অতিবৃষ্টিজনিত বৈরী আবহাওয়ায় এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিতের দাবি তোলা শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষামন্ত্রীর অবমাননাকর মন্তব্য গত সপ্তাহজুড়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। নির্ধারিত পরীক্ষার সময়সূচি অপরিবর্তিত রাখার পক্ষে মন্ত্রীর হয়তো সঙ্গতকারণ ছিল। কিন্তু শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের দাবানল তার সিদ্ধান্তের চেয়েও বেশি প্রজ্বলিত হয়েছে; মূলত যে অবজ্ঞাপূর্ণ ও তাচ্ছিল্যভরে বিষয়টি তিনি ব্যক্ত করেছেন, সে কারণে। শিক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’র সাথে তুলনা করে তিনি দৃশ্যত এটিই বোঝাতে চেয়েছেন, এরা অতি আদরে লালিত-পালিত, বাস্তবতাবিবর্জিত এবং জীবনের প্রকৃত রূঢ়তা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। তুলনাটি ছিল মর্যাদাহানিকর এবং নিষ্ঠুর। ফলে, গণ-অসন্তোষের মুখে তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ বা আশঙ্কা অযৌক্তিক ছিল না। জীবনের কঠিন বাস্তবতা বা কষ্টসহিষ্ণুতার প্রমাণ দিতে টিন-এজ শিক্ষার্থীরা নিজেদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলবে এটি প্রত্যাশিত হতে পারে না। তাদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করা অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তদুপরি, রাজধানীর বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা যাতায়াত ব্যবস্থাকে চরম দুর্বিষহ এবং রীতিমতো বিপজ্জনক করে তুলেছিল। এর পেছনে শিক্ষার্থীদের কোনো দায় ছিল না; বরং এটি নগরের পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল রাখতে এবং শহরটি ন্যূনতম বাসযোগ্য করে তুলতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চরম ব্যর্থতা। সরকারি দফতরের সেই ব্যর্থতা স্বীকার বা সংশোধন না করে, উল্টো সেই ব্যর্থতার অবর্ণনীয় পরিণতির মুখে ক্ষোভ প্রকাশ করায় মন্ত্রী যেভাবে শিক্ষার্থীদের অভিযুক্ত করলেন, তা এক কথায় নজিরবিহীন।
অনভিপ্রেত বাস্তবতা হলো, মাত্র কয়েক মাস আগে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীও দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে একইভাবে অবমাননাকর ও শ্লেষাত্মক মন্তব্য করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা তখন স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, নিজেদের প্রিয় শিক্ষায়তনের যেকোনো গঠনমূলক ও যৌক্তিক সমালোচনাকে তারা স্বাগত জানান; কিন্তু যে অপমানজনক ভাষায় মন্তব্য করা হয়েছিল, আপত্তি মূলত সেই শিষ্টাচারবহির্ভূত প্রকাশভঙ্গি নিয়ে। ছাত্রসমাজের তীব্র প্রতিক্রিয়ায় শেষ পর্যন্ত প্রতিমন্ত্রী তার বক্তব্য প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন। ভুলে গেলে চলবে না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। যদি এর শিক্ষার মান বা মর্যাদার কোনো অবক্ষয় ঘটে থাকে, তবে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে বিগত ও বর্তমানÑ সব সরকারকে এর দায় নিতে হবে। বছরের পর বছর ধরে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে চরম অবহেলা ও অর্থ-সঙ্কটে রেখে, সেই রাষ্ট্রীয় অবহেলার করুণ পরিণতির জন্য শিক্ষার্থীদের উপহাস করার অধিকার কোনো মন্ত্রীর থাকতে পারে না।
এই দু’টি ঘটনা এক সুতোয় গেঁথেছে একটি অভিন্ন বাস্তবতা। বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা আর রাজনীতিকদের কাছ থেকে আসা যেকোনো সমালোচনা মুখবুজে মেনে নিতে প্রস্তুত নন। বিশেষ করে যখন সেই সমালোচনা গঠনমূলক না হয়ে অবজ্ঞা, তাচ্ছিল্য কিংবা অপমানের ভাষায় উচ্চারিত হয়। সমাজ দ্রুত বদলাচ্ছে। আর প্রতিটি নতুন প্রজন্ম আগের প্রজন্মের তুলনায় অন্ধ আনুগত্য বা নিঃশর্ত শ্রদ্ধার সংস্কৃতি থেকে ক্রমে সরে আসছে। কেবল বয়সের জোরে কিংবা পদমর্যাদায় এখন আর তরুণদের সম্মান দাবি করা যায় না। কারণ, আমাদের অনেক প্রবীণ, বিশেষত রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সাথে নিজেদের জড়িয়ে ফেলেছেন। তারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়নে উল্লেখযোগ্য কিছু করতে পারেননি; বরং নিজের সন্তানকে উচ্চশিক্ষার জন্য ঠিকই বিদেশে পাঠান। পরিতাপের বিষয় হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীন বাংলাদেশের চেয়ে ঔপনিবেশিক শাসনামলে বেশি মর্যাদা ও সম্মান ভোগ করত। এ ব্যর্থতা শিক্ষার্থীদের নয়; আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা। প্রাজ্ঞ রাজনীতিকদের উপলব্ধি করা প্রয়োজন, তরুণ প্রজন্মের কাছ থেকে সম্মান জোর করে আদায় সম্ভব নয়। দাবি করে নয়, সম্মান অর্জন করতে হয়।
রাজনীতিবিদদের এখন অন্তত এটি অনুধাবন করা উচিত, ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লবের পর শিক্ষার্থীদের আর স্রেফ ‘অবুঝ শিশু’ বলে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নেই। দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বাঘা বাঘা রাজনীতিকরা যা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন, এই তরুণরা রক্ত আর চরম আত্মত্যাগের বিনিময়ে তা-ই করে দেখিয়েছেন। তারা একটি আঞ্চলিক পরাশক্তির মদদপুষ্ট স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার পতন ঘটিয়েছেন। দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছেন। অথচ এই গুরুভার কখনো তাদের কাঁধে পড়ার কথা ছিল না। দায়িত্ব ছিল রাজনীতিকদের। সত্যি হলো, রাজনীতিবিদরা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। ব্যর্থ রাজনীতিবিদদের দায়িত্ব নিয়ে তরুণদের রাজপথে নামতে হয়েছে। তাই রাজনীতিবিদদের লম্বা-চওড়া নীতিবাক্য শোনার ধৈর্য শিক্ষার্থীদের থাকবে না, এটাই স্বাভাবিক। যে গণতন্ত্র রক্ষা করতে নিজেরা ব্যর্থ হয়েছেন, সেই গণতন্ত্র নিজেদের রক্তে পুনরুদ্ধার করা তরুণদের উপদেশ দেয়ার নৈতিক অধিকার এসব রাজনীতিক কোথা থেকে পান? আর যেসব শিক্ষার্থী বুক পেতে বুলেট নিয়েছেন, সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে লড়াই করেছেন এবং নিজেদের বন্ধু ও সহপাঠীদের চোখের সামনে মরতে দেখেছেন, তাদের কোন সাহসে ‘ফার্মের মুরগি’ বলে আখ্যা দেন?
বিএনপির অভ্যন্তরে একশ্রেণীর আইনজীবী এবং রাজনীতিবিদের মধ্যে জুলাই বিপ্লবের রাজনৈতিক ও আইনি তাৎপর্য খাটো করে দেখার প্রবণতা স্পষ্ট। কিন্তু তারা চোখ বন্ধ রাখলে তো আর সত্যিটা মিথ্যা হয়ে যায় না। এ বিপ্লব আমাদের সামগ্রিক রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে শিক্ষার্থীদের অবস্থানকে নতুন উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। সরকার এ বাস্তবতা স্বীকার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করুক বা না করুক, শিক্ষার্থীরা যে পূর্ববর্তী শাসনব্যবস্থার পতনে নেতৃত্বমূলক ভূমিকা পালন করেছেন, তা সর্বজনস্বীকৃত। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারও মন্ত্রিসভায় শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের স্থান দিয়ে সেই সত্য আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে। ফলে শিক্ষার্থীরা এখন আর স্রেফ কোনো দলের সহযোগী বলয় নন। তারা সম্পূর্ণ নিজস্ব শক্তিতে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি। একটি প্রচ্ছন্ন ভোট ব্যাংক। একইসাথে সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনতে সক্ষম এক শক্তিশালী চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। আজ তারা যখন রাজপথে নামেন, সরকার আর তাদের ওপর মুরুব্বিপনার বা সস্তা সান্ত্বনা দেয়ার সাহস দেখায় না; বরং তাদের দাবি ও যুক্তি শুনতে রাষ্ট্র বাধ্য হয়।
প্রকৃতপক্ষে এ দেশের আসল ‘ফার্মের মুরগি’ শিক্ষার্থীরা নন, বরং সেই সব সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদ যারা আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনকালের বেশির ভাগ সময় বিদেশে পাচার করা বিপুল অর্থে পশ্চিমা বিশ্বে পরম আয়েশে জীবন কাটিয়েছেন; কিংবা আওয়ামী লীগ বা শেখ মুজিব পরিবারের সাথে পারিবারিক বা ব্যবসায়িক সম্পর্কের সুবাদে দেশে থেকেও সুরক্ষিত ছিলেন। স্বৈরাচারী আমলে তারা নিজেরা কোনো ঝুঁকিতে যাননি, অথচ আজ সেই তরুণদের নীতিশিক্ষা দিচ্ছেন যারা রাজপথে এবং আদালতে একটি নৃশংস ও বর্বর সরকারের বিরুদ্ধে বুক পেতে লড়াই করেছেন। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নিজেদের বিলাসবহুল ‘মুরগির খাঁচায়’ আরাম-আয়েশে কাটানোর পর, এখন তারা রাজনীতিতে ফিরে এসে ভাবছেন মাঠটা ঠিক আগের মতোই আছে। সরকারের ভেতরের কেউ কেউ মনে হয় বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন, জুলাই বিপ্লবের অর্থ কেবল দুর্নীতিবাজ ও অত্যাচারী আওয়ামী লীগ নেতাদের হটিয়ে সেখানে একই মানের বিএনপি নেতাদের বসানো। তারা ভুলের মধ্যে আছেন। তারা স্বীকার করুন আর না করুন, এ দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আমূল বদলে গেছে। শিক্ষার্থীরা এখন রাজনীতির ময়দানে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বতন্ত্র খেলোয়াড়; তারা অহঙ্কার, দুর্নীতি আর মুরুব্বিপনার সেই পুরনো অভ্যাসকে আর নির্বিচারে মেনে নেবে না। বিশেষ করে এটি যখন তাদের নিজেদের ভবিষ্যতের প্রশ্নের সাথে জড়িত।
লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি



