আইন পেশা, ন্যায়বিচার ও এক বিতর্কিত বিচারপ্রক্রিয়া

যুদ্ধাপরাধের এ বিচারপ্রক্রিয়ার প্রকৃত ট্র্যাজেডি বা নির্মমতা কেবল এখানে সীমাবদ্ধ ছিল না যে, রাজনীতিকরা যেকোনো মূল্যে সাজা বা দণ্ডাদেশ চেয়েছিলেন; কারণ রাজনীতিবিদরা সর্বদা তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে চাইবেন। আসল ব্যর্থতাটি নিহিত ছিল আমাদের আইনজীবী সমাজের একটি বড় অংশ এবং গণমাধ্যমসহ রাষ্ট্রের বহুবিধ প্রতিষ্ঠানের স্বতঃস্ফূর্ত আপসের মধ্যে, যারা নিজেদের স্বাধীনতাকে রাজনৈতিক আনুগত্যের কাছে সম্পূর্ণ সমর্পণ করেছিল। আইনজীবীরা যখন তাদের স্বাধীন সত্তা হারিয়ে যেকোনো আইনি প্রশ্নকে কোনো নির্দিষ্ট দলের সঙ্কীর্ণ চশমা দিয়ে দেখতে শুরু করেন, তখন ন্যায়বিচার অবধারিতভাবে চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়

মানবতাবিরোধী অপরাধের নামে প্রহসনমূলক বিচার এবং তৎপরবর্তী রাজনৈতিক নেতাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার একক দায় স্রেফ ক্ষমতাসীন দল ও তাদের আজ্ঞাবহ বিচারকদের ওপর চাপিয়ে দিলে সত্যের অপলাপ হবে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের এ বিচারিক তামাশার সবচেয়ে বড় দায়টি নিঃসন্দেহে তাদের। তবে এই বিচারের নামে অবিচার তখনই সম্ভব হয়েছে, যখন সমাজের অন্য যেসব প্রতিষ্ঠানের রক্ষকের ভূমিকা পালন করার কথা ছিল, তারা হয় স্বেচ্ছায় মৌনতা অবলম্বন করেছে, অথবা এই অন্যায় প্রক্রিয়ার সহযোগী হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছে।

এর আগেও লিখেছি, কিভাবে গণমাধ্যম এই বিচারগুলোর ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার এবং বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল স্কাইপ কেলেঙ্কারিকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছিল, যেন সেটি তেমন গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নয়। অথচ ওই ঘটনার মাধ্যমে প্রকাশ্যে আসে যে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান এবং প্রসিকিউশন-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মধ্যে সরাসরি ও অনৈতিক যোগাযোগ বিদ্যমান ছিল। একইভাবে সুখরঞ্জন বালীর অপহরণের ঘটনাও ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ, এর ফলে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে আসা একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে আদালতে উপস্থিত হতে দেয়া হয়নি। তবু দেশের শীর্ষস্থানীয় কোনো সংবাদমাধ্যম ঘটনাটির প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে কার্যকর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথ বেছে নেয়নি।

ঠিক একই চিত্র দেখা গেছে খোদ বিচারিক কার্যক্রমের সংবাদ পরিবেশনার ক্ষেত্রেও। এজলাসের ভেতরে প্রতিদিন কী ঘটছে, তার একটি খণ্ডিত ও একপেশে বিবরণ ছাপা হতো প্রায় সব পত্রিকায়। জেরার মুখে যখন রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের বিশ্বাসযোগ্যতার ভিত তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ত, গণমাধ্যম তখন রহস্যজনকভাবে তা চেপে যেত। ফলে, ট্রাইব্যুনালে পেশ করা সাক্ষ্য-প্রমাণের সবল ও দুর্বল দিকগুলো মূল্যায়নের কোনো যথার্থ সুযোগ সাধারণ মানুষের কাছে কখনো ছিল না।

আবদুল কাদের মোল্লার মামলায় কবি কাজী রোজীকে কাঠগড়ায় জেরার সেই দৃশ্যটি আমি আজও ভুলিনি। কবি মেহেরুন্নেসা খুনের প্রসঙ্গে আবদুল কাদের মোল্লার জড়িত থাকার বিষয়ে তার আগের কিছু লেখা যখন তার সামনে তুলে ধরা হলো, যেখানে মোল্লার কোনো উল্লেখ ছিল না, তখনই তার সাক্ষ্যের অসারতা প্রকাশ পেতে শুরু করে। তিনি চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। সেই সাথে বারবার সাক্ষীর কাঠগড়া থেকে পালানোর পথ খুঁজছিলেন। কিন্তু স্রেফ পত্রিকার খবরের ওপর ভরসা করা কোনো পাঠকের বিন্দুমাত্র আন্দাজের সুযোগ ছিল না যে, এজলাসে সেদিন কী ঘটেছিল। ঠিক একই চিত্র দেখা গেছে আল্লামা সাঈদীর মামলায়; যেখানে সাংবাদিক আবেদ খান একাত্তরে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে মঞ্চ কাঁপানো সব বক্তব্য দিচ্ছিলেন। অথচ জেরার মুখোমুখি হয়ে তিনি তার ব্যক্ত করা মতামতের পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য উৎস বা প্রমাণ দেখাতে রীতিমতো হিমশিম খেয়েছিলেন। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, দেশের সাধারণ মানুষ এই সত্যটি সম্পর্কেও প্রায় কিছুই জানতে পারেননি।

সংবাদপত্রগুলো ঠিক কী ছেপে প্রকাশ করছে, এটার চেয়ে কোন কোন বিষয় তারা প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তা কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ‘প্রথম আলো’ এবং ‘দ্য ডেইলি স্টার’ নিঃসন্দেহে সমসাময়িক সময়ের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র ছিল। কিন্তু সামগ্রিক যুদ্ধাপরাধের বিচারপ্রক্রিয়াজুড়ে তারা বিচারের প্রচার-প্রসারের বিষয়টি যেভাবে অগ্রাধিকার দিয়েছে, সেই তুলনায় এর গুরুতর ত্রুটি ও বিচ্যুতিগুলো অনবরত খাটো করে দেখিয়েছে। সত্যকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা কিংবা একটি নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের বিচার নিশ্চিত করার নীতিমালার প্রতি তাদের বিন্দুমাত্র দায়বদ্ধতা ছিল বলে মনে হয় না।

যা হোক, আমার আজকের আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু অন্য একটি প্রতিষ্ঠান, যার ব্যর্থতার দিকটি অনেকটা অলক্ষিত রয়ে গেছে; আর সেটি হলো, আমাদের আইন পেশা বা আইনজীবী সমাজ। আইনজীবীদের একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পেশাজীবী গোষ্ঠী হিসেবে গণ্য করা হয়। তাদের পরম কর্তব্য- আইন এবং ন্যায়বিচারের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করা। কোনো রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা নয়। অথচ এই যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকালীন আমাদের আইন পেশার এক বিশাল অংশ রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে গভীরভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল।

আইনজীবী সমাজের অভ্যন্তরীণ এই রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক বেআইনিভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিল। আবদুল কাদের মোল্লার মামলায় ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যখন আপিল শুনানির জন্য উপস্থাপন করা হয়, তখন সরকারের পক্ষ থেকে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা নিয়ে এক অদ্ভুত আইনি বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়। তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম যুক্তি দেখান যে, ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের অধীনে পরিচালিত বিচারে প্রথাবদ্ধ আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য নয়। এটি ছিল একটি নজিরবিহীন ও বিস্ময়কর যুক্তি। অথচ উভয় ট্রাইব্যুনালই তাদের রায়ে বারবার প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের ওপর নির্ভর করেছিলেন। এমনকি রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটররাও সাবেক যুগোস্লাভিয়ার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটিওয়াই) এবং রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটিআর) আইনি নজিরগুলোর ওপর ব্যাপকভাবে আস্থা রেখেছিলেন। তা সত্ত্বেও, বিষয়টি যখন আপিল বিভাগে পৌঁছাল, তখন সরকার হঠাৎ করে দাবি করে বসল যে, প্রথাবদ্ধ আন্তর্জাতিক আইন এখানে প্রযোজ্য নয়। এর কারণ ছিল অতি স্পষ্ট; যদি প্রথাবদ্ধ আন্তর্জাতিক আইন এখানে প্রয়োগ করা হতো, তবে আবদুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দেয়ার কোনো বাস্তবসম্মত সুযোগ অবশিষ্ট থাকত না।

বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে আপিল বিভাগ ২০১৩ সালের ২০ জুনের এক আদেশের মাধ্যমে আদালতকে সহায়তার উদ্দেশ্যে সাতজন ‘অ্যামিকাস কিউরি’ বা ‘আদালতের বন্ধু’ নিযুক্ত করেন। মনোনীত ওই আইনজীবীরা ছিলেন, টিএইচ খান, রফিক-উল হক, এম আমীরুল ইসলাম, মাহমুদুল ইসলাম, রোকনউদ্দিন মাহমুদ, আজমালুল হোসেন এবং এ এফ হাসান আরিফ। তারা সবাই ছিলেন দেশের আইন অঙ্গনের সর্বোচ্চ জ্যেষ্ঠ ও প্রথিতযশা আইনজীবীদের অন্তর্ভুক্ত।

প্রত্যাশিতভাবে, টিএইচ খান এবং এ এফ হাসান আরিফ যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, ১৯৭৩ সালের আইনের অধীনে পরিচালিত বিচারিক কার্যধারায় প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় ছিল এম আমীরুল ইসলামের অবস্থান। আওয়ামী লীগের সাথে তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং দলটির সরকারের একজন মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সত্ত্বেও, তিনিও প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগের সপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেছিলেন। এটি ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক সততার একটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও অনুপ্রেরণাদায়ী দৃষ্টান্ত। তিনি প্রশ্নটিকে একজন সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক দলীয় কর্মীর দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে, একজন খাঁটি আইনজীবীর পেশাদারিত্ব নিয়ে বিবেচনা করেছিলেন।

তবে অবশিষ্ট ‘অ্যামিকাস কিউরি’ বা আদালতের বন্ধুরা মূলত তাদের রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে বিভক্ত হয়ে পড়েছিলেন। রফিক-উল হক, মাহমুদুল ইসলাম এবং রোকনউদ্দিন মাহমুদ, তারা সবাই প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগযোগ্যতার বিরুদ্ধে যুক্তি প্রদর্শন করেন। আইনজীবীদের এ বিভাজনকে উপেক্ষা করা বেশ কঠিন ছিল। অবশ্য আইনজীবীদের মধ্যে মতদ্বৈধতা থাকাটা স্বাভাবিক; কারণ, আইন প্রায়শই একাধিক যৌক্তিক ব্যাখ্যার অবকাশ দেয়। কিন্তু যখন আইনি মতামতগুলো রাজনৈতিক সহানুভূতির সাথে নিখুঁতভাবে মিলে গিয়ে বিভক্ত হয়, তখন এ প্রশ্ন তোলা অত্যন্ত সঙ্গত হয়ে ওঠে যে, আইনজীবীরা কি আদালতে সম্পূর্ণ স্বাধীন আইন উপদেষ্টা হিসেবে ভূমিকা রাখছিলেন, নাকি তারা কেবল নিজেদের রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের প্রতিফলন ঘটাচ্ছিলেন?

বিচারপতি টিএইচ খানের আইনি যুক্তি ছিল একাধারে সরল ও অকাট্য। তিনি এ মর্মে আলোকপাত করেন যে, ১৯৭৩ সালের আইনে এমন অনেক আন্তর্জাতিক অপরাধের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেয়া হয়নি, যেগুলোর শাস্তি প্রদানের উদ্দেশ্যে আইনটি প্রণীত হয়। কাজেই, সেসব অপরাধের স্বরূপ এবং আইনি উপাদানগুলো বুঝে নিতে ট্রাইব্যুনাল যে প্রথাবদ্ধ আন্তর্জাতিক আইনের ওপর ভরসা করেছিল, তা শতভাগ সঠিক ছিল। এ এফ হাসান আরিফ এ বক্তব্যকে পূর্ণ সমর্থন দেন। তবে ব্যারিস্টার এম আমীরুল ইসলাম বিতর্কটিকে আরো গভীরে নিয়ে যান। তার যুক্তি ছিল, আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনের জগতে প্রথাবদ্ধ আন্তর্জাতিক আইনের অবস্থান সবার উপরে; কারণ এটি মূলত ঠিক করে দেয় যে, কোন পাশবিকতাগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা কিংবা যুদ্ধাপরাধের আওতায় পড়বে। এ বিশেষ ক্ষেত্রে যদি প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের প্রাধান্য অস্বীকার করা হতো, তবে যেকোনো স্বৈরাচারী রাষ্ট্র স্রেফ নিজেদের সংসদে কালো আইন পাস করে তাদের নিজস্ব সরকারের করা নজিরবিহীন গণহত্যা ও নৃশংসতাকে আইনি বৈধতা দিয়ে দিতে পারত। আর তা হলে, আন্তর্জাতিক ফৌজদারি বিচার ও দায়বদ্ধতার পুরো বৈশ্বিক কাঠামোটিই ধূলিসাৎ হয়ে যেত।

অন্যদিকে, প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের বিপক্ষে যেসব যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছিল, তার গভীরতা ছিল খুব সামান্য। রফিক-উল হক এবং মাহমুদুল ইসলাম, দু’জনে দাবি করেন, সংসদের মাধ্যমে বিশেষ কোনো জাতীয় আইন পাস করে সরাসরি স্বীকৃতি না দেয়া পর্যন্ত প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন এখানে খাটানো যাবে না। আইনি ব্যাখ্যার এ জায়গায় এসে তারা এক অদ্ভুত অন্ধত্বের পরিচয় দিয়েছেন; তারা খোদ এ বাস্তবতা ভুলে গেলেন যে, আমাদের জাতীয় সংসদ ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনে এই আন্তর্জাতিক রীতিনীতির দরজা পুরোপুরি উন্মুক্ত করে রেখেছিল।

অ্যামিকাস কিউরিদের পর্যালোচনার জন্য দেয়া দ্বিতীয় বিষয়টিও সমভাবে বিতর্কিত ছিল। ট্রাইব্যুনাল যখন প্রাথমিকভাবে আবদুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন, তখন সেই দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিল করার কোনো আইনি অধিকার সরকারের ছিল না। তবে সরকার যখন তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার বিষয়ে সুনিশ্চিত অভিপ্রায় ব্যক্ত করে, তখন তড়িঘড়ি করে রাষ্ট্রপক্ষকে (প্রসিকিউশন) আপিল করার অধিকার প্রদানপূর্বক একটি আইনি সংশোধনী পাস করা হয়। আসামিপক্ষ (ডিফেন্স) যুক্তি উপস্থাপন করেছিল যে, এ সংশোধনীটি ভূতাপেক্ষভাবে এমন একটি মামলায় প্রয়োগ করা আইনত বৈধ হতে পারে না, যে মামলার দোষী সাব্যস্তকরণ এবং দণ্ডাদেশ, উভয়ই ইতোমধ্যে ঘোষিত হয়ে গেছে।

এখানেও আদালতের বন্ধুরা (অ্যামিকাস কিউরি) আবারো তাদের নিজেদের রাজনৈতিক বৃত্তের টান এড়াতে পারেননি। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, এম আমীরুল ইসলাম, মাহমুদুল ইসলাম, রোকনউদ্দিন মাহমুদ এবং আজমালুল হোসেন, তারা সবাই সরকারের এই অবস্থানকে সমর্থন করেছিলেন যে, একটি বিদ্যমান বা পূর্বঘোষিত দণ্ডাদেশকে চ্যালেঞ্জ করতে সংশোধনীটি ব্যবহার করা যেতে পারে। বিপরীতে, টিএইচ খান এবং এ এফ হাসান আরিফ সম্পূর্ণ ভিন্ন যুক্তি প্রদর্শন করেন। তারা এ অবস্থানে অনড় ছিলেন যে, মৃত্যুদণ্ডের সংবেদনশীল মামলায় মৌলিক ও বস্তুগত অধিকারকে ক্ষুণ্ন করে এমন কোনো ভূতাপেক্ষ সংশোধনী, প্রতিষ্ঠিত আইনি মূলনীতিগুলোর সাথে মৌলিকভাবে চরম অসঙ্গতিপূর্ণ।

২০১৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বরের রায়ে আপিল বিভাগ সম্পূর্ণভাবে সরকারের অবস্থানটিই গ্রহণ করেন। আদালত এ মর্মে সিদ্ধান্ত প্রদান করেন যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের অধীনে পরিচালিত বিচারিক কার্যধারায় প্রথাবদ্ধ আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য নয়। আন্তর্জাতিক আইনকে বিচারিক পরিধি থেকে বাদ দেয়ার পর, আদালত তখন মানবতাবিরোধী অপরাধের নিজস্ব সংজ্ঞা তৈরি করতে অগ্রসর হন। সেই সংজ্ঞাটি আব্দুল কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন। আদালতের রায়ে আরো উল্লেখ করা হয় যে, সংশোধিত আইনের অধীনে আপিল করার পূর্ণ আইনি অধিকার সরকারের আছে। এর পরিণতি ছিল সবার জানা, আবদুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ডে উন্নীত করা হয়।

যা হোক, প্রায় বারো বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর, এটিএম আজহারুল ইসলামের মামলার রায়ে আপিল বিভাগ সেই আইনি অবস্থানকে স্বীকৃতি দিলেন, যা টিএইচ খান, এ এফ হাসান আরিফ এবং এম আমীরুল ইসলাম অনবরত দাবি করে আসছিলেন। আদালত এটি গ্রহণ করেন যে, প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের প্রাসঙ্গিকতা সত্যিই সেখানে ছিল। আদালতের আগের আইনি ব্যাখ্যাটি সঠিক ছিল না। এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আদালত পরোক্ষভাবে এটি নিশ্চিত করলেন যে, আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের পেছনে যে মূল আইনি যুক্তিটি কাজ করেছিল, তা গোড়া থেকে মৌলিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ও ভঙ্গুর ছিল।

যুদ্ধাপরাধের এ বিচারপ্রক্রিয়ার প্রকৃত ট্র্যাজেডি বা নির্মমতা কেবল এখানে সীমাবদ্ধ ছিল না যে, রাজনীতিকরা যেকোনো মূল্যে সাজা বা দণ্ডাদেশ চেয়েছিলেন; কারণ রাজনীতিবিদরা সর্বদা তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে চাইবেন। আসল ব্যর্থতাটি নিহিত ছিল আমাদের আইনজীবী সমাজের একটি বড় অংশ এবং গণমাধ্যমসহ রাষ্ট্রের বহুবিধ প্রতিষ্ঠানের স্বতঃস্ফূর্ত আপসের মধ্যে, যারা নিজেদের স্বাধীনতাকে রাজনৈতিক আনুগত্যের কাছে সম্পূর্ণ সমর্পণ করেছিল। আইনজীবীরা যখন তাদের স্বাধীন সত্তা হারিয়ে যেকোনো আইনি প্রশ্নকে কোনো নির্দিষ্ট দলের সঙ্কীর্ণ চশমা দিয়ে দেখতে শুরু করেন, তখন ন্যায়বিচার অবধারিতভাবে চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়।

লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি