বৈশ্বিকভাবে কূটনৈতিক চুক্তির মাধ্যমে অর্জিত শান্তি প্রায়শ দীর্ঘস্থায়ী হয় না। এর পেছনে বেশ কিছু গভীর কারণ রয়েছে। যেমন—
আদর্শিক ভিত্তির অভাব : শান্তির জন্য কেবল রাজনৈতিক সমঝোতাই যথেষ্ট নয়, এ জন্য শক্তিশালী আদর্শিক ভিত্তি প্রয়োজন। যদি চুক্তিতে ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও নৈতিক মূল্যবোধের পরিবর্তে কেবল রাজনৈতিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া হয়, তবে সেই শান্তি ক্ষণস্থায়ী হয়।
রাজনৈতিক ও জাতীয় স্বার্থের প্রাধান্য : অধিকাংশ কূটনৈতিক চুক্তি বড় দেশগুলোর ভূ-রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে তৈরি হয়। অনেক সময় মানবিক কারণকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে দেশগুলো নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে অবিশ্বাসের জন্ম দেয় এবং চুক্তির বিশ্বাসযোগ্যতা কমিয়ে দেয়।
মূল সঙ্কটের সমাধান না হওয়া : চুক্তির মাধ্যমে সাময়িকভাবে যুদ্ধ থামানো গেলেও সঙ্কটের মূল কারণগুলো অনেক সময় অমীমাংসিত থেকে যায়। ফলে বাহ্যিক স্থিতিশীলতা দেখা গেলেও ভেতরে অসন্তোষ দানা বাঁধতে থাকে, যা পরে বড় সঙ্ঘাতের রূপ নেয়।
পরবর্তী কৌশল বা পুনর্গঠন পরিকল্পনার অভাব : মানবিক হস্তক্ষেপ বা চুক্তির পর সংশ্লিষ্ট দেশটিতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতি বজায় রাখার জন্য কোনো সুসঙ্গত পুনর্গঠন কৌশল (Post-conflict strategy) না থাকলে সেখানে অরাজকতা সৃষ্টি হতে পারে। লিবিয়ার উদাহরণ থেকে দেখা যায়, যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে শান্তি রক্ষার উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত দেশটিকে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
মানবিক মর্যাদার উপেক্ষা : যে চুক্তিতে সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অধিকার নিশ্চিত হয় না, তা প্রকৃতপক্ষে স্থায়ী শান্তি আনতে পারে না। চুক্তির পর যদি মানুষ তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকে, তবে সেই কূটনৈতিক বিজয়কে আদর্শিক পরাজয় হিসেবে দেখা হয়।
পক্ষপাতিত্ব ও বৈষম্যমূলক প্রয়োগ : আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় বড় দেশগুলোর আধিপত্য থাকায় (যেমন— জাতিসঙ্ঘে ভেটো ক্ষমতা) অনেক সময় হস্তক্ষেপ বা শান্তিপ্রক্রিয়া পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে। কৌশলগত গুরুত্ব অনুযায়ী কোনো সঙ্কটকে গুরুত্ব দেয়া শান্তির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। মানবিকতার প্রতিফলন বনাম কাগজের চুক্তি : কেবল রাজনৈতিক চুক্তির মাধ্যমে সম্ভব নয়, প্রকৃত শান্তি মানুষের হৃদয়ে গ্রোথিত এবং বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হতে হবে। মানবিকতা, ন্যায়বিচার ইত্যাদি কেবল কূটনৈতিক কৌশলে অর্জন করা সম্ভব নয়।
লিও তলস্তয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ (যুদ্ধ ও শান্তি) বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম সেরা এবং কালজয়ী মহাকাব্যিক উপন্যাস। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে রাশিয়ার ওপর ফরাসি আক্রমণের প্রেক্ষাপটে এটি রচিত। এতে পাঁচটি অভিজাত রাশিয়ান পরিবারের উত্থান-পতন, প্রেম, বিরহ ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে। তলস্তয় এখানে মানুষের জীবনের অর্থ, যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং ইতিহাসের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে সাধারণ মানুষের ভূমিকা তুলে ধরেছেন। তলস্তয় বিভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে যুদ্ধের ধ্বংস, মানবতার মুক্তি, জীবনের উচ্ছ্বাস ও প্রেমকে মহীয়ান করার প্রয়াস পেয়েছেন। বইটি কেবল যুদ্ধের গল্প নয়; বরং মানবজীবন, সমাজ ও দর্শনের এক অসাধারণ দলিল।
তলস্তয় তার উপন্যাসে অহঙ্কার ও যুদ্ধক্ষেত্রের অসারতা দ্ব্যর্থহীনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তলস্তয় বিশ্বাস করতেন, নেপোলিয়নের মতো বড় শাসকরা ইতিহাস তৈরি করেন না। সাধারণ মানুষের ছোট ছোট সম্মিলিত কর্মকাণ্ড ও ভাগ্যের পরিহাসই ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণ করে। নাতাশার ভুল এবং এন্ড্রুর অভিমান শেষ পর্যন্ত ক্ষমার মাধ্যমে এক গভীর আত্মিক শান্তিতে রূপ নেয়। উপন্যাসটি আমাদের শেখায়, জীবনের প্রতিকূলতার মধ্যেও কিভাবে সরলতা, মানবতা ও ভালোবাসা টিকিয়ে রাখতে হয়।
যুদ্ধ ও শান্তির মতো গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও যুদ্ধবিরোধী দর্শন নিয়ে বিশ্বসাহিত্যে আরেকটি অত্যন্ত প্রভাবশালী ও কালজয়ী উপন্যাস হলো জার্মান লেখক এরিখ মারিয়া রেমার্কের ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’। যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা, শান্তির আকুলতা ও মোহভঙ্গ বইটিতে দেখানো হয়েছে। যুদ্ধ কেবল মানুষের প্রাণ কাড়ে না; বরং যারা যুদ্ধ থেকে বেঁচে ফেরে, তাদের মানসিক শান্তিও চিরতরে ধ্বংস করে দেয়। নোবেলজয়ী লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘এ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’ উপন্যাসেও যুদ্ধের ভয়াবহতা বাদ দিয়ে মানবিকতা ও যুদ্ধের অসারতা তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্ব সাহিত্যের অমর গ্রন্থগুলো শান্তির জন্য যুদ্ধের অনুমোদন দেয়নি।
শান্তির জন্য যুদ্ধ বা মানবিক হস্তক্ষেপ (Humanitarian Intervention) কতটুকু যৌক্তিক, তা একটি জটিল বিতর্ক যা নৈতিকতা, আন্তর্জাতিক আইন এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর নির্ভরশীল। এ বিষয়টিকে কয়েকটি দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা যেতে পারে, যেমন— নৈতিক দায়বদ্ধতা R2P, রেসপন্সিবিলিটি টু প্রটেক্ট নীতিতে গণহত্যা বা জাতিগত নিধনের মতো অপরাধ থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষার জন্য যুদ্ধ বা সামরিক হস্তক্ষেপকে নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়। এই নীতি অনুযায়ী, কোনো দেশ তার জনগণকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এক্ষেত্রে মানবাধিকার রক্ষা এবং বড় ধরনের নৃশংসতা বন্ধ করার উদ্দেশ্যেই এই যুদ্ধকে ন্যায়সঙ্গত মনে করা হয়। এর পর আসে সার্বভৌমত্ব বনাম নৈতিকতার প্রশ্ন।
শান্তির জন্য যুদ্ধের যৌক্তিকতা প্রায়ই একটি দেশের সার্বভৌমত্বের (Sovereignty) নীতির সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়। যদিও সামরিক হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্য মানবিক হতে পারে, তবে এটি অন্য একটি স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে, যা অনেক সময় আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। এ বিষয়টির সাথে রাজনৈতিক স্বার্থ ও দ্বিমুখী নীতি জড়িত। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শক্তিশালী দেশগুলো তাদের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক স্বার্থ অর্জনের জন্য মানবিক হস্তক্ষেপের অজুহাত ব্যবহার করে। কৌশলগত গুরুত্বহীন দেশগুলোর তুলনায় খনিজসম্পদ সমৃদ্ধ বা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোতে দ্রুত সামরিক হস্তক্ষেপ করা হয়, যা এ ধরনের যুদ্ধের নৈতিক যৌক্তিকতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।
দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি একটি বড় ইস্যু। সঠিক পরিকল্পনা ও যুদ্ধের পরবর্তী পুনর্গঠন কৌশল ছাড়া শান্তির জন্য যুদ্ধ অনেক সময় দেশটিকে দীর্ঘমেয়াদি অরাজকতা ও অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেয়। যেমন— লিবিয়াতে বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষার উদ্দেশ্যে করা হস্তক্ষেপ পরবর্তীতে দেশটিতে চরম রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে।
ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে কেবল কূটনৈতিক চুক্তি বা সাময়িক যুদ্ধবিরতিই প্রকৃত শান্তি নয়; বরং ন্যায়বিচার, সুষম বণ্টন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া অর্জিত শান্তিকে আদর্শিক পরাজয় হিসেবে গণ্য করা হয়। যুদ্ধের মাধ্যমে বাহ্যিক বিজয় এলেও মানবিক মর্যাদা ও ধর্মীয় অধিকার যদি সুরক্ষিত না হয়, তবে সেই যুদ্ধ বা সমঝোতা শান্তি নিশ্চিত করতে পারে না।
শান্তির জন্য যুদ্ধের চেয়ে প্রতিরোধমূলক কূটনীতি (চৎবাবহঃরাব উরঢ়ষড়সধপু) এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতায়ন বেশি কার্যকর হতে পারে। যুদ্ধ তখনই যৌক্তিক বা সফল হতে পারে যখন তার পেছনে কেবল রাজনৈতিক স্বার্থ না থেকে বরং সুস্পষ্ট নৈতিক মানদণ্ড এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও উন্নয়নের পরিকল্পনা থাকে। সামগ্রিকভাবে, শান্তির জন্য যুদ্ধ তাত্ত্বিকভাবে যৌক্তিক মনে হলেও বাস্তবে এটি রাজনৈতিক ক্ষমতার খেলা এবং দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার ঝুঁকির কারণে প্রায়শই বিতর্কের জন্ম দেয়।
মানবিক হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে ‘রক্ষার দায়িত্ব’ নীতিটি আন্তর্জাতিক আইনি ও নৈতিক কাঠামো হিসেবে কাজ করে। ‘রক্ষার দায়িত্ব’ নীতির মূল কথা হলো— প্রতিটি রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব তার জনগণকে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, জাতিগত নিধন এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের মতো গণসহিংসতা থেকে রক্ষা করা। কোনো দেশের সরকার তার জনগণকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হলে বা নিজেই এ ধরনের অপরাধে লিপ্ত হলে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর সেই জনগণকে রক্ষার নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব বর্তায়। জাতিসঙ্ঘের ২০০৫ সালে গৃহীত এই নীতি মানবিক হস্তক্ষেপকে কেবল একটি রাজনৈতিক পছন্দের বদলে নৈতিক বাধ্যবাধকতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এ নীতির আওতায় কোনো সামরিক হস্তক্ষেপ করার ক্ষেত্রে কয়েকটি মৌলিক নীতি মেনে চলতে হয় : গৃহীত পদক্ষেপটি সঙ্কটের তুলনায় সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, কেবল চরম প্রয়োজনে এবং বেসামরিক নাগরিকদের ক্ষয়ক্ষতি সর্বনিম্ন রাখার লক্ষ্য নিয়ে এটি কার্যকর করা হচ্ছে কি না, জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের সম্মতি এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ, তবে নিরাপত্তা পরিষদ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে সাধারণ পরিষদের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর যৌথ সমর্থন হস্তক্ষেপের বৈধতা বৃদ্ধিতে সহায়তা যায় কি না, তাত্ত্বিকভাবে শক্তিশালী হলেও বাস্তবে এ নীতির প্রয়োগ প্রায়ই ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ এবং বড় দেশগুলোর আধিপত্যের কারণে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অনেক সময় বৃহৎ শক্তিগুলো তাদের কৌশলগত বা অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে, এমন অঞ্চলেই কেবল দ্রুত হস্তক্ষেপ করে, আর কৌশলগত গুরুত্বহীন অঞ্চলের সঙ্কটগুলো উপেক্ষা করা হয়ে থাকে।
ক্ষমতার প্রয়োগে প্রায়শ সার্বভৌমত্বের সাথে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের সংঘর্ষও ঘটে। বাস্তব উদাহরণগুলো বেদনাদায়ক। লিবিয়ায় (২০১১) বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষায় ন্যাটো সামরিক হস্তক্ষেপ করেছিল। পরে এটি কেবল বেসামরিক রক্ষা নয়; বরং শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হওয়ায় দেশটি দীর্ঘমেয়াদি অরাজকতার মুখে পড়ে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে ইরানে রেজিম চেঞ্জের চেষ্টা হয়েছে। সিরিয়া ও মিয়ানমারের (রোহিঙ্গা) ক্ষেত্রে চরম মানবিক সঙ্কট থাকা সত্ত্বেও নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ঐকমত্যের অভাব এবং ভেটো ক্ষমতার কারণে সুরক্ষার দায়িত্ব নীতি প্রয়োগ করা যায়নি।
সামগ্রিকভাবে, রক্ষার দায়িত্ব নীতি মানবিক বিপর্যয় রোধে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হলেও এর কার্যকারিতা অনেকাংশেই আন্তর্জাতিক ঐকমত্য, স্বচ্ছ মানদণ্ড এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব ও গ্রন্থকার



