প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর : অর্থনৈতিক কূটনীতির নতুন অধ্যায়

বাংলাদেশের সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর বিশ্ব আমাদের নতুনভাবে মূল্যায়ন করছে। এ বাস্তবতায় প্রতিটি রাষ্ট্রীয় সফরকে বিচ্ছিন্ন কূটনৈতিক ঘটনা হিসেবে নয়; বরং একটি জাতীয় অর্থনৈতিক মিশন হিসেবে পরিকল্পনা করা উচিত। প্রতিটি সফরের সাথে থাকতে হবে সুস্পষ্ট লক্ষ্য, বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্প, সম্ভাব্য অংশীদার, বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এবং সফর-পরবর্তী জবাবদিহিমূলক অগ্রগতি মূল্যায়নের ব্যবস্থা

মেজর (অব:) মো: আখতারুজ্জামান
মেজর (অব:) মো: আখতারুজ্জামান |নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা, অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের লক্ষ্যে চীন সফরের উদ্যোগ গ্রহণে প্রথমে প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানানো প্রয়োজন। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় বিশ্বের প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর সাথে উচ্চপর্যায়ের সম্পৃক্ততা শুধু কূটনৈতিক প্রয়োজন নয়; এটি একটি জাতীয় অর্থনৈতিক অপরিহার্যতা।

এ সফর এমন একসময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যখন বিশ্ব-অর্থনীতি দ্রুত পুনর্বিন্যাসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উৎপাদন, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং পরিবর্তিত ভূরাজনীতি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। এ বাস্তবতায় কেবল রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে পারে না; অর্থনৈতিক কূটনীতিকেও সময়োপযোগী ও ফলমুখী হতে হয়।

এ কারণে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরকে আমরা কেবল একটি দ্বিপক্ষীয় রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে দেখি না; বরং বাংলাদেশের আগামী দুই দশকের অর্থনৈতিক রূপান্তর, শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সাথে গভীরতর সম্পৃক্ততার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে দেখি।

এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি, সরকার বা সফরের সমালোচনা নয়; বরং একে প্রেক্ষাপট হিসেবে ব্যবহার করে ভবিষ্যতে কিভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতিকে আরো কার্যকর, বিনিয়োগমুখী ও ফলপ্রসূ করা যায়, সে বিষয়ে একটি গঠনমূলক নীতিগত আলোচনা উপস্থাপন করা।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপ্রধানের বিদেশ সফরের মূল্যায়ন প্রায়ই লাল গালিচা সংবর্ধনা, যৌথ ঘোষণা কিংবা সমঝোতাস্মারকের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ থাকে। এগুলোর কূটনৈতিক গুরুত্ব অবশ্যই আছে; কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে কোনো রাষ্ট্রীয় সফরের প্রকৃত সফলতা এসব দিয়ে নির্ধারিত হয় না।

সমকালীন বিশ্বে প্রতিটি উচ্চপর্যায়ের সফর একই সাথে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শিল্পায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের সুযোগ। তাই সফরের মূল্যায়নও হওয়া উচিত তার অর্থনৈতিক ফলের ভিত্তিতে, আনুষ্ঠানিকতার নয়।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এখনো অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সফরকে প্রোটোকলভিত্তিক কার্যক্রম হিসেবে দেখা হয়। অথচ সফল রাষ্ট্রগুলো একই সফরকে ব্যবহার করে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও শিল্পায়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশেরও সেই মানসিক পরিবর্তন জরুরি। আমাদের বিদেশ সফরকে কূটনৈতিক প্রোটোকল থেকে অর্থনৈতিক রূপান্তরের কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত করতে হবে।

রাষ্ট্রীয় সফরের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় না করমর্দন, ছবি বা সমঝোতাস্মারকের সংখ্যায়; নির্ধারিত হয় নতুন শিল্প, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ এবং দেশের উৎপাদনক্ষমতায় তার বাস্তব অবদানের মাধ্যমে।

একবিংশ শতাব্দীতে রাষ্ট্রের শক্তি শুধু রাজনৈতিক প্রভাবের ওপর নির্ভর করে না; নির্ভরশীল অর্থনৈতিক সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা, বাস্তবায়ন দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ক্ষমতার ওপরও। তাই বাংলাদেশের সামনে আজ একটি মৌলিক প্রশ্ন উপস্থিত হয়েছে- আমরা কি ভবিষ্যতেও রাষ্ট্রীয় সফর কেবল কূটনৈতিক সৌজন্যের পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখব, নাকি প্রতিটি সফরকে একটি জাতীয় অর্থনৈতিক মিশনে রূপান্তর করব? আমাদের বিশ্বাস, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ও সমৃদ্ধির পথ দ্বিতীয় বিকল্পে নিহিত আছে।

রাষ্ট্রীয় সফরের এই পরিবর্তিত বাস্তবতা আমাদের একটি নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতির দাবি জানায়। কোনো সফরের সফলতা আর কেবল সফর শেষে বিচার করা যায় না; বরং তার প্রস্তুতি, অর্জন এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলের ভিত্তিতে মূল্যায়ন হওয়া উচিত।

প্রথম প্রশ্ন- সফরের জাতীয় উদ্দেশ্য কী? প্রতিটি রাষ্ট্রীয় সফরের আগে স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে, আমরা কোন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শিল্প অংশীদারত্ব এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তন অর্জন করতে চাই। উদ্দেশ্য যত সুস্পষ্ট হবে, ফল তত বাস্তব হবে।

দ্বিতীয় প্রশ্ন- সফরটি দেশের জন্য কী ধরনের উৎপাদনশীল মূলধন নিয়ে এলো? রাষ্ট্রীয় সফরের সাফল্য ঋণের পরিমাণে নয়; এমন বিনিয়োগে, যা নতুন শিল্প গড়ে তোলে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, প্রযুক্তি স্থানান্তর করে এবং দেশীয় শিল্পকে বৈশ্বিক বাজারের সাথে যুক্ত করে। ঋণ অবকাঠামো নির্মাণে সহায়ক হতে পারে; কিন্তু উৎপাদনশীল বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির ভিত্তি।

তৃতীয় প্রশ্ন- এ সফর দেশের উৎপাদনক্ষমতাকে কতটা শক্তিশালী করল? বাংলাদেশের অর্থনৈতিক যাত্রাপথ হওয়া উচিত- বাংলাদেশের জন্য আমদানি মবাংলাদেশে উৎপাদনমবাংলাদেশের উদ্ভ¢াবন ও ব্র্যান্ড বিশ্ববাজারে রফতানি। আমরা শুধু বিদেশী পণ্য আমদানি করতে চাই না; চাই সেই পণ্য বাংলাদেশে উৎপাদিত হোক। দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ নিজে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও ব্র্যান্ডের উৎসে পরিণত হোক। বাংলাদেশ শুধু অন্যের বাজার হতে চায় না; বাংলাদেশ হতে চায় উৎপাদনের ঠিকানা।

চতুর্থ প্রশ্ন- সফরের সফলতা কিভাবে মাপা হবে? প্রকৃত মূল্যায়ন হয় কয়েক বছর পরে। তখন বিচার করতে হবে- কত বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হয়েছে, কত শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, কত প্রযুক্তি স্থানান্তর হয়েছে, রফতানি কত বেড়েছে এবং দেশের উৎপাদনক্ষমতা কতটা শক্তিশালী হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় সফরের এই পরিবর্তিত বাস্তবতা আমাদের একটি নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতির দাবি জানায়। কোনো সফরের সফলতা আর কেবল সফর শেষে বিচার করা যায় না; বরং তার প্রস্তুতি, অর্জন এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলের ভিত্তিতে মূল্যায়ন হওয়া উচিত।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি চীন সফর সফল হয়েছে কি না, সেটি নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এ সফরের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কূটনীতির একটি নতুন দর্শন প্রতিষ্ঠা করতে পারবে? যদি পারে, তবে এ সফরের গুরুত্ব তাৎক্ষণিক সংবাদ শিরোনামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এটি ভবিষ্যতের রাষ্ট্রীয় সফরগুলোর জন্য একটি নতুন মানদণ্ড হয়ে উঠবে।

আজকের বিশ্বে কূটনীতির প্রকৃতি মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। অর্থনীতি এখন আর কূটনীতির একটি অংশ নয়; বরং অর্থনীতিই কূটনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। যে রাষ্ট্র উৎপাদন করে, উদ্ভাবন করে, প্রযুক্তি সৃষ্টি করে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করতে পারে, দীর্ঘমেয়াদে সেই রাষ্ট্র বেশি কৌশলগত গুরুত্ব অর্জন করে। বাংলাদেশেরও সেই পথে এগোতে হবে।

আমাদের বিশ্বাস, ভবিষ্যতের প্রতিটি রাষ্ট্রীয় সফরের সফলতা চারটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তরে নিহিত থাকবে। সফরের জাতীয় উদ্দেশ্য কতটা সুস্পষ্ট ছিল? কতটা উৎপাদনশীল মূলধন, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা গেল? দেশের শিল্পায়ন ও উৎপাদনক্ষমতা কতটা শক্তিশালী হলো? কয়েক বছর পরে কোন পরিমাপযোগ্য ফলের মাধ্যমে সেই সফরের সফলতা প্রমাণ করা যাবে? এ প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক উত্তর একটি সফরকে কেবল কূটনৈতিকভাবে নয়, অর্থনৈতিকভাবেও সফল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।

বাংলাদেশের সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর বিশ্ব আমাদের নতুনভাবে মূল্যায়ন করছে। এ বাস্তবতায় প্রতিটি রাষ্ট্রীয় সফরকে বিচ্ছিন্ন কূটনৈতিক ঘটনা হিসেবে নয়; বরং একটি জাতীয় অর্থনৈতিক মিশন হিসেবে পরিকল্পনা করা উচিত। প্রতিটি সফরের সাথে থাকতে হবে সুস্পষ্ট লক্ষ্য, বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্প, সম্ভাব্য অংশীদার, বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এবং সফর-পরবর্তী জবাবদিহিমূলক অগ্রগতি মূল্যায়নের ব্যবস্থা।

ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কেবল একটি ভোক্তা অর্থনীতি হিসেবে টিকে থাকতে পারবে না। আমাদের এমন একটি উৎপাদনমুখী অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে, যা প্রযুক্তি গ্রহণ করবে, মূল্য সংযোজন করবে, বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা করবে এবং নিজস্ব উদ্ভাবনের ভিত্তিতে নতুন শিল্প সৃষ্টি করবে। আমাদের অর্থনৈতিক যাত্রাপথ হওয়া উচিত- বাংলাদেশের জন্য আমদানি, উৎপাদন এবং শেষ পর্যন্ত উদ্ভাবন ও ব্র্যান্ডের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে নেতৃত্বের পথে অগ্রসর হওয়া।

আমাদের সরকারপ্রধানের ভবিষ্যতের প্রতিটি রাষ্ট্রীয় সফরকে করমর্দনের সংখ্যা, যৌথ ঘোষণাপত্র কিংবা সমঝোতাস্মারকের পরিমাণ দিয়ে নয়; শিল্পায়ন, প্রযুক্তি, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং জাতীয় সমৃদ্ধির বাস্তব অর্জনের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে।

ইতিহাস শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সফরের ছবি সংরক্ষণ করে না; সংরক্ষণ করে অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার।

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য