ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকার আসার পর থেকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ঘিরে দেশের রাজনৈতিক বিতর্কের বড় অংশ আবর্তিত। এমন প্রবণতা চোখে পড়ছে, যেখানে আওয়ামী ও ভারতপন্থী সাংবাদিক, সাংস্কৃতিককর্মী ও বুদ্ধিজীবীরা ধারাবাহিকভাবে জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব ও এর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তাদের সমালোচনার প্রধান লক্ষ্য এখন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব এবং আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক শক্তিগুলো।
সমালোচনা গণতন্ত্রের অংশ। মতভিন্নতাও স্বাভাবিক। কিন্তু যখন রাজনৈতিক সমালোচনা ব্যক্তিগত বিদ্বেষে রূপ নেয়, তখন প্রশ্ন উঠবেই। যখন ভাষা শালীনতার সীমা অতিক্রম করলে তা আর রাজনৈতিক বিতর্ক থাকে না, হয়ে ওঠে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রকাশ। আর ফ্যাসিবাদে সমর্থন বাকস্বাধীনতার অংশ হতে পারে না।
আরো একটি বিষয় অনেকের চোখ এড়ায়নি। যারা প্রতিদিন জুলাই নিয়ে কঠোর ভাষায় কথা বলেন, তাদের বড় অংশ বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে একই মাত্রার সমালোচনা করেন না; বরং তাদের রাজনৈতিক আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে কেবল জুলাই আন্দোলন, প্রফেসর ইউনূস, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি এবং জুলাইয়ের নেতৃত্ব। এ বৈপরীত্য থেকে অনেকে মনে করছেন, তাদের রাজনৈতিক অবস্থান আসলে ভিন্ন কৌশলের অংশ। বোঝা যায়, তারা বিএনপির ওপর ভর করে এ অপতৎপরতা চালাচ্ছেন। এমনকি বিএনপিরও কেউ কেউ তাদের সাথে সুর মেলাচ্ছেন। সম্প্রতি বিএনপির এক মহিলা এমপির কথায় তা প্রমাণিত।
এ পরিস্থিতিতে নতুন এক বার্তা এসেছে বিএনপির ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের পক্ষ থেকে। বিশেষ করে সংগঠনের দুই নেতার বক্তব্য নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, ‘চব্বিশের জুলাইয়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় সারা দেশের আওয়ামী লীগের দলীয় অফিসগুলো আমরা পুড়িয়ে দিয়েছিলাম; আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিলাম।’
রাকিব আরো বলেন, ৪ আগস্ট ছাত্রলীগকে বিতাড়িত করার ক্ষেত্রে যাত্রাবাড়ী, শাহবাগসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপি অগ্রভাগে ছিল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা বারবার তাদের সহযোগিতা চেয়েছিলেন এবং ছাত্রদল সেই সহযোগিতা দিয়েছে।

আরো কঠোর ভাষায় কথা বলেন ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান। এক টেলিভিশন টকশোতে তিনি বলেছেন, ‘আমি গোটা দেশের ছাত্রসমাজের উদ্দেশে বলতে চাই, গণ-অভ্যুত্থান কোনো নিয়ম মেনে হয়নি, জাতিকে মুক্ত করার জন্য এই গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। এই জুলাইকে যারা কটাক্ষ করতে চাইবে, অস্বীকার করতে চাইবে কিংবা বিভিন্ন ভাষা ব্যবহার করে জুলাইকে অবহেলা করতে চাইবে, তাদের জিহ্বা টেনে ছিঁড়ে ফেলতে হবে। সরকারকে বলতে চাই, জুলাই অভ্যুত্থানের প্রশ্নে কোনো প্রকার ছাড় কাউকে দেয়া যাবে না। জুলাই আমাদের দেশের ঐক্যের প্রতীক, দেশের অস্তিত্বের প্রতীক।’ এই বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। বার্তা স্পষ্ট। ছাত্রদল জুলাই আন্দোলনের প্রশ্নে আপস করতে রাজি নয়।
আবিদ আরো বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান যদি না হতো, তাহলে হয়তো আমি এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারতাম না। যদি জুলাই ব্যর্থ হতো, তাহলে হয়তো আমাদের হাড়-মাংসও খুঁজে পাওয়া যেত না।’ এই বক্তব্য একজন প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীর অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। তিনি জুলাইকে কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেখছেন না। তিনি এটিকে নিজের অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন।
আবিদ বলেছেন, ‘এই জুলাই বাংলাদেশ পরিবর্তনের জুলাই। বাংলাদেশকে স্থিতিশীল করার জুলাই। দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার জন্য জুলাই সংঘটিত হয়েছে। এ কারণে জুলাই সনদের যেটি বাস্তবায়ন করা জরুরি, সেটি বাস্তবায়নের জন্য আমাদের দাবি থাকবে। আশা করি, সরকার সেটি বাস্তবায়ন করবে।’
তিনি বলেন, ‘আমি যখনই সুযোগ পাই, শহীদদের কবর জিয়ারত করতে যাই। কারণ, চোখের সামনে আমি তাদের মৃত্যু দেখেছি। তাদের মৃত্যু না হয়ে তখন আমার মৃত্যু হতে পারত। আমি দীর্ঘ সময় ধরে কবরগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখি। এই যে শিশুরা অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দিয়ে চলে গেল, রাষ্ট্রের জন্য, পরিবর্তনের জন্যÑ আজকে পতিত স্বৈরাচারের বিভিন্ন ল্যাসপেন্সার দেশে বসে জুলাইকে কটাক্ষ করে পোস্ট দিচ্ছে।’ এটি একটি আবেগঘন বক্তব্য। একই সাথে এটি স্মরণ করিয়ে দেয়, জুলাই আন্দোলন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও সেই আন্দোলনে প্রাণহানির ঘটনা এবং অংশগ্রহণকারীদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বাস্তব।
তিনি আরো বলেন, ‘একাত্তর যেমন গুরুত্বপূর্ণ, চব্বিশও রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যারা জুলাইকে কটাক্ষ করে, তাদের ব্যাপারে সরকারকে অবশ্যই জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।’
ছাত্রদল বহু বছর ধরে দমন-পীড়নের মুখে ছিল। সংগঠনটির অসংখ্য নেতাকর্মী মামলা, গ্রেফতার, হামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সেই দীর্ঘ সংগ্রামের পর যদি তারা মনে করে জুলাই আন্দোলন তাদের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন, তাহলে সেটি তাদের রাজনৈতিক মূল্যায়ন।
এখানে আরেকটি প্রশ্নও উঠে আসে। বিএনপির কিছু নেতা যদি এমন ব্যক্তিদের বক্তব্যের প্রতি নরম অবস্থান নেন, যারা নিয়মিত জুলাই আন্দোলনকে খাটো করে দেখেন, তাহলে সেটি কি দলীয় অবস্থানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ? এই প্রশ্ন এখন বিএনপির ভেতরেও উঠছে। কারণ ছাত্রদলের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, নতুন প্রজন্মের রাজনীতিতে জুলাই একটি আবেগের নাম। একটি সংগ্রামের নাম। একটি রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ। এই বাস্তবতা উপেক্ষা করা সহজ নয়।
আওয়ামী লীগের সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন, জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব মূলত জামায়াত-শিবির দিয়েছে। তারা বোঝাতে চায়, বিএনপি বা ছাত্রদল জুলাই অভ্যুত্থানে ছিল না। এটা একটা চালাকি। জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বিভেদ তৈরির অপকৌশল। ছাত্রদলের বক্তব্য সেই বয়ানকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছে। তারা বলছে, বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলও আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিল।
আজ বাংলাদেশের তরুণ সমাজের বড় অংশ জুলাইকে নিজেদের রাজনৈতিক চেতনার অংশ হিসেবে দেখছেন। জুলাইকে জন-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন হিসেবে দেখেন। তারা মনে করেন, এটি শুধু সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়; রাষ্ট্রের গতিপথ পরিবর্তনের অনন্য অধ্যায়। এ কারণে জুলাই নিয়ে অবমাননাকর ভাষা বা অবজ্ঞাসূচক মন্তব্য অনেকের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। বিএনপির জন্যও এখানে বড় রাজনৈতিক শিক্ষা রয়েছে। যদি দলটি সত্যিই জুলাই আন্দোলনকে নিজের সংগ্রামের অংশ বলে মনে করে, তাহলে সেই অবস্থান স্পষ্ট ও ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা জরুরি। দ্ব্যর্থতা রাজনৈতিক বিভ্রান্তি তৈরি করে।
ছাত্রদলের সাম্প্রতিক বক্তব্য আরেকটি বাস্তবতা সামনে এনেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এখনো শেষ হয়নি। কে নেতৃত্ব দিয়েছে, কে বেশি ত্যাগ স্বীকার করেছে, কার অবদান বেশি- এসব প্রশ্ন নিয়ে বিতর্ক চলছে। কিন্তু ছাত্রদলের অবস্থান স্পষ্ট। তারা মনে করে, জুলাই তাদেরও আন্দোলন। তাদেরও আত্মত্যাগের ইতিহাস রয়েছে। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে মামলা, হামলা, গুম, গ্রেফতার ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর তারা নিজেদের এই আন্দোলনের অন্যতম অংশীদার হিসেবেই দেখে।
এখানেই নতুন রাজনৈতিক প্রশ্নটি সামনে আসে। অনেকেই বলছেন, ছাত্রদলের এই অবস্থানের পর আওয়ামী লীগ-সমর্থক সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের পুরনো বক্তব্য কতটা টিকবে? যারা এতদিন জুলাইকে খাটো করার চেষ্টা করেছেন, কিংবা আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে নানা মন্তব্য করেছেন, তারা কি এখন একই ভাষায় ছাত্রদলের সমালোচনা করতে পারবেন? তারা কি একইভাবে রাকিব বা আবিদকে আক্রমণ করবেন? আওয়ামী লীগের অফিস পুড়িয়ে দেয়াকে এখন কি তারা ‘মব’ বলার সাহস পাবেন? নাকি সেখানে নীরবতা দেখা যাবে?
আরো বড় প্রশ্ন বিএনপিকে ঘিরে। দলের কিছু ব্যক্তির বক্তব্য বা অবস্থান নিয়ে মাঝে মধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সেই সুযোগে একটি ধারণা জন্ম নিয়েছে, আওয়ামী লীগের প্রতি নরম অবস্থান নেয়ার চেষ্টা চলছে। কিন্তু ছাত্রদলের বক্তব্য ভিন্ন বার্তা দিয়েছে। তারা স্পষ্ট করে দিয়েছে, জুলাই তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ। এই অর্জন নিয়ে তারা কোনো আপস করতে প্রস্তুত নয়।
রাজনীতির বাস্তবতাও তাই বলে। নতুন প্রজন্মের কাছে জুলাই শুধু একটি আন্দোলন নয়; এটি একটি রাজনৈতিক চেতনা। তারা সেই অধ্যায়কে অস্বীকারকারীদের ছাড় দিতে রাজি নয়। যারা অতীতের ফ্যাসিবাদী শাসনের প্রত্যাবর্তনের আশঙ্কা দেখেন, তারাও জুলাইকে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করেন।
ছাত্রদলের সাম্প্রতিক বক্তব্য একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে। তরুণ রাজনীতির একটি অংশ জুলাইয়ের উত্তরাধিকার ছেড়ে দিতে রাজি নয়। সেই বাস্তবতা ভবিষ্যতের রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।
লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন



