চলতি মাসের শুরুতে জার্মানি আন্তর্জাতিক কূটনীতির অঙ্গনে এক অপ্রত্যাশিত ধাক্কা খায়। জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য পদের নির্বাচনে এবার কাক্সিক্ষত আসনটি অর্জন করতে পারেনি। ১৫ সদস্যবিশিষ্ট এ পরিষদে পাঁচটি স্থায়ী এবং দুই বছর মেয়াদে নির্বাচিত ১০টি অস্থায়ী সদস্য পদ আছে। এবারের নির্বাচনে দু’টি আসনের জন্য জার্মানির প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল অস্ট্রিয়া ও পর্তুগাল। কিন্তু বিস্ময়করভাবে জয়ী হয় অস্ট্রিয়া ও পর্তুগাল, আর জার্মানিকে ফিরতে হয় খালি হাতে। নিরাপত্তা পরিষদের নির্বাচনে এটি ছিল জার্মানির ইতিহাসে প্রথম পরাজয়, যা দেশটির সাম্প্রতিক পররাষ্ট্রনীতি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার নৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
জাতিসঙ্ঘের বাজেটে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও জাপানের পর সবচেয়ে বড় অর্থদাতা জার্মানি। তা সত্ত্বেও সাধারণ পরিষদ দেশটির পক্ষে রায় দেয়া থেকে বিরত থাকে। ভোটাভুটির কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াডেফুল স্বীকার করেন, তেলআবিবের প্রতি বার্লিনের অকুণ্ঠ সমর্থনই সম্ভবত অনেক দেশের ভোটের মনোভাব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
ইতিহাসের বাস্তবতা বিবেচনায় অধিকাংশ দেশই বোঝে যে, ইসরাইলের প্রতি জার্মানির একটি বিশেষ নৈতিক দায়বদ্ধতা আছে। অতীতের অপরাধের মুখোমুখি হওয়া এবং তার প্রায়শ্চিত্ত করা জার্মানির নৈতিক দায়িত্ব; কিন্তু সেই দায়বদ্ধতার প্রকাশ কোনোভাবে নিঃশর্ত হওয়া উচিত ছিল না, যেখানে ইসরাইল প্রতিনিয়ত মানবতাবিরোধী অপরাধ বা গণহত্যা সংঘটন করে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বরং জার্মানির অবস্থান হওয়া উচিত ছিল সেসব আন্তর্জাতিক আইনি নীতির পক্ষে, যেগুলো এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধের ভিত্তি রচনা করে; কিন্তু ফিলিস্তিনে ইসরাইলের কর্মকাণ্ডের জন্য তাকে জবাবদিহির আওতায় আনতে ব্যর্থ হয়ে বরং তার পাশে অটলভাবে দাঁড়ানোয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বৃহৎ একটি অংশের কাছে জার্মানি কার্যত গণহত্যাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে- এমন ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। ইতিহাসের এক গণহত্যায় নিজের সংশ্লিষ্টতার প্রায়শ্চিত্ত অন্য একটি গণহত্যার অভিযোগের প্রতি উদাসীন থেকে কখনোই করা যায় না।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) কর্তৃক ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানার বিষয়ে জার্মানির অবস্থানও ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। জার্মানির অনেক রাজনীতিবিদ ও সরকারি কর্মকর্তা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন যে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন যদি কখনো জার্মানির মাটিতে পা রাখেন, তবে আইসিসির জারি করা পরোয়ানা অনুযায়ী তারা তাকে গ্রেফতার করবেন। অথচ ইসরাইলি নেতাদের বিরুদ্ধে জারি করা পরোয়ানার ক্ষেত্রে কিন্তু এমন দৃঢ় অবস্থান নেয়া হয়নি। রোম সংবিধি-এর সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের জারি করা পরোয়ানা কার্যকর করা এবং আদালতের সাথে পূর্ণ সহযোগিতা করা জার্মানির একটি স্পষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা। অথচ জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ ম্যারৎস প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন যে, তিনি এমন ব্যবস্থা করবেন যাতে নেতানিয়াহু জার্মানি সফর করে গ্রেফতার ছাড়াই নির্বিঘ্নে দেশ ত্যাগ করতে পারেন। আন্তর্জাতিক আইনের বৈধতা ও নৈতিক কর্তৃত্ব বহুলাংশে নির্ভর করে আইনি বিধানের সমান ও ধারাবাহিক প্রয়োগের ওপর। রাষ্ট্রগুলো যখন নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী বেছে বেছে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে- কোন আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা তারা পালন করবে, আর কার বিরুদ্ধে তা প্রয়োগ করবে, তখন দ্বৈত মানদণ্ডের অভিযোগ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। এই সুনির্দিষ্ট বিষয়ে জার্মানির দ্ব্যর্থবোধক আচরণ অনেক রাষ্ট্রকে ভাবিয়ে তুলেছে যে, বার্লিনের আসল প্রতিশ্রুতি কি আদৌ আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি, নাকি আন্তর্জাতিক আইনের কেবল সেই অংশটুকুর প্রতি যা তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থের অনুকূলে যায়?
যদি এটি অন্য কোনো রাষ্ট্র হতো, হয়তো এতটা তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণের মুখে পড়ত না; কিন্তু জার্মানি আধুনিক ইতিহাসে এক বিশেষ ও সংবেদনশীল অবস্থান দখল করে আছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে সংঘটিত ইতিহাসের ভয়াবহতম কিছু অপরাধের দায় তার ওপর বর্তায়। সেই অপরাধের মাত্রাই জন্ম দিয়েছিল নুরেমবার্গ বিচার, যেখানে উচ্চপদস্থ রাজনৈতিক, সামরিক ও বেসামরিক নেতাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। সেই বিচারপ্রক্রিয়াই আধুনিক আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনের ভিত্তি নির্মাণ করে দেয়। ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’, ‘ব্যক্তিগত অপরাধের দায়’ এবং ‘রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত বর্বরতার জবাবদিহি’র মতো আইনি ধারণাগুলো এই নুরেমবার্গের মাধ্যমেই প্রথম আন্তর্জাতিক আইনের শব্দকোষে যুক্ত হয়। এর ধারাবাহিকতায় একদিন জন্ম নেয় আজকের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি), যার মূল লক্ষ্যই হলো আন্তর্জাতিক অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা। ‘রোম সংবিধি’ স্বাক্ষর ও অনুমোদনের মাধ্যমে জার্মানি বিশ্বকে এই বার্তাই দিয়েছিল যে, তারা তাদের অতীত থেকে শিক্ষা নিয়েছে। সেই সাথে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাই তার বর্তমান অবস্থান বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। জার্মানির নৈতিক কর্তৃত্ব গড়ে উঠেছিল এই প্রতিশ্রুতির ওপর যে, অতীতের সেই ভয়াবহতার পুনরাবৃত্তি আর কখনো হবে না। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে; কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতিই যদি এখন কেবল ‘বেছে বেছে’ প্রয়োগ করা হয়, তবে বিশ্বমঞ্চে জার্মানির নিজস্ব গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।
গত বছরের জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে চ্যান্সেলর মার্জের করা একটি মন্তব্য বিশ্বজুড়ে তীব্র বিতর্কের ঝড় তুলেছিল। সেখানে তিনি ইরানের ওপর ইসরাইলের হামলাকে বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘ইসরাইল আমাদের সবার হয়ে নোংরা কাজটা করে দিচ্ছে’। তার মন্তব্যটি বেশ কয়েকটি কারণে জার্মানির প্রকৃত মনোভাব উন্মোচিত করে দেয়। প্রথমত, এ হামলাকে ‘নোংরা কাজ’ বলে তিনি প্রকারান্তরে এর অবৈধ ও বেআইনি প্রকৃতিকে স্বীকার করে নিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, তার কথায় স্পষ্ট যে, জার্মানি এই বেআইনি কর্মকাণ্ডকে কেবল সমর্থনই করে না; বরং এর দ্বারা লাভবানও হচ্ছে। সবশেষে, যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এই মন্তব্য বিশ্বমঞ্চে এমন ধারণাকে আরো জোরদার করল যে, নিজের কোনো বন্ধু বা মিত্র রাষ্ট্র যখন আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে, তখন জার্মানি খুব সহজে চোখ বুজে তা এড়িয়ে যেতে প্রস্তুত থাকে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি উদীয়মান শক্তি হিসেবে এবং ক্রমবর্ধমানভাবে সামরিক সরঞ্জামের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী হিসেবে জার্মানির উত্থান তার বৈশ্বিক আচরণকে আরো নিবিড় পর্যবেক্ষণের আওতায় এনেছে। ইতিহাসের কী নির্মম পরিহাস, যে জার্মানির পররাষ্ট্রনীতি তৈরি হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নারকীয় তাণ্ডব থেকে শিক্ষা নিয়ে, আজ মধ্যপ্রাচ্যে এসে তাদের ভূমিকাই সেই অপরাধগুলো উসকে দিচ্ছে, যা রোধ করতেই যুদ্ধোত্তর আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে জার্মানির অনুপস্থিতি অনেক রাষ্ট্রের কাছে অপ্রত্যাশিত বলে মনে হয়নি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই অন্ধকার অতীত আজও জার্মান পররাষ্ট্রনীতিকে তাড়া করে বেড়ায়। জার্মানির প্রতিটি সরকারই ‘স্ট্যাটস্র্যাঁজো’ নামের একটি বিশেষ নীতি মেনে চলে, যার মূল প্রতিপাদ্য হলো, জার্মানির ঐতিহাসিক অপরাধবোধ থেকে উদ্ভূত একটি বিশেষ দায়িত্ব হিসেবে ইসরাইল রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে দেখা হয়। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে তাদের অবস্থানটি অবাস্তব নয়; কিন্তু আসল জটিলতা ও সমস্যা তখন তৈরি হয়, যখন এই নির্দিষ্ট নীতির প্রতি অন্ধ আনুগত্য দেখাতে গিয়ে আন্তর্জাতিক আইনের সর্বজনীন নীতিগুলোর প্রতি জার্মানির যে দায়বদ্ধতা, তা ঢাকা পড়ে যায় বা গৌণ হয়ে ওঠে।
দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নির্মমতার বিপরীতে জার্মানির যে প্রতিক্রিয়া, তা প্রকারান্তরে দেশটির বিবেক ও চিরন্তন মূল্যবোধকে বিনষ্ট করেছে। বার্লিন প্রশাসন আজ সম্ভবত বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, ১৯৪০-এর দশকের সেই জঘন্য অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করার একমাত্র উপায় হলো ইসরাইলকে নিঃশর্ত ও অন্ধ সমর্থন দিয়ে যাওয়া, এমনকি তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ যতই গুরুতর হোক না কেন। এটি করতে গিয়ে জার্মানি আন্তর্জাতিক আইনের চোখে ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যকার সুনির্দিষ্ট পার্থক্যকে ক্রমেই অস্পষ্ট করে ফেলছে। এমতাবস্থায়, নিরাপত্তা পরিষদে জার্মানির নির্বাচিত না হওয়া অত্যন্ত যৌক্তিক একটি ঘটনা। জার্মানির উচিত এ কূটনৈতিক ব্যর্থতাকে একটি আত্মসমীক্ষার সুযোগ হিসেবে নেয়া এবং নিজেদের প্রশ্ন করা, তাদের পররাষ্ট্রনীতি কি আসলেই আন্তর্জাতিক আইন দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে, নাকি অতীতের অপরাধবোধ এমন এক অবস্থানে গিয়ে ঠেকেছে, যা স্বয়ং আন্তর্জাতিক আইনকে প্রতিনিয়ত অবমূল্যায়ন করছে।
লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি



