জ্বালানি নিরাপত্তায় বিকল্প পথে সরকার

হরমুজ নিয়ে অচলাবস্থা

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতি দিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত গ্যাস পরিবাহিত হয়। এই রুটে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর, বাংলাদেশও যার বাইরে নয়। এই প্রেক্ষাপটে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে বেশ কিছু বিকল্প প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ শুরু করেছে। নীতিনির্ধারকরা বলছেন, কেবল তাৎক্ষণিক সঙ্কট মোকাবেলা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা টেকসই করতে বহুমুখী কৌশল গ্রহণ করা হচ্ছে।

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition

মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন কিছু নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতি দিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত গ্যাস পরিবাহিত হয়। এই রুটে কোনো ধরনের বিঘœ ঘটলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর, বাংলাদেশও যার বাইরে নয়। এই প্রেক্ষাপটে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে বেশ কিছু বিকল্প প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ শুরু করেছে। নীতিনির্ধারকরা বলছেন, কেবল তাৎক্ষণিক সঙ্কট মোকাবেলা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা টেকসই করতে বহুমুখী কৌশল গ্রহণ করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, বিশ্বের প্রায় সব বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি তেল আমদানির চেষ্টা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে যে পরিমাণ জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়েছে তা দিয়ে চলতি এপ্রিল ও আগামী মে মাস পর্যন্ত সরবরাহ করা যাবে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বেশ কিছু বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের শুরুর দিন থেকেই সরকার বলে আসছে জ্বালানি তেলের কোনো সঙ্কট হবে না। আমরা জ্বালানি তেল আমদানির বিকল্প নানা উৎস ব্যবহার করে জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহ চেইন ঠিক রাখছি। তিনি বলেন, গত বছরের চেয়ে চলতি মাসে প্রতি দিনই বেশি জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে, পাম্পগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ লাইন কেন- এমন এক প্রশ্নের জবাবে মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে বেশি তেল নিচ্ছে। আগে একটি গাড়িতে যে পরিমাণ ডিজেল বা পেট্রোল/ অকটেন সংগ্রহ করতো এখন তার চেয়ে বেশি নিচ্ছে। অনেকেই তার নিজের চাহিদার চেয়ে বেশি জ্বালানি নিচ্ছেন। এটা হচ্ছে অনেকটা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে। অনেকেই ব্যক্তি পর্যায়ে জ্বালানি তেল মজুদ করছে। আবার কোথাও কোথাও পাম্পগুলোর বিরুদ্ধে মজুদের অভিযোগ উঠেছে। আমরা দেশব্যাপী মজুদ বন্ধে তদারকি করছি। অনেক জায়গায় ধরাও পড়ছে। তিনি গ্রাহকদের অভয় দিয়ে বলেন, বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। বিকল্প উৎস থেকে আমদানি করা হচ্ছে। এ জন্য আতঙ্কগ্রস্ত না হয়ে মজুদ না করে প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল সরবরাহ করতে গ্রাহকদের অনুরোধ করেন।

হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব ও ঝুঁকি : বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথটি অচল হয়ে পড়লে বা আংশিকভাবে ব্যাহত হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক অস্থিরতার কারণে ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ওঠানামা করছে, যা আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। বাংলাদেশ বছরে যে পরিমাণ জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানি করে, তার একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। ফলে হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীলতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।

বিকল্প সরবরাহ উৎস খোঁজা : সরকারের অন্যতম প্রধান কৌশল হচ্ছে জ্বালানির বিকল্প উৎস খুঁজে বের করা। জ্বালানি বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনেই, এমনকি আফ্রিকার কিছু দেশ থেকেও জ্বালানি আমদানির সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে। এ ছাড়া স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির দিকে ঝুঁকছে সরকার। এতে সরবরাহে স্থিতিশীলতা আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কৌশলগত মজুদ বাড়ানোর উদ্যোগ : বর্তমানে বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের মজুদ সীমিত সময়ের জন্যই যথেষ্ট। হরমুজ অচলাবস্থার মতো পরিস্থিতিতে এই মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে যেতে পারে। তাই সরকার কৌশলগত মজুদ বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। বিশেষ করে বড় আকারের তেল সংরক্ষণাগার নির্মাণ, বিদ্যমান ডিপোগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহারের জন্য আলাদা মজুদ রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

এলএনজি আমদানিতে বৈচিত্র্য : বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে এলএনজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রেও মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। এই নির্ভরতা কমাতে সরকার কাতারের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোর সাথে নতুন চুক্তির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। এ ছাড়া ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের পাশাপাশি স্থলভিত্তিক টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগও নেয়া হয়েছে, যাতে দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর : বর্তমান সঙ্কট সরকারকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে আরো গুরুত্ব দিতে বাধ্য করেছে। সৌর ও বায়ু শক্তির ব্যবহার বাড়াতে নতুন প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমদানিনির্ভর জ্বালানি থেকে ধীরে ধীরে সরে এসে দেশীয় ও নবায়নযোগ্য উৎসে বিনিয়োগ বাড়ানোই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি বৈচিত্র্য : বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস ও তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে কয়লা, এলএনজি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমন্বিত ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করেছে এবং আরো কিছু প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। তবে পরিবেশগত বিবেচনায় কয়লার ব্যবহার নিয়েও সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।

জ্বালানি সাশ্রয়ী উদ্যোগ : সরকার শুধু সরবরাহ বাড়ানোর দিকে নয়, চাহিদা কমানোর দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার, বিদ্যুৎ অপচয় রোধ এবং শিল্প খাতে দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মোট চাহিদা কমানোর চেষ্টা চলছে। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য লোড ম্যানেজমেন্ট বা সীমিত বিদ্যুৎ সরবরাহের মতো ব্যবস্থাও নেয়া হতে পারে।

আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ : জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। ভারত, নেপাল ও ভুটানের সাথে বিদ্যুৎ আমদানি-রফতানির সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি গ্যাস পাইপলাইন সংযোগের সম্ভাবনাও বিবেচনায় রয়েছে।

এই ধরনের সহযোগিতা জ্বালানি সরবরাহে বিকল্প পথ তৈরি করতে সহায়তা করবে।

নীতিগত সংস্কার ও বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ : সরকার জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে নীতিগত সংস্কারের উদ্যোগ নিচ্ছে। বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে এলএনজি আমদানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেয়া হচ্ছে।

চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা : যদিও সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে, তবে বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, উচ্চ ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ ছাড়া বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি করতে গেলে পরিবহন খরচ বাড়তে পারে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে অচলাবস্থা বাংলাদেশসহ অনেক দেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে এসেছে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একক উৎসের ওপর নির্ভরতা যে ঝুঁকিপূর্ণতা আবারও স্পষ্ট হয়েছে। সরকার যে বহুমুখী কৌশল গ্রহণ করেছে, তা বাস্তবায়ন করতে পারলে ভবিষ্যতে এ ধরনের সঙ্কট মোকাবেলা করা সহজ হবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর পরিকল্পনা, দ্রুত বাস্তবায়ন এবং স্বচ্ছতা। দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় জ্বালানি উৎস উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করাই হতে পারে টেকসই সমাধান। বর্তমান সঙ্কট সেই পথেই এগিয়ে যাওয়ার একটি সুযোগ তৈরি করেছে।