একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি হলো জ্বালানি। শিল্প উৎপাদন থেকে শুরু করে কৃষি সংশ্লিষ্ট উপকরণ এবং দৈনন্দিন যাতায়াত—সবকিছুই জ্বালানি তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। বিদ্যুৎ উৎপাদনেও রয়েছে তরল জ্বালানির ভূমিকা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে যে অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা কেবল সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ায়নি, বরং জাতীয় অর্থনীতির সক্ষমতাকেও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে পেট্রোল ও অকটেনের মতো জ্বালানির জন্য গ্রাহকদের দীর্ঘ অপেক্ষা এবং ফিলিং স্টেশনগুলোতে ‘তেল নেই’ সঙ্কেত আমাদের সরবরাহ ব্যবস্থার সাময়িক ভঙ্গুরতাকে প্রকট করেছে। অথচ গভীর অনুসন্ধান ও পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। আমাদের দেশে অকটেন ও পেট্রোলের কোনো প্রকৃত ঘাটতি নেই, বরং আমরা এই দুই জ্বালানিতে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। সরকারও সঙ্কট মোকাবেলায় নিরলসভাবে কাজ করছে। এখন প্রয়োজন কেবল আমাদের সম্মিলিত সচেতনতা। সরকার ও জনগণের মধ্যে একটি আস্থার সম্পর্ক থাকলে যে কোনো বৈশ্বিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে বাংলাদেশ তার সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে পারবে।
বাংলাদেশে জ্বালানি চাহিদা, উৎপাদন ও আমদানির প্রকৃত চিত্র :
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ লাখ মেট্রিক টন। এর একটি বড় অংশ ডিজেল হলেও পেট্রোল ও অকটেনের হিসাবটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।
ডিজেল : মোট চাহিদার প্রায় ৭৫ শতাংশই হলো ডিজেল। বছরে প্রায় ৫০-৫৫ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল প্রয়োজন হয়, যার সিংহভাগই আমদানি করতে হয়। কৃষি সেচ এবং ভারী পরিবহনে এটি অপরিহার্য। ভারত, কুয়েত, মালয়েশিয়া এবং আরব আমিরাত থেকে এটি সংগ্রহ করা হয়।
অকটেন ও পেট্রোল : দেশে বছরে অকটেনের চাহিদা প্রায় ৩.৫ থেকে চার লাখ মেট্রিক টন এবং পেট্রোলের চাহিদা প্রায় ৩.৫ লাখ মেট্রিক টন।
উৎপাদন ও স্বয়ংসম্পূর্ণতা : এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে, বাংলাদেশ পেট্রোল ও অকটেনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার সক্ষমতা রাখে। আমাদের দেশের গ্যাস ক্ষেত্রগুলো থেকে উপজাত হিসেবে যে ‘কন্ডেনসেট’ পাওয়া যায়, তা দেশীয় রিফাইনারি এবং বেসরকারি ফ্র্যাকশনেশন প্ল্যান্টগুলোতে পরিশোধন করে মানসম্মত পেট্রোল ও অকটেন উৎপাদন করা সম্ভব। ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) এবং বিভিন্ন বেসরকারি শোধনাগারের সম্মিলিত সক্ষমতা আমাদের এই খাতে আমদানিনির্ভরতা কমানোর সুযোগ দেয়। অর্থাৎ, পেট্রোল ও অকটেনের জন্য আমাদের বিদেশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় না; আমাদের নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদই এর যোগান দিতে সক্ষম।
জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সরকারের সাহসী পদক্ষেপ : ২০২৬ সালের এই প্রারম্ভে বিশ্ব যখন লোহিত সাগরের অস্থিরতা ও ভূ-রাজনৈতিক সঙ্কটে বিপর্যস্ত, তখন বাংলাদেশের বর্তমান সরকার এক সাহসী ও জনবান্ধব নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি বৃদ্ধি পেলেও সরকার সাধারণ মানুষের ওপর সেই বোঝা চাপাতে চায় না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার কেবল দাম স্থিতিশীল রাখেনি, বরং সরবরাহ নিশ্চিত করতে কঠোর প্রশাসনিক ও কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
সরকারের নির্দেশে বিপিসি দেশের প্রধান জ্বালানি ডিপোগুলোতে পর্যাপ্ত ‘বাফার স্টক’ বা জরুরি মজুত নিশ্চিত করেছে। চট্টগ্রামের প্রধান টার্মিনাল ছাড়াও উত্তর ও দক্ষিণ বঙ্গে নতুন স্টোরেজ ট্যাংক নির্মাণ করা হয়েছে। জ্বালানি ডিপোগুলোর নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ১৯টি প্রধান ডিপোতে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। কোনো ধরনের অনিয়ম বা পাচার রোধে এটি একটি কঠোর বার্তা। এছাড়াও প্রতিটি বড় ফিলিং স্টেশনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগ দেয়া হয়েছে, যারা প্রতিদিনের বিক্রি ও মজুতের হিসাব তদারকি করছেন।
কৃত্রিম সঙ্কট ও অব্যবস্থাপনা : বর্তমান সঙ্কটের মূলে সম্পদের অভাব নয়, বরং রয়েছে গভীর প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং স্বার্থান্বেষী মহলের কারসাজি।
যেমন– ডলার সঙ্কট ও বকেয়া পাওনা : অতীতের তথ্যানুয়ায়ী আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের বকেয়া পাওনা সময়মতো পরিশোধে জটিলতা এবং এলসি খুলতে বিলম্বের কারণে মাঝেমধ্যে তেলের জাহাজ বন্দরে এসেও খালাস হতে দেরি করে। এটি একটি সাময়িক সমস্যা হলেও একে পুঁজি করে গুজব ছড়ানো হয়।
মজুতদারি ও কালোবাজারি : কিছু অসাধু ডিলার এবং পাম্প মালিক দাম বাড়ার গুজবে জ্বালানি তেল অবৈধভাবে ড্রামজাত করে মজুত করছেন। এটি কেবল আইনত দণ্ডনীয় অপরাধই নয়, বরং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এক ধরনের অর্থনৈতিক অন্তর্ঘাত।
আতঙ্কিত বা প্যানিক কেনাকাটা : সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘তেল ফুরিয়ে যাবে’ এমন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে তারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ শুরু করে। কেউ বাইকের ট্যাঙ্ক ফুল করার পাশাপাশি জারে করে তেল কিনে রাখছেন। আপনার এই বাড়তি ক্রয় বাজারে অযথা চাপের সৃষ্টি করে এবং প্রকৃত সঙ্কটের জন্ম দেয়।
নতুন খনি অনুসন্ধান পার্বত্য চট্টগ্রাম ও ব্লু ইকোনমিতে নজর :
দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার দেশীয় উৎপাদনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাব্য আধার পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সমুদ্রতলে (ব্লু ইকোনমি) নতুন নতুন খনি অনুসন্ধান করা এখন সময়ের দাবি। পার্বত্য অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতিতে বিপুল পরিমাণ গ্যাস ও তেল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা আমাদের পরনির্ভরশীলতা সম্পূর্ণ কমিয়ে দিতে পারে। গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের যে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তা সফল হলে বাংলাদেশ জ্বালানি রফতানিকারক দেশেও পরিণত হতে পারে। নিজস্ব উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধিই হবে আমাদের আগামী দিনের প্রধান রক্ষা কবচ।
সরকারের জন্য গাইডলাইন ও নীতিনির্ধারণী সংস্কার :
জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে সরকারকে আরো কিছু দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন–
বেসরকারীকরণ ও বাজার উন্মুক্তকরণ : বিপিসি-র একচেটিয়া আধিপত্য কমিয়ে বেসরকারি খাতকে তেল আমদানি ও বিপণনের অনুমতি দিলে প্রতিযোগিতা বাড়বে।
স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ : আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে মিল রেখে প্রতি মাসে তেলের দাম সমন্বয়ের একটি ‘ডাইনামিক প্রাইসিং’ মডেল অনুসরণ করা জরুরি। এতে ভর্তুকির চাপ কমবে। তবে অবশ্যই কৃষিখাত ও দরিদ্রদের জন্য বিশেষ ভর্তুকি ও সুরক্ষা ব্যবস্থা রাখতে হবে।
কৌশলগত মজুত : আপদকালীন সময়ের জন্য কমপক্ষে ৯০ থেকে ১০০ দিনের জ্বালানি মজুত রাখার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
বিকল্প মুদ্রায় লেনদেন : ডলারের ওপর চাপ কমাতে আঞ্চলিক দেশগুলোর সাথে স্থানীয় বা বিকল্প মুদ্রায় জ্বালানি আমদানির পথ প্রশস্ত করতে হবে।
জনগণকেও হতে হবে অতন্দ্র প্রহরী :
সরকার যখন বিশ্ববাজারের প্রচণ্ড চাপ উপেক্ষা করে সাধারণ মানুষের পকেট বাঁচাতে লড়ছে, তখন জনগণের সহযোগিতা ছাড়া সেই লড়াইয়ে জেতা অসম্ভব।
আমাদের যা করতে হবে : গুজব প্রতিরোধ : জ্বালানি তেলের সঙ্কট হচ্ছে বা দাম বাড়ছে—এমন ভিত্তিহীন তথ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করবেন না। গুজবই কৃত্রিম সঙ্কটের প্রধান জ্বালানি।
আতঙ্কিত হয়ে ক্রয় বন্ধ করা : সরবরাহ স্বাভাবিক আছে, তাই কেবল যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু কিনুন। আপনার অতিরিক্ত কেনা তেল অন্য একজনের প্রাপ্য অধিকার কেড়ে নিচ্ছে।
অবৈধ মজুদের তথ্য প্রদান : আপনার আশেপাশে কোথাও ড্রাম ভর্তি তেল লুকিয়ে রাখা হলে অবিলম্বে স্থানীয় প্রশাসন বা থানায় অবহিত করুন। মজুদদারদের রুখে দেয়া আজ আমাদের জাতীয় কর্তব্য।
মিতব্যয়িতা : ব্যক্তিগত গাড়ির অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমিয়ে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহারে উৎসাহিত হওয়া এবং জ্বালানি সাশ্রয় করা দেশপ্রেমের একটি অংশ।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল একটি প্রশাসনিক কাজ নয়, এটি জাতীয় সার্বভৌমত্বেরও অংশ। বাংলাদেশ পেট্রোল ও অকটেনে সক্ষম, আমাদের ডিপোগুলো পূর্ণ এবং সরকার নিরলসভাবে কাজ করছে। এখন প্রয়োজন কেবল আমাদের সম্মিলিত সচেতনতা। সরকার ও জনগণের মধ্যে একটি আস্থার সম্পর্ক থাকলে যেকোনো বৈশ্বিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে বাংলাদেশ তার সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে পারবে। মনে রাখবেন, আপনার একটু সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণ একটি বড় জাতীয় সঙ্কট মোকাবেলায় ‘গেম-চেইঞ্জার’ হিসেবে কাজ করতে পারে।
তথ্যসূত্র :
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বার্ষিক প্রতিবেদন।
পেট্রোবাংলা ও ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) ডাটাবেস।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক প্রতিবেদন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) অর্থনৈতিক সমীক্ষা।
লেখক : সাংবাদিক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।



