- রাষ্ট্রের অর্থ সাশ্রয়ে ৩টি বড় চুক্তি সংশোধনের উদ্যোগ
- আদানি ও জয়েন্ট ভেঞ্চারসহ বিদ্যুৎ আমদানিতে ৩ মাসেই ভর্তুকি প্রয়োজন ১৮,৫৩৮ কোটি টাকা
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সম্পাদিত জনস্বার্থবিরোধী অন্তত তিনটি বড় বিদ্যুৎ চুক্তি সংশোধনের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছে সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগ। উচ্চ ট্যারিফ ও অসম শর্তের কারণে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় রোধে এসব চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন ও সংশোধনের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ।
বিদ্যুৎ বিভাগের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, ভারত ও চীনের সরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথ উদ্যোগে নির্মিত তিনটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে (পিপিএ) এমন কিছু কারিগরি ও আর্থিক শর্ত যুক্ত করা হয়েছে, যা উচ্চ ট্যারিফের জন্য সরাসরি দায়ী। এর মধ্যে রয়েছে : আরওই (ইক্যুইটির ওপর রিটার্ন) : বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফার হার। নন-আরওই খরচ : অব্যবস্থাপনাজনিত বা অন্যান্য ব্যয়। ওএন্ডএম খরচ : অস্বাভাবিক ও রক্ষণাবেক্ষণ শক্তি। আর তাপ হার : শক্তিনি বা তাপীয় হারের প্রতিকূল শর্ত।
বিভাগের মতে, দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এই কারিগরি বিষয়গুলো সমাধান করা গেলে ট্যারিফ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে এবং রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।
ভর্তুকির বিশাল বোঝা ও আর্থিক সঙ্কট
বিদ্যুৎ বিভাগ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ তিন মাসেই (এপ্রিল ২০২৬ থেকে জুন ২০২৬) জয়েন্ট ভেঞ্চার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র (বিসিপিসিএল, বিআইএফপিসিএল, আরএনপিএল), বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানি এবং ভারত ও নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানির বিপরীতে ১৮ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন হবে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভর্তুকির এই পরিমাণ আগামী অর্থবছরে আরো ভয়াবহ রূপ নেবে : চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) : ভর্তুকির পরিমাণ ১৫ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে (২০২৬-২৭) : এই ভর্তুকির সম্ভাব্য আকার বেড়ে দাঁড়াতে পারে ৪২ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা, যা চলতি বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
‘গলার কাঁটা’ ৬৮ বিদ্যুৎকেন্দ্র
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের বিতর্কিত আইনের অধীনে সম্পাদিত এসব চুক্তি বর্তমানে সরকারের জন্য ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনার ফলে যে বিশাল আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, তার বড় অংশই অর্থ বিভাগ থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ এসব ব্যয় অর্থ বিভাগের নিয়মিত ভর্তুকি তালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
এই সঙ্কট নিরসনে ভারত, চীন ও নেপাল থেকে আমদানি করা বিদ্যুৎসহ মোট ৬৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে অর্থ বিভাগের ভর্তুকির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য উত্থাপিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারত ও চীনের সাথে যৌথ বিনিয়োগে নির্মিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চুক্তিতে সুকৌশলে এমন কিছু শর্ত যুক্ত করা হয়েছিল, যা দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের জন্য আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফার হার এবং জ্বালানি দক্ষতার শর্তগুলো ছিল অত্যন্ত একপেশে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জয়েন্ট ভেঞ্চারে নির্মিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে বিদেশী অংশীদারদের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে ট্যারিফ বা বিদ্যুতের দাম এমন পর্যায়ে রাখা হয়েছে, যা বৈশ্বিক বাজারের তুলনায় অনেক বেশি। বিদ্যুৎ বিভাগ মনে করে, দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে যদি এসব চুক্তি সংশোধন করা যায়, তবে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় সম্ভব। বিশেষ করে আদানি পাওয়ার, বিআইএফপিসিএল (রামপাল) ও বিসিপিসিএলের (পায়রা) মতো বড় কেন্দ্রগুলোর ট্যারিফ কাঠামো পুনর্নির্ধারণ করা এখন সময়ের দাবি।
আদানি ও ভারত-চীন সংযোগ : ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
বিদ্যুৎ খাতের এই সঙ্কটের কেন্দ্রে রয়েছে ভারতের ঝাড়খন্ডে অবস্থিত আদানি পাওয়ার প্ল্যান্ট (১৪৯৬ মেগাওয়াট) এবং নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানির মতো প্রকল্পগুলো। আদানির সাথে সম্পাদিত চুক্তিটি শুরু থেকেই বিতর্কিত ছিল, যেখানে কয়লার দাম এবং ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে অসম সব শর্তারোপ করা হয়েছিল। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এসব চুক্তি সংশোধন করা কেবল আর্থিক নয়, বরং একটি বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জও বটে।
একইভাবে চীনের অর্থায়নে নির্মিত পটুয়াখালীর আরএনপিএল এবং পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তিতে থাকা ‘টেক অর পে’ শর্তগুলো বাংলাদেশের হাত-পা বেঁধে রেখেছে। বিদ্যুৎ ব্যবহার না করলেও রাষ্ট্রকে শত শত কোটি টাকা জরিমানা বা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগ এখন এই জয়েন্ট ভেঞ্চারগুলোর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং নন আরওই ব্যয়ের মতো টেকনিক্যাল পয়েন্টগুলোতে কাঁচি চালাতে চায়, যাতে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ নামিয়ে আনা যায়।
ভর্তুকি তালিকায় প্রস্তাবিত উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র ও প্রকল্প :
১. আদানি পাওয়ার প্ল্যান্ট, ঝাড়খন্ড (১৪৯৬ মেগাওয়াট) : ভারতের আদানি গ্রুপ থেকে কেনা উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ। ২. বিআইএফপিসিএল (১৩২০ মেগাওয়াট) : বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী বিদ্যুৎকেন্দ্র (রামপাল)। ৩. বিসিপিসিএল (১৩২০ মেগাওয়াট) : বাংলাদেশ-চীন যৌথ মালিকানাধীন পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ৪. আরএনপিএল (১৩২০ মেগাওয়াট) : পটুয়াখালীতে নির্মিত বাংলাদেশ-চীন যৌথ মালিকানাধীন কেন্দ্র। ৫. নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি (১১৬০ মেগাওয়াট) : ১ মার্চ ২০২৬ থেকে ভর্তুকি আওতাভুক্তির প্রস্তাব। ৬. বি-আর পাওয়ারজেন (১২০ মেগাওয়াট): শ্রীপুর প্রকল্প। ৭. বেসরকারি ৩৮টি কেন্দ্র (৬০৯৪ মেগাওয়াট) : পিডিবির আওতাধীন বেসরকারি রেন্টাল ও আইপিপি। ৮. সরকারি ১৭টি কেন্দ্র (৪৯৭১ মেগাওয়াট) : বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্র।
বিদ্যুৎ খাতের এই নাজুক পরিস্থিতির জন্য পতিত সরকারের অপরিণামদর্শী ও অসম চুক্তিকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিদ্যুৎ বিভাগ মনে করছে, যদি বড় তিনটি জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তি এবং আদানির সাথে সম্পাদিত চুক্তির ট্যারিফ কাঠামো পুনর্নির্ধারণ করা না যায়, তবে প্রতি বছর ভর্তুকির এই পাহাড় সমান চাপ সামলানো অর্থ বিভাগের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে।
অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় ‘স্মার্ট রিব্যালান্সিং’
বিদ্যুৎ খাতের এই বিশৃঙ্খলা কেবল এই খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে। আপনাদের সাম্প্রতিক ডাটাবেজ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৪৯%-এ নেমে এসেছে। প্রবৃদ্ধির এই নিম্নগতির অন্যতম কারণ হলো শিল্প খাতে উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ এবং লোডশেডিং।
পাশাপাশি এলসি খোলার তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে ২৫.৪২% পতন ঘটেছে; অর্থাৎ দেশে নতুন কোনো শিল্প কারখানা হচ্ছে না। শিল্প খাতের চাকা সচল রাখতে হলে বিদ্যুতের দাম কমানো এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু উচ্চ ভর্তুকির কারণে সরকার যখন পিডিবিকে অর্থ দিতে পারছে না, তখন পিডিবি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিল বকেয়া রাখছে। ফলে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানি সঙ্কটে উৎপাদন বন্ধ করে দিচ্ছে, যা ঘুরেফিরে অর্থনীতিকে স্থবির করে দিচ্ছে।
সুপারিশ ও ভবিষ্যৎ পথনকশা
বিদ্যুৎ বিভাগ যে ৬৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে অর্থ বিভাগের ভর্তুকি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে, তা সাময়িক স্বস্তি দিলেও স্থায়ী সমাধান নয়। স্থায়ী সমাধানের জন্য নিচের পদক্ষেপগুলো অনিবার্য :
১. চুক্তি সংস্কার : ‘ইনডেমনিটি অ্যাক্ট’ বা বিশেষ আইনের অধীনে করা সব চুক্তি স্ক্রুটিনি করা এবং জাতীয় স্বার্থবিরোধী ধারাগুলো বাতিল বা সংশোধন করা।
২. ক্যাপাসিটি চার্জ বাতিল : ‘নো ইলেকট্রিসিটি নো পে’ ভিত্তিতে নতুন করে সব চুক্তির ট্যারিফ নির্ধারণ করা।
৩. জ্বালানি বহুমুখীকরণ : নেপাল থেকে ১,১৬০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ আমদানির যে লক্ষ্যমাত্রা মার্চ ২০২৬ থেকে ধরা হয়েছে, তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা এবং সৌরশক্তির ওপর জোর দেয়া।
৪. কূটনৈতিক দরকষাকষি : চীন ও ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ‘স্মার্ট রিব্যালান্সিং’ করা। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিরতা এবং হরমুজ প্রণালীর সঙ্কটের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম যেকোনো সময় ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে (বর্তমান প্রাক্কলন অনুযায়ী)। এ অবস্থায় আমদানিকৃত বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ উৎস অনুসন্ধানে জোর দিতে হবে।
আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া বিদ্যুৎ খাতের এই ‘বিষফোঁড়া’ এখন পুরো অর্থনীতির রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে। ১৮ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকার তিন মাস মেয়াদি ভর্তুকি কেবল হিমশৈলের চূড়া মাত্র। যদি এখনই বড় বড় জয়েন্ট ভেঞ্চার এবং আদানির মতো চুক্তিগুলো সংশোধন করা না যায়, তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৪২ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকির বোঝা বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে ধসিয়ে দিতে পারে। বিদ্যুৎ বিভাগের এই সাহসী প্রস্তাবনাটি অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদিত হওয়া এবং দ্রুত বাস্তবায়ন করা এখন জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে জরুরি হয়ে পড়েছে।



