সরকারের ২ মাস ও জনপ্রত্যাশা

শেষ পর্যন্ত একটি সরকারের সাফল্য কেবল তার নীতিতে নয়; বরং সেই নীতির বাস্তব প্রতিফলনে নির্ধারিত হয়। অর্থাৎ দেশের জনগণের জীবনমানের প্রকৃত চিত্রই হয়ে ওঠে একটি সরকারের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার চূড়ান্ত মানদণ্ড। সুতরাং এই সরকারকে মূল্যায়ন করার জন্য একান্ন দিন সময় যথেষ্ট নয় বলেই আমি মনে করি।

আহসান হাবিব বরুন
নতুন সরকারের সূচনা মানেই এক নতুন ভোরের অপেক্ষা। এটি এমন একটি সময়, যখন মানুষ অতীতের অভিজ্ঞতা আর ভবিষ্যতের প্রত্যাশাকে একসাথে মেলাতে চায়। এই সময়ে প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি বার্তা, এমনকি প্রতিটি প্রতীকী পরিবর্তনও হয়ে ওঠে গভীর অর্থবহ। কারণ, এগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আগামী দিনের শাসনব্যবস্থার রূপরেখা। সেই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত বিএনপি সরকারের প্রথম ৫১ দিন নিছক একটি সময়পর্ব নয়; বরং এটি একটি পরিবর্তন প্রত্যাশী জাতির স্বপ্ন, সংশয় এবং সম্ভাবনার এক জটিল ও তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিচ্ছবি।

এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই সরকার এমন কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যা সাধারণ মানুষের মনে আশার আলো জ্বালিয়েছে—একটি ভিন্নধর্মী শাসন সংস্কৃতির ইঙ্গিত দিয়েছে। একইসাথে কিছু সিদ্ধান্ত, কিছু বিতর্ক এবং কিছু সীমাবদ্ধতা আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে যে, পরিবর্তনের পথ কখনোই মসৃণ নয়; বরং তা প্রশ্ন, সমালোচনা এবং বাস্তবতার কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়েই পরিপূর্ণতা পায়।

তাই এই ৫১ দিনের গল্প কেবল অর্জনের নয়, এটি একটি চলমান রূপান্তরের গল্প—যেখানে প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার মেলবন্ধনই হয়ে উঠছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনা।

নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা হলো—দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবং একটি সক্রিয় প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার চেষ্টা। ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই সরকার যে ‘গতি’ প্রদর্শন করেছে, তা অতীতের অনেক ধীরগতির শাসনপ্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণরূপে ব্যতিক্রম।

এই সময়ে সামাজিক সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে—যা নিঃসন্দেহে সরকারের একটি বড় ইতিবাচক দিক। ইতোমধ্যে সরকার বেশকিছু কার্ড পরীক্ষামূলকভাবে চালু করেছে। এবং আগামীতেও আরো কিছু কার্ড চালু করার কথা রয়েছে।

শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নেও সরকার একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে। পুনঃভর্তি ফি বাতিল, ভর্তি প্রক্রিয়ায় সংস্কার এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আর্থিক সহায়তা—এসব উদ্যোগ তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। পাশাপাশি ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে জোর দেয়া একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গঠনের ইঙ্গিত দেয়।

অর্থনৈতিক খাতে সরকারের পদক্ষেপগুলো মূলত আস্থা পুনর্গঠন এবং গতি সৃষ্টির দিকে কেন্দ্রীভূত। বিদেশী বিনিয়োগ সহজীকরণ, বিনিয়োগ প্রত্যাবাসনের বাধা কমানো, বন্ধ শিল্প প্রতিষ্ঠান চালু করার উদ্যোগ—এসব সিদ্ধান্ত অর্থনীতির চাকা সচল রাখার একটি বাস্তবধর্মী প্রচেষ্টা। গেল রমজানে

বাজার মনিটরিং জোরদার এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাও সরকারের সক্রিয়তা প্রমাণ করেছে।

প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে সরলতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার যে চেষ্টা দেখা যাচ্ছে, সেটিও উল্লেখযোগ্য। ভিভিআইপি প্রটোকল কমানো, অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা হ্রাস এবং প্রধানমন্ত্রীর নিয়মিত অফিস কার্যক্রম—এসব উদ্যোগ ক্ষমতার ব্যবহারে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত দেয়। সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট সুবিধা বাতিলের মতো সিদ্ধান্ত জনআস্থা পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

আইনশৃঙ্খলা খাতে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, মাদকবিরোধী কার্যক্রম এবং প্রশাসনিক তদারকি বাড়ানো ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে। ‘সারপ্রাইজ ভিজিট’র মতো উদ্যোগ সরকারি দফতরগুলোতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, যদি তা ধারাবাহিকভাবে বজায় রাখা যায়।

অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রেও সরকার কিছু দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি দেখিয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর উদ্যোগ এবং বিমানবন্দরে আধুনিক সেবা চালু করার পরিকল্পনা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সংযোগকে আরো শক্তিশালী করতে পারে।

তবে এই ইতিবাচক চিত্রের মাঝেও কিছু বাস্তবতা সরকারকে চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। প্রশাসনে বাধ্যতামূলক অবসর ও ওএসডি নিয়ে বিতর্ক, পেশাদার কর্মকর্তাদের বঞ্চনার অভিযোগ—এসব বিষয় প্রশাসনিক সংস্কারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একটি কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে পেশাদারিত্ব ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

কিছু মন্ত্রীর মন্তব্য এবং গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক সরকারের বার্তাকে আংশিকভাবে দুর্বল করেছে। একইভাবে জুলাই সনদ ও গণভোট প্রসঙ্গ, কিছু অধ্যাদেশ বাতিল, আইন প্রয়োগে সমতার প্রশ্ন, বিতর্কিত ব্যক্তিদের জামিন এবং রাজনৈতিক সহনশীলতার বিষয়গুলো জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সরকারের অন্যান্য সাফল্যও আড়াল হয়ে যেতে পারে।

তবে সার্বিকভাবে বলা যায়, সরকারের প্রথম ৫১ দিন একটি শক্তিশালী সূচনা তৈরি করেছে। এই সময়ে নেয়া পদক্ষেপগুলো একটি সুস্পষ্ট বার্তা দেয়—সরকার পরিবর্তন চায়, এবং সেই পরিবর্তনকে দৃশ্যমান করতে চায়। এখন মূল প্রশ্ন হলো, এই গতি কতটা টেকসই হবে এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কতটা সফলতা আসবে।

একথা বললেও বেশি হবে না যে, জনগণের প্রত্যাশা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। তারা শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব ফলাফল দেখতে চায়। সুতরাং তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার যদি ইতিবাচক উদ্যোগগুলোকে আরো শক্তিশালী করে এবং সমালোচনাগুলোকে সংশোধনের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে, তবে এই সূচনা একটি টেকসই রূপান্তরের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

কারণ শেষ পর্যন্ত একটি সরকারের সাফল্য কেবল তার নীতিতে নয়; বরং সেই নীতির বাস্তব প্রতিফলনে নির্ধারিত হয়। অর্থাৎ দেশের জনগণের জীবনমানের প্রকৃত চিত্রই হয়ে ওঠে একটি সরকারের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার চূড়ান্ত মানদণ্ড। সুতরাং এই সরকারকে মূল্যায়ন করার জন্য একান্ন দিন সময় যথেষ্ট নয় বলেই আমি মনে করি।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা

[email protected]