুত্থানের সৃষ্টি হতে পারে; সামাজিক বিভাজন বাড়ে, সমাজে চরম বৈষম্য তৈরি হয়; অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সঙ্কট প্রকট হয়ে ওঠে, বিনিয়োগ হ্রাস পায়; আন্তর্জাতিক মহলে দেশের ভাবমর্যাদা নষ্ট হয় এবং নিষেধাজ্ঞা বা কূটনৈতিক একাকিত্বের ঝুঁকি বাড়ে।

সংবিধান উপেক্ষার চূড়ান্ত পরিণতি হলো একটি রাষ্ট্রের ‘কার্যকারিতা হারানো’। যেখানে নাগরিকদের জীবনের কোনো মূল্য বা নিরাপত্তা থাকে না।

লেখক : সম্পাদক, নয়া দিগন্ত

[email protected]