রাষ্ট্র এমন একটি সত্তা, যাকে না ধরা যায়, না ছোঁয়া যায়। তবে রাষ্ট্রযন্ত্রের ম্যান বিহাইন্ড দ্য ম্যাশিনই সরকার। একে ধরা যায়, ছোঁয়াও যায়। এমনকি উঠানোও যায়, নামানোও যায়; যদি রাষ্ট্রাচারে গণতান্ত্রিক আচার-অনুষ্ঠান বজায় থাকে।
বাংলাদেশ ভূ-রাজনীতির বিবেচনায় দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র। এদেশের নাগরিকরা একে স্বয়ংসম্পূর্ণ বিকাশমান এক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন। তবে স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। কারণ, ছিল নানা প্রতিবন্ধকতা। বিশেষ করে রাজনৈতিক মেরুকরণ, অর্থনৈতিক চাপ, দুর্বল কূটনীতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, সামাজিক বৈষম্য, সাংস্কৃতিক বিতর্ক ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে জনপরিসরে কষ্টের সীমা-পরিসীমা ছিল না। এমন বাস্তবতায় নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। এখন একাধিক জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে নতুন সরকারকে। এক্ষেত্রে শক্তি হচ্ছে- ভোটে প্রাপ্ত বিপুল জনসমর্থন। এসব চ্যালেঞ্জ শুধু সরকারকে নয়, রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের জীবনমানকেও প্রভাবিত করে। বিশেষ করে, বিপুল জনগোষ্ঠীর এই দেশের চরম বেকারত্ব, অর্থনৈতিক মন্দা, বাণিজ্য ঘাটতি, সর্বোপরি চাঁদাবাজির মতো অশুভ যাবতীয় বিষয়। অশিক্ষা, স্বাস্থ্য শঙ্কা, ক্রম অবনতিশীল পরিবেশ ও অস্থিতিশীল রাজনৈতিক অস্থিরতা। এখন এসব মোকাবেলা করা এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। নিকট ও দূর অতীতে আওয়ামী লীগ দু’দফা রাষ্ট্রাচারকে এমন শৈলীতে নিয়েছিল; যেখানে রাষ্ট্র নয়, ব্যক্তিকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছিল। ফলে বাংলাদেশ একটি অকার্যকর রাষ্ট্রের পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, নতুন সরকারের প্রধান লক্ষ্য হতে হবে জন-আস্থা অটুট রাখা। অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন নিশ্চিত করা। সেই সাথে জাতীয় ঐক্যের প্রতি গুরুত্বারোপ করা। এ লক্ষ্য অর্জনে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দক্ষ প্রশাসন, কার্যকর নীতিমালা এবং জনগণের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়গুলো এখনো আশানুরূপ নয়। তবে নতুন সরকার জনমুখী কার্যক্রম হাতে নিলে, রাজনৈতিকসহ অন্যত্র, স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সব ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিগত লীগ সরকার দেশের নির্বাচনব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস করে গেছে। আন্দোলন, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস এখনো জনপরিসরে আলোচনায় আছে। সরকারকে এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে রাজনৈতিক দলসহ সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকে মতপ্রকাশ করতে পারে। বিরোধ নিষ্পত্তিতে সংলাপকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। রাজনৈতিক সহনশীলতা বৃদ্ধি, গণতান্ত্রিক চর্চা শক্তিশালী করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো মেরামত করা এখন জরুরি। মনে রাখতে হবে, জনগণের মতামতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বাংলাদেশের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। মূল্যস্ফীতিতে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতসহ কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে। এ লক্ষ্য অর্জনে কৃষক ও কৃষিবিজ্ঞানে সুনজর দিতে হবে। বাজার ব্যবস্থাপনা আরো কার্যকর করা অপরিহার্য। একই সাথে শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, রফতানি ক্ষেত্র সম্প্রসারণ এবং নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার উদ্যোগ নেয়া- তথা পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং কর ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সহায়ক হতে পারে। ব্যাংকব্যবস্থা নিয়ে জনমনে যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, এর অবসান না হলে অর্থনীতিকে গতিশীল করা সম্ভব নয়।
আমাদের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। তারাই দেশের উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। কিন্তু কর্মসংস্থানের সুযোগ পর্যাপ্ত না হলে বেকারত্ব আর্থ-সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। এটি শুধু সামাজিক নয়, এই সমস্যা রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সরকারকে প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, তথ্যপ্রযুক্তি খাত এবং ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে উৎসাহ জোগাতে হবে। দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরো শক্তিশালী করা সম্ভব।
উপযুক্ত তথা মানসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষা তৈরি না হলে দেশে শুধু ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা বাড়বে। তাই শিক্ষার মান বিশ্বমানে নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে বিদেশী শিক্ষার্থীরা মানসম্পন্ন শিক্ষা পেতে বাংলাদেশে আসবেন। এতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন একটি ক্ষেত্র তৈরি হবে।
একটি দক্ষ, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন ছাড়া কখনো কাক্সিক্ষত উন্নয়ন সম্ভব নয়। জবাবদিহিতে জাতীয় সংসদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সরকারের যারা প্রতিপক্ষ; তাদের অর্থপূর্ণ ভূমিকা জরুরি। শুধু বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা নয়। যে সমালোচনা সরকারকে সঠিক পথে চলতে সাহায্য করে। প্রশাসনে সমন্বয়হীনতা, দীর্ঘসূত্রতা, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে সরকারের সব উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন এবং প্রশাসনিক সংস্কার জন-আস্থা বাড়াতে পারে।
দুর্নীতি উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়। রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়, অনিয়ম, ঘুষ ও ক্ষমতার অপব্যবহার অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি স্লথ করে দেয়। ইতঃপূর্বে যা ছিল ফ্যাসিবাদী সরকারের লাইফ-স্টাইল। নতুন সরকারকে দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারি ক্রয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন, ভূমি প্রশাসন এবং ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া স্বাধীন তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিও গুরুত্বপূর্ণ।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনের শাসন অপরিহার্য। বিচারপ্রাপ্তির দীর্ঘসূত্রতা কমানো, মামলা জট হ্রাস এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার দক্ষতা বৃদ্ধি নতুন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হতে পারে। সব নাগরিকের জন্য সমান আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা বৃদ্ধি জনগণের আস্থা অর্জনে সহায়ক হবে। বাংলাদেশের সংস্কৃতি ভাষা, সাহিত্য, সঙ্গীত, লোকজ ঐতিহ্য এবং ধর্মীয় বৈচিত্র্যের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির যুগে বিদেশী সংস্কৃতির প্রভাব বাড়ছে। সরকারকে একদিকে আধুনিক সংস্কৃতির ইতিবাচক বিষয়গুলো গ্রহণ করতে হবে, অন্যদিকে নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করতে হবে।
ধর্মীয় সম্প্রীতি, পারস্পরিক সহনশীলতা এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সমাজে সততা, দায়িত্ববোধ, মানবিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমের দ্বারা নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠিত হলে সমাজেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
শিক্ষার মানোন্নয়ন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। গবেষণা, বিজ্ঞান শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। শিক্ষাকে কর্মসংস্থানের সাথে যুক্ত করা, দক্ষতাভিত্তিক পাঠ্যক্রম প্রণয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া জরুরি। স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন নতুন সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা, চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা বৃদ্ধি, আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ এবং ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দিতে হবে। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর করতে হলে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার প্রতিও সমান গুরুত্ব দিতে হয়।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং তাপপ্রবাহ দেশের কৃষি, অর্থনীতি ও জনজীবনে প্রভাব ফেলে। পরিবেশ সংরক্ষণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, বনায়ন, নদীরক্ষা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা জোরদার করা নতুন সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান বিশ্বে অর্থনীতি ও কূটনীতি পরস্পরের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বাংলাদেশকে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও শ্রমবাজার সম্প্রসারণে কার্যকর কূটনীতি পরিচালনা করতে হবে। বৈশ্বিক পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করলে দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ আরো শক্তিশালী হতে পারে। বন্ধুত্বের পরিসীমা বৃদ্ধি এবং স্তরবিন্যাস একটি জরুরি বিষয়। বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় এখন সাইবার নিরাপত্তা একটি বড় বিষয়। অনলাইন জালিয়াতি, তথ্য চুরি, ভুয়া তথ্য প্রচার এবং সাইবার অপরাধ মোকাবেলায় আধুনিক আইন, দক্ষ জনবল এবং উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োজন।
বাংলাদেশের নতুন সরকারের সামনে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক, সাংস্কৃতিক বিশেষ করে দেশ এখন প্রচণ্ড সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মুখে- এমন সব বয়ান দেয়া হচ্ছে। সংস্কৃতির নাকি কোনো সীমান্ত থাকতে নেই। অথচ সাংস্কৃতিক সীমান্ত মুছে গেলে, ভৌগোলিক সীমান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে যেতে পারে। এ এক ভয়াবহ বয়ান। দেশের সার্বভৌমত্বের ব্যাপারে সরাসরি আঘাত। এটি আমরা কে কতটা উপলব্ধি করছি, পরিষ্কার নয়। সংস্কৃতি-সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো নিথর-নীরব। নীতিনৈতিক সব ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ আছে। তবে এসব চ্যালেঞ্জ একই সাথে সংস্কার, উন্নয়ন এবং রাষ্ট্রকে আরো কার্যকর ও জনমুখী করার সুযোগও সৃষ্টি করে।
একটি গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্রগঠনে সরকার শুধু নয়, সব রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই হবে সাফল্যের মূল ভিত্তি।
লেখক : সম্পাদক, নয়া দিগন্ত



