ট্রাইব্যুনালে আইনজীবীদের তর্কাতর্কি

‘কনস্টেবল কিভাবে স্টেট পলিসির নলেজ পাবে?’

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে রাজধানীর উত্তরায় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধসহ ১১ জনকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এক আইনি বিতর্কের জন্ম হয়েছে। মাঠপর্যায়ের একজন পুলিশ সদস্য বা কনস্টেবল কিভাবে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত বা ‘স্টেট পলিসি’ সম্পর্কে অবগত থাকবেন আদালতে আসামিপক্ষের আইনজীবীর তোলা এমন প্রশ্নকে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনালের এজলাস কক্ষে তৈরি হয় তর্কাতর্কির আবহ।

আলমগীর কবির
Printed Edition

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে রাজধানীর উত্তরায় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধসহ ১১ জনকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এক আইনি বিতর্কের জন্ম হয়েছে। মাঠপর্যায়ের একজন পুলিশ সদস্য বা কনস্টেবল কিভাবে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত বা ‘স্টেট পলিসি’ সম্পর্কে অবগত থাকবেন আদালতে আসামিপক্ষের আইনজীবীর তোলা এমন প্রশ্নকে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনালের এজলাস কক্ষে তৈরি হয় তর্কাতর্কির আবহ।

দীর্ঘ আইনি শুনানি ও অব্যাহতির (ডিসচার্জ) আবেদনের যুক্তিতর্ক শেষে ২৬ আসামির বিরুদ্ধে বিচার শুরুর (চার্জ গঠন) আদেশের জন্য আগামী ২০ আগস্ট দিন ধার্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

গতকাল সোমবার ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক বেঞ্চ আদেশের এ দিন নির্ধারণ করেন। বেঞ্চের অপর সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ।

এদিন শুনানির শুরু থেকেই আসামিপক্ষের আইনজীবীরা অভিযোগ থেকে মক্কেলদের অব্যাহতির দাবিতে শক্ত আইনি ফ্রন্ট তৈরি করেন। চার্জ গঠনের বিরোধিতা করে অন্যতম আসামিপক্ষীয় আইনজীবী অ্যাডভোকেট শামীম হায়দার পাটোয়ারী মানবতাবিরোধী অপরাধের আইনি সংজ্ঞায়ন ও প্রয়োগের মৌলিক দিক তুলে ধরে ট্রাইব্যুনালের কাছে প্রশ্ন তোলেন।

তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন, এই মামলায় আসামির তালিকায় অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি), সহকারী উপ-পুলিশ পরিদর্শক (এএসপি) থেকে শুরু করে একেবারে মাঠপর্যায়ের সাধারণ কনস্টেবলও রয়েছেন। আইন অনুযায়ী মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতে হলে সেখানে ‘স্টেট পলিসি’ (রাষ্ট্রীয় নীতি) কিংবা ‘অর্গানাইজেশনাল পলিসি’ (সাংগঠনিক নীতি) ছিল কি না এবং অপরাধের সাথে তা সম্পৃক্ত কি না, তা বুঝতে হবে। একজন সাধারণ কনস্টেবল কিভাবে এই স্টেট পলিসির নলেজ বা জ্ঞান পাবেন?

কমান্ড রেসপনসিবিলিটি বা আদেশের দায়ের ব্যাখ্যা দিয়ে এই আইনজীবী আরো বলেন, ‘একজন অধস্তন সদস্য হিসেবে ঊর্ধ্বতনের আদেশে দায়িত্ব পালন করলে সেখানে সুনির্দিষ্টভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধের সরাসরি দায় আনা যায় না। কারণ, কমান্ড পলিসির একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো থাকে।’

আসামিপক্ষের এই ধারালো যুক্তির পর ট্রাইব্যুনাল শান্ত ভঙ্গিতে মন্তব্য করে বলেন, বিচারিক প্রক্রিয়ায় যদি তদন্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণে অপরাধ প্রমাণিত না হয়, তবে আসামিরা খালাস পাবেন এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।

এদিন সকালে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উত্তরা বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মির্জা সালাহউদ্দিন, উত্তরা পূর্ব থানার সাবেক ওসি মো: মজিবুর রহমান ও আজমপুর পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক কনস্টেবল মো: হোসেন আলীসহ গ্রেফতার আট আসামিকে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় হাজির করা হয়।

কাঠগড়ায় উপস্থিত অপর আসামিরা হলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা মনোয়ার ইসলাম চৌধুরী রবিন, মো: দেলোয়ার হোসেন রুবেল, মো: সোহেল রানা, মো: শাহ আলম এবং মো: ইরফানুল হক গাজী।

মামলার মোট ২৬ জন আসামির মধ্যে বাকি ১৮ জন এখনো পলাতক। পলাতকদের তালিকায় রয়েছেন ঢাকা-১৮ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ হাবিব হাসান, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, উত্তরা বিভাগের সাবেক ডিসি কাজী আশরাফুল আজীম, এডিসি মো: তোহিদুল ইসলাম, এসি সুমন কর ও স্থানীয় সিটি করপোরেশনের একাধিক সাবেক কাউন্সিলর।

এর আগে গত ২১ জুলাই প্রসিকিউশনের পক্ষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ফরমাল চার্জ উপস্থাপন করা হয়। প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামীম ট্রাইব্যুনালে জোড়া অভিযোগের বিবরণ তুলে ধরে জানান, ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ ছিল না; বরং এগুলো ছিল সুপরিকল্পিত ও পদ্ধতিগত মানবতাবিরোধী অপরাধ।

প্রথম অভিযোগ (১৮ জুলাই) : উত্তরায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে আন্দোলন দমনে পুলিশ ও সহযোগীরা নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে বিইউপি শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধসহ সাতজন নিহত হন। এ ঘটনার নৃশংসতম অংশ ছিল উবারচালক মোখলেছুর রহমান ওরফে দুর্জয়কে পুলিশের সাঁজোয়া যান (এপিসি) দিয়ে পিষ্ট করে হত্যা করা। পরে আলামত ও লাশ গুমের উদ্দেশ্যে লাশটি পাশের তুরাগ নদীতে ফেলে দেয়া হয়।

দ্বিতীয় অভিযোগ (১৯ জুলাই) : প্রথম দিনের ধারাবাহিকতায় পরদিনও একই এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর পুনর্নিবিচারে গুলি চালানো হয়। এতে রিদোয়ান শরীফ রিয়াদ জয়সহ চারজন ঘটনাস্থলেই নিহত হন এবং রাইসুল রহমান রাতুলসহ বেশ কয়েকজন মারাত্মকভাবে জখম হন।

শুনানিতে প্রসিকিউশনের পক্ষে প্যানেল প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম, তারেক আবদুল্লাহ, শাইখ মাহদীসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন। উভয়পক্ষের বিস্তারিত যুক্তি ও আইনি লড়াই শেষে প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে চার্জ গঠনের আদেশের জন্য সময় প্রার্থনা করা হয়। ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করে ২০ আগস্ট আদেশের দিন ধার্য করেন। ওই দিনই স্পষ্ট হবে অভিযোগ গঠন হয়ে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হচ্ছে, নাকি আসামিদের ডিসচার্জের আবেদন গৃহীত হচ্ছে।

যাত্রাবাড়ীতে ১৭ হত্যা : প্রতিবেদন দাখিলে দুই মাস সময়

এদিকে চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে ১৭ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ঢাকা-৫ আসনের সাবেক এমপি কাজী মনিরুল ইসলাম মনুসহ আসামিদের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে আরো দুই মাস সময় দেয়া হয়েছে। আগামী ৪ অক্টোবর এ প্রতিবেদন জমার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ নির্দেশ দেন। প্যানেলের অন্য সদস্যরা হলেন বিচারক মো: মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। তিনি এ মামলার অগ্রগতি তুলে ধরে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দুই মাস সময়ের আবেদন করেন। পরে তার আবেদনটি মঞ্জুর করে আগামী ৪ অক্টোবরের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলেন আদালত।

এদিন সকালে সাবেক এমপি মনুসহ চারজনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। অন্য আসামিরা হলেন যাত্রাবাড়ী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৬৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর শফিকুল ইসলাম খান ও যাত্রাবাড়ী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ মুন্না।

প্রসিকিউশন জানায়, ২০২৪ সালের ১৯ ও ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীতে ১৭ জনকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তদন্ত চলছে। গত ২২ জুলাই এই চারজনের বিরুদ্ধে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট জারি করেন ট্রাইব্যুনাল-২। এরই ধারাবাহিকতায় তাদের গতকাল এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়।