সুশাসনের সাথে স্বনির্ভরতার সম্পর্ক পরস্পর প্রযুক্ত। সম্পূরকও। স্বনির্ভর হতে হলে সুশাসনকে অন্যতম পন্থা হিসেবে মানতে হবে। স্বনির্ভর হতে সুশাসনের অনিবার্যতা উপলব্ধিতে আনতে হবে রূঢ় বাস্তবতার সম্মুখীন পঞ্চান্ন ঊর্ধ্ব বয়সী বাংলাদেশের। ভূরাজনীতির ভায়রা ভাই এবং স্বদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতির চাচা-ভাতিজাদের কার্যকলাপে শুধু বাংলাদেশ কেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যের, আফ্রিকা ও পূর্ব ইউরোপের কয়েকটি পোড় খাওয়া দেশে স্বনির্ভর হওয়ার আকাক্সক্ষা বারবার হোঁচট খাচ্ছে। এসব দেশ স্বনির্ভর হতে এক পা এগোয় তো দু পা পিছায়। তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে বানরের উপরে উঠতে যেমন সময় লাগে বেশি। বর্ণচোরাদের বাড়াবাড়িতে সুখ ও সমৃদ্ধ স্বদেশ গড়ার স্বপ্ন সুদূরে মিলিয়ে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। অস্থির মতিত্বে নিমজ্জিত বিশ্ব রাজনীতি, অমানবিক উন্নয়ন প্রয়াস এবং দুর্নীতি ও দারিদ্র্যের খপ্পর থেকে বের হওয়ার পথ পাওয়া দুষ্কর হয়ে উঠছে। নিজেকে নমরুদের মতো মনে করে ঘণ্টায় ঘণ্টায় স্ববিরোধী হুমকি-ধমকিতে ত্যক্তবিরক্ত গোটা বিশ্ব। ঠিক এ সময়ে স্বনির্ভর হতে ইচ্ছুক বাংলাদেশ জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদ পাওয়ায় দারুণ উৎফুল্ল। সাময়িক সাফল্যে সন্তুষ্ট বাংলাদেশকে একই সময় বর্ডারে পুশইন ঠেকাতে সচেষ্ট থাকতে হচ্ছে। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে নিকট প্রতিবেশীর পরেরজনের সাথে দহরম মহরম বেশি হওয়ার আশঙ্কায় খটোমটো লেগে আছে। মার্কিন মুলুকের ট্যারিফের মিসাইল বহু দেশে ওড়ার ভয় দেখাচ্ছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সংরক্ষণবাদী সংস্কৃতির মাঠঘাট পয়মাল করে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক নদীর পানি ভাগবাটোয়ারায় তখন বসা হচ্ছে, যখন সেই নদী থেকে পানি অলরেডি উধাও। নিরাপদ যাত্রাকে সলিল সমাধিতে পরিণত করে দিচ্ছে। জন্মদাত্রী মায়ের লাশ পচে গলে যায়- সন্তানরা খবরও রাখে না। মূল্যবোধের গলিত এই লাশ, অস্বাভাবিক মৃত্যুর মিছিলে অমঙ্গল শোভাযাত্রার অশনিসঙ্কেত দিচ্ছে। শুধু কালো টাকা না মেধাও পাচার হয়ে যাচ্ছে, ব্যাংকের আমানত পাচার হয়ে যাচ্ছে। রূঢ় বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশকে।
দুর্নীতিবাজরাই প্রতিপক্ষ বানাচ্ছে দুর্নীতির বিরুদ্ধবাদীদের। চাঁদাবাজ পরিচয় পাল্টিয়ে মালাবদলে মাতামাতি করছে। চার দিকে যে লাউ সেই কদুই দৃশ্যমান হচ্ছে। মহার্ঘ্য মূল্য দিয়ে কেনা জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অপব্যবহারের অপচয় আত্মসাতের বোঝা বইতে হচ্ছে যে সমাজকে, সেই সমাজই যত দোষ নন্দঘোষের বলে অভিযোগের তীর ছুড়ছে। হামে শিশু মারা যাচ্ছে। এটা যেন গা সওয়া হয়ে যাচ্ছে। যে মায়ের কোল খালি হচ্ছে, তিনিই বুঝতে পারছেন মর্মবেদনা। অন্যরা প্রতিদিনের মৃতের সংখ্যা শুনে খালাস, যার যা করণীয় কর্তব্য দায়িত্ব সম্পর্কে অর্বাচিনতার অভিনয় করছেন। কে কাকে কেন ভয় পাবে; কে কার কাছে জবাবদিহি করবে, তার ঠিক-বেঠিক সকাল-বিকাল মিলিয়ে যাচ্ছে। যিনি অধীনস্থদের নিয়ন্ত্রণ করবেন তাদের থেকে কাজ আদায় করতে যার দায়িত্ব; তিনি নিজেও আওতাধীনদের সাথে দায়িত্বহীনতায় মিলেমিশে যাচ্ছেন। স্বনির্ভর হওয়ার স্বপ্ন মরীচিকার মতো মিলিয়ে যাচ্ছে।
ব্যাষ্টি ও সমষ্টির জীবনে ন্যায়নীতিনির্ভরতার প্রত্যয়, শুদ্ধাচার বা সদাচার চর্চার তাৎপর্যময় আবশ্যকতার কথা তাবত ঐশী গ্রন্থে, ধর্ম প্রবর্তক-প্রচারকের বাণীতে, সক্রেটিস (খ্রিষ্টপূর্ব ৪৭০-৩৯৯) প্লেটো, (খ্রিষ্টপূর্ব ৪৩৭-৩৪৭), এরিস্টেটল (খ্রিষ্টপূর্ব ৩৮৪-৩২২) এমনকি কৌটিল্যের (খ্রিষ্টপূর্ব ৩৭৫-২৮৩) অর্থশাস্ত্রেও ছিল। সেই সদাচার শুদ্ধাচারের চর্চা অবলম্বন অনুসরণ যুগে যুগে নানান প্রেক্ষাপটে হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটেছে। সদাচার সুশাসন লোপ পেলে ব্যক্তি সমাজ সংসার নিপতিত হয়েছে অরাজক পরিস্থিতিতে। মানবসমাজে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সূচনা- বিকাশ-বিবর্তনও ঘটেছে শুদ্ধাচারের প্রতি আকিঞ্চন আকাক্সক্ষা ও দায়বদ্ধতা থেকে। শান্তি ও শৃঙ্খলার স্বার্থে, সহযোগিতা-সহমর্মিতার স্বার্থে, ন্যায়নীতিনির্ভরতার স্বার্থে ও তাগিদে সুশাসনকে সব সময় অগ্রগণ্য সাব্যস্ত করা হয়েছে। ন্যায়নীতি নির্ভরতার মূল্যবোধ যে সমাজে যত বেশি বিকশিত, পরিপালিত, অনুসৃত হয়েছে- সে সমাজ তত বেশি সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে পেরেছে। বিপরীত অবস্থায় বিপন্ন বিপর্যস্ত হয়েছে বহু সমাজ ও সম্প্রদায়।
পঞ্চান্নয় পা রাখা বাংলাদেশে সর্বাবিধ বিচার বিবেচনায় ভৌত অবকাঠামোগত উন্নতির চমক দেখানোর বিপরীতে নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু, রাজপথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে এবং ক্ষেত্রবিশেষে তাদেরও বেপরোয়া আচরণ, বিদেশে বিপুল অর্থ পাচারের মতো সিন্ডিকেটেড আস্ফালন, দারিদ্র্য পরিবেশ পরিস্থিতিকে উপেক্ষা বরং সর্বত্রগামী দুর্নীতির অগ্রযাত্রায় অর্থনীতির সমূহ সর্বনাশ সাধন, সেবাধর্মী সরকারি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির প্রতিকার না পাওয়ার মতো বিষয়গুলো দিন দিন সাধারণ মানুষকে যাতে আরো উদ্বিগ্ন করে না তোলে, কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে কার্যকলাপ জবাবদিহির বাইরে চলে যাওয়ার মতো ঘটনার প্রতিকার পেতে একজন সাংবিধানিক ন্যায়পালের আবশ্যকতা উঠে আসছে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞরা অভিমত প্রকাশ করছেন, ন্যায়পাল সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানকে আনবে জবাবদিহির মধ্যে। একজন ন্যায়পাল থাকলে সরকারকে মুখোমুখি হতে হবে না অনেক বিব্রতকর পরিস্থিতিরও। চানক্য পণ্ডিতের মতো অনেকে এটাও বলছেন, ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠান সরকারের প্রশাসনকে করতে পারে শক্তিশালী। কেননা মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কারণে সরকারের প্রতি আস্থা হারাতে পারে সাধারণ মানুষ। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি এ আস্থাহীনতাই জন্ম দেয় সামাজিক অনাচার ও রাজনৈতিক সহিংসতার।
মানুষ বিশ্বাসের বিশ্বে বাস করে। পরস্পরের প্রতি আস্থায় বিশ্বাসের ভিত রচিত হয়। আস্থার সঙ্কট তৈরি হলে পরাধীনতার প্রতিভূ হয়ে দাঁড়ায় সহমত সহাবস্থানের। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে স্বনির্ভরতা অর্জনের প্রশ্নে গোটা দেশবাসীকে ভাববন্ধনে আবদ্ধকরণে সবার সুচিন্তিত মতামত প্রকাশের সুযোগ। কর্তব্য পালনে দৃঢ়চিত্ত মনোভাব পোষণ। উদ্দেশ্য অর্জন তথা অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোয় ঐকান্তিক প্রয়াসে সমর্পিতচিত্ত ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস যেমন জরুরি মনে করা হয়। তেমনি জাতীয় উন্নয়ন প্রয়াস প্রচেষ্টাতেও সমন্বিত উদ্যোগের আবশ্যকতা অনস্বীকার্য।
জাতীয় সঞ্চয় ও বিনিয়োগে থাকা চাই প্রতিটি নাগরিকের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অবদান। অপচয় অপব্যয় রোধ, লাগসই প্রযুক্তি ও কার্যকর ব্যবস্থা অবলম্বনের দ্বারা সীমিত সম্পদের সুষম ব্যবহার নিশ্চিতকরণে সবার মধ্যে অভ্যাস, আগ্রহ ও একাগ্রতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠা দরকার। নাগরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা ও উপলব্ধির জাগৃতিতে অনিবার্য হয়ে ওঠে যে, নিষ্ঠা ও আকাক্সক্ষা- তা অর্জনে সাধনার প্রয়োজন। প্রয়োজন ত্যাগ স্বীকারের। কোনো কিছু অর্জনে বর্জন বা ত্যাগ স্বীকার যেমন জরুরি, তেমনি প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মাঝে বাস্তবতা এ জানান দেয় যে, ‘বিনা দুঃখে সুখ লাভ হয় কি মহিতে’?
প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থানে থেকে সব প্রয়াস প্রচেষ্টায় সমন্বয়ের মাধ্যমে সার্বিক উদ্দেশ্য অর্জনের অভিপ্রায়কে অয়োময় প্রত্যয় প্রদান সমাজ উন্নয়নের পূর্বশর্ত। একজন কর্মচারীর পারিতোষিক তার সম্পাদিত কাজের পরিমাণ বা পারদর্শিতা অনুযায়ী না হয়ে; কিংবা কাজের সফলতা ব্যর্থতার দায়দায়িত্ব বিবেচনায় না এনে যদি দিতে হয়; অর্থাৎ কাজ না করেও সে যদি বেতন পেতে পারে, তাহলে দক্ষতা অর্জনের প্রত্যাশা আর দায়িত্ববোধের বিকাশভাবনা মাঠে মারা যাবেই। এ ধরনের ব্যর্থতার বজরা ভারী হতে থাকলে যেকোনো উৎপাদনব্যবস্থা কিংবা উন্নয়ন প্রয়াস ভর্তুকির পরাশ্রয়ে যেতে বাধ্য। দারিদ্র্যপীড়িত জনবহুল কোনো দেশে পাবলিক সেক্টর বেকার ও অকর্মণ্যদের জন্য যদি অভয়ারণ্য কিংবা কল্যাণ রাষ্ট্রের প্রতিভূ হিসেবে কাজ করে, তাহলে সেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে। যদি বিপুল জনগোষ্ঠীকে জনশক্তিতে পরিণত করা না যায়। উপযুক্ত কর্মক্ষমতা অর্জন ও প্রয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি না করা যায়; তাহলে উন্নয়ন কর্মসূচিতে বড় বড় বিনিয়োগও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে। চাকরিকে সোনার হরিণ বানানোয় সে চাকরি পাওয়া এবং রাখতে অস্বাভাবিক দেনদরবার চলাই স্বাভাবিক। দায়দায়িত্বহীন চাকরি পাওয়ার সুযোগের অপেক্ষায় থাকায় নিজ উদ্যোগে স্বনির্ভর হওয়ার আগ্রহতেও অনীহা চলে আসে। মানবসম্পদ অপচয়ের এর চেয়ে বড় নজির আর কী হতে পারে।
দরিদ্রতম পরিবেশে যেখানে শ্রেণিনির্বিশেষে সবার কঠোর পরিশ্রম, কৃচ্ছ্রসাধন ও আত্মত্যাগ আবশ্যক, সেখানে সহজে ও বিনা ক্লেশে কিভাবে অর্থ উপার্জন সম্ভব সে দিকে ঝোঁক বেশি হওয়াটা সুস্থতার লক্ষণ নয়। ট্রেড ইউনিয়ন নির্বাচনে প্রার্থীর পরিচয়ে যে অঢেল অর্থব্যয় চলে তা যেন এমন এক বিনিয়োগ, যা অবৈধভাবে বেশি উসুলের সুযোগ আছে বলেই। শোষক আর পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থায় বঞ্চিত নিপীড়িত শ্রমিকশ্রেণীর স্বার্থ উদ্ধারে নিবেদিত চিত্ত হওয়ার বদলে ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃত্ব নিজেরাই যখন উৎপাদনবিমুখ আর শ্রমিক স্বার্থ উদ্ধারের পরিবর্তে আত্মস্বার্থ উদ্ধারে ব্যতিব্যস্ত হয়ে শোষণের প্রতিভূ বনে যায়; তখন দেখা যায় তারা যাদের প্রতিনিধিত্ব করছে; তাদেরই তারা প্রথম ও প্রধান প্রতিপক্ষ। প্রচণ্ড স্ববিরোধী এই পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে স্বনির্ভরতা অর্জনের আকাক্সক্ষা বালখিল্য হয়ে দাঁড়ায়।
লেখক : অনুচিন্তক



