সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব বাবার : শিশুর অধিকার রক্ষায় সহায়ক হবে

আমরা মনে করি, পিতৃত্ব শুধু সন্তানের জন্মদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তার লালন-পালন এবং ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার দায়িত্বও সমানভাবে বাবার। এই দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া শুধু আইনের লঙ্ঘনই নয়, মানবিক মূল্যবোধেরও পরিপন্থী। এ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে উচ্চ আদালতের এই রায় একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এটি ভবিষ্যতে অনুরূপ মামলায় দিকনির্দেশনা হতে পারে। সেই সাথে শিশুদের অধিকার সুরক্ষায় বিচার বিভাগের দৃঢ় অবস্থানকে আরো সুসংহত করবে।

নারী-পুরুষ বিয়েবন্ধনের মাধ্যমে দাম্পত্য জীবন শুরু করেন। বিয়ের মূল উদ্দেশ্য- পরিবার গঠন করে মানবধারা অক্ষুণ্ন রাখা। কিন্তু নানা কারণে অনেক বিয়ে বিচ্ছেদে গড়ায়। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদে নাবালক সন্তানের বেড়ে ওঠায় আর্থ-সামাজিক বহুমাত্রিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। এ জন্য তালাকপ্রাপ্ত নারী ও তার গর্ভের সন্তানের অধিকার নিশ্চিতে কিছু বিধান আছে। কিন্তু আমাদের দেশে অনেক পুরুষ সেই বিধান পালন করেন না। এবার নাবালক সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্বের একটি সুরাহা করে দিয়েছেন উচ্চ আদালত।

বৈবাহিক বিরোধ থাকলেও নাবালক সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব বাবার। হাইকোর্টের একটি একক বেঞ্চ গত ২২ জুন এই রায় দিয়েছেন। পূর্ণাঙ্গ রায়টি গত বৃহস্পতিবার হাতে পেয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবী। রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, নাবালক সন্তানের ভরণপোষণের অধিকার মা-বাবার মধ্যে বৈবাহিক বিরোধ আছে কি না, তার ওপর নির্ভরশীল নয়। তালাক বৈধ বা কার্যকর হয়েছে কি না, এ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও নাবালক সন্তানের ভরণপোষণের আইনগত দায়িত্ব বাবার ওপর বর্তায়। এক মামলায় (সিভিল রিভিশন) হাইকোর্টের রায়ে এমন অভিমত এসেছে।

হাইকোর্টের এই রায় শুধু একটি আইনি সিদ্ধান্ত নয়; সমাজে পিতৃত্বের দায়িত্ব ও শিশুর অধিকার সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। রায়ের মাধ্যমে আদালত স্পষ্ট করেছেন, দাম্পত্য সম্পর্কের অবসান হলেও বাবা-মায়ের সন্তানের প্রতি দায়িত্বের অবসান ঘটে না। বিশেষ করে নাবালক সন্তানের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও সার্বিক বিকাশ নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব থেকে কোনো বাবা নিজেকে মুক্ত রাখতে পারেন না।

কে না জানেন, আমাদের সমাজে বিয়েবিচ্ছেদ বা দাম্পত্য কলহের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয় শিশুরা। বিচ্ছেদের পর অনেকসময় সন্তানের দায়িত্ব এককভাবে মায়ের ওপর বর্তায়। ফলে মায়েরা আর্থ-সামাজিক ও মানসিক সঙ্কটে পড়েন। অন্য দিকে সন্তানের প্রাপ্য ভরণপোষণ থেকে বঞ্চিত হওয়ায় তার স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এমন বাস্তবতায় হাইকোর্টের রায় শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়া দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। সংবিধান, প্রচলিত আইন এবং আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদ, সব শিশুর নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার কথা বলে। আদালতের এই রায় সেই নীতিগুলো আরো দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করবে। এটি মনে করিয়ে দেয়, সন্তানের ভরণপোষণ কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; একটি আইনগত ও নৈতিক দায়িত্ব। আদালত রায় দিয়ে তার দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন এ রায়ের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে।

আমরা মনে করি, পিতৃত্ব শুধু সন্তানের জন্মদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তার লালন-পালন এবং ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার দায়িত্বও সমানভাবে বাবার। এই দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া শুধু আইনের লঙ্ঘনই নয়, মানবিক মূল্যবোধেরও পরিপন্থী। এ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে উচ্চ আদালতের এই রায় একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এটি ভবিষ্যতে অনুরূপ মামলায় দিকনির্দেশনা হতে পারে। সেই সাথে শিশুদের অধিকার সুরক্ষায় বিচার বিভাগের দৃঢ় অবস্থানকে আরো সুসংহত করবে। একটি সভ্য ও মানবিক সমাজে প্রতিটি শিশুর নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবারের সম্মিলিত দায়িত্ব। নিঃসন্দেহে আদালতের এ রায় সেই দায়িত্ব পালনের পথে একটি মাইলফলক।