জহিরুল ইসলাম
জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রীর দেয়া সর্বশেষ তথ্য (ফেব্রুয়ারি ২০২৬) অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকারের মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি বা পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৮.০৬৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ঋণসঙ্কট থেকে মুক্তি পেতে একটি দেশের জন্য সঠিক ও কঠোর অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নেয়া জরুরি। কোনো দেশ যদি দ্রুত ঋণ পরিশোধ করতে চায়, তবে নিচের কৌশলগুলো অবলম্বন করতে পারে :
১. আয় বৃদ্ধি ও খরচ কমানো: সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি কেনা, অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ এবং বড় বড় উৎসবের খরচ পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে।
২. কর ব্যবস্থার সংস্কার : কর ফাঁকি বন্ধ করতে হবে। ধনী ব্যক্তিদের ওপর করের হার বাড়িয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বাড়াতে হবে।
৩. ভর্তুকি কমানো : অলাভজনক খাতগুলোতে সরকারের দেয়া বড় বড় ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে হবে।
৪. উৎপাদন ও রফতানি বাড়ানো এবং রফতানি পণ্যের বৈচিত্র্য : শুধু এক বা দু’টি পণ্যের ওপর নির্ভর না করে নতুন নতুন পণ্য বিদেশে রফতানি করতে হবে।
৫. স্থানীয় শিল্পের বিকাশ : দেশের ভেতরের শিল্পকারখানাকে সুবিধা দিতে হবে, যেন বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি করতে না হয়।
৬. প্রবাসী আয় বৃদ্ধি : বৈধ পথে বা ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয় দেশে আনার জন্য প্রবাসীদের বোনাস বা বিশেষ সুবিধা দিতে হবে।
৭. ঋণ পুনর্গঠন: ঋণদাতা দেশ বা সংস্থার সাথে কথা বলে সুদের হার কমানো বা ঋণ পরিশোধের সময় বাড়িয়ে নিতে হবে।
৮. কম সুদের ঋণ : পুরনো চড়া সুদের ঋণ পরিশোধ করার জন্য তুলনামূলক কম সুদের নতুন ঋণ নেয়া যেতে পারে।
৯. বিনিয়োগ ও দুর্নীতি রোধ, বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ : দেশের ব্যবসায়-বাণিজ্যের পরিবেশ সহজ করে বিদেশী বড় বড় কোম্পানিকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে হবে।
১০. দুর্নীতি দমন : মেগা প্রকল্প বা বড় সরকারি কাজে দুর্নীতি ও অর্থপাচার কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে, যাতে রাষ্ট্রের প্রতিটি টাকা সঠিক খাতে ব্যয় হয়।
একটি টেকসই, যুগোপযোগী, বাস্তবায়নযোগ্য, স্বল্প খরচের কৌশল হচ্ছে, বৈধ পথে বা ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয় দেশে আনা। কিন্তু কিভাবে? একটি কমিশন গঠন করা, যার কাজ হবে, ডিজিটাল কারেন্সি অথবা সফট ক্যাশ অথবা ই-ওয়ালেট পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করা। এই পরিকল্পনার মেইন থিওরি হচ্ছে, ধাপে ধাপে হার্ড ক্যাশ বিলুপ্তকরণ। কিন্তু কেন? বাঙালিরা দুটো পয়সা যেদিকে বেশি পায়, সেদিকেই দৌড়ায় (কতিপয় দেশপ্রেমিক ছাড়া)। মানে হুন্ডি, ওভার ইনভয়েসিং, অবৈধ পথে উপার্জিত টাকা বিদেশে পাচার। অবসর জীবনে রাজকীয় ও উচ্চাভিলাষী জীবনযাপন কাটানোই মূল লক্ষ্য।
অনেকেই হয়তো ভাবতে পারেন এটি করতে অনেক টাকার সফটওয়্যার ক্রয় করতে হবে। কিন্তু না, আমাদের বর্তমানে ব্যাংকিং সেবার যে মান রয়েছে, এতেই সম্ভব। আসলে অনেকেই এটিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে, যেমন, বিকাশ, রকেট, নগদ ও অন্যান্য অ্যাপের মাধ্যমে অনেকেই লেনদেন করছেন, কেনাকাটা করছেন, পেমেন্ট দিচ্ছেন, টাকা বাড়িতে পাঠাচ্ছেন, বেতন নিচ্ছেন ও দিচ্ছেন। আর ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার তো আকাশচুম্বী হারে বেড়েছে। এখন শুধু নীতিগত কিছু পদক্ষেপই পারে স্বল্প সময়ের মধ্যে একটি স্বাস্থ্যকর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ভরপুর করতে। আর, পর্যাপ্ত রিজার্ভ থাকলে, এসব ঋণ শোধ করা সময়ের ব্যাপার মাত্র।
৫ এপ্রিল ২০২৬ এর ‘দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস’ এর প্রতিবেদন অনুসারে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ১৭৬টি দেশে ১৫ মিলিয়নেরও বেশি বাংলাদেশী শ্রমিক কর্মরত। এই দেড় কোটি প্রবাসীর মধ্যে এক কোটি ৪৫ লাখ প্রবাসী যদি প্রতি মাসে গড়ে ৩০ হাজার টাকা পাঠায় তাদের পরিবারের সাংসারিক খরচ বাবদ, তাহলে প্রতি মাসে রেমিট্যান্স আসার কথা ৪৩ হাজার কোটি টাকা। পক্ষান্তরেwww.bmet.gov.bd তথ্য মতে, ২০২৫ সালে ১৮টি দেশ থেকে জানুয়ারি ২০২৫ থেকে মে ২০২৫ পর্যন্ত মোট ১৩ হাজার ৭৩০ মিলিয়ন ডলার এসেছে মানে মাসিক দুই হাজার ৭৪৬ মিলিয়ন ডলার অর্থাৎ, ১২৫ টাকা ডলার রেটে ৩৪ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা। মানে ৯ হাজার কোটি টাকার একটি ফারাক পরিলক্ষিত হয়।
উল্লেখ্য, প্রবাসীদের একটি বড় অংশ প্রবাস জীবনে সফল ব্যবসায়ী এবং উচ্চ পদে কর্মরত। এদের মধ্যে অনেকেই মাসিক এক কোটি টাকার মতো আয় করে থাকেন, সেই হিসাবটা যথাযথভাবে নিরূপণ করতে পারলে ফারাকের পরিমাণ অনেকগুণ বেশি হয়ে দাঁড়াবে। কেবল যথাযথ ব্যাংকিং চ্যানেলে, রেমিট্যান্সপ্রবাহ নিশ্চিত করতে পারলেই এই বিশাল অঙ্কের ঋণ পরিশোধ করা সময়ের ব্যাপার মাত্র। শক্তিশালী ও দক্ষ একটি ই-ক্যাশ কারেন্সি কমিশনই পারে ই-ক্যাশ বাস্তবায়নে, নিম্নোক্ত বাধাগুলো অতিক্রম করার কৌশলগত কার্যকরী সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশকে শক্তিশালী অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নিতে।
এতে প্রধান বাধাগুলো হলো : দুর্বল কারিগরি অবকাঠামো, সাইবার নিরাপত্তা ও হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি, ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব, নগদ লেনদেনের প্রতি মানসিক আসক্তি, স্মার্টফোন ও ডিভাইসের উচ্চমূল্য, আস্থার সঙ্কট ও আন্ডারগ্রাউন্ড ইকোনমি, নীতিগত ও আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতা।
আগেই বলা হয়েছে, ধাপে ধাপে ই-কারেন্সি বাস্তবায়ন করতে হবে। সর্বপ্রথমে, যে দলটাকে লক্ষ্য করে কাজ করা হবে, ইতোমধ্যেই তারা উপরোক্ত বাধাগুলো সফলভাবে অতিক্রম করতে পেরেছে। বর্তমানে বেশির ভাগ ব্যাংকই অনলাইনে কার্যক্রম চালাচ্ছে এবং এদের সাথে সমান্তরালে তাল মিলিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও এগিয়ে যাচ্ছে। এখন শুধু নীতিগত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা। একটি কমিশন গঠনের মাধ্যমেই শক্তিশালী অর্থনীতির ভিত গড়ার চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
লেখক : অর্থনৈতিক চিন্তাবিদ



