বৈশাখ হাওর এলাকায় ফসল কাটার উৎসব। এই উৎসবকে বলা হয় ‘বৈশাইগ্যা’। হাওরে বৈশাইগ্যা আসতে আর কয়েক দিন বাকি। কৃষক প্রস্তুত হচ্ছেন ‘দাওয়া-মাড়া’ অর্থাৎ ধান কাটা ও মাড়াইয়ে। কিন্তু এবার কিশোরগঞ্জের হাওরে নেমে এসেছে নজিরবিহীন বিপর্যয়। ওখানে ১০ হাজার হেক্টর জমির ধান নষ্ট হবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। গতকাল নয়া দিগন্তের খবরে জানানো হয়েছে, যারা বিএডিসি (বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন) থেকে বীজ নিয়ে উচ্চ ফলনশীল ব্রি-ধান ৮৮ চাষ করেছেন, সেসব কৃষক এখন দিশেহারা।
একই জমিতে দেখা যাচ্ছে নানা জাতের ধান। কোনোটা পেকে ঝরে পড়ছে, কোনোটা আধা পাকা, আবার কোনোটায় কেবল শীষ এসেছে। কৃষকরা বুঝতে পারছেন না, এই ফসল কিভাবে গোলায় তোলা হবে। মূলত বীজে জাত-মিশ্রণে এ ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বিএডিসির মতো একটি প্রতিষ্ঠান থেকে সরবরাহ করা বীজে এমন মিশ্রণকে কেবল ‘সামান্য ভুল’ বা ‘প্রাকৃতিক কারণ’ বলার সুযোগ নেই। কিশোরগঞ্জে প্রায় ১৮ হাজার ৫৬০ হেক্টর জমিতে ব্রি-ধান ৮৮ আবাদ হয়েছে। তবে অর্ধেকের বেশি জমিতে দেখা দিয়েছে বিপর্যয়। মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, বিএডিসির প্যাকেটে পাওয়া বীজে বিভিন্ন জাতের মিশ্রণ থাকায় ধানের জীবনচক্রে ভিন্নতা দেখা দিয়েছে। এতে একই গুচ্ছের কোনো ধান আগে পাকছে, কোনোটা পরে। এ কারণে ধান কাটায় দেখা দিয়েছে সমস্যা। যান্ত্রিক বা সনাতন, কোনো পদ্ধতিতে কাটা সম্ভব নয়। এর পেছনে যে অশুভ ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, সেটিও উদ্বেগজনক। নয়া দিগন্তের কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধির সাথে কথা বলে জানা গেছে, বিএডিসির অসাধু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছেন সেখানকার কৃষকরা। তাদের অভিযোগ, খোলাবাজার থেকে সাধারণ ধান সংগ্রহ করে বিএডিসির সিলমারা প্যাকেটে ভরে বীজ হিসেবে কৃষকের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে।
বিএডিসি সাধারণত নিজস্ব খামারে বা নিবন্ধিত চাষিদের মাধ্যমে কঠোর তত্ত্বাবধানে বীজ উৎপাদন ও শোধন করে থাকে। যেখানে প্রতিটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণ করার কথা, সেখানে বিশাল পরিমাণ বীজে মিশ্রণ কিভাবে সম্ভব হলো, তার জবাব বিএডিসিকে দিতে হবে। সরকারের এই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা দায় এড়াতে ‘ন্যাচারাল মিউটেশন’ বা সেচ ব্যবস্থাপনার অজুহাত দিচ্ছেন, যা দায়িত্বজ্ঞানহীন। বিএডিসির ওপর আস্থা রেখে কৃষক বীজ কেনেন। আবাদ করেন।
কোনো অসাধু কর্মকর্তা এ অপকর্মের সাথে জড়িত থাকলে তাদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। সেই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত ১০ হাজার হেক্টর জমির কৃষকদের রক্ষায় সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। যারা ধারদেনা করে চাষ করে সর্বস্বান্ত হওয়ার পথে, তাদের ক্ষতি নিরূপণ করে দ্রুত সময়ে ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা জরুরি। না হয় এই বিশাল অঞ্চলের কৃষক আগামী মৌসুমে চাষাবাদের সামর্থ্য ও আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। একই সাথে বিএডিসির ভেতরে কোনো সিন্ডিকেট ঘাপটি মেরে থাকলে সেটি উপড়ে ফেলতে হবে। যারা কৃষিপ্রধান দেশে কৃষকের ফসলের সাথে প্রতারণা করতে পারেন, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। ‘কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে’ এ স্লোগান যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, তার প্রমাণ প্রশাসনকে দিতে হবে।



