আমলাতন্ত্রের ঝুঁকি

সুরঞ্জন ঘোষ
দেশে গণতন্ত্র ফিরেছে। এর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। আমলাদের দিয়ে নয়, এ জন্য রাজনীতিকদেরই হাল ধরতে হবে। দেখা যাচ্ছে, রাজনীতির অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা নেই এমন আমলাদের আজ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানো হচ্ছে। এতে রাষ্ট্র ও দেশ বিপদগ্রস্ত হতে পারে।

আমলাতন্ত্রের উৎপত্তি ও বিকাশ
রাষ্ট্রের উৎপত্তির সময় থেকেই আমলাগোষ্ঠীর আবির্ভাব, প্রশাসনিক সংগঠন হিসেবে। প্রাচীন জনপদ মেসোপটেমিয়া, গ্রিস, রোম, মিসর, চীন ও ভারতবর্ষে এরূপ সংগঠনের অস্তিত্ব ছিল। আমলারা ছিলেন রাষ্ট্রের অপরিহার্য অঙ্গ। রাষ্ট্রের সম্রাট বা রাজন্যরা তাদের শাসনকার্য পরিচালনার প্রয়োজনে আমলাদের নিয়োগ করতেন, যাদের প্রধান কাজ ছিল কর আদায় করা।

শাসকের ইচ্ছামতো আমলা-কর্মচারী নিয়োগের পরিবর্তে মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতামূলক বাছাইয়ের মাধ্যমে নিয়োগের নিয়ম চালু করা হয় প্রাচীন চীনে। চীনের হান রাজবংশ (খ্রিষ্টপূর্ব ২২০-২০৬ অব্দ) আমলা নিয়োগের জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করে।

দ্বিতীয় শতাব্দীতে গ্রিসে পেশাজীবী আমলাদের স্থায়ী সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। আমলাতন্ত্র সুশৃঙ্খল কাঠামো পায়। আমলাতন্ত্র প্রথমবার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।

তৃতীয় শতাব্দীতে গ্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কারের মাধ্যমে আমলাতন্ত্র নতুন ধাপে উন্নীত হয়। রাজ্য বা রাষ্ট্রগুলোকে নগরী, প্রদেশ ও অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়। এর প্রত্যেক এককে নাগরিক সেবা দিতে আমলা বাহিনী নিয়োজিত করা হয়।

বাংলাদেশে আমলাতন্ত্রের উত্তরাধিকার : ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমল
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আবির্ভাব হয় ১৯৭১ সালে, ৯ মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। মুক্তিযুদ্ধের সময় যে প্রবাসী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় পরে তার দফতর ছিল ভারতের কলকাতায়। প্রবাসী সরকারের আমলাবাহিনী ছিল পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা পাকিস্তান সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারী। তারাই পক্ষত্যাগ করে কলকাতায় গিয়ে প্রবাসী সরকারের অধীনে একটি আমলাতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলেন। অতি নড়বড়ে ও সীমিত আকারের এই কাঠামোটিই বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের আদিরূপ।

স্বাধীনতার পর কলকাতা থেকে প্রবাসী সরকার ঢাকায় স্থানান্তরিত হলে প্রবাসী সরকারের আমলা গোষ্ঠীও ঢাকায় আসে।

এরশাদের শাসনকাল : ১৯৮২-৯০
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনকাল শুরু হয় সামরিক শাসনের মাধ্যমে। এক পর্যায়ে তা বেসামরিক শাসনে রূপান্তরিত হয়। সামরিক শাসনকালে সরকারপ্রধান ছিলেন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (CMLA)। দেশকে বিভিন্ন অঞ্চলে ভাগ করে ওই সব অঞ্চলের শাসনভার ন্যস্ত করা হয় আঞ্চলিক সামরিক আইন প্রশাসকদের ওপর। অতএব দেশের নির্বাহী দায়িত্বে ছিলেন সামরিক শাসকরা। বেসামরিক আমলারা ছিলেন কার্যত তাদের অধীন।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক শাসনের অধীনে জারি হলো সামরিক আইন আদেশ ৯ বা এমএলও-নাইন। আইনটি ছিল স্বেচ্ছাচারী ও নিবর্তনমূলক। এতে ক্ষতিগ্রস্ত কর্মকর্তার আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ ছিল না। কোনো ক্ষমতাশালীর ব্যক্তিগত আক্রোশ বা শত্রুতাবশতও অনেকে চাকরি হারান। এই আইনে সরকারি চাকরিতে ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত মোট ৫৫৫ জন চাকরিচ্যুত হন। এই চাকরিচ্যুতির আদেশের বিপক্ষে দেশের কোনো আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার সুযোগ ছিল না। তবে সামরিক আইন উঠিয়ে নিয়ে বেসামরিক লেবাসের সরকার প্রতিষ্ঠার পর প্রেসিডেন্টের (একই ব্যক্তি, যিনি সিএমএলএ ছিলেন) নির্দেশে কেউ কেউ চাকরি ফিরে পেয়েছিলেন।

শুরুতে বরাবরের মতো দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, ‘দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে জিহাদ’ ও রাষ্ট্রীয় সব পর্যায়ে কৃচ্ছ্রতা সাধনের ঘোষণা এবং কর্মসূচি নেয়া হয়। এর প্রভাব পড়ে আমলাতন্ত্রে। সামরিক আমলারা বেসামরিক আমলাদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় শেষোক্তদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অপদস্ত করেন। অবশ্য পরে সামরিক শাসনের চিরাচরিত পথ ধরে বেসামরিক আমলাদের সাথে মৈত্রীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই আমলাতন্ত্রে পূর্ববর্তী সরকারের সূচিত নিয়মনীতি কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন ও সংশোধন করা হয়। সিনিয়র সার্ভিস পুল পদ্ধতি ক্রমাগতভাবে অকার্যকর করে পরে তা অবলুপ্ত করা হয়। সিভিল সার্ভিসে নিয়োগের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী সরকারের প্রবর্তিত শৃঙ্খলা ভেঙে ফেলে ১৯৭২-৭৫ মেয়াদের মতো মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগের পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়। সিভিল সার্ভিসে নিয়োগের বয়সসীমা নজিরবিহীনভাবে ৫০ বছর পর্যন্ত বাড়িয়ে বয়স অনুযায়ী বেতন নির্ধারণের ব্যবস্থা নেয়া হয়। উচ্চতর পদে পদোন্নতির কমিটিতে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষকে প্রধান করা হয়। অনেক অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মরত সামরিক আমলাকে বেসামরিক আমলাতন্ত্রে নিয়োগ দেয়া হয়। সেই সাথে রাষ্ট্রপতির কোটায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়।

আমলাদের চাকরির সাধারণ শর্তাবলি ও তুলনামূলক অবস্থা
বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের আমলাদের সরকারি কর্মচারী বা Government Servants-এর পরিচিতি উঠে এসেছে উত্তরাধিকার সূত্রে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের বিদায়কাল পর্যন্ত আমলারা ছিলেন প্রকৃতপক্ষেই সম্রাটের আজ্ঞাবহ শাসনের যন্ত্র। ১৯৪৭-পরবর্তী পাকিস্তান রাষ্ট্রের চরিত্রেও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অনুকরণ প্রবলভাবে উপস্থিত ছিল। এর ফলে আমলাতন্ত্রেও ব্রিটিশ আমলাতন্ত্রের আদলে ‘স্টিল ফ্রেম সিভিল সার্ভিস’ তথা সিএসপির সংস্করণ হয়। প্রকৃতপক্ষে সিএসপি ছিল ব্রিটিশ আইসিএসের আদলে গড়া এলিট আমলাগোষ্ঠী। একই অবস্থা ছিল সিএসএসসহ অন্য সার্ভিসগুলোরও। এই মডেলে তারা রাষ্ট্র ও জনগণের চেয়ে সরকারের সেবক ছিলেন বেশি। সেই অর্থে ‘সরকারি কর্মচারী’ আখ্যাই তাদের কাজের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল।

রাষ্ট্রের আমলাদের এই পরিচিতির বিষয় নিয়ে ১৯৯৬ সালে তৎকালীন ডাকসাইটে আমলা মহিউদ্দিন খান আলমগীর জোরদার আওয়াজ তোলেন। তিনি জোরেশোরে উল্লেখ করেন, আমলারা সরকারের নয়, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। তিনি প্রচারপত্র ছাপিয়ে ঘোষণা করেন, ‘আমরা সরকারের গোলাম নই, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী।’ তার এ ঘোষণার উৎস ছিল সংবিধানের বর্ণনা। কিন্তু এর মাধ্যমে তিনি আসলে চেয়েছিলেন তখনকার বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে আমলাদের উস্কে দিতে। আর তাই ১৯৯৬-পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে আর কথা ওঠেনি। সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালায় কোনো পরিবর্তনও হয়নি।

সিনিয়র সিলেকশন বোর্ড ও কাউন্সিল কমিটি
আমলাতন্ত্রের পুনর্গঠনে বিএনপি সরকার ১৯৭৬-৮১ সালের মেয়াদে কতগুলো প্রশংসনীয় পদক্ষেপ নিয়েছিল। ওই সময় সরকার সিভিল সার্ভিসে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার উপর জোর দেয়। তারা মেধা কোটা দ্বিগুণ করে। নিয়োগ অধিকতর প্রতিযোগিতামূলক এবং যোগ্য ও মেধাবীদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে ১৬০০ নম্বরের বাছাই পরীক্ষার ব্যবস্থা করে। পাশাপাশি সচিবালয়ের উপসচিব ও তদূর্ধ্ব পদসমূহ সিনিয়র সার্ভিস পুল বা এসএসপি নামে অভিহিত পুলের অন্তর্ভুক্ত করে তাতে সব সার্ভিস থেকে মেধার ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্তির ব্যবস্থা করা হয়।

পাবলিক সার্ভিস : স্বাধীনতা-উত্তরকাল
পাবলিক সার্ভিস কমিশনের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ভিত্তিতে উপসচিব পদে অন্তর্ভুক্তির বিধান করা হয়। কিন্তু ১৯৮১ সালে ওই সরকারের শেষ দিন পর্যন্ত পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করা যায়নি। পরবর্তী সরকার প্রথমে এসএসপি অব্যাহত রাখলেও পরীক্ষা পদ্ধতি কার্যকর করেনি। পরে তারা এসএসপিও বাতিল করে দেয়।

অধিকাংশ আমলার আশা ছিল আগের নীতির ধারাবাহিকতায় নতুন সরকার সিভিল সার্ভিসসহ আমলাতন্ত্রকে একটি যুগোপযোগী কাঠামোতে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেবে। কিন্তু সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ ওই নীতির ধারেকাছে না গিয়ে বিপরীতমুখী নীতি গ্রহণ করে। পদোন্নতির মাধ্যমে উচ্চতর পদে নিয়োগের পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়। এই লক্ষ্যে ১৯৯১ সালের আগস্ট মাসে সিনিয়র সিলেকশন বোর্ড (SSB) গঠিত হয়। এটি ছিল সচিবদের সমন্বয়ে গঠিত একটি পদোন্নতি কমিটি। এ সময় রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের নেতৃত্বে কাউন্সিল কমিটিও বহাল থাকে। এর ফলে দ্বৈত সুপারিশের পদ্ধতি চালু হয়। সিনিয়র সিলেকশন বোর্ডের সুপারিশকৃত তালিকা কাউন্সিল কমিটিতে পাঠানো হতো এবং কাউন্সিল কমিটির সুপারিশের দ্বারা তা চূড়ান্ত হতো। এসএসবির সভাপতি ছিলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। আর কাউন্সিল কমিটির সভাপতি হলেন সংস্থাপন প্রতিমন্ত্রী। এ সময়ে পদোন্নতির ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত শর্তাদি যুক্ত হয় :

১. পদোন্নতির ক্ষেত্রে সাক্ষাৎকার গ্রহণের পদ্ধতি চালু করা হয়। পদোন্নতির যোগ্য তালিকাভুক্ত কর্মকর্তাদের কাউন্সিল কমিটি সমীপে সাক্ষাৎকারে হাজির হওয়ার বিধান করা হয়। ১৯৭৩ ব্যাচকে উপসচিব পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়া দিয়ে এর শুরু হয়।

২. দুর্নীতি দমন ব্যুরো থেকে ছাড়পত্র গ্রহণের বিধান চালু হয়।

এ ছাড়া প্রত্যেক মন্ত্রণালয়ে ওই মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন চতুর্থ গ্রেড পর্যন্ত ক্যাডারভুক্ত ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদোন্নতির বিষয় বিবেচনার জন্য ‘বিভাগীয় পদোন্নতি বোর্ড’ পুনর্গঠন করা হয়।

১৯৭৩ ব্যাচের উপসচিব পদে পদোন্নতি
সিভিল সার্ভিসে ১৯৭৩ ব্যাচের উপসচিব পদে পদোন্নতি ছিল আলোচিত ঘটনা। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম এই ব্যাচটির পদোন্নতির বিষয়ে পূর্ববর্তী সরকার ছিল আগাগোড়া নেতিবাচক। এমনকি এই সরকারের প্রভাবশালী আমলারাও ছিলেন পরীক্ষার মাধ্যমে বাচাই করে পদোন্নতির পক্ষে। সিএসপি, ইপিসিএস ও সিএসএসÑ সবাই ছিলেন এক্ষেত্রে একাট্টা। কিন্তু ১৯৭৩ ব্যাচ ছিল এই পরীক্ষার পুরোপুরি বিরোধী। অবশেষে যখন পূর্ববর্তী সামরিক সরকার ইপিসিএসদের পরীক্ষা ছাড়াই পদোন্নতি দিয়ে সুপিরিয়র সার্ভিস পুলের পরীক্ষা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলো, তখন মুক্তিযোদ্ধা এই ব্যাচ পরীক্ষায় বসার ব্যাপারে পুরোপুরি বেঁকে বসল। এই অবস্থায় সৃষ্ট টানাপড়েনে ওই সরকার একসময় সুপিরিয়র সার্ভিস পুল পরীক্ষা নিয়ম বাতিল করে। সুপিরিয়র সার্ভিস পুল পদ্ধতিও বাতিল করা হয়। তবে তারা এই ব্যাচটির পদোন্নতির বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

নতুন সরকারে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রীর বিষয়ে ইতোমধ্যে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হয়েছে। তিনি ১৯৭৩ ব্যাচের একজন সদস্য ছিলেন। পুরনো এই ব্যাচমেটকে সংস্থাপনের মন্ত্রী হিসেবে পেয়ে তারা এবার আশান্বিত হলেন। তিনি দায়িত্ব নিয়ে এক্ষেত্রে উপায় উদ্ভাবন করলেন। এই উপায় উদ্ভাবনে ওই ব্যাচের কিছু ঘনিষ্ঠ নেতার পরামর্শ গ্রহণ করলেন। বিশাল সংখ্যার এই ব্যাচের একসাথে পদোন্নতির বিষয় ছিল প্রায় অসম্ভব। পদোন্নতির জন্য এত শূন্য পদ ছিল না। ব্যাচের নেতাদের পরামর্শে তিনি পদের অতিরিক্ত সংখ্যায় পদোন্নতির ব্যতিক্রমী নীতি গ্রহণ করলেন।

এ ছাড়া বাছাইয়ের লক্ষ্যে প্রচলিত প্রক্রিয়ার বাইরে সাক্ষাৎকার বা মৌখিক পরীক্ষার বিধান করেন। প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত কমিটি এই মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ করে। চাকরি-সংক্রান্ত প্রচলিত মূল্যায়নের সাথে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর যোগ করে পদোন্নতির তালিকা তৈরি করা হয়। এর ভিত্তিতে ১৯৯২ সালে মোট ১৮টি ক্যাডারে কর্মরত ৩৯৬ জন কর্মকর্তাকে একসাথে উপসচিব পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। এ ছাড়া ইপিসিএস ও অন্যদের মধ্য থেকে ১৯২ জনকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। এই পদোন্নতিতে প্রথমবার দু’টি ব্যতিক্রমী উপাদান যোগ হয়। এই দু’টি উপাদান হলো :

এই পদোন্নতি প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে পদোন্নতিবঞ্চিত কিছু কর্মকর্তা হাইকোর্টে রিট করেন। ওই রিট মামলায় পদোন্নতির জন্য মন্ত্রীর সভাপতিত্বে গঠিত পদোন্নতি কমিটি বাতিল ঘোষণা করা হয়।

কতিপয় আমলার রাজনৈতিক অভিলাষ ও জনতার মঞ্চ
১৯৯৫ সালে তদানীন্তন সরকারের মেয়াদের শেষ প্রান্তে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়। বিরোধী দল পরবর্তী নির্বাচন দলীয় সরকারের পরিবর্তে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পরিচালনার জোর দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলে। বিরোধী দলে তখন আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও জাতীয় পার্টি। সরকারে আসীন বিএনপি। সরকার ও সরকারি দল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ধারণার বিরোধী। উভয়পক্ষ মুখোমুখি। সরকার ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে তাদের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করে। এর ফলে সৃষ্টি হয় রাজনৈতিক অস্থিরতা। দুই পক্ষের এই রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যে কিছু আমলা আমলাতন্ত্রের স্বাভাবিক শিষ্টাচার ও মূল্যবোধ ত্যাগ করে প্রথমে গোপনে বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সাথে রাজনৈতিক সংযোগ স্থাপন করেন। এ ক্ষেত্রে কেউ কেউ তাদের চাকরিপূর্ব জীবনের রাজনৈতিক ভূমিকা ও সংযোগ কাজে লাগান। মূলত আমলাতন্ত্রের প্রশাসন সার্ভিসের দু’টি বড় অনিয়মিত ব্যাচের কিছু কর্মকর্তা এই উদ্যোগে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন। এই দু’টি ব্যাচ হলো ১৯৭৩ ও ১৯৮৩ ব্যাচ। প্রথমটি মুক্তিযোদ্ধা ব্যাচ নামে পরিচিত। এই ব্যাচটিকে অনেকে তাদের নিয়োগকালীন সময়ের আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টার দায়িত্বপালনকারী তোফায়েল আহমেদের নামানুসারে ‘তোফায়েল ব্যাচ’ বলেও অভিহিত করেন। এই ব্যাচটি কেবল মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছিল। দ্বিতীয় ব্যাচটি ১৯৮২ সালে নিয়োগকৃত ৬৫০ ম্যাজিস্ট্রেটের বিশেষ ব্যাচ। এদের নিয়োগও হয়েছিল অনুরূপ মৌখিক ও টিক চিহ্নের বিতর্কিত বিশেষ পরীক্ষার মাধ্যমে। তাদের সাথে প্রশাসনের ১৯৮২ নিয়মিত ব্যাচের একজন ও ১৯৭৭ ব্যাচের একজন কর্মকর্তাসহ তথ্য, পুলিশ ও প্রকৌশল সার্ভিসের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা যোগ দেন। আর তাদের নেতৃত্বের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন সিএসপি সচিব ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর। তারা আমলাতন্ত্রে একটি সরকারবিরোধী ও আওয়ামী লীগপন্থী ক্ষুদ্র রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেন। শক্তি বৃদ্ধি করতে একসময় তারা সচিবালয়ের কর্মচারী সমিতিকে তাদের সাথে সম্পৃক্ত করেন। সচিবালয় কর্মচারী সমিতি তখন তাদের নিজস্ব দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন করে।

শেষ কথা হলো, আমলারা কারো চিরস্থায়ী পক্ষের লোক নয়, যখন যে সরকার আসে তারা সেই সরকারের হয়ে কাজ করে। তাই তাদের ওপর নির্ভর করা রাজনৈতিক সরকারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।

লেখক : কলামিস্ট ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা